সোমবার, ১৩ আগস্ট, ২০১২

আমি কোন জীবন পাব



সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আমার একদিকে অনল
আমার অন্যদিকে সাগর
আমি কোন পথে যাব?

আমার এক হাতে গরল
আমার অন্য হাতে মরণ
আমি কোনটা বেছে নেব?

আমার এক পাশে কাঁটা
আমার অন্য পাশে নরক
আমি কোন দিকে যাব?

আমার এক পৃথিবী লাঞ্ছনার
আমার অন্য পৃথিবী হতাশার
আমি কোন পৃথিবী চাইব?

আমার এক জীবনে যৌনতা
আমার অন্য জীবনে ভালোবাসা
আমি কোন জীবন পাব?

বুধবার, ৮ আগস্ট, ২০১২

শ্রদ্ধাঞ্জলি:শিল্পী এস.এম সুলতান

আ. জ. ম কামাল:
কিছু কিছু মানুষ সমাজ সংস্কৃতি, জাতি তথা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে চলমান বিশ্বের সৃজন ধারায় কিছু অবদান রেখে যান যা আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃতির মতই øিগ্ধতায় অনুভবে অনুরণন তোলে। ত্যাগ আর সেবার সারল্যতায় সংস্কারের বেড়াজাল ভেঙ্গে ফুলের মত নির্মল শিশুদের থেকে শুরু করে দিন মান খেটে খাওয়া ফুটিয়ে তোলেন রঙ আর তুলির আলতো পরশে ক্যানভাসের পাতায়,ফুটিয়ে তোলে মানবতার আকুতিকে সংগ্রাম আর সহনশীল ভালবাসায় উদ্দীপ্ত চেতনার মধ্য দিয়ে। তেমনি একজন মানুষ একজন শিল্পী এস এম সুলতান।
আমার সাথে এ মহান শিল্পীর পরিচয় করিয়ে দেন গণসঙ্গীত শিল্পী মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীর। একুশে বই মেলায় গিয়েছিলাম আমার দুই বন্ধু তোফাজ্জেল হোসেন হিরু ও ফজলুর রহমান। আলমগীর ভাই বলেন সালাম কর। আমি তাই করলাম। কালো রংয়ের সালোয়ার, পাঞ্জাবী, ওড়না পড়া মেয়েদের মত মাথায় বড় চুল। আমার মধ্যে জানার ভীষণ আগ্রহ। ফকির ভাই বলেন, আমার পীর। পৃথিবীর বড় মাপের চিত্রশিল্পী। একা একা থাকেন। মাঝে মাঝে তার কাছে যেও। ভোলা মনের মানুষ। কিছু পরে মহিউদ্দিন ফারুকী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, খ. ম. হাসান, শামীম শিকদার, কামরুল হাসানসহ আরো গুণীজন এলেন। আমরা সবাই তাদের কথা শুনছিলাম। এক ফাঁকে সালাম দিয়ে শিল্পীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম।
তারপর থেকে রোজ একুশে বই মেলায় যেতাম সুলতান সাহেবের সাথে কথা বলতে, জানতে। মাঝে মাঝে তার বাসায় যেতাম। এস এম সুলতান সবার সাথে আপনি বলে কথা বলতেন। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক একবার বলেছিলেন,‘লাল মিয়া মানে এশিয়া’। জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘এস এম সুলতানকে যে চিনবে সে এশিয়াকে চিনবে।’ চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান জ্বীদ্দশায় তার প্রতিভার স্বীকৃতি যে পাননি তা নয়। ১৯৮২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ম্যান অব দ্যা ইয়ার অর্থাৎ বছরের শ্রেষ্ঠ মানব ঘোষণা করে। এ ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট এবং এশিয়া উইক পত্রিকা কর্তৃক ম্যান অব এশিয়া সম্মানে ভূষিত করে। ১৯৮১ সালে তাকে আর্টিস্ট ইন রেসিডেন্ট ঘোষণার মাধ্যমে সম্মানিত করে।
এস এম সুলতানের জন্ম ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল জেলার মাছিমদিয়া গ্রামে। বাবা রাজমিস্ত্রী মেছের আলী। বাবা তার নাম রাখেন লাল মিয়া।
৫ বছর বয়সে ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে লাল মিয়া ৫ম শ্রেণিতে পড়েন। সে সময় ড. শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় আসেন স্কুল পরিদর্শনে। লাল মিয়া তার একটি পোট্রেট এঁকে তাকে দেন, সবাই মুগ্ধ। পড়ার ফাঁকে বাবাকে সাহায্য করতেন তিনি। ১৯৩৮ সালে অজানার উদ্দ্যেশ্যে বেড়িয়ে পড়েন লাল মিয়া। বাড়ি তাকে ধরে রাখতে পারেনি। সোজা চলে এলেন কোলকাতায়। কোলকাতার ভবানীপুর রুবী স্টুডিওর মালিক ছিলেন তার স্কুলের শিক। কৃষ্ণনাথ ভট্টাচার্যের বাড়ি সেখান থেকে একদিন হাজির হন নড়াইল জমিদারদের কোলকাতার কাশিমপুরের বাড়িতে। জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় লাল মিয়াকে খুব ভালোবাসতেন, øেহ করতেন। তাকে জানালেন তিনি আর বাড়ি ফিরে যাবেন না। তিনি বলেন, জমিদার বাড়ির অরুণ রায়ের মতন শিল্পী হবেন। আর্ট কলেজে ভর্তি হতে মেট্রিক পাশ লাগে। লাল মিয়ার আগ্রহ দেখে অরুণ বাবু ব্যবস্থা করেন। ভর্তি পরীায় লাল মিয়া প্রথম হন। হৈচৈ পড়ে গেল কলেজে। কিন্তু কি হবে। মেট্রিক পাশ ছাড়া ভর্তি হওয়া যাবে না।
জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় এবং অরুণ রায় শহীদ সোহরাওযার্দীর কাছে গিযে ঘটনা বলেন। বিখ্যাত চিত্র সমালোচক শহীদ সোহরাওয়ার্দী আর্ট কলেজের কার্যকরি কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। তার অনুরোধে লাল মিয়াকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে। লাল মিয়ার প্রতিভায় তার বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে। তার দামী গাড়িতে করে মাছিমদিয়ার রাজমিস্ত্রীর ছেলে লাল মিয়া প্রতিদিন আর্ট কলেজে যাতায়াত করে।
সময় ১৯৩৮ সাল। জযনুল আবেদিন সে বছর আর্ট কলেজে শিক হিসাবে যোগদান করে। লাল মিয়া ও কামরুল হাসান সহপাঠী। শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাল মিয়ার নাম রাখেন এস এম সুলতান। এ নামেই সে পৃথিবী জোড়া পরিচিতি লাভ করে। সুলতান প্রতিবছর প্রথম হন। কারো কাছে না বলে বেড়িয়ে পড়েন পথে। প্রথমে আগ্রা। পকেটে মাত্র চার আনা। তাজমহলে আসতেই চার আনা শেষ। দারুণ ুধা নিয়ে ছবি আঁকেন। তিনজন আমেরিকান সৈনিককে ছবি এঁকে দিতে হবে। তারা তাকে ১৫০টাকা দেন। সোজা গিয়ে ওঠেন বিসমিল্লাহ হোটেলে। এসময় ড. বি এম জহুরীর সাথে তার পরিচয় হয়। জহুরী তাকে চাকুরী করার অনুরোধ করেন। কাজ ছবি আঁকা। সুলতান রাজী হন এবং তার সাথে চলে যান।
চার মাস পর চলে আসেন দিল্লী। সেখানে এক শিল্পীর বাড়ি এক মাস থাকেন। তাদের সাথে আজমীর শরীফ আসেন। আজমীরে এক মাস থাকার পর তিনি চলে আসেন লাক্ষ্মৌতে। সেখান থেকে হিমালয়ের
 প্রতি হিল স্টেশনে পায়ে হেটে ঘুরে বেড়ান, দেখেন দেরাদুন কাগন জালি। লক্ষ্মৌ ছেড়ে আসেন সিমলা। সেখানে অনেক ছবি আঁকেন। সিমলায় বসে এক কানাডিয়ান মহিলার সাথে তার পরিচয় হয়। তার সহযোগিতায় সিমলা সেন্টার পিটার্স স্কুলে তার ছবির প্রদর্শনী হয়। উদ্বোধন করেন কাপুরতলার মহারাজ। প্রদর্শনীতে চার শত টাকার ছবি বিক্রি হয়। সেখান থেকে চলে আসেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। পরিচিত হন সেখানকার নবাব ফরিদ খানের সাথে। ফরিদ খান তার ভালো বন্ধু হয়েছিলেন। পরে চলে আসেন কাশ্মীরে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় করাচি এসে পরিচয় হয় কবি জসীম উদ্দীনের সাথে। এসময় শাকের আলী , শেখ আহমেদসহ আরো নামিদামি শিল্পীদের সাথে পরিচিত হন। এবং আর্ট কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এস এম সুলতান করাচিতে প্রদর্শনী করেন। যা উদ্বোধন করেন ফিরোজ খান নুন। এরপর করাচী ুসিবধ হলে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মিস ফাতেমা জিন্নাহ। টিকেট এক টাকা। প্রচুর লোক সমাগম হয়েছিল।
১৯৫০ সালে পাকিস্তান চিত্রশিল্পীদের মধ্য থেকে তাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য মনোনিত করা হয়। তিনি ২০টি ছবি নিয়ে ১ জানুয়ারি আমেরিকা যান। আমেরিকা যাওয়ার আগে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি কোথায় কোথায় যাবেন। তিনি জানান, শিশুদের স্কুল দেখতে যাবেন। আমেরিকার ওয়াশিংটন, বোস্টন,শিলানা, মিসিগান শহরে তার একক প্রদর্শনী হয়। আমেরিকা থেকে আসেন লন্ডনে। সেখানে তার একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়। ভিক্টোরিয়া ডুস্বি ডালি,পন, ব্র্যাক,ক্রীব’র মত বিখ্যাত শিল্পীদের সাথে তার ছবি সমমর্যাদায় প্রদর্শীত হয়।
এস এম সুলতানের আগে এশিয়া মহাদেশের এমন দুর্লভ সম্মান কোন চিত্রশিল্পী পান নি। লন্ডনের লিসার গ্যালারীর প্রদর্শনী শেষে ছবিগুলো গ্যালারীকে দান করে যান। ১৯৫৩ সালে তিনি দেশে ফেরেন। সরকার তাকে আর্ট কলেজের উপাধ্য পদের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। জয়নুল আবেদিন তখন অধ্য। তিনি রাজী হলেন না। বিশ্বজয়ের মুকুট মাথায় নিয়ে তিনি চলে আসেন নড়াইল। ১৯৫৮ সালে সরকারি ভাবে বিশ শতাংশ জমিসহ একটি পুরাতন বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানে তিনি ১৯৫৯ সালে ‘দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। স্বরূপে স্বতন্ত্র এ মানুষটির হৃদয় জুড়ে ছিল প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। চিত্রা নদীর তীরে তিনি গড়ে তুললেন এক তপোবন। বিভিন্ন জাতের বিচিত্র বৃরাজিতে পরিপূর্ণ এ তপোবনে প্রবেশ করলে মন ভরে যাবে।  এরপর গড়ে তোলেন চিড়িয়াখানা। এখানে বানর, হনুমান, ঘোড়া, খরগোশ, গিনিপিগ, বনবিড়াল, দেশি-বিদেশি কুকুর, জাতি সাপ ও নানান জাতের নানান রঙের পাখি রয়েছে। এ মহান শিল্পীর মৃত্যুর পর তার চিড়িযাখানার জীব-জন্তু সব ঢাকা চিড়িয়াখানায় নিযে যাওয়া হয়। লাল মিয়া সুন্দর সুরে বাঁশি বাজাতেন। গভীর রাতে জমিদার বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে বাঁশি বাজাতেন। এলাকার লোকেরা বলেছে তার বাঁশির সুরের তালে তালে সাপ ফণা তুলতো।
১৯৫৯ সালে রফিকুন নবী ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। তিনি বলেন, অধ্য জয়নুল আবেদিন, কামরুর হাসান, শফি উদ্দিন আহমেদ চারুকলার চত্বরে জলসভায় বসা। তারা সবাই এক মহিলা অতিথির সাথে গল্প করছেন। মহিলা অতিথি আমাদের কাসের দিকে পিঠ করে বসা। মাথায় ঢেউ খেলানো কোকড়ানো চুল। পড়নে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। ঠিক এগারটার দিকে স্যারদের সাথে অতিথি আমাদের কাসে আসে। আমরা সবাই চমকে উঠলাম। অতিথি মহিলা নন; সে একজন জ্বলজ্যান্ত পুরুষ মানুষ। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। হাতে বাঁশের বাঁশি। অধ্য সার পরিচয় করিয়ে দিলেনÑ নাম এস এম সুলতান। জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও এস এম সুলতানের বন্ধু ছিলেন। এস এম সুলতানের যক্ষ্মা হয়েছিল ৮০ সালের দিকে। ব্যাংককের সুমিতভেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়; ভালো হয়ে দেশে এলেন।
এস এম সুলতান সর্ববৃহৎ ক্যানভাসে ছবি এঁকেছেন। যার আয়তন ২০ বর্গফুট। নড়াইলের লাল মিয়া চির কুমার ছিলেন। আমি তাকে যত কাছ তেকে দেখেছি। তার কাছে থাকার সৌভাগ্য হয় আমার। আজ মনে হয়, আর বাঁশি বাজবেনা, ইঞ্জিনের নৌকা চলবেনা, কেউ জানতে চাইবে না, ডাক্তার আসবেনা,সাংবাদিক জানবে না, সবাইকে আড়ালে রেখে, জাতিকে ফাঁকি দিয়ে নড়াইলের চিত্রা নদীর পারের মাছিমদিয়া গ্রামের এস এম সুলতান (লাল মিয়া) ১০ অক্টোবর চিরদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। ধন্য নড়াইলের মাটি, ধন্য চিত্রা নদী, ধন্য মাছিমদিয়া গ্রাম।

