শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৩

কালকিনিতে জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরামের বর্ষবরণ


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘আইলো আইলো আইলোরে, রঙ্গে ভরা বৈশাখ আমার আইলোরে’- স্লোগানকে সামনে রেখে শুভ নববর্ষ ১৪২০ বঙ্গাব্দ উপলক্ষে যায়যায়দিন ফ্রেন্ডস ফোরাম কালকিনির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বর্ণাঢ্য আয়োজনে শোভাযাত্রা, বাঙলার চিরায়ত ঐতিহ্য পান্তা-ইলিশ ভোজন, আলোচনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রেসক্লাব চত্বর থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
যায়যায়দিনের কালকিনি প্রতিনিধি মোঃ শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে জাহিদ হাসানের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে আজিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ রায়, কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সমাজ কর্ম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকন মোশাররফ হোসেন, উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা সরদার লোকমান হোসেন ও মসিউর রহমান সবুজ। বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমান, খায়রুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামীম হোসাইন। সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি করেন জাহিন, জাবির, মীম, রাইসা, ফারিহা ও সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সংগীত পরিবেশন করে মানসী. আসমাউল ইসলাম, রাফিয়া, শফিউল, সিফাত, ফাহিম ও মুহিত। নৃত্য পরিবেশন করে রাফিয়া ও সায়মা। সবশেষে শিল্পীদের মাঝে উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
যুগ্ম আহ্বায়ক, ফ্রেন্ডস ফোরাম
কালকিনি।
০১৭২৫৪৩০৭৬৩


কালকিনিতে ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ

অপর্ণা দাস :
‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেল বন্ধন’- শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের ব্যবস্থাপনায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এর রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক কেন্দ্রীক প্রযোজনা ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ হয়।
গত ১৬ এপ্রিল সোমবার রাত ৯ টায় কালকিনি উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বৈশাখী মেলা মঞ্চে নাটকে অভিনয় করেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, বি এ কে মামুন, নাহিদুল ইসলাম মুকুল, শান্ত কুমার, সঞ্জীব তালুকদার, সাইফুল ইসলাম, আহসান হাবীব, পলাশ হোসেন, মাহমুদা খানম, ঝুমা আক্তার, শাকিলা আক্তার, অপর্ণা দাস, নিপা, রোমানা, সজল নন্দী ও সাকিব মাহমুদ।

বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৩

মাদারীপুরে স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ

মারজিয়া নিশি:
‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেল বন্ধন’- শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের ব্যবস্থাপনায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এর রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক কেন্দ্রীক প্রযোজনা ‘বৈচাপাগল’ গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় মাদারীপুর মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়।

শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর কবিতা

# উত্তরাধিকার

এ কেমন আচানক বিষণœ দুপুর, পাখির ডানার ভাঁজে ভাঁজে উড়ন্ত মেঘ।
আলো আঁধারির লুকোচুরি, ফিকে হয়ে আসে দিগন্তের হাসি।
কুয়াশার আড়ালে উঁকি মারেÑ প্রিয়তমার ফ্যাকাশে মুখ।
এ কেমন কর্মহীন অলস দুপুর, রমনীর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে সুখ।
শৃংগারে শিৎকারে কাতরতা, ভাবি প্রজন্মের প্রত্যাশিত আলো।
সঙ্গমের আড়ালে উঁকি মারেÑ আগামীর সুযোগ্য উত্তরাধিকার।

# তোমার স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে

তুমি বললে, আমার কোন স্বপ্ন নেই। আমি শুনে খুশি হলাম-
আশ্চার্যান্বিতও বটে। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে?
অবুঝ শিশু, অন্ধ-বোবা সবার যদি স্বপ্ন থাকে
তোমার কেন থাকতে নেই।
তুমিতো পরিপূর্ণ মানবীÑ কোন জড় পদার্থ নও।

সমীকরণটা কেমন এলোমেলো কোন সুত্রেই ঠিক মিলল না।
স্বপ্ন আছে বলে আমরা আছি, আমারা থাকলে স্বপ্নও থাকবে।
তুমি না চাইলেও ঘুরে ফিরে স্বপ্ন আসবে তোমার কাছে।
তোমাকে পথ দেখাবে, ঘুম পাড়ানি গান শোনাবেÑ
নিয়ে যাবে সীমাহীন গন্তব্যে।

একদিন তুমি স্বপ্নের দেখা পাবে, হবে স্বপ্নের সাথে খুনসুটি।
স্বপ্নের সাথে হবে ঘর-গেরস্থালি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
এখনো তোমার বুঝতে বাকি- তোমার স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে তোমার মনের গহীণে।

কালকিনি, মাদারীপুর
০৭ এপ্রিল ২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৩

শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার কৃতি সন্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও দহন(সাহিত্যপত্র)- এর নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ হাসান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রিয় নির্বাহী সংসদের সদস্য হওয়ায় কালকিনিবাসীর পক্ষ থেকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

শুভেচ্ছান্তেÑ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সম্পাদক, দহন(সাহিত্যপত্র)।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর প্রেমের কবিতা

১. তোমাকে দিলাম

তোমাকে দিলাম ভালোবাসার প্রথম প্রহর-
ভোরের শিশির একখন্ড আকাশ।
তোমাকে দিলাম ফাগুনের রঙ- দখিনা বাতাস।
তোমাকে দিলাম সবটুকু অনুভূতি- জীবনের কিছু স্মৃতি।

তোমাকে দিলাম ডাহুকের লুকোচুরি,
মাছরাঙার শিকার স্বচ্ছ কালোজল দিঘির।
তোমাকে দিলাম সবটুকু আবেগ- জীবনের গতিবেগ।
তোমাকে দিলাম আকাশের নীল- সাগরের শঙ্খচিল।
তোমাকে দিলাম এই আমি সবটুকু প্রেম আমার
অনাকাক্সিক্ষত ছোঁয়া উষ্ণতার।

২. অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা

একটি সুদৃশ্য মোড়ক আমায় বিহ্বল করে।
কি আছে এর অন্তর্নিহিত সারমর্ম?
প্রশ্নের পাহাড় বুকে নিয়ে ঝুকে পড়িÑ
প্রতিটি ভাঁজ খুলতে খুলতে আমি ক্লান্ত।
কাক্সিক্ষত বস্তুর কোন গন্ধ নেই।
মনে কল্পনার নানাবিধ জাল বুনি!
মোড়কের ভেতর মোড়কÑÑ
এক  
দুই   
তিন...
চতুর্দশ মোড়ক খুলতেই
বাতাসে উড়ে যায় ছোট্ট চিরকুট।
তাতে লেখাÑ
‘বাতাসে উড়িয়ে দিলাম আমার প্রথম ভালোবাসা।’


৩. কোথাও পাবি না খুঁজে প্রেম

তাকিয়ে দেখ জীবনের যত ছবি
খুঁজে পাবি হাজার রঙ,
জীবনের অলি-গলি পার হয়ে
সেজেছিস কতবার সঙ।

লাল-নীল-বেগুনি কিংবা হলুদ
স্বপ্নের রঙ শাদা-কালো,
রঙিন ছবির মাঝে জীবনের আড়ালে
কোথাও পাবি না খুঁজে আলো।

চেয়ে চেয়ে দেখ কত ঝরা ফুল
পেতে পারিস কত গন্ধ,
কোথাও পাবি না খুঁজে প্রেম
হলে চোখ থাকতে অন্ধ।

