মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর, ২০১২

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন কুন্ডুবাড়ির মেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন হিসাবে আখ্যায়িত করলে অত্যুক্তি করা হবে না। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালী পূজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত কুন্ডুবাড়ির মেলায় আগত দর্শনার্থীর সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানই কয়েকগুণ বেশি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-‘ গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান।’ এইতো ছিল আমাদের গ্রামবাংলার সম্প্রীতির চিরায়ত সংস্কৃতি। কিন্তু ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় গোড়ামী আজ যখন সাম্যের পথে বাধা হয়ে শক্ত প্রাচীর গড়তে যাচ্ছে সে সময়ে এমন মিলন মেলা আমাদের অবশ্যই স্মরণ করিয়ে দেয় ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ আমরা ফিরে পেতে চাই সোনালী দিন। আমরা বলতে চাই- আমরা জন্মসুত্রে বাংলাদেশী। জাতিগত পরিচয়ে আমরা এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়- মেলার একদিকে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। অন্যদিকে বিশাল এলাকা জুড়ে পণ্যের বিকি-কিনি। সর্বোপরি বাধভাঙা আনন্দ উপচে পড়ে বিনোদন মঞ্চে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসে তাদের পণ্যের পসার সাজাতে। দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ আসবাবপত্রের মেলা হিসাবে খ্যাত কুন্ডুবাড়ির মেলা শতবছর পেরিয়ে সহস্র-অযুত-লক্ষ-নিযুত-কোটি বছর কিংবা আজীবন টিকে থাকবে। টিকে থাকবে এ অঞ্চল তথা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ হিন্দুদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেলাকে সফল করতে নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসে স্থানীয় মুসলমানরা। সম্প্রতি রামু ও উখিয়ায় ঘটে যাওয়া সহিংসতাও দমাতে পারেনি আয়োজকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা । গ্রামবাংলার শতবছরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দলমত নির্বিশেষে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার কমতি নেই স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের।
কুন্ডুবাড়ির মেলার উৎপত্তির ইতিহাস দুর্বোধ্য হলেও ধারণা করা হয়- স্থানীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালীপূজা উপলক্ষে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার গোপালপুর গ্রামের কুন্ডুবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা। সঠিক দিন তারিখ কেউ না জানলেও ধরে নেওয়া হয় আনুমানিক আঠারো শতকের শেষের দিকে কুন্ডুদের পূর্বপুরুষরা ধর্মীয় উৎসব কালীপূজার আয়োজন করে। ক্রমান্বয়ে তাদের পূজাকে ঘিরে প্রথমে বাদাম, বুট, রয়্যাল গুলি, লাঠি লজেন্স, মন্ডা-মিঠাই ও খেলনা নিয়ে অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী বসতো। পরে আস্তে আস্তে প্রতিবছর ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় এখবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে স্থানীয়রা এর নামকরণ করেন ‘কুন্ডুবাড়ির মেলা’ নামে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থিরতার মধ্যে মেলা বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ মেলা জমজমাটভাবে হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও ১৩ নভেম্বর সকাল থেকে ১৭ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কুন্ডুবাড়ির মেলা। তিন দিনব্যাপী হওয়ার কথা থাকলেও ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে আরো দু’দিন বাড়িয়ে সমাপ্ত হলো। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা বাঁশ, বেত, ইস্পাত-কাঠের আসবাবপত্র, খেলনা ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে আসেন। অনেকে আসেন পণ্য সামগ্রী কিনতে। পাশাপাশি নাগর দোলা, পুতুল নাচসহ বিভিন্ন বিনোদনে আকৃষ্ট হয় দর্শনার্থীরা। বস্তুত বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেলা হয়ে ওঠে উপভোগ্য। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চাপ কম থাকলেও বিকেলের পরে বাড়তে থাকে জনস্রোত। বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয় মেলা প্রাঙ্গন। তবুও মেলার দীর্ঘ ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার নজির নেই।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা কেউ কেউ বাচ্চাদের জন্য খেলনা, আসবাবপত্র কিংবা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনছেন। আবার কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ব্যবসায়ীদের প্রচুর লাভ হয়। কোন ঝুট-ঝামেলাও নেই। মেলা উদযাপন কমিটিও যথেষ্ট আন্তরিক। কুন্ডুবাড়ির মেলা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ণ। তাই বংশ পরম্পরায় তারা এ ঐতিহ্যকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। তিনি আরো জানালেন, তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি আঠারো শতকের শেষের দিকে এ মেলার প্রবর্তন করেন। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ মিলন মেলা। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সব ধর্মের মানুষ আসে। হিন্দু-মুসলমান কে কোন জাত সে বিচারের উর্ধ্বে গিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন গড়াই সকলের উদ্দেশ্য। জাতিগত সীমাবদ্ধতার বাহিরে উদার মানসিকতার পরিচয় মেলে এখানে। বেচা-কেনা কেবল উপলক্ষ মাত্র। আমরা বাঙালি। আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার একাত্মতা ঘোষণার একটা প্লাটফর্ম বলা যায়।
মেলার অগণিত মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য পূজা মন্ডপের পাশে স্থায়ীভাবে একটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাদের সহযোগিতা করেন। ফলে বিশৃঙ্খলার কোন সুযোগ নেই। কুন্ডুদের পূর্বপুরুষদের প্রবর্তিত এ মেলা শতবছর পেরিয়েছে। মেলার আয়োজকরা হিন্দু হলেও এটা এখন এলাকার ঐতিহ্য ও সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ঐতিহ্য ও সম্পদ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের। ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা এ অঞ্চলের প্রাণের উৎসব। তাই পূর্ব নির্ধারিত তিনদিনের হলেও বর্ধিত আরো দু’দিন অর্থাৎ পাঁচদিনে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে এ উৎসব। কুন্ডুবাড়ির মেলা আমাদের শিক্ষা দেয়- রামুর মতো আর সহিংসতা নয়। মানুষে মানুষে হৃদ্যতাই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমরা বাঁচতে চাই- হাতে হাত রেখে। আমরা বাঁচতে চাই- কাঁধে কাঁধ রেখে।
বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গন ঘুরেও মনে হয় ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে/ যেন শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ জনসমুদ্র সাঁতরে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে পড়ে যায়- ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা/ অগ্রাণে নবান্ন উৎসবে/ আবার বাংলা ভরে উঠবে সোনায়/ বিশ্ববাসী চেয়ে রবে।’ আমাদের শুধু একটাই প্রার্থনা, শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা টিকে থাকুক মানুষের ভালোবাসা আর বন্ধনে। সাম্য ও মৈত্রী হোক এর একমাত্র লক্ষ। কোন অসাম্প্রদায়িকতা যেন এর পবিত্রতাকে বিনষ্ট করতে না পারে এ প্রত্যাশা সকলের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভরে উঠুক প্রিয় স্বদেশ। একই দুর্বা ঘাসের শিশিরে সিক্ত হোক সকলের চরণ। এক শীতল আবেশে সম্প্রীতির সুবাতাস বইয়ে দিক সবার অন্তরে। এক সামিয়ানার নিচে সব ব্যবধান ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে গেয়ে উঠুক মানবতার জয়গান। কুন্ডুবাড়ির মেলা দীর্ঘজীবি হোক। অটুট বন্ধনে চিরজীবি হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এর সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয় সবার উপরে সম্প্রীতি সত্য তার উপরে নাই।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১২