আ.জ.ম কামাল,
প্রশিক, নাটক বিভাগ
জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুর।

রবিবার, ৫ আগস্ট, ২০১২

অস্থির বাতাসে নিভে যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গনের জ্বলন্ত প্রদীপ

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
অস্থির হয়ে উঠছে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন। যা জাতির জন্য উদ্বেগজনক বিষয়। জাতির মেরুদন্ড আক্রান্ত হচ্ছে সন্ত্রাস,দলীয়করণ ও রাজনীতিসহ জঘন্যতম কর্মকান্ডে। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সহিংসতায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গন। ফলে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে । মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে বাবা-মা সন্তানকে জ্ঞানের আলো অন্বেষণে পাঠান; তারা সর্বদাই উৎকন্ঠিত থাকেন অনাকাক্সিক্ষত কোন দুঃসংবাদের জন্য। অথচ শিক্ষাঙ্গন হওয়ার কথা পুষ্প সৌরভে সুরভিত। পাখির কুঞ্জন আর শিক্ষার্থীর পদভারে মুখরিত। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত শিক্ষাঙ্গন গোলাগুলি,মারধর আর ভাঙচুরের শব্দে অশান্ত হয়ে উঠছে।
নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার শুরু থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধীরে ধীরে রাজনীতি প্রবেশ করে। ফলে নষ্ট হতে থাকে শিক্ষার পরিবেশ। বাড়তে থাকে সহিংসতা, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, খুন ও জখমের মত অপ্রীতিকর ঘটনা। সহিংসতার অতল গহ্বরে ডুবতে থাকে শিক্ষাঙ্গন। ছাত্র-শিক্ষকদের নোংরা রাজনীতির রাহুগ্রাসে অস্থির হয়ে ওঠে সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য দলীয়করণ ও ছাত্ররাজনীতি এর জন্য দায়ি। সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। পাশাপাশি শিক্ষকদের চক্রান্ত, রেষারেষি ও দায়িত্বহীনতাও কম দায়ি নয়। শিক্ষকরাও নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে প্রিয় ছাত্রদের উদ্বুদ্ধ করেন অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিতে। ছাত্ররা কী শিখছে, কেন শিখছে, কিভাবে শিখছে এ দিকে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ না থাকলেও নিজেদের কর্তৃত্ব বা অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে তারা সচেতন।
গোয়েন্দা সূত্র মতে, কেবল মহাজোট সরকারের সাড়ে তিন বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২৩ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে মাত্র দু’জন ব্যক্তিগত কোন্দলে এবং বাকি ২১ জন নোংরা রাজনীতির শিকার। ২০০৯ সাল থেকে ছাত্রলীগ-ছাত্রদল-শিবিরের পরস্পর দলীয় কোন্দল, হলদখল ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীফুজ্জামান নোমানী, ফারুক হোসেন, নসরুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাহিদ, মাসুদ বিন হাবিব, মহিউদ্দিন, হারুন অর রশীদ কায়সার, আসাদুজ্জামান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবায়ের আহমেদ, ঢাকা মেডিকেল  কলেজের আবুল কালাম আজাদ ওরফে রাজীব, সিলেট এমসি কলেজের পলাশ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের আবিদুর রহমান, রাজশাহী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের রেজানুল ইসলাম চৌধুরী, পাবনা টেক্সটাইল কলেজের মোস্তফা কামাল শান্ত ও সর্বশেষ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহেল রানা নিহত হন।
এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সহিংসতায় জখম হন। তাদের মধ্যে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে ৫৪ জনকে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে ২৩ জনের।
চোখের সামনে শিক্ষাঙ্গনের অস্থির বাতাসে নিভে যাচ্ছে জ্বলন্ত প্রদীপগুলো। ধীরে ধীরে আঁধারে নিমজ্জিত হচ্ছে গোটা জাতি এবং কতগুলো পরিবারের আশার প্রদীপ জ্বলে ওঠার আগেই দপ্ করে নিভে যাচ্ছে। জাতি হারাচ্ছে তার অমুল্য সম্পদ। এ অবস্থা থেকে উত্তরোণের পথ খোঁজে না কেউ। ছাত্ররাজনীতি বন্ধের জন্য তৈরি হয় না কোন নীতিমালা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্বার্থেই তারা নেন না কোন পদক্ষেপ। শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি বন্ধ হয়ে গেলে রাজনৈতিক দলগুলো নিঃস্ব হবার ভয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন দেশের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় মেধাবী সন্তানদের।
শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা নতুন কিছু না হলেও ইদানিং এর মাত্রাটা বেড়ে গেছে। সারাদেশের প্রায় সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত কলেজগুলোতে অস্থিতীশীল অবস্থা বিরাজ করছে। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ হচ্ছে বিঘিœত। ভোগান্তিতে পড়ছে নিরীহ শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বেশ কয়েকটি প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেশ কয়েকটি কলেজ ও আটটি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে চরম অশান্তি বিরাজ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে কেবল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরিয়ে দেওযা ছাড়া অন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আদালতের রায়ে বুয়েটের আন্দোলন বন্ধ থাকলেও ভেতরে ভেতরে ফুঁসছেন আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে আছে বুয়েটের শিক্ষা কার্যক্রম। চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন। বর্তমানে আদালতের রায়ে আন্দেলন বন্ধ থাকলেও ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য চাঁদার টাকা আদায়ের পর তা ভাগাভাগির জের ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দু’গ্র“পের গোলাগুলি, বোমাবাজি ও সংঘর্ষের ঘটনায় গত মাসে এক ছাত্র প্রাণ হারায়। এরপর থেকে স্বাভাবিক হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ঢাকসু নির্বাচনের দাবিতে গত ১৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়। সে থেকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন ইস্যুতে যে কোন সময় ঢাবিতেও বড় ধরণের সংঘর্ষ ঘটতে পারে।
ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজির ফলে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলছে জগন্নাথ বিম্ববিদ্যালয়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায়ই ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। ফলে প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘিœত হচ্ছে। এছাড়া রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা করেজ, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, ঢাকা কবি নজরুল কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, ঢাকা পলিটেকনিক কলেজসহ সারাদেশের বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনের কারণে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। সর্বশেষ গত ২ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনভর ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা বলেছেন,‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের একটি প্রবণতাও তেরি হয়েছে।’ সাম্প্রতিককালে সরকারের দলীয়করণকে অস্থিরতার অন্যতম কারণ বলেও মনে করেন তিনি। তিনি আরো বলেন,‘একটি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন মতের লোকজন থাকবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি ঢালাওভাবে নিজ দলের লোকজনকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয় তাহলে এ সঙ্কট সহজেই কাটবে না।’
অন্যদিকে চলমান অস্থিরতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেছেন,‘বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এ ঘটানাগুলো দুঃখজনক। আমরা অস্থিরতা নিরসনে পদক্ষেপ নিয়েছি।’ এখন কথা হচ্ছে সব ঘটনারই তো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু সে পদক্ষেপের পথ আর ফুরায় না। কাজের কাজ কিছুই হয় না। তবে শিক্ষাঙ্গনে নোংরা রাজনীতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করলেই কেবল সহিংসতা এড়ানো সম্ভব। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজনীতির ঘাঁটিগুলো উচ্ছেদ করতে হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এগিয়ে আসতে হবে দলমত নির্বিশেষে সকলকে। শিক্ষাঙ্গন রাখতে হবে রাজনীতির সব রকম প্রভাবমুক্ত। তবেই দূর হবে অস্থিরতা। শিক্ষার্থীরা পাবে তাদের কাক্সিক্ষত পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনের অস্থির বাতাসে আর নিভে যাবে না জ্বলন্ত প্রদীপ। জাতি পাবে তার মেধাবী সন্তান। উন্নতির চরম শিখরে উন্নীত হবে আমাদের প্রিয় স্বদেশ।