কালকিনি, মাদারীপুর
০৩ এপ্রিল ২০১৩

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৩

গান গেয়ে সংসারের খরচ জোগান

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘এক সময় পালাগান গাইতাম। এহোন আর পালাগানের চল নাই। তাই জারিগান বান্ধি। এতেই সংসার চলে। মাঝে মাঝে সংসারে একটু-আধটু টানাটানি হয়। কি করুম? বোঝার পর থিক্যাই গানরে সঙ্গী কইরা লইছি। আর ছাড়তে পারি নাই। চার পোলারে দলে রাখছি। বাপ-বেটারা মিইল্যা দল চালাই। আমার সুখ তাতেই। বাউল সম্রাট শাহ আ: করিমের মত কইতে অয়- ‘আর কিছু চাইনা মনে গান ছাড়া।’ কথাগুলো বলছিলেন গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আ: সাত্তার বয়াতী। তার পরিবারের সবাই শিল্পী। সংগীত তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। গান গেয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। বিশাল এ পরিবারের ভরন-পোষণ জোগান তারা গানে গানে।
এক সময় গ্রামবাংলায় পালাগান, সারি গান, পুঁথি পাঠ, যাত্রাপালা ও জারি গান ছিল অহরহ। সে সব গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন বহুলাংশে লোপ পেয়েছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে শিল্পীরা ছুটছে দিগি¦দিক। কিন্তু মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামে ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করা আঃ সাত্তার বয়াতি তার পুরো পরিবার নিয়ে ধরে রেখেছেন সেই ঐতিহ্য। কেবল গান গেয়েই সংসারের খরচ জোগান তারা।
আঃ সাত্তার বয়াতী এনায়েতনগর জে.এম উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অর্থাভাবে আর লেখা-পড়ার সুযোগ হয়নি তার। ছোট বেলা থেকেই গানের প্রতি তার ঝোক ছিল। তাই পেশা হিসেবে বেছে নেন সংগীত। ১৯৬৫ সালে ২০ বছর বয়সে ওস্তাদ জালাল বয়াতির সাথে সারি গানের মাধ্যমে সংগীত জীবনে প্রবেশ করেন। তার সাথে কাজ করেন ৫ বছর। এরপর নিজেই একটি গানের দল তৈরি করেন। তার দলের নাম রাখেন ‘পল্লী কবিয়াল সাংস্কৃতিক দল’। শুরুর দিকে পালাগান করতেন। তখন শরীয়ত-মারেফাত, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, রাত্রি-দিনসহ একাধিক পালাগান গেয়েছেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে থাকতেন জালাল বয়াতি. সফিজদ্দিন বয়াতী, রশিদ বয়াতী, জয়নাল বয়াতী, মঞ্জুরানী সরকার, রেখা বয়াতী, রুনা সরকার ও মাকসুদা বয়াতী।
পালাগানের কদর কমে গেলে অনেক শিল্পী দল ছেড়ে চলে যান। আঃ সত্তার বয়াতী শুরু করেন জারি গান। নিজের সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখেন গানের দল। এরপর থেকে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও ব্যক্তির উদ্যোগে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, দুর্নীতি, বৃক্ষ রোপন বা বনায়ণ, কৃষি, মৎস্য, এইডস, মাদক, দেশাত্মবোধক ও বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির নির্বাচনী জারী গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।
দলের বর্তমান শিল্পীরা তার পরিবারের সদস্য। চার ছেলে ও মেয়ের ঘরের নাতিকে নিয়ে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৬ জন। বড় ছেলে জামাল হোসেন হারমোনিয়াম বাদক এবং গায়ক। মেজ ছেলে রুবেল গান গাইতো। তিন বছর আগে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। স্ত্রী, ২ মেয়ে, ১ ছেলের দায়ভার এখন আঃ সত্তার বয়াতীর ওপর। সেজ ছেলে আক্তার হোসেন ঢোল বাদক। চার নম্বর ছেলে সুজন বাজায় মন্দিরা। ছোট ছেলে আকাশ দেওয়ান শিশুশিল্পী। মেয়ের ঘরের নাতি পান্নাও তাদের দলের শিশুশিল্পী।
তারা এ পর্য়ন্ত ঢাকা, ঝালকাঠি, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, খুলনা ও ভোলাসহ অনেক জেলা ঘুরে ঘুরে গান গেয়েছেন। প্রতিমাসে ৭-৮ টা জারি গানের অনুষ্ঠান করেন। প্রতি অনুষ্ঠানে সর্বনিু ২২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা পর্যন্ত পান। এছাড়া দুঃস্থ শিল্পী হিসাবে সরকারের কাছ থেকে একবছরে প্রতিমাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পেয়েছেন। বর্তমানে প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পান। এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, কালকিনি এডিপি’র তালিকাভূক্ত গানের দল হিসাবে মাসে চারটা অনুষ্ঠান করে প্রতি অনুষ্ঠানে ২২০০ টাকা করে মোট ৮৮০০ টাকা পান। 
গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যাপারে আঃ সাত্তার বয়াতী বলেন,‘এরশাদের আমলে গানের জন্য সাটিভেট (সার্টিফিকেট) পাইছি। বর্তমানে কিছুটা দুরবস্থার মধ্যে আছি। অনুষ্ঠান না পাইলে সংসার চালাইতে একটু কষ্ট হয়। গান গাইয়া ছেলেগো ব্যবসা করার ব্যবস্থা কইরা দিতাছি। তবে আমার জীবন-মরণ গান। যতদিন আছি, গান লইয়াই আছি। মইরা গেলে পোলাপানে দল চালাইবো কি না জানিনা।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
১৩.০৩.২০১৩

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৩

রচয়িতা: দুই বাংলার কবিদের মিলনমেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