প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধির ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের বিচারের দাবীতে গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কালকিনি বন্ধুসভার উদ্যোগে স্থানীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে কালকিনি বন্ধুসভার সভাপতি সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে মিজানুর রহমানের সঞ্চালনে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক মোঃ জামাল উদ্দিন, খন্দকার মনিরুজ্জামান, আসাদুজ্জামান রিপন, সাইফুল ইসলাম, তপন বসু, ওমর আলী সানি, আঃ গফুর মোল্লা, জহিরুল ইসলাম খান, উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন, মাদারীপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী রতন কুমার দাস প্রমুখ। বক্তারা খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সকালে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলাল ও তার সমর্থকদের হামলায় প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলম গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন চিরকাল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
‘কেউ কথা রাখেনি’- কবিতাটি প্রথম শুনি খালাতো ভাই মহিউদ্দিনের কন্ঠে। খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। কবিতার কবিকে চিনতাম না। তবে নাম শুনেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কবিতার সাথে সেই আমার প্রথম প্রেম। কবিতার বইটি খুঁজতে থাকি। নাম জানিনা। ২০০৩ সালে যখন ঢাকায় থাকি; তখন একদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশের রাস্তায় পুরনো বইয়ের দোকানে ‘সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামের একটি পুরনো বইয়ের ওপর চোখ পড়ে। হাতে নিয়ে খুলে দেখি-‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতা আছে। একটি কবিতার জন্য বিশ টাকা দিয়ে বইটা কিনলাম। একদিন পত্রিকায় দেখি- কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর জন্মস্থান কালকিনিতে এসে নোংড়া রাজনীতির শিকার হয়েছেন। কালকিনিবাসী তাঁর কথা রাখেনি।
২০০৫ সালে বাংলা সাহিত্যে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আসি কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে। তখন কলেজে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য বাছাই পর্বে ‘কেউ কথা রাখেনি’ আবৃত্তি করলাম। বাছাইতে টিকলেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারিনি। খুবই আহত হয়েছিলাম। কারণ বিচারকরা আমার কথা রাখেননি। এরপর আবৃত্তিটাকে আঁকড়ে ধরলাম। শিমুল মুস্তাফা, মাহিদুল ইসলাম, মেহেদি হাসানদের অডিও ক্যাসেট কিনে রোজ শুনতাম। তারপর অনেক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছি। আমার আবৃত্তি জীবনে ঐ একটা কবিতাই মুখস্থ। এরপর যত আবৃত্তি করেছি তা মুখস্থ করিনি। স্ক্রীপ্ট দেখে করেছি।
২০০৬ সালে কলেজের নোটিশ বোর্ডে সুনীল সাহিত্য ট্রাস্টের গল্পলেখা প্রতিযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছি। পুরস্কারে সুনীলের লেখা ‘কাকাবাবু’ পেয়েছিলাম। এরপর আত্মীয়ের বাড়িতে ‘সোনালী দুঃখ’ পড়েছি। আস্তে আস্তে সুনীলের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। সেই থেকে বছরে একটা ছোটগল্প লিখে জমা দিতাম। তারমধ্যে ২০১০ ও ২০১১ সালেও ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছি। পুরস্কারের সাথে কবির হাতের লেখা আশির্বাদ পত্র দেওয়া হয়। সেখানে লেখা ‘আমি তোমাদের মাঝে বেঁচে রই চিরদিন চিরকাল!- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।’ কবির আর্শিবাদ আমাকে কবির কাছে ঋণী করে দেয়। এখন মনে হচ্ছে মাদারীপুরে প্রবর্তিত সুনীল সাহিত্য পুরস্কারকে জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তবেই হয়তো কবির কথা না রাখার দীনতা ঘুচাতে পারবো।
২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার জন্মভিটায় পা রাখবেন। শুনে আনন্দিত হলাম। শরীরী কবিকে দেখব। এ যেন অন্যরকম অনুভূতি। অশরীরী সুনীলের সাথে প্রথম পরিচয় খালাবাড়ির ঘরোয়া আড্ডায়। দ্বিতীয় পরিচয় পল্টনের ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকানে। তৃতীয় পরিচয় সুনীল সাহিত্য পুরস্কারে। কবির সাথে শেষ দেখা মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে। কবির কাছে গিয়েছি, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছি। কবি মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করেছেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনেছি। কবিকে দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে কবি-অকবিরা ছুটে এসেছেন। নির্জনে বা একান্তে কথা বলার সুযোগ কারোই হয়নি।
তবে সৌভাগ্য আরেক আবৃত্তি শিল্পী মেহেদী হাসানের। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার ছেলে। চাকরি করতো পুলিশের বিশেষ শাখায়। পুলিশ হলেও রসবোধ চমৎকার। সংস্কৃতির চর্চা করেন। তার দায়িত্ব ছিল কবিকে বেনাপোল থেকে নিয়ে আসার। সাথে ছিলেন মাদারীপুর শিল্পকলা একাডেমীর নাট্যপ্রশিক্ষক আ জ ম কামাল ও উদ্ভাস আবৃত্তি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কুমার লাভলু। মেহেদী হাসানরা কবিকে একা পেয়ে ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার গোড়ার কথা জানতে চেয়েছিলেন। কবি অকপটে সব বলেছেন। মেহেদী হাসান আবৃত্তি করছেন আর কবি ব্যাখা করছেন। কবি বলেছিলেন, তাঁর বয়স যখন তেত্রিশ পেরিয়ে গেছে তখন এমন অনুভূতি তাকে তাড়িত করেছে। তাই তিনি লিখলেন ‘কেউ কথা রাখেনি।’ কবিতার কিছু অংশে কল্পনার সংমিশ্রন থাকলেও পুরো কবিতাটিই বাস্তবতার আলোকে লেখা। কবিতায় বোষ্টুমীর প্রসঙ্গ কাল্পনিক হলেও অবাস্তব নয়। কবি ১৯৩৪ সালে ৭ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার আমগ্রামের নানা বাড়িতে। তখন পৈতৃক নিবাস কালকিনির মাইজপাড়ায়। সম্ভবত ১০-১১ বছর বয়সে অর্থাৎ দেশভাগের আগেই পরিবারের সাথে চলে যান কলকাতা। সেখানেই কেটেছে তার পুরোটা জীবন। দেশভাগ তাকে আহত করেছে বারবার। যা তার বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। তবু তিনি ভুলতে পারেননি শৈশবের স্মৃতি। দেশভাগ করে কথা রাখেননি নেতারা। কিন্তু কবি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ‘পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায়’ থেকেছেন। সে সময় মনে হয়েছে তার মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী তাকে বলেছিল,‘বড় হও দাদাঠাকুর তোমাকে আমি/ তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব’। কবির আর সে বিল দেখা হয়নি।
তিন প্রহরের বিলে সাপ আর ভ্রমরের প্রসঙ্গ এলে কবি মুচকি হাসলেন। তিনি বললেন, তখন আমি ছোট ছিলাম। মামারা যখন নৌকা নিয়ে বিলে যেত। তখন আমিও বায়না ধরতাম। কিন্তু মামারা নিতেন না। ছোট্ট সুনীলকে ভয় দেখানোর জন্য বলতেন, সে বিলে যেতে- আসতে তিন প্রহর লেগে যায়। তুমি অতো দূরে কি করে যাবে। আর সেখানে ভয়ঙ্কর সাপ রয়েছে। সেই বোধ থেকেই বিলের নাম দেই তিন প্রহরের বিল। আর সাপ আর ভ্রমরের খেলাটা বাচ্চাদের ভয় দেখানোর জন্য বলা। এসময় আ জ ম কামাল অভিযোগ করে বললেন, কবি কবিতায় আপনি মুসলমানদের ছোট করেছেন। একটি মাত্র চরিত্র তাও আবার মাঝি। কবি তখনও হাসলেন। বললেন, আরে কামাল শোন, তখন মুসলমানরা এখনকার মতো এতো সচেতন ছিলেন না। আমি তাদের ছোট করিনি বরং তাদের পশ্চাৎপদতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তখনও মুসলমানরা শিক্ষাদীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল। মামাবাড়ির আশপাশের মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের বাড়ির কামলা খাটত বা নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো।
কবিরা আর্থিকভাবে অতটা স্বচ্ছল ছিলেন না। মার্বেল খেলার জন্য একটা রয়্যালগুলিও তিনি কিনতে পারেননি। তখন মাইজপাড়ার লস্কররা খুবই বিত্তবান ছিলেন। লস্কর বাড়ির ছেলেদের লাঠি লজেন্স খেতে দেখে কবি বাবার কাছে বায়না ধরতেন। বাবা বলতেন, পরে কিনে দেব। কবি অপেক্ষায় থেকেছেন। বাবা স্কুল মাস্টার। বেতন কম। তাই তার মা কবিকে বলতেন, জীবনে অন্য কিছু করবে তবু মাস্টারি করবে না। তাই কবি কখনো মাস্টারি করতে যাননি। রাস উৎসবের যে অনুসঙ্গ এসেছে এব্যাপারে কবির বক্তব্য হচ্ছে- কবি ছেলেবেলায় খুব ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। তাদের গাঙ্গুলি বাড়িতে যখন রাস উৎসব হতো তখন ভেতর বাড়িতে মহিলারা নাচ-গান করতেন। কবি তার ব্যাঘাত ঘটাবেন বলে তাকে সেখানে ডুকতে দেওয়া হতোনা। নিচেকে অসহায় কল্পনা করে কবি এমন অভিব্যক্তি করেছেন। কবি তখন ভাবতেন, একদিন আমিও সব পাব। রয়্যাল গুলি, লাঠি লজেন্স আর রাস উৎসব সবই তিনি পেয়েছেন। কিন্তু তার বাবা এসব কিছুই দেখে যেতে পারেননি। আজ সুনীলের সব আছে কিন্তু তার স্কুলমাস্টার বাবা নেই। এই শূন্যতা তাকে বারবার গ্রাস করেছে।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- কবিকে যখন বরুণার প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলো; কবি তখন মুচকি হেসে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন। হয়তো তখন কবির সঙ্গে তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন বলে। কবি শুধু এইটুকু বললেন, এটা কল্পনা। বরুণা বলে কেউ ছিলনা। তবে পরে আমরা জেনেছি, কবির এক বন্ধুর বোনের প্রতি কবির দূর্বলতা বা ভালোবাসা জন্মেছিল। কবি তার কোন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সে সময়ে একমাত্র বন্ধুর সুবাদে কেবল বন্ধুর বোনের সাথেই কথা বলার বা ভাববিনিময়ের সুযোগ ছিল। হবে হয়ত বরুণা তার কল্পনার নারী। কিন্তু বরুণা বেঁচে আছে সব প্রেমিকের অন্তরে।
কবি কুমার লাভলুকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, লাভলু তুইতো বিয়ে করলি না। চিরকুমার থেকে গেলি। আচ্ছা, তুই কি নাস্তিক হতে পেরেছিস? কুমার লাভলু বলেছিল, ভয় পাই। পূর্ব পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করি কিভাবে? কবি বললেন, জানিস লাভলু ‘আস্তিক হওয়া খুব সহজ; কিন্তু নাস্তিক হওয়া বড়ই কঠিন।’ কথাটায় হাস্যরসাত্মক পরিবেশটা হঠাৎ গুরুগম্ভীর হয়ে উঠলো। গাড়ি বেনাপোল থেকে চলে এল মাদারীপুর। ৭৫ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করতে কবি এলেন তার জন্মভিটায়। এটা কবির জন্য যতটা আনন্দের; মাদারীপুরবাসীর জন্য ততটা গর্বের। তিন দিন অবস্থান করে কবি আবার চলে গেলেন তার গড়িহাটির পারিজাতে। রেখে গেলেন স্মৃতি। অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশভাগের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে সৌহার্দের মিলনরেখা। কিন্তু সব ছেড়েই তাকে চলে যেতে হলো ২২ অক্টোবর। পড়ে রইল পারিজাত। পড়ে রইল জন্মভিটার সুনীল আকাশ। কেউ কথা না রাখলেও আমরা আগলে রেখেছি তার সুনীল আকাশ সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র এবং সুনীল সাহিত্য পুরস্কার। কবি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তার কর্মে। কবি বেঁচে থাকবেন আমাদের মর্মে। আমাদের চিন্তা-চেতনায়, আমাদের উপলব্ধিতে। তিনি বেঁচে থাকবেন চিরদিন চিরকাল।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
সুনীল সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।