বৃহস্পতিবার, ২ আগস্ট, ২০১২

আলী ইদ্রিসের গুচ্ছ কবিতা

*এখানে বিকেল নামে

শরতের বিকেল নির্জণ নিশ্চুপ
মসৃন পাতার চকচকে পিঠ
সুর্য রূপালী রং ঢালে তরুশাখে
এখানে প্রেমিক হৃদয় শত সহস্র
স্বপ্ন আাঁকে প্রেয়সীর চোখে।
এখানে নিদাঘ আকাশ সুবোধ বালকের কায়া,
উঠোনের ঘাসে পড়ে বিকেলের ছায়া।
এখানে অপূর্ণ আশা ফোটে মেঘের সরোবরে,
একটি নয় দুটি নয় অজস্র স্বপ্ন ভাসে লতার ভীড়ে।
এখানে মাছরাঙ্গা ভালবেসে মাছরাঙ্গীর ঠোঁটে
তুলে দেয় প্রতীক্ষার ফসল
অবশিষ্ট সুখ খোঁজে পালকে মুখ ঘষে ঘষে,
এখানে মানুষ বাঁচে স্বপ্নের জমিন চষে চষে।
সরু পা ফেলে ডাহুক চলে পাতার উপর
জলের স্বাধীনতা লুফে নেয় দুর্জয় খোকা হংসশাবক।
এই বিকেল প্রশাšিতর প্রলেপ টানে নগরীর ক্ষতচিহ্নে।
এই বিকেল ধিঙ্গি মেয়ের ডিঙ্গি বাওয়া সুখ।

এই বাংলায় যেখানে বিকেল নামে
হলদে ডানায় কাশফুলের নরম ছোয়ায়
অনিন্দ্যসুন্দর লাজনম্র কুমারীর চোখে।

*শিকার

গতকাল দেখেছি কঁচুবনে ব্যাঙ হল সাপের শিকার
বর্ষা অবধি আমার চারপাশের জলাভূমিতে
নানা পদ্ধতিতে চলছে মাছ শিকার
অহরহই দেখি জলের ধারে মাছরাঙ্গার নিবাস
এছারা প্রতিদিনই দেখি মাঠে ঘাটে এমনকি আমার
বারান্দার কাছে চাতালের ঘাসে শালিক, কানিবক
ডাহুক আরও নানান জাতের পাখি
তারা সবাই শিকারের নেশায় ঘুরঘুর করে
ছোট ছোট কীটপতঙ্গ এদের শিকার
এইসব শিকারের আছে অনেক শিকার
সুন্দরবনে বাঘে হরিণ খায়
হরিণের শিকার ঘাস ও লতাপাতা
বাজপাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যায় ইঁদুর, মুরগী ছানা
ছোটমাছ বড়মাছের শিকার
অনাদিকাল থেকেই চলছে এই হত্যাযজ্ঞ
পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় ও বেঁচে থাকার তাগিদে
চলছে এই শৃঙখল
জায়েজ না জায়েজের প্রশ্ন এখানে অবাšতর
হত্যা; প্রয়োজন এবং লালসার কারণে
আশরাফুল মাখলুকাত আজ ভুলে গেছে
প্রয়োজন আর লালসার তফাৎ
ড্রয়িং রুমে ঝুলছে হরিণের শিং, বাঘের চামড়া
শোকেসে হাতির দাঁত
বিজ্ঞান বলে মানুষ সর্বভূক তাই বলে এমন শিকার?
ছোট দেশ বড় দেশের শিকার
নীতি দুর্নীতির শিকার
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মত এভাবে অনেক সঙ্গা পাল্টে গেছে পৃথিবীতে
ইতিহাস ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতি আইন আদালত
সব উপাদানই “মাইট ইজ রাইট” এর জবরদখলে
তবে খাদ্য শৃঙ্খলের সঙ্গাটাও যে এত সহজে
রাতারাতি পাল্টে যাবে ভাবতে অবাক লাগে
হয়ত এই অবদানটাও আধুনিক সভ্যতার
আজ মানুষ মানুষের শিকার।

*তোমাকে ভালবেসে

তোমাকে ভালবেসে একখন্ড আকাশ দিয়েছিলাম
তারায় তারায় ভরিয়ে দিতে
বিনিময় তুমি দিলে শ্বাসরুদ্ধকর চিলেকোঠা
ছলনার বিষবাষ্পে অস্পষ্ট নীলাকাশ
একটা ফুল দিয়েছিলাম সৌরভে জগত ভরিয়ে দিতে
তুমি পাঁপড়িগুলো শুকিয়েছ সাহারার মরুতে
তোমাকে ভালবেসে একটা নদী দিয়েছিলাম
ধরণীর তৃষ্ণা মেটাতে
তৃষ্ণার অধিক মিটিয়ে তুমি ঠাঁই করে দিলে
নদী সিক¯িত তালিকাতে
এভাবে আর কত?
তোমাকে ভালবেসে  হারিয়েছি অনেক কিছু
হারিয়েছি একমাত্র প্রেম
আমার আকাশে আর কোনদিন যা হবেনা উদয়
তোমাকে ভালবেসে পেয়েছি অনেক কিছু
তার মধ্যে একটা ভগ্ন হৃদয়।

*কাঁচের টুকরার মত

প্রতিদিন কত টেলিফোন আসে
বেজে ওঠে নকিয়া টিউন
পরিচিত পাখির মত প্রতিদিন
মনিটরে বাসে হাজারো মুখের চিন
তারে আর দেখিনা‘ক খুঁজেছি অনেক দিন
তৃতীয়া চাঁদের মত মৃদু হেসে
নিরবে হারাল সে আধার ভালবেসে।

এই ফুল পাখি লতা পাতা আর
কোনোদিন মনে রাখিবেনা তারে
ঝরা পাঁপড়ির মত ভুলে যাবে
তরুশাখা ক্ষণিক মিলনের সাথিটারে
ভুলিবনা আমি তারে আসুক যন্ত্রনা শত
এইসব দিনরাত্রির মাঝে তার স্মৃতি ভাসে
হৃদয়ের গভীরে কাঁচের টুকরার মত।

বুধবার, ১ আগস্ট, ২০১২

কালকিনিতে হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে শোকসভা


আছিয়া নূপুর:
নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে প্রথম আলো বন্ধুসভা, কালকিনির উদ্যোগে শোক র‌্যালী ও শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ শহীদ মিনার থেকে শোক র‌্যালী শুরু হয়ে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদণি শেষে শহীদ মিনারে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে নাফিজ সিদ্দিকী তপুর সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্য মো: খালেকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি ও অধ্যাপক দুলাল সরকার, সাংবাদিক ইয়াকুব খান শিশির, সাংবাদিক মিজানুর রহমান। বক্তব্য রাখেন শহিদুল ইসলাম, খায়রুল আলম, জাহিদ হাসান, মেহেদী হাসান, মাইনুল ইসলাম ও বি এ কে মামুন প্রমুখ।

আছিয়া নূপুর,
কালকিনি বন্ধুসভা

বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই, ২০১২

নন্দিত নরক থেকে পুষ্পিত বিদায়

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন তাঁর আপন ঠিকানায়। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। সাহিত্য, নাটক ও সিনেমা জগতে এনেছেন নতুন বাঁক। হাতে ফুল, চোখে জল নিয়ে আমার তাঁকে সমাহিত করেছি তাঁর প্রিয় নুহাশ পল্লীতে। আলোকিত নত্রের আকস্মিক পতনে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত।
‘শোয়াচান পাখি আমি ডাকিতাছি, তুমি ঘুমাইছ নাকি’- হাজার ভক্তের ডাকেও পাখি সাড়া দেয় না। পাখি চিরনিদ্রায় শায়িত। তিনি চলে গেলেন ১৯ জুলাই ১১ টা ২০ মিনিটে। তাঁকে সমাহিত করা হয় ২৪ জুলাই বাদ জোহর।
তিনি আসবেন ‘চান্নি পসর রাতে’। ‘ময়ূরাী’র তীরে হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে। তিনি বেঁচে থাকবেন হিমু, মিসির আলী আর বাকের ভাইদের মাঝে। দহন সাহিত্যপত্রে’র প থেকে হুমায়ূন আহমেদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

সোমবার, ২৩ জুলাই, ২০১২

যাওয়া তো নয় যাওয়া

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
তুমি কোন অভিমানে চলে গেলে সব ফেলে?
তোমার শূন্যতায় ‘ময়ূরাী’র বুকে চর জাগে।
হারানোর বেদনায় নিঃসঙ্গ বসে থাকে হিমুÑ
অযতেœ ঝরে পরে ‘হিমুর হাতে সাতটি নীলপদ্ম’।
মিসির আলী, বাকের ভাই হয়ে যায় নিরুদ্দেশ,
নিস্তব্ধ নুহাশপল্লী-কুতুবপুর,শোকাহত বাংলাদেশ।
‘যাওয়া তো নয় যাওয়া’-তবুও কী চলে যেতে হয়?
চলেই যদি যাবে ণিকের তরে কেন এসেছিলে তবে?
তুমি কী আর ফিরবে না এই ‘শ্যামল ছায়া’র মাঠে।
কেন ‘নন্দিত নরকে’ রেখে গেলে ‘আগুনের পরশমনি’,
এত বেহেশতি সুখ ছোঁয়ার পরেও ‘সবাই গেছে বনে’।
তুমিও কী তাই চলে গেলে আজ একাকী আনমনে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর
০১৭২৫৪৩০৭৬৩।

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১২

এখানে আমি একা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
আসলে এখানে আমি একা, এখানে আমার কেউ নেই।
আমি বারবার ভুলে যাই- এখানে আমি শুধুই পরবাসী।
এখানে স্বার্থের বাইরে এক চিলতে সম্পর্ক নেই।
এখানে নেই ভালোবাসার লেনদেন- সবাই জয়ী হতে চায় ।
এখানে স্বার্থের কাছে ভালোবাসাও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এখানে কর্মকে লুটপাট করে আমাকে ছুঁড়ে দেয় শূন্য ভাগাড়ে।
এখানে আমার অহংকার থাকতে নেই, তাই প্রতিনিয়ত মা চাইতে হয়।
এখানে আমি কার- কে আমার? রক্তের বন্ধন এখানে তুচ্ছ।
এখানে আমি ণিকের অতিথি তাই সূর্যাস্তের পূর্বে ফিরে যেতে হয়।
বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়-রক্তের বন্ধনই আমার শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।

কালকিনি, মাদারীপুর।
17.07.2012

বুধবার, ৪ জুলাই, ২০১২

জাতীয় নাট্যোৎসবে ‘একটাই চাওয়া’

আ জ ম কামাল:
‘স্বাধীনতার ৪০ বছর ও শিল্পের আলোয় মহান মুক্তিযুদ্ধ’- স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্যোৎসবে মাদারীপুর সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ ও কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে গত ৩ জুলাই রাত সাড়ে আটটায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে কলেজ পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক ‘একটাই চাওয়া’ মঞ্চস্থ হয়।
আজিজুল ইসলাম স্বপনের রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন মাহমুদা খান লিটা, আজিজুল ইসলাাম স্বপন, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সাজ্জাদ হোসেন, লুবনা জাহান নিপা, আশিষ রায়, শাকিলা আক্তার, নাহিদুল ইসলাম মুকুল, সঞ্জীব তালুকদার, শান্ত কুমার, আসাদুজ্জামান রুপম, বি এ কে মামুন, মাইনুল ইসলাম ও সাইদুল ইসলাম।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুর জেলায় ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা ফুটে ওঠে‘ একটাই চাওয়া’ নাটকে। সোলেমান বয়াতির সংসারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যেতে থাকে নাটকের কাহিনী। সোলেমান বয়াতীর স্ত্রী আমিরনের সম্ভ্রম হারানো। পাক হানাদারের নির্যাতনে সাজুর মৃত্যু। যুদ্ধে গিয়ে শেষ অবধি রফিকের ফিরে না আসা। কিশোর বাচ্চুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ। রাজাকার ওয়াজেদ আলী ও কেতর আলীর কুদৃষ্টি একাত্তরের পৈশাচিক দৃশ্য ফুটে উঠবে। সুফিয়া, বেনু, পান্না ও নুরুল ইসলামের আত্মত্যাগ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। সবশেষে বাচ্চুর বাবা, বয়াতী, বাদল ও মানিকের কন্ঠে দৃঢ়তার সাথে উচ্চারিত হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। অভিনেতাদের সাথে সাথে দর্শকরাও গর্জে ওঠে।
নাটক শেষে নির্দেশক আ জ ম কামালের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মৃণাল কান্তি দে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব শংকর সাওজাল, ঝুনা চৌধুরী ও তৌফিক হোসেন ময়না প্রমুখ।