ষান্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’ ৩য় বর্ষের ২য় সংখ্যা প্রকাশিত হলো ঢাকার একুশে বইমেলায়। ‘দুই বাংলার কবি ও কবিতা’ নিয়ে ৫০ পৃষ্ঠার মনভুলানো এ আয়োজন নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ সফলতা ‘রচয়িতা’র নিপূণ কারিগর আরিফুল ইসলামের। কবিরা উপলক্ষ মাত্র। কারণ কবিরা কেবল জন্মদাতা, সম্পাদক গর্ভধারিনী। গর্ভধারণের যন্ত্রণা ও প্রসবের বেদনা আমরা বুঝিনা। আমাদের মুখে শুধু তৃপ্তির হাসি। প্রচ্ছদ এঁকে শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন এম. আসলাম লিটন। অশেষ ধন্যবাদ জানাই তাকে।
বর্তমান অবক্ষয়িত যুব সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হাতে আবির্ভূত হয়েছেন আরিফুল ইসলাম। ‘সাহিত্য পরিবার গঠনের দৃঢ় অঙ্গিকার’ নিয়ে কন্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে চলেছেন ক্লান্তিহীন এক পথিক। তার কাফেলায় সামিল হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে আজ। নবীন-প্রবীণ কবিদের সমন্বয়ে সাজানো ‘রচয়িতা’ সর্বস্তরের পাঠকের মনে দাগ কাটতে পেরেছেÑ এ আমার বিশ্বাস। শুধু তা-ই নয়, ‘রচয়িতা’ জামালপুরের ইসলামপুর থেকে ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশ এমনকি ওপার বাংলায়। লিটল ম্যাগ প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবেÑ এটাই আমার প্রত্যাশা।
নবীন কবিদের লেখালেখির সুতিকাগার ছোট কাগজ। প্রবীন বা প্রথিতযশা কবিদের পাশাপাশি নবীনরাও তাদের কাঁচা হাতের আঁকিবুকির প্রয়াস অব্যাহত রাখবে। তবেই আমাদের বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হবে। কেননা, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে সবকিছু এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। দুই হাতে লিখতে পারি। বাতাসে উড়িয়ে দিতে পারি যা কিছু তা-ই। মুহূর্তেই তা পৌঁছে যাচ্ছে সঠিক গন্তব্যে। সবকিছুই যখন হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক। তখন আমরা কেনইবা থাকবো স্থবির হয়ে।
‘রচয়িতা’ হাতে পাওয়ার পর আমি বিস্মিত অভিভূত। মফন্বলে বসেও এমন চমৎকার সৃজন সম্ভব। সাহিত্য চর্চা এখন কেবল নগরকেন্দ্রিক নয়। একথাই প্রমাণ করে ‘রচয়িতা’। কবিতা বাছাই, সম্পাদনা, প্রকাশ ও বিপণনের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদক। ওপার বাংলার পাঠকরাও আগরতলা বইমেলায় রচয়িতার মুখ দেখেছেন। ১৩০ জন কবির পাঠানো কবিতার মধ্যে মাত্র বিয়াল্লিশ জন কবির কবিতা বাছাই করা আসলেই কষ্টসাধ্য। বিশাল এ দায়িত্ব তিনি সামলেছেন প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে। কায়মনো বাক্যে অপারগতাও প্রকাশ করেছেন। বাকী লেখা আগামী সংখ্যায় প্রকাশ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। হয়তো আগামী সংখ্যার জন্য আরো কবিতা জমা পড়বে। এভাবে পড়তেই থাকবে। দায়বদ্ধতা থেকে যাবে কবিদের কাছে। তবুও এগিয়ে যেতে হবে।
আরিফুল ইসলামের সম্পাদকীয় পড়ে মনে হয়েছে কবিতার বিপ্লব শুরু হয়েছে। বিস্ফোরক বারুদ স্পি­ন্টারের মত দিগি¦দিক কবিতার বিস্ফোরণ। প্রতিশ্র“তিশীল কবিদের উদাত্ত আহ্বান- কবিতার ভূবনে আসার। একটি সুন্দর আগামী বিনির্মাণেও প্রত্যয়দীপ্ত কন্ঠস্বর অনুরণন তুলছে চারিদিকে। কাঁটাতারের বেড়াকে উপেক্ষা করে এপার বাংলা-ওপার বাংলার কবিদের মিলন মেলার আয়োজক ‘রচয়িতা’। তাই অবলীলায় বলা যায়, ‘কবিতা কোন বাধাকে স্বীকার করে না, কবিতা সশস্ত্র কবিতা স্বাধীন।’
মৃণাল বসু চৌধুরী, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, জ্যোতির্ময় দাশ, মধুমঙ্গল বিশ্বাস, ইন্দ্রানী সেনগুপ্তা, চিরঞ্জিব হালদার, মনোজিৎ কুমার দাশ, শিবশংকর পাল, সুবীর সরকার, রহমান হেনরী, নজরুল জাহান, টোকন ঠাকুর, ধ্র“বজ্যোতি ঘোষ মুকুল, গোলাম মোস্তফা, কচি রেজা, রতœাদিপা দে ঘোষ, ড. আফরোজা পারভীন, ওয়াহিদুজ্জামান, আলী ইদ্রিস, ভোলা দেবনাথ, তালাত মাহমুদ, আমজাদ সুজন, অমিতাভ দাশ, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, আদিত্য অনিক, সুচেতা রায়, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সুরঞ্জন রায়, আজিজ আহমেদ, ফয়সাল অভি, সৈকত আহমেদ বেল্লাল, রিপন ঘোষ, নাজমুল হাসান, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, অঞ্জন আচার্য, মৌ সেনগুপ্তা, সীমা রানী বন্দ্য, সৈয়দ সাদী, চঞ্চল মেহমুদ কাসেম, সুমন হাফিজ, সামীর রহমান ও আরিফুল ইসলামের কবিতা নি:সন্দেহে পাঠককে আকৃষ্ট করেছে। অনেকে অনেক ফোন পেয়েছেন। যেমন পেয়েছি আমি। কবি ও কবিতার স্বার্থকতা এখানেই।
ধন্য রচয়িতা, ধন্য আরিফুল ইসলাম।
কবিতার জয় হোক। ‘রচয়িতা’ দীর্ঘজীবি হোক।

কালকিনি, মাদারীপুর।
৩০.০৩.২০১৩

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর দু’টি কবিতা

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ

যা কিছু চেয়েছিলাম; হয়তো পেয়েছি বা পাইনি।
অদূরে দাঁড়িয়ে হাতছানি দেয় সৌভাগ্য,
হতাশার সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গেছি ঈশ্বরের মনোনীত স্বপ্নচূড়া দ্বীপে।

কী আছে অজানা জনারণ্যেÑ যাবতীয় প্রেম, প্রেমের অসুখ
উচাটন মন, মনের দূরত্ব। কিংবা সাফল্যের শেষ উপাদান হাতড়ে হাতড়ে
ঈশ্বরের তীক্ষè দৃষ্টিতে রমণীর কামনার সুরসুরির নিষেধাজ্ঞা
উপেক্ষা করে ছিটকে পড়েছি ভাগাড়ে।

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ চুকাতে গিয়ে বারবার ঠকেছি।
জিতেছেন ঈশ্বর; ঈশ্বরেরা বরাবরই জয়ী হন-
জয়ী হবার বদলে আমাকেই ক্ষমা চাইতে হয়।
এবার আমার হিসাবের পালা শেষ,     স্বার্থপর ঈশ্বরের সাথে কোন আপোষ নেই।
কড়ায়-গন্ডায় কষে নেব সব হিসাব-নিকাশ। আমার জয়ের হিসাব,
আমার প্রেমের হিসাব, আমার সীমাহীন প্রাপ্তীর হিসাব।

ঈশ্বরেরর সাথে এ আমার শেষ হিসাব-নিকাশ।

ঈশ্বর বনাম তুমি

তোমাকে ভালোবাসি বহু বছর বহু কাল,
ঈশ্বরের মতো ভালোবাসি তোমাকে।
তোমাকে না পেলে হারাবো ঈশ্বর-
ঈশ্বরকে না পেলে তোমাকেও পাবো না।
তোমার মাঝে খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব,
তোমার মাঝে ঈশ্বরের বসবাস।
তোমার ঠোটে ঈশ্বরের আনন্দের হাসি,
তোমার চোখে ঈশ্বরের বেদনার জল।
আমার ভালোবাসা শুধু দু’জনার জন্যÑ
ঈশ্বর বনাম তুমি। হয়ত তুমি গ্রহণ কর;
নয়ত ঈশ্বরকে দিতে দাও।

২৮.০৩.২০১৩
কালকিনি, মাদারীপুর।

মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ, ২০১৩

কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বাঙলা বিভাগের নবীন বরণ ও কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

রফিকুল ইসলাম মিন্টু,কালকিনি:
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বাঙলা বিভাগের নবীন বরণ ও কৃতি শিক্ষার্থী সালাহ উদ্দিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান গত ২৪ মার্চ সকাল ১০টায় কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ইয়াকুব খান শিশিরের সভাপতিত্বে সদস্য সচিব অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামাসের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোঃ শাহজাহান মিয়া ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবু আলম। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক দেদারুল আলম মুরাদ, সন্ধ্যা রাণী বল, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী জাহিদ হাসান, সালাহ উদ্দিন, নুরুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও রাখিবন্ধন শেষে বরণপত্র পাঠ করেন কামরুন্নাহার, সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন সুমাইয়া আক্তার সামী। অনুষ্ঠানে সালাহ উদ্দিনকে ক্রেষ্ট ও অভিনন্দন পত্র দেওয়া হয়। উল্লেখ্য ১৯৯৩ সালে বাঙলা বিভাগ যাত্রা শুরু করে এই প্রথম এমএ শেষ বর্ষে প্রথম শ্রেণি পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয় সালাহ উদ্দিন।
সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি করেন অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান, কবি আকন মোশাররফ হোসেন, সালাহ উদ্দিন, সাহিদা পারভিন লিপু ও সুমাইয়া আক্তার সামী। কৌতুক পরিবেশন করেন অধ্যাপক মোঃ শাহজাহান মিয়া, সংগীত পরিবেশন করেন অধ্যাপক ইয়াকুব খান শিশির, অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান, প্রভাষক সঞ্জয় মজুমদার ও আবুল কালাম আজাদ। সবশেষে সালাহ উদ্দিনের রচনায় নুরুদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় নাটক ‘কালচারাল ফ্যামিলি’ মঞ্চস্থ হয়। এতে অভিনয় করেন সালাহ উদ্দিন, সোহরাব হোসেন, নুরুদ্দিন, দবির হোসেন, শাহ আলম ও শহিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ কোন পথে?