নেই

দুলাল সরকার
(সদ্যপ্রয়াত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণে)

গৃহপালিত সকল শব্দের মধ্যে
‘নেই’ শব্দটি বড় বেশি কাছের
ও একি সাথে দূরের যেন দিগন্তের ওপাড়ে
এক বাস্তুভিটার ’পর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা
এক পথের চুপচাপ, স্তব্ধতার হাসি;

‘নেই’ মানে শূন্যের আভাসÑ দৃশ্যান্তরে
বিমূর্ত সত্তার কারুকার্যখচিত পাথরÑ
পাথরে চুম্বন সদৃশ্য কিছু তন্ময় বেদনা,
কিছু অনুভূতি, ধূ ধূ রাত, তেপান্তর নামের বিরহ।
স্বাতীর কপাল লগ্ন চুলের বিদ্রোহÑ
কেউ ছিল, এইমাত্র উঠে যাওয়া
ঘামের গন্ধ নিয়ে ভাঙা বাতাস, অশ্লীল উত্তাপ;
চোরাগুপ্ত হামলার শিকার
অথবা কতটা সত্যÑ ‘নেই’ মানে
বিশ্রী সহ্যের শেষে গুমোট আঁধারে বসে পীড়িত জোছনা;

‘নেই’ মানে গন্ধহীন গোলাপের ভাজ
বিষণœ ত্বকের নিচে বাস্তুহারা ‘নেই’ এর সংবাদ
হারানো চাবির গোছাÑ
অনুমোদনহীন আত্মসমর্পণের দৃশ্য মঞ্চের উপর।
২৪.১০.২০১২

মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১২

কথা না রাখার দু:খ নিয়ে প্রস্থান সুনীলের

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সকালে ঘুম ভাঙে সাংবাদিক বন্ধু রফিকুল ইসলামের ফোন পেয়ে। কিছুক্ষণ পর কবি দুলাল সরকারের ফোন। তারপর নাট্যব্যক্তিত্ব আ জ ম কামাল। কবি আকন মোশাররফ হোসেনও ফোন দিলেন। সবার একই কথা- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর নেই। অনেকটা বিদ্যুতাড়িত হওয়ার মত। ঝিম মেরে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম তাঁকে। তাঁর জন্মস্থানে শেষবারের মত যখন এলেন। অনেক হাসি-আনন্দের স্মৃতি রয়েছে প্রত্যেকের অন্তরে। বন্ধনের সুতোয় যেন টান পড়েছে। কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয়-তাই ছুটে গেলাম তার জন্মভিটায়। একটু স্বান্তনা, একটু শেষ শ্রদ্ধা জানাবার তাগিদে।
‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি’- এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন দুই বাংলার বিখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমরা তার কথা রাখার চেষ্টা করেছি। কতটুকু পেরেছি জানি না। ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’- এভাবে অঅর নিখিলেশকে ডাকবেন না তিনি। তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
২২ অক্টোবর রাত ২টায় কলকাতার নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর চলে আসে তাঁর জন্মস্থান মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত পুরো উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ। ভোর থেকেই তাঁর জন্মস্থানে ছুটে আসেন স্থানীয় কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও সাংবাদিকসহ তাঁর ভক্ত অনুরাগিরা। সবাই শোকাহত। শোকে স্তব্ধ তার সুনীল আকাশ (সুনীল সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র)। তাঁর হাতে লাগানো নারিকেল গাছের চিড়ল পাতা বেয়ে ভোরের শিশির হয়ে ঝরে পড়ছে কবি হারানোর শোক। গাঁয়ের আকা-বাঁকা মেঠো পথে শোকাহত মানুষের দীর্ঘ সারি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের আগেই ১০-১১ বছর বয়সে কষ্ট আর অভিমান নিয়ে পরিবারের সাথে চলে যান ভারতের কলকাতায়। অনেক বছর পর প্রথম এসেছিলেন ২০০৩ সালে। চারিদিকে তখন অনেক খ্যাতি। তবু তিনি ভোলেননি তাঁর জন্মস্থানের মাটি। তখন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের একাডেমিক ভবনের শুভ উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নোংরা রাজনীতির শিকার হন তিনি। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেই অনেক কষ্ট নিয়ে চলে যান কলকাতায়।
এরপর সর্বশেষ ৭৫তম জন্মদিনে ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর এসেছিলেন নিজ গ্রামে। তাঁর জন্মবার্ষিকী ও আগমন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপি সুনীল মেলা বসেছিল। চারিদিকে অফুরন্ত উচ্ছ্বাস। নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর সফর সঙ্গী হয়েছিলেন স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, কবি বেলাল চৌধুরী ও আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনসহ বাংলাদেশ ও কলকাতার অনেক গুণীজন।
তিন দিন অবস্থান করেছিলেন কালকিনির মাইজপাড়ায়। ঘুরে ঘুরে দেখেছেন আর বাল্যকালের স্মৃতি হাতড়ে বেরিয়েছেন। যাবার সময় বলে গিয়েছিলেন-‘কালকিনির মানুষের ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি শুধু ওপার বাংলার কবি নই। আমি বাংলা ভাষার কবি।’
আজ তাঁর প্রস্থানে ছুটে গিয়েছিলাম মাইজপাড়ায়। অযতœ অবহেলায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সুনীল আকাশ গবেষণা কেন্দ্র। লতায় জড়িয়ে আছে কবির রোপন করা নারিকেল গাছ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। তবে কি তার স্মৃতিবিজড়িত এসব কালের গর্ভে একদিন বিলীন হয়ে যাবে? আমাদের কি কিছুই করার নেই। তিনি হয়তো আর আসবেন না। তার পদস্পর্শ আর স্মৃতিময় তিনটি দিনকে কি আমরা স্মৃতির ফ্রেমে আটকে রাখতে পারবো না? এমন আকুতি আর সংশয় আজ সবার মনে।
কবির বাল্যবন্ধু আব্দুর রাজ্জাক কাজী বললেন, সুনীল ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। আজ সে চঞ্চলতা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবারা তোমরা ওর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটু ব্যবস্থা করো। আমরা চাই সুনীল মেলা প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হোক। তার স্মৃতি অম্লান থাকুক। তিনি জানালেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জন্মস্থানে এসে গ্রামসহোদর কানাডা প্রবাসী লেখক রাজ্জাক হাওলাদারের বাড়িতে ছিলেন। তারা তাঁর পছন্দের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কবি খাল-বিলের মাছ খুব পছন্দ করতেন। কৈ, শিং ও মাগুর মাছ ছিল তাঁর প্রিয়।
আমাদের পেয়ে এলাকাবাসী একটি দাবি জানায়। আমরাও তার সাথে ঐকমত্য পোষণ করি। সে দাবিটি হলো- তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বালিগ্রাম ইউনিয়নের পাথুরিয়া পাড় থেকে মাইজপাড়া পর্যন্ত সড়কটি ‘সুনীল সড়ক’ নামে নামকরণ করা হোক। তিনি বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে। সুস্থ্য থাকলে এবারের সুনীল মেলায় তাঁর আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে সুনীল আকাশ গবেষণা কেন্দ্রের সংস্কার প্রয়োজন। সুনীল মেলা যাতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মেলা থেকে যেন আমরা কিনতে পারি কবির প্রিয় রয়্যাল গুলি, লাঠি-লজেন্স। তাহলে হয়তো আমরা তাঁর কথা রাখতে পারবো। যে কথা বরুণা রাখতে পারেনি। আমরা তা রাখার চেষ্টা করবো। দুরন্ত ষাড়ের চোখে বাঁধবো লাল কাপড়। খুঁজে এনে দেব একশ’ আটটা নীল পদ্ম। জয়তু সুনীল দা। আশির্বাদ করো- আমরা যাতে তোমার কথা রাখতে পারি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১২

অসমাপ্ত কথা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

১.
যার সাথে তোমার আজন্ম শত্র“তা
তার সাথে তোমার চির বসবাস,
যাকে দেখলে তুমি আঁৎকে ওঠ
পুলকিত করবে তার পরশ।

২.
ছাই ভেবে যেই ছুঁতে গেলাম
হয়ে গেল সোনা,
ভালোবাসি তোমায় শুধু
আর কিছু বলবো না।

৩.
চিটচিটে বালিশ
খিটখিটে মেজাজ
ছেঁড়া কাঁথা-কম্বল,
ফুটো মশারী
বিরহী সুখ
এসবই আজ সম্বল।