বুধবার, ২৭ জুন, ২০১২

মাদক বিরোধী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

নুরুদ্দিন আহমেদ:
মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কালকিনি এডিপি’র উদ্যোগে গত ২৬ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জারী গান পরিবেশন করেন আঃ সাত্তার বয়াতী ও তার দল, সংগীত পরিবেশন করেন ইব্রাহীম, জামাল ও শান্তা ইসলাম। আবৃত্তি করেন সুবর্ণা, জারিন তাসনিম রাইসা ও জান্নাতুল ফেরদাউস মীম। নৃত্য পরিবেশন করেন রোজিনা, সুমী, মিতু, নিপা, তামান্না, নাসিমা, রিয়া, রুহুল াামিন, মাসুম ও লিমা।
সবশেষে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনায় মাইনুল ইসলামের পরিচালনায় মেহেদী হাসানের নির্দেশনায় আ জ ম কামালের রূপসজ্জায় ও প্রথম আলো কালকিনি বন্ধুসভার পরিবেশনায় মাদক বিরোধী নাটক ‘আলোর পথে’ মঞ্চস্থ হয়। এতে অভিনয় করেন বি এ কে মামুন, লিমা, মাইনুল ইসলাম, মহিউদ্দিন, সিমন, মেহেদী হাসান, সাইফুল ইসলাম, সজল নন্দী ও মাসুম।

মাদকবিরোধী দিবস পালিত

আফিয়া মুন:
মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কালকিনি এডিপি’র উদ্যোগে গত ২৬ জুন শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।সকাল ১০টায় কালকিনি এডিপি কার্যালয় থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে শেষে কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডা. শামীম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সমাজ কর্ম বিভাগের প্রধান জাহাঙ্গীর হোসেন ও উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মোঃ এনামুল হক। বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হোসেন, মনিরুল ইসলাম ও মোঃ সেলিমুল্লাহ প্রমুখ।

রবিবার, ২৪ জুন, ২০১২

বাচ্চু মিয়ার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরাম পুর ইউনিয়নের আন্ডার চর গ্রামে পৌঁছতেই দেখা গেল সারিবদ্ধভাবে দাাঁড়িয়ে আছে কিছু দরিদ্র মানুষ। লাইনের সামনে একটা কাঠের টেবিলে কিছু ঔষধ নিয়ে বসে আছেন একজন। তিনি রোগী দেখছেন আর রোগ নির্ণয়ের পর বিনামুল্যে ঔষধ দিচ্ছেন। পিছনে ঝোলানো একটি ব্যানার। তাতে ‘শৃঙ্খলা ও সুস্থ্যতাই সুন্দর জীবন’ স্লোগান লেখা। এরপর ‘মানব স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচী’ ও ‘বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা’সহ বিস্তারিত বিবরণ।
লোকটির নাম বিএম বাচ্চু মিয়া। এ নামটি এখন হতদরিদ্র মানুষের মুখে মুখে। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিনি দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ঔষধ দিয়ে থাকেন। তার এ কর্মকান্ডে উপকৃত হচ্ছে নিজের গ্রামসহ পাশ্ববর্তী আরও ৪টি ইউনিয়নের মানুষ। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাধিক অসহায় মানুষ ছুটে আসে তার কাছে স্বাস্থ্য সেবা নিতে। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি মানুষকে সুস্থ্য থাকার নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তার এ কর্মকান্ডের খবর পেয়ে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ মসিউর রহমান স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পরিদর্শণ করেন। এবং ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর একটি প্রত্যয়ন পত্র দেন। সবাইকে তিনি একটা কথাই বলেন,‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। রোগ হওয়ার আগে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতন হওয়া জরুরী।’ তিনি সুস্থ্য থাকতে রীতিমত শাক-সবজি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ছোটবেলা থেকে অসহায় অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করার কথা চিন্তা করতেন। বিশেষ করে হতদরিদ্র মানুষ যখন বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। তখন তিনি খুব ব্যথিত হতেন। সে চিন্তা ও দর্শন থেকেই নিজের উপার্জিত অর্থ থেকে ব্যয় করে শুরু করেন তার কার্যক্রম। কেমিস্ট প্যারাডাইস কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ থাকাকালীন ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মানব সেবা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠন। ঐ বছর ৩ ডিসেম্বর শুক্রবার দিন তিনি তার স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। সেদিন ২০ জন মেডিকেল অফিসার এনে দিনভর এলাকার অসুস্থ্য মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেন। তার এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রফেসর আসাদুজ্জামান। পরে রিপ্রেজেন্টিটিভের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকার আইয়ূব মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের সাথে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। আর নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে চালিয়ে যান মানব সেবা। চিকিৎসার স্বার্থে ২০১০ সালের ৩০ জুন পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রায় একযুগ ধরে তিনি মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রত্যেক রোগীকে ৪০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের ঔষধ দিয়ে থাকেন। শুরুর দিকে প্রতি শুক্রবার ক্রোকির চর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম চালালেও প্রতিষ্ঠানের নিষেধাজ্ঞায় এখন পাশ্ববর্তী আন্ডার চর গ্রামের আনোয়ার হোসেন মাস্টারের বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কোন মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা না করেও কেন এমন কাজের প্রতি বাচ্চু মিয়ার আগ্রহ। এটা তো একটা জটিল বিষয়। রোগ নির্ণয় কিভাবে করবেন। এমন সব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘আমি মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ থাকাকালীন রোগসংক্রান্ত যে বিদ্যা অর্জন করেছি। তা-ই আমাকে সহায়তা করে। এরপর পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তাছাড়া আমিতো জটিল রোগের চিকিৎসাও করি না, ঔষধও দেই না। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি। তাতে ইনশাআল্লাহ শতকরা নব্বই জন লোকই আমার ঔষধে আরোগ্য লাভ করেছে।’
স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচি ছাড়াও তার আরো কয়েকটি কর্মসূচি রয়েছে। তার মধ্যে বাচ্চু মিয়া নিজ অর্থায়নে সাহেবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও ক্রোকির চর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র তেরি করে দিয়েছেন। তার দর্জি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অর্ধশতাধিক নারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ঘরে বসে অর্থ উপার্জন করছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় গরিব মানুষদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তাও করেন।
বিএম বাচ্চু মিয়া এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন সমবায় সমিতি। সমিতির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ২০ টাকা করে চাঁদা দেন। সমিতির বর্তমান সঞ্চয় হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। এ সমিতির মাধ্যমে বিনা সুদে বিপদগ্রস্ত মানুষকে ঋণ দিয়ে থাকেন। যাতে উপকৃত হয় হতদরিদ্র মানুষ।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেল, অনেক মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিকিৎসার জন্য। নিবিষ্ট মনে রোগী দেখছেন বাচ্চু মিয়া। তাকে সহযোগিতা করছেন দুই নারী। তারা এই মানব সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মী। একজন রুনু কাওসারি। তিনি আগত রোগীদের তালিকা করছেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। আরেকজন পল্লবী বিশ্বাস। তিনি রোগীদের ঔষধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে রুনু কাওসারি জানান,‘প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। পাশ্ববর্তী কয়ারিয়া, রমজানপুর, চর দৌলতখান, শিকার মঙ্গলসহ প্রায় ৫টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামে এ সেবা কার্যক্রম চলে। ২০০১ সাল থেকে এপর্যন্ত প্রায় ২৬ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে।’
চিকিৎসা নিতে আসা আন্ডার চর গ্রামের ফরনা বেগম জানান,‘ এর আগেও দুই বার আইছি। কোন টাহা পয়সা লাগে না। রোগও ভালো অয়। উপকার পাই, তাই আহি। মোগোতো আর অত টাহা খরচ কইরা বড় ডাক্তার দেহানোর ক্ষমতা নাই। তাই মোগো বাচ্চু মিয়াই ভরসা।’ এছাড়াও রিণা বেগম, ওয়াজেদ হাওলাদার, লিলি, সুখী, সুমি ও স্বপন ঘরামিসহ বেশ কয়েকজন বলেন,‘আমাগো অসুখ-বিসুখে বাচ্চু মিয়ার কাছে ছুইট্টা আহি। উপকারও পাই। বিনা পয়সায় ওষুধ দেয়। একযুগ ধইরা এই কাম কইরা আইতাছে। আইজ পর্যন্ত কোন মাইনষের অপকার বা সমস্যা অয় নাই।’ ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ বাহারুল ও ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজাহার মীর জানান,‘বাচ্চু মিয়া একটি মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা তাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করি। তার মতো এরকম কাজ আরো হওয়া উচিৎ।’
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেব রামপুর ইউনিয়নের ক্রোকির চর গ্রামে ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিএম বাচ্চু মিয়ার জন্ম। পিতা এসকান্দার আলী ও মা আমেনা বেগম। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বাচ্চুই সবার বড়। ব্যক্তি জীবনে বিবাহিত। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। স্ত্রী আরজু বেগম ও সন্তানদের নিয়ে মাদারীপুর শহরে বসবাস করেন। সাদা মনের এ আলোকিত মানুষটি প্রথম আলোকে জানান,‘ রাজনৈতিক বা অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মানব সেবা করছিনা। নিজে পরিবারসহ খেয়ে পড়ে যা থাকে তাই দিয়ে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। বর্তমানে বসার জায়গা নিয়ে সমস্যায় আছি। পাশাপাশি আরো কিছু অর্থ দরকার। তবে সকলের সহযোগিতা পেলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারব। আমি চাই আমার এলাকার একটা মানুষও যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়।’
বিএম বাচ্চু মিয়ার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ও মানব সেবা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ মসিউর রহমান বলেন,‘বাচ্চু মিয়ার এ কার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আমি তার কার্যক্রম পরিদর্শণ করেছি। আমার মতে, তার মতো আমাদের প্রত্যেককেই এরকম জনসেবা মূলক কাজে এগিয়ে আসা উচিৎ।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহরিয়াজ বলেন,‘এমন জনসেবা মূলক কাজের জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। তার মতো প্রত্যেক গ্রামে বা ইউনিয়নে তা নাহলে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে আরো অনেকের এগিয়ে আসা উচিৎ। আমি তাকে যে কোন ধরণের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছি। যাতে সে তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারে।’

বুধবার, ২০ জুন, ২০১২

বৃষ্টি নয় খরা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

ভেবেছিলাম- তোমায় নিয়ে যাব বৃষ্টিøানে;
কিন্তু বৃষ্টি কোথায়? সারাটা দিন খরা।
বর্ষা এলো তবু দেখ শুকিয়ে যায় কদম,
এমন সময় এর আগে দেখিনি কোন জনম।