মো: খবির উদ্দিন

৯০’র গণ অভ্যূত্থানের কথা কাউকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আজ হঠাৎ মনে পরে গেল ৯০’র গণ অভ্যূত্থানের ইতিহাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রতিদিনের মত বন্ধুদের সাথে মিরপুর পল্লবী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ‘চৈতালী’তে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গেলাম। ঐদিনকার প্রথম প্রিয়ড যথারীতি ১১ টায় শুরু হবে। সময় এদিক-সেদিক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। হলোও ঠিক তাই। এগারটা বাজার সাথে সাথে কলা অনুষদের দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশে যেখান থেকে তাকালেই রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং ও মাষ্টার দা-সূর্যসেন হল চোখে পরে এমন একটি কক্ষে স্যারের লেকচার শুরু হলো। শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্বেয় ড. রুহুল আমীন স্যার। আমার খুব প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বহু গল্প করেছি স্যারের সাথে। অনেক প্রাণবন্ত আলোচনা যা আজও ভুলতে পারিনা। একটু নিরবে নিভৃতে থাকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে প্রফেসর ড. হাবিবুর রহমান স্যার, প্রফেসর ড. রুইছউদ্দিন স্যার, প্রফেসর ড. আবদুস সাত্তার স্যার, প্রফেসর ড. আবদুল বাকী স্যার, প্রফেসর শামছুল হক স্যারসহ অন্যান্য শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের কথা। যাদের কাছ থেকে অ-নে-ক জ্ঞানগর্ভ কথা ও আলোচনা শুনেছি। যখন স্যারদের ক্লাশ শুরু হতো তখন মাঝে মধ্যে মনে মনে ভাবতাম আজ যদি এই ক্লাশটা কোন বিরতি না দিয়ে অবিরাম চালিয়ে যেতেন। মনে পড়লেই হারিয়ে যাই সেই মধুময় স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলোর মধ্যে।

যাক্ সে সব কথা, এখন যে উদ্দেশ্যে এই লেখা সে প্রসংগে আসা যাক। ড. রুহুল আমীন স্যার লেকচার শুরু করে এক পর্যায়ে বললেন, দেখেন গতকাল জহুরুল হক হলের উত্তর পাশের রাস্তায় চুন্নুকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। কার ভাগ্যে যে কোন সময় বিপদ এসে যায় বলা মুশকিল। তাই আপনারা একটু সাবধানে চলার চেষ্টা করবেন। যতটা সম্ভব সংঘাত এড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করে চলবেন। স্যারের কথার মধ্যে অনেক উপদেশমূলক ইংগিত বহন করছিল যা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না। স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ গুলির আওয়াজ হলো, গুলিটা যে খুব কাছে হচ্ছিল তা গুলির আওয়াজেই বুঝা গেল। এরপর শুধু গুলি আর গুলি। মনে হলো এ যেন সেই ছোট বেলার রমজান শেষে দীর্ঘ প্রতিক্ষিত ঈদের চাঁদ ওঠার পরে একযোগে গ্রামের শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন রকম বাজি ফুটানোর আওয়াজের মত। স্যার আমাদের খুব জোর করে বললেন, তোমরা কেউ বেঞ্চ থেকে ঊঠোনা এবং জানালার পাশে এসোনা। এইতো পশ্চিম পাশের মাঠেই গোলাগুলির আওয়াজ চলতে লাগল অবিরাম। খবর শোনা গেল স্বৈরশাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর পালিত বাহিনীর নেতা অভি-নিরু মিডফোর্ট মেডিকেলের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং ও কলা ভবনের মাঝখানের মাঠে ঢুকে পড়েছে। প্রাণপণ গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্যাম্পাস দখলে নেয়া। কিন্তু বহুদলীয় ছাত্র ঐক্যের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেয়া হলো। প্রায় এক ঘন্টার অধিক সময় ধরে উভয়পক্ষের মধ্যে আক্রমন ও পাল্টা আক্রমন চলতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ সংগ্রাম করে টিকতে না পেরে স্বৈরশাসকের বাহিনী শেষমেষ বিফল হয়ে সরকারী প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়েছিল। আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছিলাম তাতে জানা গেল ঐদিন প্রায় ৫০০ রাউন্ডের মত গুলি ছোড়া হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সমস্ত ক্লাস অনির্দিষ্টকালের জন্য Ÿন্ধ ঘোষণা করলেন।

দীর্ঘদিন যে সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলন চলছিল তা আরও বেগবান হতে লাগল। সরকারের পক্ষ থেকে শুরু হলো সংঘাত, জুলুম, নির্যাতন, মিছিলের উপরে গুলিবর্ষণ। এর একপর্যায়ে ডা: মিলন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। আন্দোলন আরও তুমুল হতে লাগল। প্রতিদিনই সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম চলতে লাগল। অনেক রক্ত ঝরল, শেষমেষ রক্তের হলি খেলায় স্বৈরশাসক হেরে গেলেন। শেষ চেষ্টা করেও কোন কাজ হলোনা। অনেক তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত গদির লোভ তাকে ছাড়তে হলো এবং ১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর সাধারণ জনগণ ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কঠোর প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। অবসান ঘটল নয় বছরের স্বৈরশাসনের। দেশের মানুষ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

সংকটকালিন মুহূর্তে দায়িত্ব এসে পড়ল বিচারপতি সাহাব উদ্দিনের কাঁধে, দায়িত্ব পড়ল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করার। নির্ভেজাল চরিত্রের মানুষ বিচারপতি সাহাব উদ্দিন তাঁর শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে জাতিকে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য মানের একটি নির্বাচন উপহার দিলেন এবং প্রত্যেকটি দল এ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছিলেন ।

১৯৯১ এর নির্বাচনে সাধারণ জনগণের মধ্যে স্বতস্ফূর্ত ভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। জনগণ তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। নির্বাচনী ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সমমনা দলগুলো নিয়ে সরকার গঠন করলেন। বছর না ঘুরতেই আবার আন্দোলন দানা বেধে ঊঠতে লাগল, হরতাল মিছিল মিটিংসহ সংসদ বর্জনও চলতে লাগল। অনেক চড়ই-উৎরাই পেরিয়ে বিএনপি অনেকটা হঠকারী সিন্ধান্ত নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্র“য়ারী বিরোধীদলবিহীন জাতীয় সংসদের নির্বাচন করলেন। প্রধান বিরোধী দল না থাকায় একচেটিয়া সংসদের প্রায় সকল আসন পেয়ে গেলেন তারা। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উক্ত নির্বাচনকে অবৈধ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে তত্তাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে পূন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তারা রাজ পথে তুখোড় আন্দোল গড়ে তুললেন। প্রচন্ড আন্দোলনের মুখে বিএনপি বিরোধীদলের দাবী মেনে নিয়ে তত্তাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ ক্ষমতা থেকে নেমে পরলেন। প্রমাণ হলো, জনগণের যে কোন যৌক্তিক দাবি সংসদের সংখ্যা গরিষ্ঠতার বলে অবহেলা করে মোটেও পার পাওয়া যায়না।

এবার জনগণ খুব স্বস্তি বোধ করলেন। ভাবলেন এবার বুঝি ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য সংঘাত আর হানাহানি থেকে বাঁচা গেল, ভবিষ্যতের জন্য আর কোন হানাহানির অবকাশ থাকলনা। যেহেতু ভবিষ্যতে প্রতিটা সরকারের মেয়াদ শেষে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¦াবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অতএব স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য হল যে, নির্বাচন অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের ও জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে। এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¦াবধায়ক সরকারের বিষয়টি সাংবিধানিক ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেল। 