কালকিনি, মাদারীপুর
২২.১০.২০১২

মঙ্গলবার, ৯ অক্টোবর, ২০১২

অবহেলিত আজ মানুষ গড়ার কারিগর

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
বাদশাহ আলমগীর তাঁর ছেলেকে বিদ্যা অর্জনের জন্য দিল্লীর এক শিক্ষকের কাছে দিয়েছিলেন। একদিন সকাল বেলা তিনি ছেলেকে দেখতে শিক্ষকের বাড়ি গেলেন। গিয়ে দেখলেন তাঁর ছেলে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর শিক্ষক নিজ হাতে পা ধুয়ে নিচ্ছেন। এটা দেখে তিনি কিছু না বলে চলে এলেন। পরে শিক্ষককে ডাকলেন। বললেন, আপনি কাজটি ঠিক করেন নি। এ কথায় শিক্ষক ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে কাজ করিয়েছি। নিশ্চয়ই মহা অন্যায় হয়ে গেছে। তিনি তার অপরাধ জানতে চাইলেন। বাদশাহ আলমগীর তখন বললেন, আপনি আমার ছেলেকে আদব-কায়দা কিছুই শেখান নি। আমার ছেলে শুধু আপনার পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছিল। তার তো উচিৎ ছিল নিজ হাতে আপনার পা ধুইয়ে দেওয়া।
এতো অনেক আগের কথা। গল্পের মতো মনে হয়। আমরা কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় এ ঘটনা জেনেছি। ইতিহাসও সাক্ষী। এখন বাদশাহ আলমগীরের যুগ নেই। তাই বলে কি শিক্ষকদের মর্যাদাও নেই। ইতিহাস আজ ভিন্নভাবে লিখতে হয়। সে ইতিহাস শিক্ষকদের অবহেলার ইতিহাস। লাঞ্ছনা আর নির্যাতনের ইতিহাস। আমরা অতীত ভুলে যাচ্ছি। সরকার বাহাদুরই শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে জানেন না। তার পোষা সন্তানেরা কীভাবে শিক্ষকের মর্যাদা দিবে। তা নাহলে গত চার অক্টোবর সরকার বাহাদুরের পোষা পেটোয়া পুলিশ সন্তানেরা কীভাবে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে। এ কথা লিখতে গিয়ে যেখানে আমাদের হাত কেঁপে উঠছে। সেখানে তাদের বুক এতটুকুও কাঁপলো না।
নিয়তির নির্মম পরিহাস! যে পুলিশের হাতে আজ শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছে, তারা কোন না কোন শিক্ষকের ছাত্র ছিল। তাদের মানুষ করার দায়িত্ব ঐ শিক্ষকরাই নিয়েছিল। আজ প্রাক্তন ছাত্রদের ছোড়া কাদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও লাঠিপেটার যন্ত্রণা নিয়ে পরদিন চোখের জলে পালন করতে হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকরা দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তাঁরা হয়ত তাঁদের বেয়াদব ছাত্রদের বরাবরই ক্ষমা করে দেন। কিন্তু বিবেকবান মানুষ এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের যথাযোগ্য শাস্তি কামনা করেন। বাকিটা নির্ভর করে সরকার বাহাদুরের ওপর। কারণ এ ব্যর্থতা তার এবং এমন আচরণের দায়ভারও তার। জাতির এমন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের যেন আর পুণরাবৃত্তি না ঘটে- এ প্রত্যাশা সকলের। 
‘যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত’-কথাটাকে আজ উল্টে বলার সময় চলে এসেছে। তাই অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয়-‘যে জাতি যত বেশি শিক্ষকদের পেটায় সে জাতি তত বর্বর।’ এটাই আজ নির্মম বাস্তব সত্য। এটা অস্বীকার করার কোন পথ বা উপায় নেই।
সরকার বাহাদুর আইন করে শিক্ষকদের হাত থেকে বেত বা লাঠি কেড়ে নিয়েছেন। সে লাঠি আজ তাদের পিঠেই। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়-‘বাহ! কী চমৎকার দেখা গেল।’ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে পেটানো বা কোন রকম সাজা দেওয়া আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। শিক্ষকরা তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু রাজপথে পুলিশ দ্বারা শিক্ষক পেটানো কি অপরাধ নয়? এমন অপরাধও কি মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বাইরে প্রাইভেট পড়ানো কিংবা কোচিং করানো সরকার বাহাদুর অবৈধ ঘোষণা করেছেন। শিক্ষকরা তাও মেনে নিয়েছেন। তাহলে শিক্ষকদের দাবি সরকার বাহাদুর কেন মেনে নেবেন না। মেনে নিলে তো আজ এ রকম লজ্জাজনক ইতিহাস লিখতে হতো না।
শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষার্থীর মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা-মার চেয়ে শিক্ষকের অবদানই বেশি। এ কথা আমরা স্বীকার করি কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে তা মানতে চাই না। ভুলে গেলে চলবে না- শিক্ষকেরা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ পুলিশি নির্যাতনের পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসে শিক্ষকরা তাদের আন্দোলন স্থগিত করে দিলেন। তারা ইচ্ছা করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারতেন। শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে বুকে-পিঠে ক্ষত নিয়েও পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী মেনে নেবেন তাদের দাবিগুলো? গত রোববার বা সোমবার শিক্ষকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বসার কথা ছিল। কিন্তু বসা হয় নি। কেন বসা হয় নি, সে কারণ হয়ত অজ্ঞাত। তবে কেন এই মিথ্যা আশ্বাস? নাকি জাতির প্রধান চালিকাশক্তির চাঁকা স্তব্ধ করে দেবার প্রয়াস। তাঁর আশ্বাসের ফলাফল কী হবে? এটাই এখন দেখার বিষয়।
আমাদের শিক্ষকরা এতো অবহেলিত কেন? যুগ যুগ ধরে তাদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে কেন? জাতির মেরুদন্ডকে সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেও যথাযোগ্য পারিশ্রমিক হতে তারা বঞ্চিত কেন? যদিও শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদন্ডে পরিমাপ করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি মহান পেশা হিসাবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত। তারপরও সেই ‘তালসোনা পুরের তালেব মাস্টারের অবস্থার’ আর পরিবর্তণ হয় না। শিক্ষকদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটে না। যুগের সাথে, দ্রব্য মূল্যের উর্দ্ধগতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়।
সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতা গুরুত্বপূর্ণ পেশা হলেও জাতীয়ভাবে শিক্ষকদের তেমন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। যুগের পর যুগ বহতা নদীর মতো বয়ে গেলেও শিক্ষকদের নির্মম ভাগ্যের কোন পরিবর্তণ আজও ঘটে নি। শিক্ষকদের প্রতি কেন এই উদাসীনতা? অথচ তাঁরা প্রদীপের মতো অন্যকে আলোকিত করে নিজেরা জ্বলে জ্বলে নিঃশেষিত হন। একথা এজন্য বলতে হয়- যখন বিশ্ব শিক্ষকসমাজ যুগোপযোগী ও উন্নত শিক্ষার কথা ভাবছেন, তখন আমাদের দেশের শিক্ষকসমাজ অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন করছেন। কারণ গোটা শিক্ষাব্যবস্থার নব্বই ভাগ নিয়ন্ত্রণকারী বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থান অনেকটাই অবহেলিত। ফলে ইউনেসকো-আইএলও সনদের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ এবং অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিভিন্ন সময়ে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও আমাদের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কোন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন তো দূরের কথা গ্রহণযোগ্যতাও পায়নি। একটি স্বাধীন জাতির জন্য এ অবস্থা যেমন দুর্ভাগ্যজনক, তেমনই লজ্জার। বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ প্রণয়ন করলেও এর বাস্তবায়ন সে অর্থে শুরু হয় নি। শিক্ষানীতিতে অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য অবসানের কোন দিকনির্দেশনা নেই।ূ
বর্তমান সরকার যদি শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল, বেসরকারি শিক্ষদের বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, পদোন্নতির সুযোগ, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর জীবনে পেনশনের ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ উৎসব ভাতার মতো শিক্ষানীতির কল্যাণমূলক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে তা হবে জাতির জন্য মঙ্গলজনক। শিক্ষকদের জন্য আশাব্যঞ্জক। পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা না করে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তবেই শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা ফিরে পাবেন। সুতরাং আর কোন বঞ্চনা নয়, আর কোন হতাশা নয়। সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক- এ প্রত্যাশা গোটা শিক্ষকসমাজের।
 