তাইতো তোমায় একটুখানি
চাইতে গেলেই চতুর্মুখী বাঁধা।
এখন আর মৌসুমও নেই ভালোবাসার,
জগত জুড়েই হতাশা আর হাহাকার।

বৃষ্টির আশায় আকাশ পানে চাইতে গেলে
মরার খরা পোড়ায় এ দেহটারে।
তার চেয়ে সেই কি নয় ভালোÑ
তোমার চোখের জলে আমি ভিজি,
আমার চোখের জলে তুমি।

সোমবার, ১৮ জুন, ২০১২

মঞ্চ নাটক: একটাই চাওয়া

রচনাঃ মোঃ আজিজুল ইসলাম স্বপন
নির্দেশনায়: আ.জ.ম কামাল
প্রশিক্ষকঃ জেলা শিল্পকলা একাডেমী মাদারীপুর
সার্বিক তত্ত্বাবধানে:
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
ছাত্র, নাটক বিভাগ
 জেলা শিল্পকলা একাডেমী মাদারীপুর
চরিত্রলিপি:
বয়াতী, আমীরন,সাজু , রফিক, বাদল, মানিক , রফিকের মা , বাচ্চুর বাবা, ওয়াজেদ আলী, কেতর আলী, মেজর. আরও কিছু আর্মি ও মুক্তিযোদ্ধা।
প্রথম দৃশ্য:
স্থান: বয়তীর বাড়ী
সময়ঃ সকাল
সারারাত গানবাজনা করে ভোর বেলা বাড়ী ফেরে সোলেমান বয়াতী। সোলেমান বয়াতীর স্ত্রী আমিরন তখন উঠান ঝাড়– দিচ্ছিল। সোলেমান বয়াতী উঠানে গান গাইতে পা রাখতেই আমিরনের তাছ্যিলের সুর।
আমিরনঃ আইজ কি সূর্য্য পশ্চিম দিক দিয়া উঠল নাকি? ব্যাপার কি? বয়াতী যে সাত-সকালে দোতারা হাতে নিয়া বাড়িীতে হাজির। গানের আসর কি ভালো জমে নাই?
বয়াতীঃ তুমি মনে হয় ভূল দ্যাখতাছো। সূর্যতো তোমাগো বাড়ীর পিছন দিয়া উঠছে।
আমিরনঃ সংসার চালানোর মুরদ নাই, আবার মুখে মুখে তর্ক, ভালো হইবোনা কইয়া দিতাছি।
বয়াতীঃ কেউ তর্ক করতে চাইলে কি মুখ বন্ধ কইরা থাকুম। তর্ক করলে কি করবা তুমি? কিছুই করতে পারবানা  আমার। আমি বিজয়ের ডাক শুনতে পাইতাছি(উদাস ভঙ্গি)পরাধীনতার শিকল ছেড়ার আওয়াজ শুনতাছি।
আমিরনঃ কথা ঘুরাইবানা কইতাছি, ইসস.. রে আমার জুয়ান মরদ, কথা হুইন্না মনে অইতাছে দ্যাশটারে একেবারে স্বাধীন কইরা আইছো
বয়াতীঃ বউরে একলা যদিও পারুম না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কি? আহারে, খুব মনে চায় দেশটা যদি স্বাধীন করতে পারতাম(দীর্ঘশ্বাষ)। হের লাইগ্যাইতো মুখে বানছি দেশের গান, হাতে নিছি দোতারা
আমিরনঃ কতায় আছে না, গুজায় চায় চিৎ অইয়া হুইতে বয়াতীর অইছে হেই দশা।
বয়াতীঃ তুমি কিন্তু আমারে অপমান করতাছো। তুমি জানো, প্রয়োজনে আমি দোতারা ছাইরা হাতে রাইফেলও নিতে পারি।
আমিরনঃ হ......... যার মানই নাই তার আবার অপমান, ভাত পায় না আবার চা খায়, হাটতে পারে না বন্দুক ঝুলায়
বয়াতীঃ এই, মান নাই মানে? তুই কি কইতে চাস।
আমীরনঃ কি কইতে চাই বোঝ না? একজন জোয়ান মরদের বউ মাইয়া মাইনষের বাড়ীতে কাম কইরা প্যারে খুদা মিডায়। হেইয় মনে থাকে না
বয়াতীঃ তাও তো তোর বাপের বাড়ী থিকা ভালো আছোস।
আমীরনঃ তোমার ভালোর খ্যাতা পুরি। সারাদিন রাইত পইড়া থাকে দোতারা লইয়া, আর বাড়ী আইয়া করে ঝগড়া, আগে জানলে এমন পোড়া কপাইল্যার সংসারেই আমি আইতাম না।
বয়াতীঃ অহন তো জানছোস, তয় যা গিয়া, আমার লগে আমার মাইয়া আছে, আর আছে দোতারা, তোর মতন অমন বান্দরনীরে আমার লাগবোনা, তোর তোন আমার দোতারা অনেক বেশি সুন্দর। আহারে কি সুন্দর সুর দেয়, এই দোতারা আমারে দ্যাশের মাটিতে মিশাইয়া দেয়, যার তারে বাইজা উঠে দ্যাশের গান। (একটি দেশের গান)
আমীরনঃ কি কইলা আমার তোনে তোমার দোতারা সুন্দর, তোমার দোতারা আমি ভাইঙ্গাই ছাড়–ম, (এমন সময় ঘর থেকে মেয়ের প্রবেশ,মেয়ে বলে উঠে)
সাজুঃ ওমা তোমরা এ কি শুরু করলা, কাম কাইজ বাদ দিয়া শুধু ঝগড়া করো
আমীরনঃ থাক তুমি তোমার দোতারা লইয়া, আমি ও দ্যাখতে চাই তোমার প্যাডের যোগান কেডা দেয়, তোমার দোতারা  না আমি।
সাজুঃ মা,থাম তো, বাজান তুমিও থামো
বয়াতীঃ আয় মা, আমার কাছে আয় , দ্যাখ তোর মায় সকাল বেলা আমার মেজাজটা বিগরাইয়া দিছে। (আমীরন নিজের কাজে মন দেয়)
সাজুঃ বাজান, হুনছো-দ্যাশে না-কি আগুন লাগছে, পাকিস্তানি মেলেটারিরা নাকি খালি বাঙ্গালিগো ধইর‌্যা ধইর‌্যা মারতাছে।
বয়াতীঃ তোর কাছে কেডা কইল?
সাজুঃ শহরের মানুষ লাইন ধইরা গেরামে আইতাছে, শহরে নাকি মেলা গন্ডগোল অইতাছে।
বয়াতীঃ আমি ও একটু একটু হুনছি। তয় এহনতো মনে অইতাছে ঘটনা আসলেই হাছা।(আমীরন ভয় পেয়ে এসে বলে)
আমীরণঃ এই সব কতা হুইন্যা আমার খুব ডর করতাছে। হোনেন আমনে আর গান গাইতে দুরে দুরে যাইয়েন না, মাইডা বড়ো অইছে, কহন কি অইয়া যায় আমার কিন্তু আসলেই ডর করতাছে।
বয়াতীঃ ডরের কিছু নাই,(আনমনে ......... ভয় কি মরনে গান ধরে)
আমীরনঃ রাখেন আমনের গান, আমনে সব কিছুতেই খালি হেলামী করেন
বয়াতীঃ আইচ্ছা, আমি দুরে চইল¬া গ্যালেইতো তুমি খুশি অইবা, ঠিক না?
আমীরনঃ (অভিমান নিয়ে), আমনে খালি আমার বাহিরডাই দ্যাখলেন, ভিতরডা দ্যাখলেন না, ভিতরে ভিতরে যে আমার মনডা আমনের লাইগ্যা পুইড়া ছারখার হয়,হেইডা কোনদিন বুজলেন না।
বয়াতীঃ হেইডাতো তুমি ও বুজলানা।
আমীরনঃ হোনেন, আসল কতা কইতেই ভুইল্যা গেছি,  কাইল সন্ধ্যাকালে মানিক ভাই আইছিলো, আমনেরে দ্যাহা করতে কইছে।
বয়াতীঃ কও কি?এই কতা আরও আগে কইবা না, আমি অহোনি যাইতাছি....(দ্রুত প্রস্থান)
আমীরনঃ কিছু মুখে দিয়া যান....... হায়রে মানুষ( সবার প্রস্থান)
২য় দৃশ্য:
*( কোন এক গোপন স্থানে কয়েকজন মুক্তিকামি যুবক বসে আলোচনা করছে, এমন সময় বয়াতীর আগমন)
বয়াতীঃ মানিক ভাই তুমি আমারে আইতে কইছো?
মানিকঃ শোন বয়াতীভাই দ্যাশের অবস্থা ভালো না, গত ২৫ শে মার্চ রাইতে পাক আর্মিরা ইয়াহিয়া খানে নির্দেশে নিরীহ বাঙ্গালীর উপর ঝাপাইয়া পড়ছে, জাগায় জাগায় আগুন ধরাইয়া দিছে।
বাদলঃ হ বয়াতী ভাই, হুনলাম বাশগাড়ীর নুরুল ইসলাম শিকদার তখন ইপিআরে আছিলো, সে পিলখানা থেকে পালইয়া আইছে, যুদ্ধ শুরু অইয়া গ্যাছে, এহন আর সময় নাই, আমরা দ্যাহাইয়া দিমু আমাগো ভারী অস্ত্র নাথাকলেও মনোবল আছে, আছে দ্যাশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি আছে গভীর টান, আর থাকবোইবা না ক্যান? বঙ্গবন্ধু কইছে না যার যা কিছু আছে তাই শত্র“র বিরুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়ো, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।
বয়াতীঃ হ, ঠিকই কইছো, আমরা ও দেখাইয়া দিমু এখনোই আমাগো উপযুক্ত সময়। কিন্তু কীভাবে কি করবা? ঠিক করছো কিছু?
বাদলঃ শোন, আগে আমাদের মনোবল বাড়াতে হবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ঘর থিকা বাহির হইয়া আসতে হবে, আমাগো যুদ্ধের প্রস্তুুতি নিতে হইবো, আমাগো এহন ট্রেনিং দরকার, লিডারদের সাথে যোগাযোগ অইতাছে। তারা সবাই আসমত আলী খান সাহেবের বাসায় আছে, ইলিয়াস চৌধুরী, শওকত ছ্যার, স্টুয়ার্ড মুজিব ও ফনি বাবু ও আছে।
মানিকঃ বাদল ভাই তুমি না কইলা, শওকত ছ্যার আর স্টুয়ার্ড মুজিব নাকি আমাগো দ্যাখা করতে কইছে।
বাদলঃ হ, হাতে সময় খুব কম, তোমরা যার যার বাড়ী থিকা বিদায় নিয়া আসবা। আগামীকাল সকালে আমরা নাজিমুদ্দিন কলেজে হইমু, জাগো জাগো বাছাই করবো তারা আমরা ট্রেনিং এ যামু।
বয়াতীঃ এহন তয়লে উডি, কাইল সকাল সাতটার মধ্যে কলেজ মাডে থাকুম।
মানিকঃ হ, স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে একটা টিম ইন্ডিয়ায় ট্রেনিং এর জন্যে পাঠানো অইবো, শোন, যারা ট্রেনিং এ যাইতে চায় তাগো আসতে কইবা
বয়াতীঃ বুজছি, আমি তাইলে পোটলা পাটিলি লইয়া হাজির অইয়া যামু, তয় সবাই খুব সাবধান, আমাগো সলা পরামর্শ য্যান কেউ জানতে না পারে, হুনছি আমাগো এলাকার কয়েকজন বেঈমান নাকি গোপানে পাকিস্তানিগো সাহায্যে করে, খোজ-খবর দেয়,
বাদলঃ ঠিক আছে, আমরা এহন তাইলে, সবাই যার যার বাড়ী যাই (সকলের প্রস্থান)
৩য় দৃশ্য:
স্থানঃ বয়াতীর বাড়ী
সময়ঃ ভোরবেলা
(বয়াতী পোটলা পাটলি বাধছে, আমীরনের প্রবেশ)
আমীরনঃ আমনে পোটলা পাটলি বান্ধেন ক্যান, কই যাইবেন, দ্যাহো দেহি, মুখখান ক্যামোন হুগাইয়া আমসীর মতো অইয়া গ্যাছে। কতা কন না ক্যান?
বয়াতীঃ (সম্বিৎ ফিরে পেয়ে) আমারে কিছু কও?
আমীরনঃ হ, কই, সাত সকালে আমনে কই যান? সারাদিন কিছু খান নাই, রাইতে খান নাই, এহনো না খাইয়া পোটলা পাটলি বাইন্ধা আমনে কই যান।  কাইলকের রাগ বুঝি এহনো আছে? ইচ্ছা কইর‌্যা কি আমনের লগে অমন করি,
বয়াতীঃ নারে, সাজুর মা তুই যা ভাবতাছোস, আসলে তা না, আমি তোর লগে রাগ যাইতাছি না। হুনছোস পাকিস্থানীরা আমাগো উপর অত্যাচার করতাছে, অগো আমার ঘেন্যা ধইরা গ্যাছে। অগো খতম কইরা আমি বাড়ী ফিরুম।
আমীরনঃ আমনে কই যাইবেন, আমনে গ্যালে আমাগো কেডা দ্যাখবো?
বয়াতীঃ তোগো আল¬ায় দ্যাখবো, তোগা লাইগ্যা আমি কিছুই করতে পারি নাই। তয় এইবার মনে অয় কিছু করতে পারুম, খালি তোগো লাইগ্যা না দ্যাশের লাইগ্যাও কিছু করতে পারুম। বউরে যদি বাইচ্যা আহি তো আইলাম, না আইলে তুই গর্ব কইরা কবি তোর স্বামী দ্যাশের লাইগ্যা যুদ্ধ কইরা শহীদ অইছে।
আমীরনঃ সাজু তো ঘুমাই রইছে, অর লগে কতা কইয়া যাইবেন না, আমি অরে ডাইক্যা দেই।
বয়াতীঃ না, অরে ডাকোনের কাম নাই, হাতে সময় কম, অয় ওটলে অরে কইবা, তোর বাজানে যুদ্ধে গ্যাছে। আমি অহোন যাই (আমীরন পিছু পিছু কাদতে কাদতে যায়, পিছন থেকে মেয়ে সাজু ডাকে)
সাজুঃ মা তুমি কান্দ কেন? বাজান কই?
আমীরনঃ তোর বাজানে গ্যাছে গা।
সাজুঃ মা বাজানে কই গ্যাছে?
আমীরণঃ তোর বাজানে যুদ্ধে গ্যাছে।
সাজুঃ মা-রফিকের মা চাচি কইলো। রফিক ভাই নাকি যুদ্ধে যাইবে, চাচি পাগোলের মত কানতাছে।
আমীরনঃ কছকি? তুই তইলে ঘরের কাম কর। আমি একটু ঐ বাড়ি যাই।
সাজুঃ আইচ্ছা যাও। তাড়াতাড়ি আই ও। (আমীরনের প্রস্থান। রফিকের প্রবেশ)
রফিকঃ চাচী, চাচী ও চাচী বাড়িতে আছেন?
সাজুঃ ক্যাডা?  (বের হয়ে) ও আপনে? মায় তো এই মাত্র আপনা গো বাড়ী গেল। বাজানে যুদ্ধ গ্যাছে। আপনিও নাকি            যাইবেন।
রফিকঃ হ, যাইতাছি। তয যাওয়ার আগে তোমারে একটা কতা বলার আছিল।
সাজুঃ কি কতা কইবেন। আমনে আমার দিকে ওমনে চাইয়া রইছেন ক্যান।
রফিকঃ চাইয়া রইছি ক্যান তুমি বুঝ না।
সাজুঃ  না বুঝি না। বুঝলে কি জিগাইতাম।
রফিকঃ আমি তোমারে খুব পছন্দ করি। কইতে পার ভালোও বাসি।
সাজুঃ আপনার কি সরমলজ্জা নাই। আসারে এইসব কইতাছেন।
রফিকঃ তোমার কাছে আমার শরম কীসের। জানিনা সাজু জান লইয়া ফিরতে পারুম কিনা যদি ফিরি তাইলে তোমারে আমার জীবন(সঙ্গী/সাথী) করুম।
সাজুঃ ঠিক আছে আগে দ্যাশটারে রক্ষা করেন। দেশের এই বড় বিপদে আমাগো সকলেরই উচিৎ দ্যাশের কথা চিন্তা করা। যদি ঠিকমতো দ্যাশ স্বাধীন হয় আর আমরা সবাই বাইচ্চা থাকি তয় অবশ্যই আমি আমনের হমু।
রফিকঃ সাজু তোমার উৎসাহ আমার শক্তি আরও বাড়াইয়া দিছে। তুমি দোয়া কইরো আমি যেন তোমার লাইগা স্বাধীন দ্যাশের পতাকা লইয়া ফিরতে পারি। (আবেগ জরিত কন্ঠে রফিকের বিদায়) আমি তাইলে এইবার া আসি সাজু।