যেহেতু বিএনটি সংসদ ভেংগে দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তাই নিয়মানুযায়ী নির্দিস্ট (তিন মাস) মেয়াদের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। সে অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং নির্বাচন হলো তত্ত্বাবধায় সরকারের মাধ্যমে। এবার সংখ্যা গরিষ্ঠতার বলে ক্ষমতায় এলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এভাবেই ক্ষমতার পালা বদলে আবার ২০০১ সালে সংসদের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন বিএনপি। কিন্তু বিএনপির মেয়াদ শেষে তত্ত্বাধায়ক সরকারে প্রধান ব্যাক্তি কে হবেন এ নিয়েই অনেক নাটক ঘটে গেল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এ নিয়ে প্রচন্ড রকমের সংঘাতময় পরিস্থিরি সৃষ্টি হলো। এ অরাজক পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ আবার অসহায় হয়ে পড়লেন। প্রতিদিনই নৃশংসতা চলতে লাগল। পল্টনের ঘটনা আমাদের অজানার কথা নয়। দেখা গেল চেহারা না চেনার কারনে নিজ দলের লোকদের হাতে নিজেরাই মার খাচ্ছে। যেমন আওয়ামীলীগের এ আমলেও বিশ্বজিৎ এর বেলায় ঘটল। এমনি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে এক এগারোর সৃষ্টি হলো। এক এগারোর সময় বিএনপি ও আওয়ামীলীগের উপরে যে খড়গ নেমে এসছিল সে ইতিহাস আমাদের সকলকেই নাড়া দেয়। আজ এ লেখায় এক এগারোর ভালো মন্দ বিশ্লেষণে যাবনা এবং উদ্দেশ্য আমার সেটা নয়।

পাঠক হয়ত মনে করতে পারেন এই পুরনো ইতিহাস সকলেরই জানা আছে তাহলে কেন অহেতুক এই বাসি গল্প আলোচনায় আনা হলো? ঊদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। যে ঊদ্দেশ্যে এত পেছনে ফিরে তাকাতে হলো সেটা  হলো আমরা আজ কোথায় ফিরে যাচ্ছি। যেহেতু ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ আন্দেলনের মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি মিমাংসিত হয়েছিল এবং বর্তমান সংসদের মাধ্যমে তত্ত্বধায়ক আইন বাতিল করা হয়েছে তাই ভবিষ্যত নির্বাচন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অনিবার্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এখন সহসাই প্রশ্ন আসতে পারে, আসলে আমাদের ভবিষ্যত রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে?  আমরা দেশ ও জাতিকে আবার সেই পিছনের দিকে অর্থাৎ ১৯৮২, ১৯৯০-এর অভ্যূত্থান, ১৯৯৬’র মাত্র ১৫ দিনের সংসদ না কি এক-এগারোর দিকে নিয়ে যাচ্ছি? জানি, এ উত্তর রাজনীতিবিদরা মিলাতে পারলেও মিলাবেন না।

এ প্রসংগে আমার একটা উদহরণ মনে পড়ে গেল, সেটা হলো- আমাদের দেশের স্বাধীনতার বয়স ৪২ পেড়িয়েছে অর্থাৎ ৪২ বছর পূর্বে আমাদের দেশের জন্ম হয়েছে। এই ৪২ বছর পরেও আমরা কোথায় অবস্থান করছি। শিশু অবস্থায় না-কি ৪২ বছর বয়সের এক সুঠাম দেহের অধিকারীর ন্যায়। জন্মের পরে এক সময় মানুষ হাটতে শিখে। তারপরে একটু জোরে হাটে। তারপরে একা একা দৌঁড়াতে পারে। সারা জীবনতো আর মানুষ হাটা শিখেনা। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের অবস্থা প্রকৃত অর্থে ঐ শিশুটির ন্যায়। যে জন্মের ৪২ বছর পার হওয়ার পরেও বাপের হাত ধরে হাটা শিখছে।

আমি এ দেশের একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশের শ্রদ্ধাভাজন দুই নেত্রীকেই বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাচ্ছি, আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমরা আর অন্যের হাত ধরে হাটা শিখতে চাইনা। আমরা আর হানাহানি চাইনা, আমরা এক ভাই আরেক ভাইয়ের রক্ত দেখতে চাইনা। আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে চাই। সর্বোপরি আমরা সহাবস্থান চাই। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা উভয়েই এই মহান স্বাধীনতার মাসকে শ্রদ্ধা করেন। বিশেষ করে এই স্বাধীনতার মাসের উপরে শ্রদ্ধা রেখে আপনারা পিছনের সব অপ্রীতিকর ইতিহাস ভুলে গিয়ে জনগণের ও দেশের কথা চিন্তা করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি যৌক্তিক সিন্ধান্তে এসে উপণীত হবেন। এদেশের সাধারণ জনগণ যারা কম শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চ শিক্ষিত আছেন তাদেরকে আর শ্রমিক বানিয়ে বিদেশে না পাঠিয়ে যাতে করে এ এদেশের মাটিতেই কর্মক্ষেত্র তৈরী করে দিতে পারেন তার জন্য প্রয়োজনে একটি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করুন এবং এ দেশের জনগণের হাতকেই কাজে লাগিয়ে দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিন। এদেশের ষোল কোটি মানুষ আপনাদেরকে আমরণ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে যাবে। আমরা এই অপরাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক তিলোত্তমা ও সহকারী ব্যবস্থাপক, দৈনিক করতোয়া।

শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০১৩

মাতৃভাষার একাল-সেকাল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
আমরা ক’জন একালের স্মার্ট তরুণ। বন্ধুর জন্য বাসা খুঁজতে বেরিয়েছি রাস্তায়। দেয়ালে টানানো ‘টু-লেট’ দেখে তিলপাপাড়ার চিপাগলিতে বাসা খুঁজতে খুঁজতে এক বৃদ্ধের সাথে দেখা। আমরা বললাম,‘এক্সকিউজ মি আংকেল! ৩১২ নম্বর বাসাটা কোন দিকে?’ বৃদ্ধ অবাক চোখে পরখ করলেন আমাদেরÑ তারপর বললেন,‘আমাকে আঙ্কেল বললে কেন? বল চাচা। চাচা ডাকটি কী বিশ্রী লাগে শুনতে?’ তপু বিড়বিড় করে বলল,‘লোকটা বড্ড ব্যাকডেটেড।’ ইতস্তত হয়ে আমি বললাম,‘সরি!’ বিশ্বাস করুন, আমি বলতে চেয়েছিলাম.....। কিন্তু মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। ভেরি ভেরি সরি। নেক্সটাইম আর বলবনা।’ বৃদ্ধের চোখে-মুখে ক্ষোভের বিচ্ছুরণ। বললেন,‘আবার সরি কেন? বল দু:খিত। বাসাটা ওই দিকে।’ আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম,‘থ্যাঙ্ক ইউ!’ বৃদ্ধ এবার রাগ সামলে দন্তবিহীন মুখে মলিন হাসি হাসলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-‘তোমাদের দোষ দিয়ে কী লাভ? এটাইতো আমাদের স্বভাব। তোমাদের যা শেখাই। তোমরা শিখছ তাই।’ বলেই হাতের লাঠি দিয়ে পথ ঠুকতে ঠুকতে অদৃশ্য হলেন। আমরা হতবাক! অণুকরণপ্রিয়তা আর পরনির্ভরশীলতার লজ্জায় মাতৃভাষার জন্য বেরিয়ে এল অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস!

## সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
     কালকিনি, মাদারীপুর।
     আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৩