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১২

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’- বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের এ কথাগুলো আজ মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। হাজার রছরের পুরনো আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগকেও হার মানিয়েছে রামুর সহিংসতা। রামুর ঘটনার জন্য আমরা কাকে দায়ি করবো? নিশ্চয়ই উগ্রতা আর ধর্মান্ধতাকে। আর ব্যর্থতা প্রশাসনের। দায়ভার অবশ্যই সরকারের। এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুকের কারণে নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্কজনক অধ্যায়। তবে অবাক হতে হয় যখন রাজনৈতিকভাবে এ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। যা অনভিপ্রেত। রামুর সহিংসতা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল এখন দাবা খেলায় মেতে উঠেছে। দাবার গুটি বানানো হচ্ছে নির্যাতিত সংখ্যালঘু বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে।
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ ধর্মীয় সম্প্রীতি আমাদের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের অংশ। পৌষ-পার্বণে কিংবা ঈদ উৎসবে বুকে বুক মিলানোর ইতিহাস আমাদের পুরনো। অথচ অতি উৎসাহি কিছু ধর্মান্ধ মানুষের জন্য সে সম্প্রীতি ভেঙ্গে চুড়মাড় হয়ে গেল। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত আটটার দিকে কক্সবাজারের রামু উপজেলার মেরুংলোয়া বড়–য়া পাড়ার উত্তম কুমার বড়–য়ার ফেসবুকে কে বা কারা পবিত্র কুরআন শরিফ অবমাননার একটি ছবি যুক্ত (ট্যাগ) করে। ছবিটি অন্যান্যরাও শেয়ার করে। ফলে রাত দশটার দিকে কয়েক হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে রামুর চৌমুহনী চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
শুধু প্রতিবাদেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। সমাবেশ শেষে সংঘবদ্ধ লোকজন সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শত বছরের পুরনো ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে। পুড়িয়ে দেয় চল্লিশটির মতো বসতবাড়ি এবং ভাঙচুর করেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। একই কারণে ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়ায় দু’টি বৌদ্ধবিহার ও একটি হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।
হযরত মুহম্মদ(স:) কে নিয়ে নির্মিত ব্যঙ্গ চলচ্চিত্র ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’ ও ফ্রান্সের পত্রিকায় প্রকাশিত ব্যঙ্গ কার্টুনের কারণে এমনিতেই মুসলিম বিশ্ব ছিল উত্তপ্ত। ফলে জ্বলন্ত আগুনে তেল ঢেলে দেওয়ার মতোই রামুর এ ঘটনা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভাঙন ধরাতেই এমন কর্মকান্ড করা হয়েছে বলে বিজ্ঞজনের ধারণা। তবে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের আরো ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিৎ ছিল কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ কোন এক যুবকের অপরাধের জন্য শতাধিক মানুষের জান ও মালের ক্ষতি সাধন করার ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াও হয়ত সমর্থন করবে না। যেহেতু বিষয়টি জানার সাথে সাথে যুবক তার ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। তাছাড়া সে নিজেতো আর ছবি পোস্ট করেনি। কে বা কারা ট্যাগ (যুক্ত) করেছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে এটা বড় ধরনের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। যা তৃতীয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত হওয়াটা অমূলক নয়। ঐ যুবক যদি স্বেচ্ছায় করে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এতবড় সহিংস ঘটনার পিছনে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল এটা নিশ্চিত। কারণ একটি অপরাধ হাজারো অপরাধের জন্ম দেয়। কোরআন অবমাননার বিষয়টি মোটেই ছোট কোন অপরাধ নয়। কিন্তু যে ঘটনা ঘটলো তাকেও ছোট করে দেখার উপায় নেই। তাই আমরা বাধ্য হয়েই দু’টি ঘটনাকে অনাকাঙ্খিত ঘটনা বলছি। তবে এভাবে অনাকাঙ্খিত ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটলে সংঘাতময় পরিস্থিতি কোনভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ফলে বিশ্বজুড়ে অশান্তির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা শান্তির পক্ষে-আমরা সম্প্রীতির পক্ষে।
অনাকাঙ্খিত ঘটনা পরিদর্শণে গেলেন সরকারের দুই মন্ত্রী। তাদের বক্তব্যে উচ্চারিত হয় ভিন্ন সুর। সেখানে না আছে শান্তির বাণী না আছে সম্প্রীতির জয়গান। প্রথমেই তাদের দৃষ্টি মৌলবাদী ও বিরোধীদলের ওপর। বিরোধী দলও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তারাও অভিযোগ আনেন ক্ষমতাসীন দলের ওপর। ফলে ঘটনা মোড় নিতে থাকে ভিন্ন খাতে। যেটা সাধারণ নিরীহ মানুষের কাছে কাম্য নয়। দায়িত্বশীল দু’টি দল বা ব্যক্তির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সহিংসতা দীর্ঘজীবি হোক- এটা কারোই কাম্য নয়। এতে হয়ত প্রকৃত দোষিরা ছাড়া পেয়ে যাবে। আর দুর্ভোগ পোহাবে নিরীহ শান্তিপ্রিয় কিছু মানুষ। গ্রামীণ প্রবাদের মতো-‘পাটা-পুতায় ঘঁষাঘঁষি মরিচের শ্যাষ’ হওয়ার মতো অবস্থা ছাড়া আর কি হতে পারে। তবে ধর্মপ্রাণ মানুষের দাবি- এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার হোক। যাতে এমন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুণরাবৃত্তি না ঘটে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর ঘটনাস্থল পরিদর্শণ শেষে এক সমাবেশে বলেছেন,‘সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা করেছে।’ কিন্তু জামায়াতের সেক্রেটারি জি এম রহি মোল্লা বলেছেন,‘ফেসবুকে ছবি প্রকাশ হওয়ার পর রামুতে যেসব মিছিল-মিটিং হয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন আওয়ামীলীগের নেতারাই।’ বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বঙ্কিম বড়–য়া দাবি করেন,‘ পুলিশ শুরু থেকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। রাত তিনটার পর সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা মাঠে না নামলে অবশিষ্ট মন্দিরগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হতো না।’ রামু উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার বলেন,‘ জামাত-শিবির মৌলবাদী চক্র এঘটনার সাথে যুক্ত থাকতে পারেন’। তাই যদি হবে তবে আপনি ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কী ভূমিকা রেখেছিলেন। এ প্রশ্ন এখন সকলের মনে।
তাছাড়া পুলিশ যদি সময়মতো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারে এমনকি চেষ্টাও যদি না করে তাহলে সরকারের এত টাকা ব্যয় করে পুলিশ পোষার দরকার কী? আর যারা এখন পরস্পর বিরোধী কথা বলেন; ঘটনা ঘটার আগে তারা কি কোন আলামত পাননি। তাহলে আপনারা বসে বসে কি করছিলেন? তামাশা দেখছিলেন। চোখের সামনে কীভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতিগত সভ্যতা।
আসলে আমরা কেউ নির্দোষ নই। ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপাতেই আমরা ওস্তাদ। ধ্বংসলীলা দেখে আমরা মর্মাহত হইনা। আমাদের মানবতা আজ পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেছে। ধর্মান্ধতা আর গোড়ামী আমাদের মনুষ্যত্বকে গলা টিপে হত্যা করেছে। এর কি কোন প্রতিকার নেই। সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত দোষিদের বিচারের আওতায় আনা কি সম্ভব নয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নোংড়া খেলা কি কখনোই শেষ হবার নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আসুন আমরা অসহায় নির্যাতিত মানুষের পাশে দাড়াই। খোলা আকাশের নিচে যে শতাধিক মানুষ অন্নহীন-বস্ত্রহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে-তাদের মাথার ওপরে একটু ছায়ার ব্যবস্থা করে দেই। আমার কী তাও পারবো না? আসলে মানুষ না ধর্ম; আমরা কোন দিকে যাবো? সবশেষে বাউল শাহ আব্দুল করিমের সুরে বলতে হয়-‘করি যে ভাবনা, সেদিন আর পাব না। ছিল বাসনা সুখি হইতাম। দিন হতে দিন, আসে যে কঠিন। করিম দীনহীন কোনপথে যাইতাম। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। আমরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

লাবণ্যময়ী অন্ধকার

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

অন্ধকারের কী এমন বিশেষত্ব আছে?
আমি জানিনা। তবে এইটুকু জানি,
রোজ অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে পাইÑ
ফেলে আসা স্মৃতির টুকরো,
উঁইপোকায় খাওয়া সুখের বান্ডেল,
ইঁদুরে কাটা প্রেমের চাঁদর,
বানের জলে ভেসে যাওয়া আশা।
কভূ মনে হয়, অন্ধকার আছে বলে
তবুও তো কিছু পাওয়া যায়। তাই
অন্ধকারের লাবণ্যে আমি নিখোঁজ হইÑ
কারণ অন্ধকার আমাকে ঝাপটে ধরে
হারানো প্রেয়সি- øেহময়ী জননী-
অভিমানী বোন আর লাজুক খুকীর মতো।

মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২

আবুলের বাগানে গোলাপের সৌরভ

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বারবার হোচট খাওয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী এলাকা মাদারীপুর-৩ আসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারি আব্দুস সোবহান গোলাপ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছেন। হঠাৎ করে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’র মতো নিজ এলাকায় গণসংযোগ, শুভেচ্ছা বিনিময়সহ বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু করেছেন। দল ক্ষমতায় আসার তিন বছর পরে হঠাৎ করে গোলাপের এমন কর্মকান্ডে স্থানীয় আওয়ামীলীগ পড়েছে মহা বিপাকে। গোলাপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের দোহাই দিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ এখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যা আগামী নির্বাচনে কাল হতে পারে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সুত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি, মাদারীপুর-৩ (কালকিনি-সদর) নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামীলীগের বর্তমান সাংসদ ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ২৪ বছরের দূর্গ ভাঙতে আব্দুস সোবহান গোলাপের সাথে স্থানীয় আওয়মীলীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন সংগঠনের বঞ্চিত নেতারা হাত মিলিয়েছেন। আবুল হোসেনের মন্ত্রিত্ব হারানো, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি ও মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে দাবি আবুল হোসেন পন্থিদের।
স্থানীয় আওয়ামীলীগ এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল সুবিধাভোগি অন্যদল সুবিধা বঞ্চিত। ফলে আওয়ামীলীগের বঞ্চিত নেতারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চান, সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনির উন্নয়নের জন্য কিছুই করেন নি। তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের মধ্যেও এ তথ্য প্রচার করছেন। কালকিনি ছাড়াও সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে, সারাদেশের কথা বাদ দিলেও আবুল হোসেন তার নিজ এলাকার জন্যও কিছুই করেন নি। সঙ্গত কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও তার ব্যর্থতার চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা প্রতিদিন পত্রিকা পড়েন। টেলিভিশনে নিয়মিত খবর দেখেন। তারা এখন চায়ের দোকানে বসে সংবাদ দেখে স্বিদ্ধান্ত নিতে শিখেছেন। আবুল হোসেন না সোবহান গোলাপ। কে হবেন কালকিনির আগামী রাজনীতির কান্ডারী।
পদ্মা সেতুর ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ। সময় মতো প্রতিশ্র“তির বাস্তবায়ন না করা তার ব্যর্থতা। যা শুধু স্থানীয় রাজনীতি নয় জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সবাই। দুর্নীতির কথা বাদ দিলেও এ ব্যর্থতার দায়ভার কখনোই এড়ানো সম্ভব নয়। যদিও লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৈয়দ আবুল হোসেনকে ‘একজন দেশপ্রেমিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের বৃহৎ স্বার্থেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। তবে জনগণ এখনো বুঝে উঠতে পারেনি যে, বিশ্ব ব্যাংক এত অভিযোগ করার পরও কেন প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশ প্রেমিক বললেন। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে যাবে? স্থানীয় রাজনীতিইতো এখন হুমকির মুখে।
এদিকে আব্দুস সোবহান গোলাপের অনুসারিরা কালকিনির আওয়ামীলীগের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিরোধী দলের সাথে আওয়ামীলীগের কোন রকম সংঘাত-সংঘর্ষ না থাকলেও নিজ দলের সাথে সংঘর্ষের কারণে তিনটি মামলা হয়েছে। নিজ দলের নেতা-কর্মীরা মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরা। তারা দাবি করেন, গোলাপ একটি সাজানো গোছানো দলের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। যেখানে সৈয়দ আবুল হোসেন চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন; সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ছাড়া বঞ্চিতদের নিয়ে কীভাবে ঈদ শুভেচ্ছা জানান।
যে কারণে গত ৩১ জুলাই কালকিনির এনায়েতনগরের খালেকেরহাটে আবদুস সোবাহানের গণসংযোগে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরা বাধা দিয়েছেন। স্থানীয় মহিলারা ঝাড়– মিছিল করে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এসময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যা কালকিনির রাজনৈতিক ইহিাসে প্রথম। তাই সচেতন মহল মনে করেন, আবুল হোসেনের সাজানো বাগানে এখন গোলাপ ফুল ফুটতে শুরু করেছে। হয়ত আগামীতে সে গোলাপ সৌরভ ছড়াবে। হতে পারে তা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে। এখন অপেক্ষা শুধু সময়ের। ‘কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়’ তা দেখার জন্য উৎসুক হয়ে আছে তৃতীয় পক্ষ।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১২

শিশুতোষ মঞ্চ নাটক: উভয় সঙ্কট

রচনা- সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, 
পরিচালক, প্রথমা রঙ্গমঞ্চ, কালকিনি।
আলাপ- ০১৭২৫৪৩০৭৬৩, ০১৮২৯৭৬৭২৫৮
প্রযোজনা- ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ,কালকিনি এডিপি।
পরিবেশনা- শিশু ফোরাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ,কালকিনি এডিপি।
চরিত্র: অভি,রনি,নুসরাত,জাকির,রাজিয়া,পুলিশ,আকাশ ও আফিয়া
প্রথম দৃশ্য:
রাস্তায় অভি ও রনি দাঁড়িয়ে আছে। কারো জন্য অপো। এদিক ওদিক তাকায়। এমন সময় নুসরাতের আগমন।
অভি: দোস্ত, ওই যে তোর পেয়ারের নুসরাত আইতাছে।
রনি: কই, কই?
অভি: আরে ওইযে, দ্যাক্ চাইয়া।
রনি: ইয়েস, তাইতো। কিন্তু মাইয়ারতো অনেক দেমাগ। মা মারা মাইয়া, কেবল কাস নাইনে পড়ে। তাতেই ভাব কত দ্যাকছোস?
অভি: হ্যা, লাইনে আনতে সময় লাগবো। ছোট মানুষতো। তাছাড়া তোর তো আবার রেকর্ড ভালো না। (কাছাকাছি আসলে গতিরোধ করে)
অভি: দাড়াও নুসরাত, রনি তোমারে যা কইছে তার উত্তর দিয়া যাও।
নুসরাত: আমি তার সাথে কথা বলতে রাজি নই। আমিতো আগেই বলেছি আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না। তাহলে বাবার কাছে বলতে বাধ্য হব।
রনি: ডিস্টার্ব, কিসের ডিস্টার্ব। আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। এতে বাবার কাছে বলার কি আছে?
নুসরাত: দ্যাখ তোমরা ডিস্টার্ব কর বলে এই অল্প বয়সে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মেয়ে বলে কি এ সমাজে আমাদের কোন অধিকার নাই।
রনি: আমি তোমাকে বিয়ে করবো।
নুসরাত: অসম্ভব। তোমার মতো একটা বখাটেকে বিয়ে করবো আমি। মরে গেলেও না। তোমার জন্য তায়েবা আত্মহত্যা করেছে। তুমি জেল খেটেছো। জেল থেকে বের হয়ে আমার পিছু নিয়েছ। আর এখনোতো আমার বিয়ের বয়সই হয়নি।
রনি: তোমাকে পেলে আমি ভালো হয়ে যাব।
নুসরাত: যে ভালো হবার সে এমনিতেই হয়। আমার পথ ছাড়ো। বাবা আামার জন্য বসে অছে।
রনি: তুমি আমার সাথে চল। আমি আজ তোমাকে নিয়ে যাব। (হাত ধরে)
নুসরাত: অসম্ভব। ( থাপ্পড় দেয়) (নুসরাতের প্রস্থান)
রনি: (গালে হাত দিয়ে) আমি তোকে দেখে নেব শালি। তোর জীবন আমি তছনছ করে দেব। তোর সংসারে আগুন লাগিয়ে দেব। হু.. কত বড় সাহস, রনির গায়ে হাত তোলে।
অভি: আমি জানতাম, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না, আঙুল একটু বাকা করতে হবে। চল, একদিন না একদিন এর খেসারাত ওকে দিতে হবে। রাজিয়ার সাথে কথা বলে প্ল্যান করতে হবে। আর সুযোগের অপোয় থাকতে হবে। (প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য:
নুসরাতের চুলের মুঠি ধরে নিয়ে আসে জাকির। ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। নুসরাত উবু হয়ে কাঁদতে থাকে।
জাকির: ইকটু খানি মাইয়া তার আবার বড় বড় কথা। আমার টাকা চাই টাকা। টাকা কই? আনতে পারোস নাই। পারবি কেমনে? বাপের থাকলে তো। বিয়ার সময় তো বড় বড় কতা কইছিলো তোর বাপ।
নুসরাত: আর কত দিব। দিতে দিতে তো বাপজান জমি-জিরাত সব বেইচ্যা দিছে। আর পাইবো কই।
জাকির: টাকা কই পাইবো, তা আমি কি জানি। টাকা দিতে না পারলে সোজা বাপের বাড়ি চইলা যা। ( জাকিরের প্রস্থান)
নুসরাত: হ যামু, এই নরকের মধ্যে আর এক মুহূর্তও থাকমু না। ( নুসরাতের প্রস্থান।)
(রাস্তায় পূর্ব পরিচিত রাজিয়ার সাথে দেখা।)
রাজিয়া: কিরে নুসরাত তোর খবর কি?
নুসরাত: আপা আমার সব শ্যাষ অইয়া গেছে।
রাজিয়া: ক্যান কি অইছে?
নুসরাত: দ্যাহো আপা, বখাটে রনির ভয়ে বাজানে অল্প বয়সে বিয়া দিলো। লেখাপড়া বন্ধ অইলো। এহন আবার যৌতুকের কারণে আমার স্বামী বাড়ি থিকা বাইর কইরা দিলো। আামি এহন কি করুম আপা। আমারতো উভয় সঙ্কট।
রাজিয়া: ও তাই। যাক, তুমি কোন চিন্তা কইরো না। আচ্ছা চাকরি করবা তুমি?
নুসরাত: চাকরি? কেডা দিবো আমারে চাকরি।
রাজিয়া: সেই ব্যবস্থা আমি করুম। শোন, শহরে আমার পরিচিত একজন আছে। একটা এনজিওর জন্য কিছু মেয়ে চাইছিলো। দাড়াও ফোন দিয়া দেখি। (ফোন দেয়)
হ্যালো, দাদা আমি রাজিয়া। হ হ । একটা মেয়ে আছে।  হ হ । পারবো।  না না ।  কোন চিন্তা নাই। হ হ । আমি কাইল নিয়া আসবো। হ হ  । রাখি। ( ফোন রেখে)
হ কাজ হয়ে গেছে। তোমাকে নিয়ে কালকে যেতে বলেছে।
নুসরাত: এহন তাইলে আমি কই যামু। এইভাবে বাজানের কাছে যাইতে পারমু না।
রাজিয়া: আচ্ছা তাইলে চল আমার বাসায়।
নুসরাত: হ, তাইলে তোমার বাসাতেই চলো।
রাজিয়া: হ, খালি এক রাইতের ব্যাপার। সকালে তো তোওে নিয়া শহরেই চইলা যামু। তারপর নতুন জায়গা, নতুন চাকরি, নতুন দুনিয়া। (প্রস্থান)