৪র্থ দৃশ্য:
(চারদিকে গোলাগুলির শব্দ। চিৎকার ধ্বনি।)

মানিকঃ (ফিস ফিস গলায়) বাদল ভাই, আমরা যারা ট্রেনিং নিয়া আইছি। তারা এহন কী করুম। একটা কিছু ভাবা দরকার।
বাদলঃ হ, তা-ই ভাবতাছি। দুইডা ব্রীজ ধংসের পরে আমাগো হাতে এহন তেমন কোন অস্ত্র নাই। তাই প্রথমে কৌশলে পোষ্ট অফিস পাটের গুদাম, তফসিল অফিস, টেলিফোনের লাইন এগুলা ধ্বংস করতে হবে। অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর যামু অন্য কোন অপারেশনে।
বয়াতীঃ হ-তয় খুব সাবধান। জুটমিল, কুলপদ্দি বাজারসহ কয়েকটা জায়গায় আর্মিরা ক্যাম্প বসাইছে। আর তগো সাহায্য করতাছে আমাগো দ্যাশের কিছু বেঈমান কুত্তারা।
মানিকঃ জানেন বাদল ভাই আমার পিচ্চি ভাইর ব্যাটা বাচ্চু আছেনা? ও আমাগো লগে লগে থাকতে চায়। হেদিন আমারে কয় চাচা আমারে একটা অস্ত্র দ্যাও। আমি দ্যাশের শত্রুগুলা শ্যাষ কইরা দেই।
বয়াতীঃ শোন মানিক, বয়াতী ঠিকই কইছে। আরে কবি-কাগজে-কাগজে স্লোগান লেইখ্যা পোষ্টার বানাইয়া গোপনে সবখানে লাগাইয়া দিতে।
রফিকের প্রবেশ।
বয়াতীঃ আচ্ছা বাদল ভাই সমাদ্দারে ব্রীজটা উড়াইয়া দিলে ক্যামন হয়। নুরুল ইসলামরা নাকি কালকিনির গোপালপুর ব্রীজ উরাইয়া দিছে। তয় নুরুল ইসলাম হানাদারগো গাত থেইক্কা বাঁচতে পারে নাই। ব্রীজ উরাইয়া যাওয়ার সময় আর্মিগো গুলিতে শহীদ হইছে।
বাদলঃ হ- নুরুর লেইগ্যা খুব খারাপ লাগতাছে। তয় জীবনের ঝুকি নিয়া হইলেও সমাদ্দারের ব্রীজ উড়াইতে হইবো। তাইলে আর্মি আর মাদারীপুর এর ভিতরে ঢুকতে পারবোনা।
রফিক ঃ হ-হেইডাই ভালো হয়। চোকদার ব্রীজ, আমগ্রাম ব্রীজতো ধ্বংস করা হইছেই। তয় সমাদ্দারের ব্রীজটাই হইলো আসল।
বাদল ঃ শোন, আজকে আমাগো দুই দলে ভাগ হইয়া যাইতে অইব। একদল চরমুগরীয়ার জেডিসি পাটের গুদাম ধ্বংস করব। আর একদল এ আর হাওলাদার জুট মিল ধ্বংস করবো। শোন, আইজ ১৪ই আগষ্ট। পাকিস্তান দিবস। আমাগো প্রান থাকতে বাংলার মাটিতে পাকিস্তান দিবস পালন করতে দিমু না।
বয়াতীঃ তয় সাবধান। আমাগো খলিল বাহীনির সবার চোখ কান খোলা রাখতে হইবো। শুনলাম কুলপদ্দিতে দুই জন মুক্তিযোদ্ধারে কারা য্যান ধারাইয়া দিছে।
মানিকঃ রাজৈর, শিবচর, কালকিনির খবরাখবর ও একটু লইও কোখায় সকি অবস্থা। বাদল ভাই এহন তইলে আমরা উডি। মূল অপারেশনের দিকে যাই। আর বাচ্চুরে পাঠাইয়া দেই কুলপদ্দিতে আটক দুইজনের নাম জাইন্না আসতে।
বয়াতীঃ চলো সবাই। জয় বাংলা। (সকলের প্রস্থানঃ গোলাগুলির শব্দ)