শীত কালের খেজুর রস হতে পারে সারা বছরের আয়ের উৎস


শীত কালের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ খেজুর রস বা গুড়। গ্রামাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ মাত্র ২-৩ মাস খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বারো মাসের সাংসারিক খরচ জোগাতে পারেন। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কিংবা গুড় তৈরি করে এ আয় করা সম্ভব। খন্ডকালীন এ পেশায় যারা নিয়োজিত হন গ্রামবাংলায় তাদের বলা হয় ‘শিউলি বা গাছি’। খেজুর রস বা খেজুর গুড় পরিবারে এনে দিতে পারে সচ্ছলতা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।
যা যা প্রয়োজন: রস সংগ্রহ করতে প্রথমত নিজের বা অন্যের খেজুর গাছ নির্বাচন করতে হবে। রসের উপোযোগি গাছ ঝোরতে (পরিস্কার) হবে। এরপর বাঁশের তৈরি ঠুই বা ঠুলি (ঝুড়ি) দরকার। খলা তৈরি করতে দুইটি ছেনদা ও একটি কোপাদা। আবার দা ধারালো রাখতে বালু আর বালিকাচা (সুপারি কাঠ)। কোমড়ে বাঁধতে একটি পাটের চট বা বস্তা। ৫-৬ হাত লম্বা কাছি (রশি)। যা শিউলিকে গাছের সাথে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে। ৩ হাত লম্বা একটি বাঁশ, যেটা গাছের ডাল-পালা পরিস্কার করার সময় আড়াআড়ি বেঁধে দাঁড়াতে প্রয়োজন হয়। সবশেষে রস পড়ার উপযোগি খলা তেরি করে বাঁশের নলি(নল) ও দুইটা খিল দিয়ে হাড়ি দিতে হবে। 
খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ: বাঙলা কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গাছের একদিকের কাঁটা ফেলে দিয়ে কিছুদিন বিশ্রামের পর অগ্রহায়নের মাঝামাঝি খলা তৈরি করে রস সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ চলবে চৈত্র মাস পর্যন্ত। তবে যে গাছে খেজুর হয়না তাকে বলে ‘চুমুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস সংগ্রহ শুরু করতে হবে অগ্রহায়নের শেষের দিকে। আর সংগ্রহ শেষ হবে মাঘ মাসের শেষের দিকে। যে গাছে খেজুর ধরে তাকে বলে ‘খাজুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহ করা যাবে। সপ্তাহের চারদিন বিকেলে গাছ কাটতে হবে। রাতের জমানো রস সকাল বেলা সংগ্রহ করতে হবে। গাছকে অবশ্যই সপ্তাহে ৩ দিন বিশ্রাম দিতে হবে।
যেভাবে তৈরি হয় গুড়: শিউলিরা ইচ্ছা করলে রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে পারেন। রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে হলে সকালে রস সংগ্রহের পর বাড়ির আঙিনায় স্থায়ী বা অস্থায়ী চতুর্ভূজ আকৃতির বিশেষ চুলার ওপর সিলভারের তাফালে (চতুর্ভূজ আকৃতির পাত্র) আগুনে জাল দিয়ে চিট (আঠাল) হলে ছোট ছোট মাটির গর্তের ওপর কাপড় রেখে কিংবা পরিস্কার প্লেট বা থালায় ফেলে তার ওপর ঢেলে গুড় তৈরি করতে হবে। শক্ত হলে গুড় তুলে নিতে হবে। আকারে ছোট গুড়কে ‘পাটালি’ আর বড় গুড়কে ‘মধুখন্ড’ বলা হয়।
বিক্রি ও আয়: বাজারে এক হাড়ি রস ১০০-১৩০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। রস ক্রেতারা সকাল বেলা আপনার বাড়ি এসে নিয়ে যাবেন বা স্থানীয় বাজার থেকেও কিনে নিতে পারবেন। আপনার অধীনে ৩৫-৪০টি গাছ থাকলে আপনি প্রতিদিন ৪০০-৫০০টাকার রস বিক্রি করতে পারবেন। আর বর্তমানে বাজারে খেজুর গুড় বিক্রি করতে পারেন প্রতি কেজি ৮০-১৩০ টাকা দরে। যারা গুড় তৈরি করবেন তারা অন্য শিউলি বা গাছির কাছ থেকে অতিরিক্ত রস কিনে নিতে পারবেন। গুড় বিক্রেতারা স্থানীয় ব্যবসায়ি বা পাইকারের কাছে গুড় বিক্রি করতে পারেন। তবে পাইকারি বিক্রি করলে লাভ একটু কম হবে। তবে হাটে বসে খুচরা বিক্রি করলেই লাভবান হবেন বেশি।
শিউলি বা গাছির কথা: শিউলি বা গাছি আবুল কালাম জানান,‘মোর ৩০টা গাছ মুই কাটি। ভালোই আয় অয়। আরেক জনের গাছ কাটা লাগে না। আরেক জনেরটা কাটলে তারে তিনভাগের একভাগ দেওয়া লাগে। তিন বছর অইলো পোলা দুইডা বিদাশ আছে। অগো টাকা মোর লাগেনা। মোরা খাইয়া-লইয়া ভালোই আছি।’

অথবা: আবুল কালামের সংসার চলে খেজুর রস বিক্রি করে

শীত কালের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ খেজুর রস বা গুড়। গ্রামাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ মাত্র ২-৩ মাস খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বারো মাসের সাংসারিক খরচ জোগাতে পারেন। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কিংবা গুড় তৈরি করে এ আয় করা সম্ভব। খন্ডকালীন এ পেশায় যারা নিয়োজিত হন গ্রামবাংলায় তাদের বলা হয় ‘শিউলি বা গাছি’। তাই ২০ বছর যাবৎ খেজুর রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন আবুল কালাম। দুই ছেলেকে তিন বছর আগে দুবাই পাঠিয়েছেন। কাজ-কর্ম বোঝার পর থেকেই খেজুর গাছ কাটাকে নিজের পেশা হিসাবে নেন তিনি। এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার উত্তর রাজদী কাঠেরপুল গ্রামের শিউলি বা গাছি আবুল কালামের কথা জানাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।
‘তেমন কিছু করি না। মাঝে মাঝে মানুষের বাড়ি কামলা খাটি। আর শীতকাল আইলে খাজুর গাছ কাটি। রস বেইচ্যা যা আয় অয় তাতেই হারা বছর পার অইয়া যায়।’ কথাগুলো বললেন আবুল কালাম। তিনি ২০ বছর যাবৎ এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন। তার একমাত্র আয়ের উৎস খেজুর রস।
বাঙলা কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গাছের একদিকের কাটা ফেলে দিয়ে কিছুদিন বিশ্রামের পর অগ্রহায়নের মাঝামাঝি খলা তৈরি করেন। যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে পৌষ মাসের শুরু থেকেই পুরোদমে রস সংগ্রহ করতে থাকেন। এ সংগ্রহ চলে চৈত্র মাস পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে গাছের ধরণ অনুযায়ি দুইটি সময় উল্লেখযোগ্য। আর তা হলো- যে গাছে খেজুর হয় না তাকে বলে ‘চুমুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস সংগ্রহ শুরু করেন অগ্রহায়নের শেষের দিকে। আর সংগ্রহ শেষ হয় মাঘ মাসের শেষের দিকে। যে গাছে খেজুর ধরে তাকে বলে ‘খাজুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহ করেন। সপ্তাহে চারদিন বিকেলে গাছ কাটেন। সারারাতের জমানো রস সকাল বেলা সংগ্রহ করে বিক্রি করেন ।
বর্তমান বাজারে এক হাড়ি রস ১০০-১৩০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। রস ক্রেতারা সকাল বেলা তার বাড়ি এসে নিয়ে যায় বা স্থানীয় বাজার থেকেও কিনে নেয়। তার নিজেরই ৩০টি খেজুর গাছ আছে। সপ্তাহে তিন দিন গাছ কাটেন না। বাকি চার দিনে তার দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকার রস বিক্রি হয়। ২-৩ মাস রস বিক্রি করে টাকাটা জমিয়ে রাখেন। শীতকালের ২-৩ মাসের আয়ে তার সারা বছর চলে যায়। এছাড়া মাঝে মাঝে কামলা খাটেন। তার জমানো টাকা ও নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিছু ধার করে দুই ছেলেকে ৩ বছর আগে দুবাই পাঠিয়েছেন। তবুও ছাড়েননি এ পেশা। খেজুর গাছ কাটা তার নেশায় পরিণত হয়েছে।
আবুল কালাম জানান,‘মোর ৩০টা গাছ মুই কাটি। ভালোই আয় অয়। আরেক জনের গাছ কাটা লাগে না। আরেক জনেরটা কাটলে তারে তিনভাগের একভাগ দেওয়া লাগে। তিন বছর অইলো পোলা দুইডা বিদাশ আছে। অগো টাকা মোর লাগেনা। মোরা খাইয়া-লইয়া ভালোই আছি।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
১৭.০১.২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সোমবার, ১১ মার্চ, ২০১৩

পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস ‘হোগলা’ শিল্প

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘হোগলা’ গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এ শিল্পের কারিগর নারীরা। গ্রামের নারীরাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। পারিবারিক বিভিন্ন কাজে হোগলা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশেষ করে গ্রামে হোগলার ব্যবহার লক্ষণীয়। ঘরের বিছানা, খাদ্যশস্য রোদে শুকানো, মিলাদ-মাহফিল, পূজা-পার্বণে অনেক মানুষকে বসতে দেওয়ার ক্ষেত্রেও হোগলা ব্যবহৃত হয়। আর এতে সাবলম্বী হচ্ছে নারীরা। পরিবারে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বাড়তি উপার্জন করে সচ্ছলতা সাবলম্বী হয়েছে। পরিবারে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা।
হোগলা পাতা সংগ্রহ:
নদীর পাড়ে বা চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হোগলা কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাসের মধ্যে কেটে শুকিয়ে বিক্রির জন্য হাট-বাজারে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের পুরুষরা বাজার থেকে হোগলা পাতা কিনে নিয়ে যান। বাকি কাজ করতে হয় নারীদের। এক মুঠি হোগলা পাতা ৫০-১০০ টাকায় কিনতে হয়। এক মুঠিতে ২টা হোগলা হয়। প্রতিটি হোগলা পাইকারি ৬০-১২০ টাকা বিক্রি করা যায়।
যেভাবে তৈরি হয়:
হাট-বাজার থেকে কিনে আনা শুকনো হোগলা পাতা দেখতে ত্রিকোণাকৃতির। মাদুর তৈরির জন্য প্রথমে শুকনো পাতাগুলো ‘কেচতে’ হয়। অর্থাৎ ত্রিকোণাকার পাতার এক পিঠে তিন-চার ইঞ্চি মাপের একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ফাঁড়ার জন্য দাগ দিতে হয়। এরপর পাতা চ্যাপ্টা করে শুরু হয় মাদুর বোনার কাজ। বুনন শেষে ‘মুড়ি ভাঙা’ দিয়ে কাজ শেষ করতে হয়। দক্ষ হাতে ১০ বাই ১২ ফুট বড় একটি হোগলা পাতার মাদুর তৈরি করতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। বারো মাসই হোগলা তৈরি করা যায়।
বিক্রি হয় যেভাবে:
হোগলা পাতার মাদুর বিক্রি হয় হাট-বাজারে। ব্যবসায়িরা পাইকারি দরে হোগলা কিনে বরিশাল, স্বরূপকাঠি, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় ট্রলার বা লঞ্চ যোগে পাঠিয়ে দেন। মাদুর প্রতি তাদের দুই-তিন টাকা লাভ হয়। প্রতিটি চালানে কয়েক হাজার মাদুর পাঠাতে পারেন।
হোগলার জন্য প্রসিদ্ধ:
হোগলার জন্য প্রসিদ্ধ মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পৌর এলাকার তিনটি গ্রাম পাতাবালী, জুরগাও ও নয়াকান্দি; সিডিখান ও নবগ্রাম ইউনিয়নের ১০টি, এনায়েতনগর ইউনিয়নের ফাঁসিয়াতলা ও বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে হোগলা তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি মাদুর কেনাবেচা হয় জুরগাঁও হাটে। রোববার ও বুধবার সপ্তাহে দুই দিন বসে হাট। পাতা সংগ্রহ ও হোগলা বিক্রি করা জয় ঐদিন।
হোগলা শিল্পীদের কথা:
হোগলা শিল্পী মালতী মন্ডল ও সুমিত্রা সরকার জানান, ঘরে বসে থেকে কি করবো? হোগলা বুনে ভালো আয় হয়। সংসারও ভালো চলে। শুধু কী পুরুষের আয় দিয়েই সংসার চলে? তাই আমাদের গ্রামের নারীরা বাড়িতে বসে হোগলা বুনে বাড়তি আয় করে। তাতে সংসারের অভাব দূর হয়। তবে যত বেশি চালান খাটানো যায়; তত বেশি লাভ হয়। ব্যবসাটা ভালোই। পরিশ্রমও কম। সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে আমরা হোগলা বুনি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
০৫.০১.২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

কবিতার জন্য কবিকে প্রেমে পড়তে হয়

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
বাঙলা সাহিত্যে কাব্য সাহিত্যের শাখাটি সর্বাধিক সমৃদ্ধ। সেই প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ হয়ে আধুনিক যুগে এসেও একচ্ছত্রভাবে বরাবরই আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। ঠিক তেমনিভাবে বাঙলা কবিতায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে প্রেম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় মনোভাব, যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক অস্থিরতা ও সমকালীন সমস্যার পাশাপাশি মানবীয় প্রেম-বিরহও স্থান কওে নিয়েছে কাব্যে। নিঃসঙ্গ কবির ব্যক্তি জীবনের দুঃখদুর্দশা তাকে প্রেমের কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
 
কবিতা লিখতে গিয়ে কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। অথবা প্রেমে পড়ে তাকে কবিতা লিখতে হয়েছে। দুটাই চিরন্তন সত্য। কবি মনে প্রেম জাগ্রত না হলে কবিতা হয় না। কাব্যচর্চার জন্য প্রেম অনিবার্য। আর সে চর্চাকে অব্যাহত রাখতে হলে বেছে নিতে হয় বিরহকে। কারণ মিলনের চেয়ে বিরহই কবিকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করে। নব সৃষ্টির উন্মাদনা জাগ্রত করে। কবি বলেছেন-‘প্রেমের পরশে প্রত্যেকেই কবি হয়ে উঠেন।’ কবিতার সাথে যেন প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। লোকে বলে- কবি মানেই প্রেমিক। আর প্রেমিক মানেই কবি। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর যিনি জীবনে অন্তত এক লাইন প্রেমের কবিতা বা ছন্দ রচনা করেন নি। সবার জীবনে একবার প্রেম আসে- কথাটা যেমন সত্য; ঠিক তেমনি জীবনে অন্তত একবার কাব্য রচনা বা সাধনা করেন নি একথাও অস্বীকার করার জো নেই। কেউ যদি মনে-প্রাণে,ধ্যানে-জ্ঞানে কবি হন তবেতো কথাই নেই।

বাঙলা সাহিত্যে প্রেমের কবিতা বা কবিতায় প্রেম বিষয়ে পরিসংখ্যান করা খুবই দুঃসাধ্য। দ্রোহ-সংঘাত বা অস্থিরতার মধ্যেও বাঙলা কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ অগণিত। মধ্যযুগের পদাবলি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অধিকাংশ কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ এসেছে অসংখ্য বার। বর্তমানে যারা খ্যাতনামা কবি বা যারা প্রতিষ্ঠার জন্য কাব্যচর্চা করছেন প্রত্যেকেই হয়তো প্রথম জীবনে কোন বালিকার উদ্দ্যেশ্যে প্রেমকাব্য রচনার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছেন।

প্রাচীন যুগের(৬৫০-১২০০খ্রিস্টাব্দ) বাঙলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে কিঞ্চিৎ প্রেমের আভাস পাওয়া যায়। সেটা কূলবধুর পরকীয়ার অভিসার। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণে পরকীয়া প্রেমের নিষিদ্ধ আনন্দ থাকলেও এর গূঢ়ার্থ ভিন্ন। চর্যার ২ নম্বর পদে পদকর্তা উল্লেখ করেছেন-
‘দিবসহি বহুড়ী কাউ হি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরূ জাই ॥’
Ñ‘দিনে বধূ কাকের ভয়ে ভীত আর রাতে কামরূপ (অভিসারে) চলে যায়।’

মধ্যযুগে (১২০১-১৮০০খ্রিস্টাব্দ) ধর্মাশ্রিত কাব্য সাধনা থেকে বেরিয়ে এসে কবিরা মানবাত্মার জয়গান গাইতে শুরু করলেন। সে সময়কার বৈষ্ণব পদাবলীর কবিদের ধর্মÑ প্রেমধর্ম। যে প্রেমের কোন হেতু নেই, যে প্রেম কোন বাধা মানে না, কোন প্রতিদান চায় না, যে প্রেমে আত্মসুখের কামনা নেই, যে প্রেম ইন্দ্রসম ঐশ্বর্যকেও তুচ্ছজ্ঞান করে, যে প্রেম মৃত্যুকেও ভয় করে না। বৈষ্ণব কবিদের প্রেম সেই প্রেম। কবি চন্ডিদাস বলেছেন-
‘সই, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া            আন বাড়ি যায়
আমার আঙিনা দিয়া।’
-এরকম প্রেমের অনুষঙ্গ সেই বৈষ্ণব কবিতাতেই প্রথম উচ্চারিত হয়।

জীবের মধ্যে যে সুখ বাসনা আছে, তা ইন্দ্রিয়জ বা সাংসারিক সুখভোগে চরিতার্থতা পায় না। ভগবানের প্রেম হৃদয়ে লাভ করতে পারলেই মানুষ যথার্থ আনন্দিত হতে পারে। তাই শ্রীকৃষ্ণকে পরমাত্মা ও রাধাকে জীবাত্মার প্রতীকে বৈষ্ণবেরা এ প্রেম ব্যক্ত করেছেন। কবি চন্ডীদাস বলেছেন-
‘এমন পিরীতি কভূ দেখি নাই শুনি
পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা-আপনি।
দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।’

মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার ছবি আঁকতে গিয়ে কবিরা বরাবরই প্রেমকে করেছেন উপজীব্য। এমনকী মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণও প্রেমের ভারে আক্রান্ত হয়েছে। ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারের চেয়ে বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তা হয়ে উঠেছে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী। পরমাত্মা ও জীবাত্মার প্রেমকাহিনী প্রতীকি ব্যঞ্জনার কারণে তৎকালীন সাহিত্য সমালোচকদের কাছে অশ্লীলতার দোষেও দুষ্ট হয়েছে।

আধুনিক যুগে এসে সমকালীন বিভিন্ন উপাদানের মধ্যেও প্রেম হয়ে উঠেছে কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের আড়ালে প্রেমকেই উচ্চকিত করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বিদ্রোহের জন্য প্রেম অনিবার্য। তাই বাংলা কবিতায় অনিবার্যভাবেই প্রেম তার জায়গা দখল করে নিয়েছে। কবিরা সুন্দরের পূজারি। প্রেমের সৌন্দর্য অপরিসীম। প্রকৃতি ও নারী কবি মনে প্রেমের উন্মেষ ঘটান। কবিরা ভালোবাসতে গিয়ে নারী ও প্রকৃতিকে একাকার করে ফেলেন। যেমনটা করেছেন জীবনানন্দ দাশ। ‘বনলতা সেন’ তার অমর কাব্য। হোক সে নারী বা প্রকৃতি। কবি ভালোবেসেছেন। প্রেমে পড়েছেন- তারই অভিব্যক্তিÑ
‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু’দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’

বাংলা কবিতার প্রেমকেও বিভাজিত করা যায়- হতে পারে সেটা প্রকৃতি প্রেম, দেশপ্রেম, স্রষ্টার প্রতি প্রেম, মানবপ্রেম ও নারীর প্রতি প্রেম। প্রেম সার্বজনীন। ভালোবাসার অধিকার সকলের। কবি ত্রিদিব দস্তিদার ‘ভালোবাসতে বাসতে ফতুর হয়ে যাবার’ কথা বলেছেন। হতে পারে সেটা ক্ষেত্র বিশেষ। জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনির্বার। সৃষ্টিকর্তাও নারীকে সৃষ্টি করেছেন অপরিমেয় সৌন্দর্যের সমন্বয়ে। সংগত কারণেই পুরুষ নারীর প্রেমে পড়ে। নারী পুরুষের প্রেমে পড়ে। আর এজন্যই যুগে যুগে রচিত হয় প্রেম কাহিনী। প্রেমের কবিতা পাঠককেও আকৃষ্ট করে তাড়াতাড়ি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ কেউ কথা রাখেনি’ কবিতারÑ
‘ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম’
Ñএর মত প্রেমের কবিতার লাইন প্রচারিত হয় প্রেমিক পুরুষের মুখে মুখে। একজন নেহায়েত বেরসিক মানুষও প্রেমের কবিতা পাঠে অপ্লুত হন। এটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তাই কবিরাও প্রেমের কবিতা লেখাতেই বেশি মনোযোগি হন। কখনোবা সাম্প্রতিক বা ঐতিহাসিক ঘটনাবলিও কবিতার উপজীব্য হয়। তবুও যুগ যুগ ধরে পাঠকের হৃদয়ে গতিবেগ সঞ্চার করে প্রেমের কবিতা।

বাঙলা কাব্যে উল্লেখযোগ্য বা বিখ্যাত যত কবিতা রয়েছে তার বেশির ভাগই প্রেমের কবিতা। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণ, বৈষ্ণব পদাবলি, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মধ্যে লাইলি-মজনু, পদ্মাবতী, ইউসুফ-জুলেখা প্রভৃতি প্রেমের উল্লেখযোগ্য কাহিনীকাব্য। আধুনিক যুগের কাহিনী কাব্যের মধ্যেও জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ উল্লেখযোগ্য প্রেমকাহিনী। ‘নকশী কাঁথার মাঠ কবি জসীম উদদীনের প্রথম কাহিনীকাব্য। গ্রামবাংলার দুটি তরুণ-তরুণী রূপা আর সাজুর অনাবিল প্রেম আর করুণ পরিণতি এ কাব্যে উপস্থাপিত হয়েছে।’ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাহিনীকাব্যে দুটি ভিন্ন সমাজের দুটি কিশোর-কিশোরী সোজন ও দুলীর প্রণয়কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

এছাড়াও মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন মিত্র, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, পূর্ণেন্দু পত্রী, মহাদেব সাহা, অসীম সাহা, দাউদ হায়দার, হুমায়ুন আজাদ, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সমুদ্র গুপ্ত, সৈয়দ শামসুল হক, হেলাল হাফিজ, দুলাল সরকার, ফারুক মাহমুদ, টোকন ঠাকুর, হেনরী স্বপন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আসলাম সানী প্রভৃতি কবিরা অনবদ্য প্রেমের কবিতা রচনা করেছেন। তাদের বিখ্যাত প্রেমের কবিতার মধ্যে বিদায় বেলা, অভিশাপ, পত্র লেখা, বিদায়, হঠাৎ দেখা, আকাশলীনা, বনলতা সেন, পাহাড় চূড়া, কেউ কথা রাখেনি, প্রেম, উল্লেখযোগ্য স্মৃতি, ফেরীঅলা, হে আমার বিষণœ সুন্দরসহ অসংখ্য কবিতায় মানব-মানবীর প্রেম হয়েছে উচ্চকিত।

সবশেষে বলা যায়, পৃথিবী যতদিন থাকবে; ততদিন মানুষ থাকবে। মানুষ যতদিন থাকবে; ততদিন ভালোবাসা থাকবে। এসব কিছু যতদিন থাকবে; কবিরাও ততদিন থাকবে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা য্ায়, কবিরা যতদিন থাকবে; প্রেমের কবিতা ততদিন থাকবে। তাই একথার সাথে সবাই একমত হবেন যে, কবিতা মানেই প্রেম, প্রেম মানেই কবিতা। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ কবিদের হাতে প্রেম হয়ে উঠবে আরো বি¯তৃত। বাঙলা কবিতায় প্রেম হয়ে উঠবে পবিত্রতম আরাধনা। জয় হোক প্রেমের, জয় হোক কবিতার। কবিরা দীর্ঘজীবি হউন। প্রেমের কবিতা ছড়িয়ে পড়–ক সর্বত্র।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সুনীল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পকার,কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।
কালকিনি প্রেসক্লাব, কলেজ রোড, কালকিনি, মাদারীপুর। আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সহায়িকা:     বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: মাহবুবুল আলম
বাংলাদেশের সাহিত্য(কবিতা): মাহবুবুল আলম
        শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণ: বড়– চন্ডীদাস
        জসীমউদদীন,জীবনীগ্রন্থমালা-১৫: মুহম্মদ ইদরিস জলী
        সাহিত্য-সন্দর্শন: শ্রীশচন্দ্র দাশ
        বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়