তৃতীয় দৃশ্য:
নুসরাত ও রাজিয়া শহরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়। এমন সময় পুলিশসহ আকাশ ও আফিয়ার আগমন। পুলিশ দেখে রাজিয়া পালাবার পথ খোঁজে। পুলিশ রাজিয়ার পথ আগলে দাঁড়ায়Ñ
পুলিশ: দাঁড়ান, আপনি রাজিয়া?
রাজিয়া: (এদিক ওদিক তাকিয়ে) ক্যান বলুন তো।
নুসরাত: হ্যা সার, ওনার নাম রাজিয়া। আমারে চাকরি দিব। আমারে নিয়া শহরে যাইব।
পুলিশ: (নুসরাতের উদ্দেশ্যে) ও আপনাকে মিথ্যা বলেছে। (রাজিয়ার উদ্দেশ্যে) রাজিয়া নারী ও শিশু পাচারের অভিযোগে আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।
রাজিয়া: অফিসার আপনি ভুল করছেন।
পুলিশ: না সব প্রমাণ নিয়েই আমরা এসেছি। এর আগে আপনি পাঁচ জন নারী ও শিশুকে পাচার করেছেন। (আকাশকে উদ্দেশ্য করে) আকাশ তোমরা নুসরাতকে নিয়ে বাড়ি গিয়ে ওর বাবাকে নিয়ে থানায় এসো। রাজিয়া আপনি থানায় চলুন। (প্রস্থান)
আকাশ: নুসরাত তুমি অনেক বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেছ। রাজিয়া ভালো মেয়ে নয়। ও কাজ দেওয়ার কথা বলে মেয়েদেও নিয়ে বিক্রি কওে দেয়।
আফিয়া: হ্যা নুসরাত, আকাশ ঠিকই বলেছে। তোমার বিপদের কথা আমরা শুনেছি । তুমি চিন্তা করো না। আমারা তোমাকে ওয়ার্ল্ড ভিশনে নিয়ে যাব। আমাদের সাথে তুমিও কাজ করবে।
নুসরাত: ( আফিয়াকে জড়িয়ে ধরে) তোমরা আমাকে বাঁচাও। আমি বাঁচতে চাই। বাঁচার মতো বাঁচতে চাই। অঅমি আমার অধিকার চাই।
আকাশ: সব হবে। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ অবহেলিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
আফিয়া: সে সব পরে হবে। আগে চলো ওর বাবার কাছে যাই। তার কাছে সব ঘটনা খুলে বলে তাকে নিয়ে থানায় যেতে হবে। থানার কাজ শেষ হলে তাকে নিয়ে আমাদের অফিসে যাব।
আকাশ: হ্যা চল, (দর্শকের উদ্দেশ্যে) আপনারা শুনুন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ শিশুদের পরিপূর্ণ জীবন গঠনের জন্য কাজ করে।
আফিয়া: আসুন, শিশু ফোরামে যুক্ত হোন। শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুন।
সবাই: ‘আর সইব না অত্যাচার, ফিরিয়ে আনবো অধিকার।’
(সবাই ফ্রিজ)

বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১২

জন্মভূমি

আশ্রাফুন নাহার

তোমার আমার জন্মভূমি
তোমার আমার মা,
তোমার আমার স্বপ্ন আশা
দুঃখ- বেদনা।
তোমার আমার মুখের হাসি
দু’চোখ ভরা জল,
এদেশ মোদের সুখের আকাশ
তারায় ঝলমল।
তোমার আমার রক্ত দেহের
বেঁচে থাকার শ্বাস,
জন্মভূমি বাংলা মোদের
বসন্তের আশ্বাস।

সাধারণ সম্পাদক, খেলাঘর আসর,
খাসের হাট শাখা, কালকিনি।

শীত আসবে উড়ন্ত পাখির ডানায়

হেনরী স্বপন

যে পাখিরা এলো পুচ্ছ নাড়িয়ে ডানায় ;
এরাই যে শীত খুঁজে এনেছে গরমকাল
থেকে বরফের চাক...

যেখানে কিছু পালক Ñফাটলে রেখেছি গুঁজে
কিছু বেখেয়ালে পুড়ে গেছে ;
গোপন মনিটরে আগুন ছিলো
নম্বরগুলো ঘেমে উঠলে
অবয়ব চিনে রাখা ভালো : ০১৭১-৪৫৩২৩৯...

হ্যাঁ... বলুন ; প্রচন্ড শীতের অতীত এখনো
মনে আছে ; লিখেই জানাবো...

এখনো খড়ের তাপ শুকোয় নি ;
নিুাঞ্চলে ডাকাত পড়বে বলেÑ ধানক্ষেতে
আজও জোয়ারের জল নামে...

হিংস্রতায় ভরা সাইবার গেমগুলো
ঘিরে আছে মৃত্যুকাল !
বিপন্ন শব্দের কুয়াশায় ; হিম গায়ে গরম পোশাকে

এতোবার রিং-টোন পাল্টালে ;
তবে- বুঝি ? শীত আসবে উড়ন্ত পাখির ডানায়।

১৩.১০.২০১০ ইং।

সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১২

আমি কোন জীবন পাব



সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আমার একদিকে অনল
আমার অন্যদিকে সাগর
আমি কোন পথে যাব?

আমার এক হাতে গরল
আমার অন্য হাতে মরণ
আমি কোনটা বেছে নেব?

আমার এক পাশে কাঁটা
আমার অন্য পাশে নরক
আমি কোন দিকে যাব?

আমার এক পৃথিবী লাঞ্ছনার
আমার অন্য পৃথিবী হতাশার
আমি কোন পৃথিবী চাইব?

আমার এক জীবনে যৌনতা
আমার অন্য জীবনে ভালোবাসা
আমি কোন জীবন পাব?