৫ম দৃশ্য:
*সোলেমান বয়াতীর দাওয়ায় বসে আমীরন তার মেয়ে সাজুর মাথায় বিলি কাটছে। এমন সময় রফিকের মার প্রবেশ।)
রফিকের মাঃ মায়ে ঝিয়ে ক্যামন আছো?
আমীরনঃ হ-গো-বু আমাগো আর থাকা। দ্যাশের যা অবস্থা প্রত্যেকটা রাইত কাটে দুঃচিন্তায়, আর রাজাকারগো ভয়ে।
রফিকের মাঃ তুমি ঠিকই কইছো। মা সাজু ঘরে কি পান টান কিছু আছে? (সাজু ঘরে যায়)
রফিকের মাঃ বইনরে বুকটার মইধ্যে খালি ধক্্ ধক্্ করে। আমার রফিক ক্যামন আছে, খোদা মাবুদই জানে। সাজুর বাপের কোন খোজ খবর পাওনি বোইন।
আমীরনঃ নারে বু-কোন খোজ খবর পাই নাই। দোয়া করেন বু দোয়া করেন। আমাগো আপনজন যাতে দেশ স্বাধীন কইরা আমাগো বুকে ফিইরা আহে। মাইয়াডা আমার মনমরা অইয়া গ্যাছে।
রফিকের মাঃ বু- সাবধনে থাকিস। ওয়াজেদ আলী আর কেতর আলী পাকবাহীনিরে সাহায্যে করতাছে। বাড়ি বাড়ি ঘুইরা মুক্তিযোদ্ধাগো আর জুয়ান মাইয়া মানুষ ধইরা নিয়া মেলেটারীগো হাতে তুইল্লা দেয়।
আমীরনঃ আমি ও হুনছি। হের লেইগ্যাইতো ডর। ঘরে আমার ডাঙ্গর মাইয়া। (পান হাতে সাজুর প্রবেশ)
সাজুঃ নেন চাচী আমনের পান। পানও ক্যামন শুকাইয়া গ্যাছে। হাড়ে-ঘাড়ে কেন্ডা যাই কন? তিন বেলার খাওন এক বেলায় খাই।
রফিকের মাঃ হরে- মা। তোর মুখখান ক্যামন শুকাইয়া গ্যাছে। কী সুন্দর বউ আমার ক্যামন হইয়া গ্যাছে। (সাজু লজ্জা পায়) থাউক, আর কয়ডা দিন মা, পোলা আমার দ্যাশ স¦াধীন কইরা ফিরলেই তোরে লাল শাড়ী ফিন্দাইয়া আমার ঘরে নিমু।
আমীরনঃ দোয়া করো বু। দোয়া করো সব উপর আলার মর্জি।
রফিকের মাঃ আইজ যাইরে বইন। একটু সাবধানে থাকিস।
আমীরনঃ চলেন আপনেরে একটু আগায় দিয়া আহি। চল মা সাজু। (সকলের প্রস্থান)
ষষ্ঠ দৃশ্য:
স্থানঃ আর্মি ক্যাম্প
সময়ঃ বিকাল
*( পাক বাহীনির ক্যাম্পে মেজরের সাথে রাজাকার ওয়াজেদ আলী ও কেতর আলীর কথোপকথোন)
ওয়াজেদ আলীঃ মেজর সাব, মুক্তি বাহীনিরা যা শুরু করছে তাতে তো বেশি সুবিধার মনে হইতাছে না।
মেজরঃ (ভয় পেয়ে) তুম কিয়া বাত বোলা, মুক্তি কোনছে............ মুক্তি মিলেগা।
ওয়াজেদঃ না হুজুর এ ধারমে নেহী মিলেগা। তবে যেভাবে ক্ষ্যাপছে তাতে এ ধারমে আইতে কতক্ষন।
মেজরঃ (অট্রহাসি) মুক্তি এ ধারমে নেহি আয়েগা কাভি নেহি। তুম ঝুট বলতাহু। হামছে ডরমে লাগা থা। যা শালা মেজাজ মে বিগড়ে দিলে তো।
ওয়াজেদঃ হুজুর, খোশ আমদেদ হো এওগা ভি খুশির বাত বোলতাহু। মেজাজ ভি ঠান্ডা হোতা হায়।
কেতরঃ কিচু মনে না করলে একটা কথা কই। সুন্দরী জোয়ান মাইয়া আছে। আপনার মেজাজ এক্কেবারে ঠান্ডা হইয়া যাইবো।
মেজরঃ মাইয়া? মাইয়া কিয়া হ্যায় ?
কেতরঃ মাইয়া মানে হইলো মানে ....................... (আটকে যায়)
ওয়াজেদঃ মাইয়া মানে বহুত খুব সুরত লাড়কী।
মেজরঃ ও ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়। যাও ওকে লিয়ে  আসতা হ্যায়।
ওয়াজেদঃ হুজুর, জেলার সাহেবকা কিয়া বাদ হে।
মেজরঃ জেলার সাবকা লাড়কীকা বাদ মে সব খতম করতা হায়।
ওয়াজেদঃ হুজুর, জেলারের মেয়ে বাদে সব খতম?
কেতরঃ মানে ঐ সুন্দরী সুফিয়া?
মেজরঃ হা- হা- হা- হা ওকে হাম ধীরে ধীরে খতম করতাহু। ও হামার ক্যাম্পে ভি রাখতাহু।
ওয়াজেদঃ আমরা তাইলে এখন আসি হুজুর।
মেজরঃ ঙশ তুম যাও  মেজরের প্রস্থান)
ওয়াজেদঃ শোন কেতর আলী। বয়াতীর বাড়ীর দিকে নজর রহিস শুনলাম ও নাকি যুদ্ধে গ্যাছে। সালার কত্তবড় সাহস সালায় ভাত পায় না চা খায়।
কেতরঃ হুজুর দোতারা লইয়া যুদ্ধে যায়। হুজুর ঘরে কিন্তু সুন্দরী বউ আর মাইয়া আছে।
ওয়াজেদঃ কেতর আলী চল গায়েনের বাড়ীর দিকে যাই ওর যুদ্ধে যাওনের সাধ মিটাইয়া দিমু চল।
কেতরঃ চলেন তাইলে। (উভয়ের প্রস্থান)
সপ্তম দৃশ্য:
(স্থানঃ মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানা)
বাদলঃ কিরে মানিক চারিদিকের খবর কী?
মানিকঃ ভাই আমগ্রাম আর পাথুরিয়াপাড় ব্রীজ ধ্বংস কইরা দিছি। মিলিটারিরা এহন আর সহজে ঢুকতে পারবো না। তয় সমাদ্দারের ব্রীজ ভাঙ্গতে পারলেই আমরা সফল।
বয়াতীঃ শোন গোপনে একটা খবর পাইলাম।
সবাইঃ কী খবর?
বয়াতীঃ রফিক, কাশেম আর সাইদুলরা মিল্লা ঘটকচর স্কুলে কয়েকজন রাজাকারগো আটক করছে। আমাগো এহন সে দিকে যাওয়া দরকার।
মানিকঃ তাইলে চল, আমরা এহনই যাই। শালাগো জনমের তরে বেঈমানীর সাধ মিটাইয়া দেই।
বয়াতীঃ সাবধানে যাইস, তোরা আইলে আমরা এ আর হাওলাদার জুট মিলে হামলা করুম। হুনলাম, কালকিনির ফাসিয়াতলা হাটে পাকবাহীনিরা আইজ গণহত্যা চালাইছে। ঘরে ঘরে আগুন ধরাইয়া দিছে। শত শত মানুষরে মিথ্যা কতা কইয়া বাজারে আইন্না গুলি কইরা মারছে। আমাগো গোপন সংবাদ দাতা নুরে আলম পান্নারে ধইরা লইয়া গ্যাছে।
মানিকঃ হ- গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ ধইরা আনছে জুট মিলে। তাগোরে মুক্ত করতে না পারলে হারামীর বাচ্চারা তাগো মাইরা জুট মিলের মধ্যেই গণকবর দিব। বেশি দেরি করন ঠিক অইবোনা।
বয়াতীঃ বাদল, মানিক আমার মনডা জানি ক্যামন করতাছে বউ মাইয়াডারে খুব দ্যাখতে মন চায়। না জানি ওরা ক্যামন আছে।
বাদলঃ বয়াতী তুমি এই অবস্থার মইধ্যে বাড়ীর কথা ভাবো?
বয়াতীঃ হ-ভাবি, তোমরা কি বুঝবা। তোমাগোতো আমার মতোন সংসার নাই, বউ নাই, শিয়ানা মাইয়া নাই। জানি না ওরা কোন বিপদে আছে।
মানিকঃ সব ঠিক অইয়া যাইব। দেইখেন আমাগোরই জয় অইবো। আপনে কোন চিন্তা কইরেন না। ওরা ভালোই আছে।
বাদলঃ না বয়াতী, তোমার বাড়ি যাওনের কাম নাই। আমার এখন উডি( সকলের প্রস্থান)

অষ্টম দৃশ্য:
(ঝি ঝি পোকার শব্দ)
* (সলেমান বয়াতীর বাড়ি। খন্দকার ও কেতর আলী আসে)
ওয়াজেদঃ বয়াতী ও সলেমান বয়াতী, বাড়ী আছ নাকি?
আমীরনঃ ক্যাডা, ক্যাডা জিগায়?
ওয়াজেদঃ আমি ঐ পাড়ার খন্দকার ওয়াজেদ আলী
আমীরনঃ তারে  কি দরকার? হে তো বাড়িতে নাই।
ওয়াজেদঃ না মানে,ওতো আমাগো গৌরব। মুক্তিযোদ্ধা- জয় বাংলার সৈনিক। মনে বড় আশা ছিল যুদ্ধে যামু। এই দ্যাহো আমি ট্রেনিং কইরাও যাইতে পারলাম না।
কেতরঃ হে- হে- হে। হুজুর আপনার আর কী আশা ছিল।
আমীরনঃ আমনেরা এহোন যান। হে আইলে আমি আমনের কতা কমু হানে।
ওয়াজেদঃ আহা........ । লক্ষী পায়ে ঠ্যালতে নাই। তারে দিয়া আমি কি করুম। দরকারতো তোমারে। ঘরে মেজবান আইলে একটু খাতির যতœ করতে হয় না?
আমীরনঃ সুন্নতী লেবাস পইরা  এইসব কি কতা কন? শয়তান বদমাইশ, এই দিকে আর একটু ও আগাই বিনা কইতাছি।।
ওয়াজেদঃ (অট্রহাসি দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে) কেতর আলী শালিরে আমি নিতাছি তুই মাইয়াডারে নিয়া চল মেজর সাব পাইলে খুশি হইবো।
আমিরনঃ ছাড় কুত্তার বাচ্চা। তগো মা বোন নাই। তগো উপর আল্লার গজব পরবো। তোরা শান্তিতে থাকতে পারবি না।
মেয়েঃ ছাড় শয়তান ছাড়, তোরা আমাগো ছাড় কইতাছি।
*একদিক দিয়া ওয়াজেদ আলী, গায়েনের বউ ও মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, অপর দিক দিয়ে আবার ওয়াজেদ কেতর আমীরন ও মেয়েকে নিয়ে ঢুকবে মেজর সাবে ক্যাম্পে।
ওয়াজেদঃ হুজুর, এই যে, আপনার সুন্দরী লাড়কী
মেজরঃ আও লারকী আও। হাম তুমকো সাদি করতাম। হাম তুমকো বিবি বানাইতাম। আও মেরা দিলের রানী। তুম বহুত সুরাত হে।
আমীরনঃ না- না- না। আমার গায় হাত দিবি না কইলাম, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের দোহাই দিয়া কইতাছি আমারে ছাইড়া দে।
মেয়েঃ বেঈমান, রাজাকার, আমাগো ছাইড়া দে। অবলা  মাইয়া মানুষ লইয়া টানাটানি করছ ক্যান। পারলে মুক্তিযোদ্ধার সামনে গিয়া খাড়া। আমার বাজানে হুনলে তোগো কাইট্টা কুত্তা দিয়া খাওয়াইব।
মেজরঃ গায়েনের বউকে অত্যাচার করতে উদ্যত হয় তখন সাজু কেতরের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মেজরের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বলে আমার মায়রে ছাইড়া দে কইতাছি। মেজর তখন রাগ হয়ে গলায় ফাস দিয়ে সাজু কে মেরে ফেলে।
(আমীরনকে টেনে নিয়ে ভিতরে নিয়ে যায় এবং সকলের প্রস্থান)
নবম দৃশ্য:
বাদলঃ হুনছনি তোমরা কালকিনি, রাজৈর ও শিবচর হানাদারমুক্ত অইয়া গ্যাছে। চিন্তুা কইরো না আমরাও শীঘ্রই মুক্ত অইয়া যাইমু। আমাগো দ্যাশ ও স্বাধীন অইয়া যাইব।
মানিকঃ ভাই, রফিকের তো কোন খোজ পাইলাম না।
বাদলঃ রফিকের ঐ দুঃসম্পর্কের বোন কি জানি অর নাম বেনু না কি জানি? অয়তো গোপনে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাগো অনেক সাহায্যে তরছে। অর খবর কী?
মানিকঃ হ- ভাই বোইনডা আমার দ্যাশের লাইগ্যা নিজের ইজ্জত পর্যন্ত হারাইছে। তয় হুনছি হানাদারগো খতম না কইরা বেনু  ও থামবো না।
বাদলঃ হ-বেনু পারবো। অর বুকের মধ্যে জেদ ধইরা গ্যাছে। ও এহোন জীবনের পরোয়া করে না। কি নিয়াই ও বাচবো মাইয়াডা।
মানিকঃ বয়াতী ভাই কি হইছে- তুমি এত অস্থির ক্যান?
বয়াতীঃ সাইদুলের কাছে হুনলাম ওয়াজেদ আলী নাকি আমার বউ আর মাইয়ারে ধইরা নিয়া গ্যাছে। বাদলরে আমার সব শ্যাষ হইয়া গ্যালো রে ভাই সব শ্যাষ হইয়া গ্যালো।
বাদলঃ আইজ এতগুলা দুঃসংবাদ আমারে দিলা। বয়াতী কান্দ ক্যান। কাইন্দা কোন লাভ নাই, এই ধরো অস্ত্র, এইডারে চাইপ্পা ধরো। মনটারে শক্ত করো, বাঁচতে অইলে লড়তে অইবো। সব কিছুর বিনিময়ে অইলেও দ্যাশ স্বাধীন কইরা ছাড়–ম। চলো তোমরা, আইজই সমাদ্দারের দিকে, ঐখানে আর্মিগো গাড়ি আইসা জড়ো হইছে। অগো খতম করতেই হইবো।
বয়াতীঃ বাদলরে না আমি আর কান্দুম না, আমি এইবার পাকিস্থানি ক্ত্তুার বাচ্চাগো কইলজা টাইন্না বাইর কইরা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু।
মানিকঃ চল সবাই (একদিকে দিয়ে বের হয়ে অন্য দিক দিয়ে ঢুকবে এবয় আর্মিদের সাথে যুদ্ধ করবে।
এক জন : আমাদের গোপন সংবাদ দাতা জানিয়েছে মাদারীপুর থেকে আর্মিরা সব কিছু নিয়ে যে কোন সময় পালিয়ে যাবে।
বাদল : ঘটকচর থেকে প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতে হবে।
যুদ্ধের সময়
বাদলঃ বাচ্চু তুই গ্রেনেড সাবধানে মার। ওরা কিন্তু রাস্তার ওপারে বন্দুক তাক করে আছে।
মানিকঃ তুই যা বাচ্চু আমি তোরে কাভার দিতাছি।
 আর্মিঃ মুক্তির উপর গুলি ছোর দে। (বাচ্চুর মারা যাওয়ার শব্দ)
মানিকঃ বাদল ভাই বাচ্চু মনে হয়,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
বাদল : মেজর খটক, তুমি আতœসমর্পন কর। মুক্তি যোদ্ধারা তোমাদের চারিদিক ঘিরে ফেলেছে।
 *যুদ্ধের ময়দানে মানুষ মরে পড়ে থাকবে ঐ দিকে বাদলের কাছে মেজর সাব সাদা রুমাল দেখিয়ে আত্মসমর্পন করবে।
(থমথমে পরিবেশ থাকবে)
শেষ দৃশ্য:
(যুদ্ধ শেষ। জয় বাংলার মিছিলে। বয়াতী ছুটে আসে তার বাড়ী অন্যদিকে জয়বাংলার মিছিলের  শব্দ শুনে রফিকের মাও ছুটে আসে বয়াতীর বাড়ী)
বয়াতীঃ আমীরন, সাজু তোমরা কই? এই দ্যাগো আমি আইছি। দ্যাশ স্বাধীন করে আইছি।
(বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)
রফিকের মাঃ সোলেমান ভাই তুমি আইছ? তয় বড় দেরি কইরা হালাইছো। তোমার মাইয়াডা আর ফিরতে পারে নাই, বউডা সব হারাইয়া পাগল হইয়া গ্যাছে। হয়তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাছে........। (হাঠাৎ রফিকের কথা মনে হয়ে ব্যাকুল হয়ে গায়েনকে প্রশ্ন করবে)
রফিকের মাঃ গায়েন ভাই তুমি একলা আইছ ক্যান? আমার রফিক আহে নাই। আমার রফিক কই। গায়েন ভাই তুমি কথা কওনা ক্যান?(গায়েন শোকে বিহ্বল হয়ে কান্নাজরিত কন্ঠে বলে)
বয়াতীঃ ভাবীসাব তোমার রফিকের কোন খোজ পাই নাই(রফিকের মার চিৎকার কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে আসবে) না........... আমার রফিক..............................
রফিকের মাঃ আমার বাজান, আয় বাব, তুই ফিরা আয় যুদ্ধ তো শ্যাষ তুই এহোনো কি করছ? সবাইতো ঘরে ফিইরা আইছে, তুই কবে আবি বাজান কবে? আয়.............বাবা আয়( বলে কানতে কানতে বেরিয়ে যাবে, গায়েন রফিকের মার পিছন পিছন গিয়ে আবার ফিরতে যাবে এমন সময় আমীরন পাগল বেশে প্রবেশ করবে এবং গায়েন দেখে আশ্চর্য হয়ে যাবে। বউকে ধরতে যায় সে ছিটকে দুরে সরে যায়)
আমীরনঃ না আমারে ছুইবিনা ছুবিনা কইতাছি, পর পুরুষ আমার সব কাইরা নিছে। তুই আবার কোন পুরুষ? তুই আবার কি চাষ(কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)
বয়াতীঃ আমীর আমার আমীরন। আমি তোমার গায়েন আমীর। আমার সাজু মইরা গিয়া বাইচ্চা গ্যাছে। দ্যাশের জন্য শহীদ হইছে। এই দৃশ্য দেখার আগে আমি ক্যান শহীদ হইলাম না? আমু...... আমুরে কতা কও আমীর কতা কও। (বলে জোরে ঝাকুনী দেয়)
আমীরনঃ (স্মৃতি ফিরে পেয়ে) আমি মরি নাই? আমি বাইচ্চা আছি ক্যান? গায়েন কতা কও ক্যান আমি বাইচ্চা আছি? কি আছে আমার? তুমিতো দ্যাশ স্বাধীন করছো। কত মানুষের মুখে হাসি ফুটাইছো। হ্যারা কি পারবো আমাগো ইজ্জত ফিরাইয়া দিতে। জানো ওরা আমার আর সাজুর ইজ্জত একলগে নিছে। (আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে গায়েনের বুকে।)
বয়াতীঃ চুপ করো, আমীরন চুপ করো, আর কইওয়ানা তুমি চুপ করো। (গায়েনের কোলে আমীর মারা যায়) আমির কতা কও, কতা কওনা ক্যান? চোখ খোল আমীরন চোখ খোল।( কান্নারত অবস্থায় আমীর কতা কও বলে জোরে চিৎকার করে)
বয়াতীঃ আমার আমীরন কতা কয়না। তোমরা কতা কওনা ক্যান? তোমরা চুপ কইরা রইছো ক্যান? দ্যাহো তোমরা, দ্যাশের লাইগ্যা আমি আমার সব হারাইলাম। তোমরা আমারে ফিরাইয়া দিতে পারবা? পারবানা। তোমাগো কাছে কিছু চাই না আমি, খালি আমার নিষ্পাপ মাইয়া আর বউরে যারা নষ্ট কইরা মারছে,যারা আমাগো মাছুম বাচ্চুরে মারছে, যারা এই দ্যাশের লগে বেঈমানী করছে যাগো হিং¯্র থাবায় দ্যাশ আর দ্যাশের মানুষ ধ্বংস হইয়া গ্যাছে, আমি হেইসব ওয়াজেদ আলী আর কেতরগো বিচার চাই। পারবানা তাগো বিচার করতে? আমি মরার আগে আমার “একটাই চাওয়া” একটা জিনিস দেইখ্যা যাইতে চাই আর কিছু চাই না (বলতে বলতে কান্নারত অবস্থায় পতাকা দিয়ে  বউকে ঢেকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যায়)
* নেপথ্যে গান বাজবে-একসাগর রক্তের বিনিময় বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা)
:সবাই ফ্রীজ:

বুধবার, ১৩ জুন, ২০১২

মহাত্মা গুরুনাথ স্মরণে বসন্ত উৎসব

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
সত্যধর্মের প্রচারক কবিরতœ মহাত্মা গুরুনাথ সেন গুপ্ত স্মরণে সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের উদ্যোগে মাদারীপুরের কালকিনি অঞ্চলের নিভৃত পল্লী ঝুরগাঁও গ্রামে তিনদিনব্যাপী বসন্ত উৎসব পালিত হয়। প্রতিবছর ২৮ জানুয়ারি সকাল থেকে ৩০ জানুয়ারি গভীর রাত পর্যন্ত ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে  একেক বছর একেক স্থানে এ উৎসব পালিত হয়।
সন্ধ্যা নাগাদ উৎসবস্থলে পৌঁছে আমি হতবাক। সহস্র লোকের আনাগোনা। ভক্তরা মন্ডপের সামনে তাবুতে বসে আরাধনা করছেন। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। এরই ফাঁকে কথা হয় কয়েকজন ভক্তের সাথে। তারা সত্য ধর্মাবলম্বী। যুগ যুগ সাধনা করে মহাত্মা গুরুনাথ সত্য ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এ দিনে পালিত হয় এ উৎসব। আয়োজন করেন সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি। একেক বছর একেক স্থানে পালিত হয়। এ বছর স্থান নির্ধারণ করা হয় কালকিনি। এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘সৃষ্টিস্থীতিলয় কর্তা সর্ব শক্তিমান মঙ্গলময় জগদীশ্বরের উপাসনা।’
উৎসবের তিনদিন স্রষ্টার গুণকীর্তণ, মহাত্মা গুরুনাথ রচিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও আলোচনা, সকল দেহত্যাগী আত্মার জন্য প্রার্থনা করা। সবশেষে সমাপনী রাতে কবিরতœ মহাত্মা গুরুনাথের পাদপদ্মে অর্চনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তী ঘোষণা করা হয়। উৎসবে বিভিন্ন জেলা থেকে মহাত্মা গুরুনাথের অগণিত ভক্ত অংশগ্রহণ করেন।
এ বছর সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রমেশ চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে উৎসবকে অলংকৃত করতে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হারান চন্দ্র দাস, হবিগঞ্জ জেলার সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মলয় চৌধুরী, নেপালে কর্মরত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ নীহার রঞ্জন বিশ্বাস ও গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তন্ময় কুমার সরকার।
উৎসবে মোট ৮টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন তিন ঘন্টা সময় নিয়ে তিনটি করে অধিবেশন হয়। পরিবেশিত হয় ধর্মীয় সংগীত। সংগীতের মূর্ছনায় কলুষিত অন্তর পরিশুদ্ধ হয়। সত্যধর্মের জয় কামনা করে বিদায় নিতে হয় আগত ভক্তদের। তখন সৃষ্টি হয় একটি ভ্রাতৃত্বময় পরিবেশের। যে দৃশ্য আজীবন প্রত্যাশা করেন সবাই।