বুধবার, ৮ আগস্ট, ২০১২

শ্রদ্ধাঞ্জলি:শিল্পী এস.এম সুলতান

আ. জ. ম কামাল:
কিছু কিছু মানুষ সমাজ সংস্কৃতি, জাতি তথা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চলমান বিশ্বের সৃজন ধারায় কিছু অবদান রেখে যান যা আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃতির মতই øিগ্ধতায় অনুভবে অনুরণন তোলে। ত্যাগ আর সেবার সারল্যতায় সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙ্গে ফুলের মত নির্মল শিশুদের থেকে শুরু করে দিন মান খেটে খাওয়া ফুটিয়ে তোলেন রঙ আর তুলির আলতো পরশে ক্যানভাসের পাতায়,ফুটিয়ে তোলে মানবতার আকুতিকে সংগ্রাম আর সহনশীল ভালবাসায় উদ্দীপ্ত চেতনার মধ্য দিয়ে। তেমনি একজন মানুষ একজন শিল্পী এস এম সুলতান।
আমার সাথে এ মহান শিল্পীর পরিচয় করিয়ে দেন গণসঙ্গীত শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর। একুশে বই মেলায় গিয়েছিলাম আমার দুই বন্ধু তোফাজ্জেল হোসেন হিরু ও ফজলুর রহমান। আলমগীর ভাই বলেন সালাম কর। আমি তাই করলাম। কালো রংয়ের সালোয়ার, পাঞ্জাবী, ওড়না পড়া মেয়েদের মত মাথায় বড় চুল। আমার মধ্যে জানার ভীষণ আগ্রহ। ফকির ভাই বলেন, আমার পীর। পৃথিবীর বড় মাপের চিত্রশিল্পী। একা একা থাকেন। মাঝে মাঝে তার কাছে যেও। ভোলা মনের মানুষ। কিছু পরে মহিউদ্দিন ফারুকী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, খ. ম. হাসান, শামীম শিকদার, কামরুল হাসানসহ আরো গুণীজন এলেন। আমরা সবাই তাদের কথা শুনছিলাম। এক ফাঁকে সালাম দিয়ে শিল্পীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম।
তারপর থেকে রোজ একুশে বই মেলায় যেতাম সুলতান সাহেবের সাথে কথা বলতে, জানতে। মাঝে মাঝে তার বাসায় যেতাম। এস এম সুলতান সবার সাথে আপনি বলে কথা বলতেন। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক একবার বলেছিলেন,‘লাল মিয়া মানে এশিয়া’। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘এস এম সুলতানকে যে চিনবে সে এশিয়াকে চিনবে।’ চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান জ্বীদ্দশায় তার প্রতিভার স্বীকৃতি যে পাননি তা নয়। ১৯৮২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ম্যান অব দ্যা ইয়ার অর্থাৎ বছরের শ্রেষ্ঠ মানব ঘোষণা করে। এ ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট এবং এশিয়া উইক পত্রিকা কর্তৃক ম্যান অব এশিয়া সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮১ সালে তাকে আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্ট ঘোষণার মাধ্যমে সম্মানিত করে।
এস এম সুলতানের জন্ম ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামে। বাবা রাজমিস্ত্রী মেছের আলী। বাবা তার নাম রাখেন লাল মিয়া।
৫ বছর বয়সে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে লাল মিয়া ৫ম শ্রেণিতে পড়েন। সে সময় ড. শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় আসেন স্কুল পরিদর্শনে। লাল মিয়া তার একটি পোট্রেট এঁকে তাকে দেন, সবাই মুগ্ধ। পড়ার ফাঁকে বাবাকে সাহায্য করতেন তিনি। ১৯৩৮ সালে অজানার উদ্দ্যেশ্যে বেড়িয়ে পড়েন লাল মিয়া। বাড়ি তাকে ধরে রাখতে পারেনি। সোজা চলে এলেন কোলকাতায়। কোলকাতার ভবানীপুর রুবী স্টুডিওর মালিক ছিলেন তার স্কুলের শিক। কৃষ্ণনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি সেখান থেকে একদিন হাজির হন নড়াইল জমিদারদের কোলকাতার কাশিমপুরের বাড়িতে। জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় লাল মিয়াকে খুব ভালোবাসতেন, øেহ করতেন। তাকে জানালেন তিনি আর বাড়ি ফিরে যাবেন না। তিনি বলেন, জমিদার বাড়ির অরুণ রায়ের মতন শিল্পী হবেন। আর্ট কলেজে ভর্তি হতে মেট্রিক পাশ লাগে। লাল মিয়ার আগ্রহ দেখে অরুণ বাবু ব্যবস্থা করেন। ভর্তি পরীায় লাল মিয়া প্রথম হন। হৈচৈ পড়ে গেল কলেজে। কিন্তু কি হবে। মেট্রিক পাশ ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে না।
জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় এবং অরুণ রায় শহীদ সোহরাওযার্দীর কাছে গিযে ঘটনা বলেন। বিখ্যাত চিত্র সমালোচক শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর্ট কলেজের কার্যকরি কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। তার অনুরোধে লাল মিয়াকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে। লাল মিয়ার প্রতিভায় তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে। তার দামী গাড়িতে করে মাছিমদিয়ার রাজমিস্ত্রীর ছেলে লাল মিয়া প্রতিদিন আর্ট কলেজে যাতায়াত করে।
সময় ১৯৩৮ সাল। জযনুল আবেদিন সে বছর আর্ট কলেজে শিক হিসাবে যোগদান করে। লাল মিয়া ও কামরুল হাসান সহপাঠী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাল মিয়ার নাম রাখেন এস এম সুলতান। এ নামেই সে পৃথিবী জোড়া পরিচিতি লাভ করে। সুলতান প্রতিবছর প্রথম হন। কারো কাছে না বলে বেড়িয়ে পড়েন পথে। প্রথমে আগ্রা। পকেটে মাত্র চার আনা। তাজমহলে আসতেই চার আনা শেষ। দারুণ ুধা নিয়ে ছবি আঁকেন। তিনজন আমেরিকান সৈনিককে ছবি এঁকে দিতে হবে। তারা তাকে ১৫০টাকা দেন। সোজা গিয়ে ওঠেন বিসমিল্লাহ হোটেলে। এসময় ড. বি এম জহুরীর সাথে তার পরিচয় হয়। জহুরী তাকে চাকুরী করার অনুরোধ করেন। কাজ ছবি আঁকা। সুলতান রাজী হন এবং তার সাথে চলে যান।
চার মাস পর চলে আসেন দিল্লী। সেখানে এক শিল্পীর বাড়ি এক মাস থাকেন। তাদের সাথে আজমীর শরীফ আসেন। আজমীরে এক মাস থাকার পর তিনি চলে আসেন লাক্ষ্মৌতে। সেখান থেকে হিমালয়ের
 প্রতি হিল স্টেশনে পায়ে হেটে ঘুরে বেড়ান, দেখেন দেরাদুন কাগন জালি। লক্ষ্মৌ ছেড়ে আসেন সিমলা। সেখানে অনেক ছবি আঁকেন। সিমলায় বসে এক কানাডিয়ান মহিলার সাথে তার পরিচয় হয়। তার সহযোগিতায় সিমলা সেন্টার পিটার্স স্কুলে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। উদ্বোধন করেন কাপুরতলার মহারাজ। প্রদর্শনীতে চার শত টাকার ছবি বিক্রি হয়। সেখান থেকে চলে আসেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। পরিচিত হন সেখানকার নবাব ফরিদ খানের সাথে। ফরিদ খান তার ভালো বন্ধু হয়েছিলেন। পরে চলে আসেন কাশ্মীরে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় করাচি এসে পরিচয় হয় কবি জসীম উদ্দীনের সাথে। এসময় শাকের আলী , শেখ আহমেদসহ আরো নামিদামি শিল্পীদের সাথে পরিচিত হন। এবং আর্ট কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এস এম সুলতান করাচিতে প্রদর্শনী করেন। যা উদ্বোধন করেন ফিরোজ খান নুন। এরপর করাচী ুসিবধ হলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। টিকেট এক টাকা। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল।
১৯৫০ সালে পাকিস্তান চিত্রশিল্পীদের মধ্য থেকে তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য মনোনিত করা হয়। তিনি ২০টি ছবি নিয়ে ১ জানুয়ারি আমেরিকা যান। আমেরিকা যাওয়ার আগে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি কোথায় কোথায় যাবেন। তিনি জানান, শিশুদের স্কুল দেখতে যাবেন। আমেরিকার ওয়াশিংটন, বোস্টন,শিলানা, মিসিগান শহরে তার একক প্রদর্শনী হয়। আমেরিকা থেকে আসেন লন্ডনে। সেখানে তার একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়। ভিক্টোরিয়া ডুস্বি ডালি,পন, ব্র্যাক,ক্রীব’র মত বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে তার ছবি সমমর্যাদায় প্রদর্শীত হয়।
এস এম সুলতানের আগে এশিয়া মহাদেশের এমন দুর্লভ সম্মান কোন চিত্রশিল্পী পান নি। লন্ডনের লিসার গ্যালারীর প্রদর্শনী শেষে ছবিগুলো গ্যালারীকে দান করে যান। ১৯৫৩ সালে তিনি দেশে ফেরেন। সরকার তাকে আর্ট কলেজের উপাধ্য পদের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। জয়নুল আবেদিন তখন অধ্য। তিনি রাজী হলেন না। বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় নিয়ে তিনি চলে আসেন নড়াইল। ১৯৫৮ সালে সরকারি ভাবে বিশ শতাংশ জমিসহ একটি পুরাতন বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ১৯৫৯ সালে ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্বরূপে স্বতন্ত্র এ মানুষটির হৃদয় জুড়ে ছিল প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। চিত্রা নদীর তীরে তিনি গড়ে তুললেন এক তপোবন। বিভিন্ন জাতের বিচিত্র বৃরাজিতে পরিপূর্ণ এ তপোবনে প্রবেশ করলে মন ভরে যাবে।  এরপর গড়ে তোলেন চিড়িয়াখানা। এখানে বানর, হনুমান, ঘোড়া, খরগোশ, গিনিপিগ, বনবিড়াল, দেশি-বিদেশি কুকুর, জাতি সাপ ও নানান জাতের নানান রঙের পাখি রয়েছে। এ মহান শিল্পীর মৃত্যুর পর তার চিড়িযাখানার জীব-জন্তু সব ঢাকা চিড়িয়াখানায় নিযে যাওয়া হয়। লাল মিয়া সুন্দর সুরে বাঁশি বাজাতেন। গভীর রাতে জমিদার বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে বাঁশি বাজাতেন। এলাকার লোকেরা বলেছে তার বাঁশির সুরের তালে তালে সাপ ফণা তুলতো।
১৯৫৯ সালে রফিকুন নবী ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। তিনি বলেন, অধ্য জয়নুল আবেদিন, কামরুর হাসান, শফি উদ্দিন আহমেদ চারুকলার চত্বরে জলসভায় বসা। তারা সবাই এক মহিলা অতিথির সাথে গল্প করছেন। মহিলা অতিথি আমাদের কাসের দিকে পিঠ করে বসা। মাথায় ঢেউ খেলানো কোকড়ানো চুল। পড়নে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। ঠিক এগারটার দিকে স্যারদের সাথে অতিথি আমাদের কাসে আসে। আমরা সবাই চমকে উঠলাম। অতিথি মহিলা নন; সে একজন জ্বলজ্যান্ত পুরুষ মানুষ। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। হাতে বাঁশের বাঁশি। অধ্য সার পরিচয় করিয়ে দিলেনÑ নাম এস এম সুলতান। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও এস এম সুলতানের বন্ধু ছিলেন। এস এম সুলতানের যক্ষ্মা হয়েছিল ৮০ সালের দিকে। ব্যাংককের সুমিতভেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়; ভালো হয়ে দেশে এলেন।
এস এম সুলতান সর্ববৃহৎ ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন। যার আয়তন ২০ বর্গফুট। নড়াইলের লাল মিয়া চির কুমার ছিলেন। আমি তাকে যত কাছ তেকে দেখেছি। তার কাছে থাকার সৌভাগ্য হয় আমার। আজ মনে হয়, আর বাঁশি বাজবেনা, ইঞ্জিনের নৌকা চলবেনা, কেউ জানতে চাইবে না, ডাক্তার আসবেনা,সাংবাদিক জানবে না, সবাইকে আড়ালে রেখে, জাতিকে ফাঁকি দিয়ে নড়াইলের চিত্রা নদীর পারের মাছিমদিয়া গ্রামের এস এম সুলতান (লাল মিয়া) ১০ অক্টোবর চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। ধন্য নড়াইলের মাটি, ধন্য চিত্রা নদী, ধন্য মাছিমদিয়া গ্রাম।

আ.জ.ম কামাল,
প্রশিক, নাটক বিভাগ
জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুর।