শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

দেশপ্রেম কি কেবল দিবসভিত্তিক হয়ে যাবে

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’- এ ঘোষণা ইসলাম ধর্মের হলেও সকল ধর্মের মানুষই এ ঘোষণার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কে দেশদ্রোহী হতে চায়? কেউ না। যারা দেশদ্রোহী; তারা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে তৎপর। তারা মানুষের কল্যাণে নয়, নিজের কল্যাণে সব করে। তারা ঘৃণ্য ও অপাঙক্তেয়। দেশদ্রোহীতার পরিণতি সকলেরই জানা। দেশপ্রেমকে ধর্মাচার বললেও অত্যুক্তি হবে না। সকল ধর্মেই দেশপ্রেমের কথা বলা হয়েছে। তাই দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অন্তরে দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। কারণ, যে দেশের মাটি বায়ু জল বাতাসে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠি আমি। সে দেশতো আমার মা। আর মাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। যে করে সে অকৃতজ্ঞ ও মহাপাপী। তাই আমরা সবাই দেশপ্রেমিক হতে চাই। মনে-প্রাণে দেশকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি বলেই ১৯৭১ সালে জীবনের বিনিময়ে দেশকে রক্ষা করেছিলাম। আমরা জাতির গর্বিত সন্তান।
কিন্তু আজকাল আমরা দেশপ্রেমের নামে প্রহসনে মেতে উঠেছি। ইদানীং দেশপ্রেম হয়ে গেছে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার। হয়ে গেছে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ। শুধু রাজনীতিবীদরাই দেশপ্রেমের স্লোগান দেবেন। বাকিরা তাকিয়ে উপভোগ করবেন। সর্বোপরি দেশপ্রেম এখন দিবসভিত্তিক। প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ ও ২১ ফেব্র“য়ারি এলে নানাবিধ কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে তা পালন করি। পরদিন সকালেই দেশের বারোটা বাজানোর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠি। দেশকে ভালোবাসার নামে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে ফ্যাশনে রুপান্তরিত করি।
‘দেশ আমার, মাটি আমার’- স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করি আকাশ। বিভিন্ন রঙের বাহারি পোস্টারে, ফেস্টুনে, ব্যানারে ও দেয়াল লিখনে তখন দেশের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তির প্রচার। ‘ দেশদরদী, গরীবের বন্ধু অমুক নেতার পক্ষ থেকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা’ প্রভৃতি প্রচার-প্রচারণায় ছেয়ে যায় অলি-গলি, হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রাজপথ। এ আমাদের দেশপ্রেমের নমুনা। অথচ আমাদের আশপাশের হতদরিদ্র মানুষগুলো দু’বেলা দু’মুঠো না খেতে পেয়ে বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তির মত জঘন্য কাজ। কবির ভাষায়-‘ঘাতক শিল্পের দেশ তাকে আমি কখনোই স্বদেশ বলি না।’ ক্ষুধার তাড়নায় নারী বেছে নেয় বেশ্যাবৃত্তির মত জঘন্য পেশা। তাইতো কবি বলেছেন,‘বেশ্যালয়কে কখনো আমি স্বদেশ বলি না।’ তাতে কি আমাদের দেশ সারা বিশ্বের কাছে লজ্জিত হয় না? ব্যক্তির প্রচারে অর্থ ব্যয় না  করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে কী দেশপ্রেম প্রকাশিত হয় না। কয়দিন থাকে ঐ ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার? একদিন, একসপ্তাহ, একমাস বা একবছর। অথচ ডিসেম্বর মাসের এ কনকনে শীতের রাতে কোন বস্ত্রহীন মানুষকে একটি শীতবস্ত্র দিলে সেটার স্থায়ীত্ব বহুদিন। দেশের মানুষকে ভালোবাসা কী দেশপ্রেম নয়?
আসলে প্রকৃত দেশপ্রেম কী? আমরা অনেকেই জানিনা বা বুঝতে চাই না। শুধু মুখেই বলি দেশ ও দশের কল্যাণে আমি নিয়োজিত। অথচ দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনের চেয়ে আমরা নিজেদের কল্যাণেই নিয়োজিত থাকি। তাইতো দেশপ্রেমিকের সংজ্ঞাও আমরা পাল্টে ফেলেছি। দেশ ও দশের কল্যাণে ব্যর্থ হয়েও আমরা ‘দেশপ্রেমিক’ উপাধি পেতে পারি। বেয়াদবি মাফ করবেন, ‘আসল কথা হইতেছে- আমরা যে যত বেশি দেশ ও দশের বারোটা বাজাইতে পারিব। সে তত বড় দেশপ্রেমিক হিসাবে উপাধি লাভ করিয়া থাকিবেন।’
আমি দেশপ্রেমিক। তা ঘোষণা দেওয়ারতো কিছু নাই। সেদিন গাড়ীর জন্য এক বাস স্টপেজে অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় প্যান্ট-শার্ট পড়া এক ভদ্রলোকের মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো। রিংটোনে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সুর। আমি চমকে উঠলাম! এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক ফোন রিসিভ করলেন। রিং থেমে গেল। জাতীয় সংগীতের সম্মান বা ব্যবহারের বিধিমালাও আমাদের জানা নেই। আমি যতটুকু জানি, তাতে জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। যত্রতত্র জাতীয় সংগীত বেজে উঠলে আমরা কী করতে পারি? এতো ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’র মতো।
কিছুদিন আগের ঘটনা। গত শারদীয় দূর্গা পূজায় ‘আনন্দধারা নাট্যগোষ্ঠী’র আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের একটি গ্রামে। পূজার অনুষ্ঠান চলছে। সবশেষে নাটক মঞ্চস্থ হবে। নাটকের আগে পরিবেশিত হবে জাতীয় সংগীত। শিল্পীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন শুরু করলেন। কেউ দাঁড়ালো না। আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে একাই দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার দেখাদেখি সাংবাদিক বন্ধু মিজানুর রহমানও দাঁড়ালেন। পরে আমাদের দেখাদেখি পূজামন্ডপ প্রাঙ্গনে যে যেখানে বসা ছিলেন; তারা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। জাতীয় সংগীত সহযোগে দেশকে সম্মান জানানো হলো। জনগণ কি বুঝেছে জানি না। তবে আমার মনে হয়, যেহেতু আমরা অনুষ্ঠানের অতিথি। অতিথিরা দাঁড়িয়েছে তাই সবাই দাঁড়িয়েছে।
আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা পাসের জন্য পৃষ্ঠা ভরে ‘দেশপ্রেম’ রচনা লিখেছি। কিন্তু তার সারমর্ম কিছুই অনুধাবন করিনি। দেশপ্রেমকে কেবল রচনার জন্যই উপযুক্ত মনে করেছি। আমরা বলি-‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ কিন্তু আজ সেটা উল্টে গেছে। বলতে হবে- দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। তাই যদি না হবে তবে আমাদের দেশ আজ এত দুর্ভাগা কেন? দেশের অর্থ কেন বিদেশে পাচার হয়? কেন ‘নিবিড় পাটচাষের বদলে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে নিবিড় কোটিপতির চাষ।’ দেশি পণ্য না কিনে আমরা বিদেশি পণ্য কিনে ধন্য হই। দেশি পণ্য ব্যবহার করলে না কি প্রেসটিজ নষ্ট হয়। এছাড়াও দেশি সংস্কৃতির চেয়ে পরগাছা সংস্কৃতি লালন করি। আমার মনে হয় না- এবার শতকরা বিশজন মানুষ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখেছে। তার কারণ, আমার আকাশ দখল করে রেখেছে স্টার জলসা, জি বাংলা, স্টার প্লাস আর জি টিভিরা। ‘টাপুর টুপুর’, ‘সাতপাকে বাধা’ আর ‘মা’ (ঝিলিক) আমাদের নারী সমাজের মগজ এমনভাবে ধোলাই করেছে যে, তারা ঐ সিরিয়াল দেখে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবেন। ভুলেও চ্যানেল পাল্টে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান দেখবেন না। ছি! আমরা কতটাই অকৃতজ্ঞ। অথচ ভারত সরকার তাদের টেলিভিশনে আমাদের কোন চ্যানেল প্রচারে অনুমতি দেন নি। কবি যথার্থই বলেছেন-‘ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো টিভি পর্দায় যখন পাশ্চাত্যের/ হাঙর-সংস্কৃতি এসে গিলে খাচ্ছে পদ্মার রূপালী ইলিশ।’
বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও মাতৃভাষা দিবস এলেই ফুল দেই। লাল-সবুজের রঙে নিজেকে সাজাই। একদিন পড়ে সে পোশাক তুলে রাখি আগামী বছরের জন্য। পত্র-পত্রিকাগুলো সাময়িকী ছাপে। পনের দিন দেশাত্মবোধ জাতীয় কলাম ও প্রতিবেদন ছাপে। ব্যাস, ঐ পর্যন্তই। টেলিভিশনগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, সিনেমা ও টকশো প্রভৃতি প্রচার করে। এরপর পাল্টে যায় সবার চেহারা। কেন? দেশপ্রেম কী কেবল দিবসভিত্তিক? দেশাত্মবোধকে কেন আমরা সঙ্কীর্ণ গন্ডির মধ্যে নিয়ে এসেছি। দেশাত্মবোধক নাটক, সিনেমা কী সারা বছর প্রচারিত হতে পারে না।
আসুন শুধু মুখেই নয় অন্তরেও ভালোবাসতে শিখি। রাজনীতির স্বার্থে নয়, ব্যক্তি স্বার্থে নয়, ক্ষমতার লোভে নয়। ঈমানী দায়িত্ব মনে করেই দেশকে ভালোবাসি। নিজের কল্যাণে নয়, দেশের কল্যাণে এগিয়ে আসি। দেশের প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানাই। ‘দেশ আমার, মাটি আমার’- স্লোগানকে অন্তরে ধারণ করে দেশের অভ্যন্তরের যাবতীয় ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিতে ঐক্যবদ্ধ হই। দলের স্বার্থে দলাদলি না করে দেশের স্বার্থে সবাই এক হয়ে কাজ করি। তাই কবির ভাষায় বলতে হয়-‘যখন আমাদের শত্র“রা সংঘবদ্ধ, বন্ধুরা ঐক্যভ্রষ্টÑ/ তখন এই কবিতাটির ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

চল্লিশ বছর পরও উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
৮ ডিসেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে কমান্ডার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা লালপোল সংলগ্ন ও থানার অভ্যন্তরে পাক হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে কালকিনিকে হানাদার মুক্ত করেন। এ দিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিজয়ের আনন্দে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রকাশ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। কালকিনি মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা মাদারীপুর সদর মুক্ত করার জন্য রওয়ানা হন। ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মাদারীপুর সদর। কিন্তু স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও এ দিনটি কালকিনিবাসীর কাছে উপেক্ষিত বা অজ্ঞাত। মুক্ত দিবস উপলক্ষে নেই কোন কর্মসূচি।
শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও কালকিনিতে নির্মিত হয়নি স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ। প্রবীণ থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মও জানে না কালকিনি মুক্ত হয় কত তারিখে। লজ্জার বিষয়, অনেক মুক্তিযোদ্ধাও দিনটির কথা বেমালুম ভুলে বসে আছেন। তার কারণ, কালকিনি মুক্ত দিবস উপলক্ষে চল্লিশ বছরে একবারও কোন কর্মসূচি পালিত হয়নি। এমনকি এনায়েত নগর ইউনিয়নের ফাসিয়াতলার গণহত্যা দিবসও ভুলে গেছে সবাই। ভুলে গেছে শহীদ বীর বিক্রম এম নুরুল ইসলাম ও শহীদ নুরুল আলম পান্নাসহ অনেক শহীদের নাম। তার কারণ, স্বাধীনতার চল্লিশ বছরেও নির্মিত হয়নি স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বা অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক।
বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এনায়েত নগর ইউনিয়নের ফাসিয়াতলা বন্দর সাপ্তাহিক হাটের দিন বলে সরগরম। নিয়মিত নিয়মে চলছে বেচা-কেনা। হঠাৎ সন্ধ্যার ঠিক আগে দু’জন অপরিচিত লোক ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করল,‘মুক্তিবাহিনী আইছে। তারা আপনাগো লইয়া মিটিং করব। আপনারা বাজার ছাইড়া যাইবেন না।’ ঘোষণার ১৫ মিনিট যেতে না যেতেই রাজাকার ও আল বদর বাহিনী বাজার ঘেরাও করে ফেলে। এর ১০ মিনিট পর নদীতে গানবোটে চরে আসে পাক বাহিনী। রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনী সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র হাটুরে মানুষের ওপর। হানাদারদের অতর্কিত হামলায় শহীদ হয় প্রায় দেড়শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ। অনেককে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাজারের দোকানপাট। যাওয়ার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮ জনকে। এর মধ্যে ১০জন আজো ফিরে আসেনি।
১৯৭১ এর মে মাসে বর্তমান পৌর এলাকার দক্ষিণ রাজদী গ্রামের নুরুল আলম পান্না যোগ দেন ৩০৩ নম্বর রাইফেলে। মেজর মনজুর নেতৃত্বে ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে কালকিনি অঞ্চলে নুরু কবিরাজের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। যুদ্ধকালীন তাঁর কাজ ছিল পাক বাহিনীর গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একাত্তরের ১০ অক্টোবর উপজেলার ফাসিয়াতলা বাজারে যান। সেখানে রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনী তাকে আটক করে মাদারীপুর এ.আর হাওলাদার জুট মিলের মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। হত্যার পর নিশ্চিহ্ণ করে দেওয়া হয় মৃতদেহ। এরপর কেটে গেছে চল্লিশ বছর। অথচ নিখোঁজ শহীদ নুরে আলম পান্নার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই। আজ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর তাঁর আত্মীয়-স্বজনের কাছে খোঁজ নিয়ে শুনতে হয় তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন শহীদের ভাই জহিরুল আলম সিদ্দিকী ডালিম।
১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পাক বাহিনীর যাতায়াতে বিঘœ ঘটানোর জন্য গোপালপুর ব্রীজে মাইন বিস্ফোরণ শেষে ফেরার পথে রাজাকার ও পাক বাহিনীর নির্মম বুলেটে শাহাদাত বরণ করেন উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের পরিপত্তর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা এম নুরুল ইসলাম। তাঁর লাশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিজের ভিটায় দাফন করার সৌভাগ্য হয়নি স্বজনের। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর বীর বিক্রম উপাধীতে ভূষিত করেন। অথচ তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণেও আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি স্মৃতিস্তম্ভ। কিংবা কোন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা স্থাপনার নামকরণও হয়নি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজ ভুলতে বসেছে কালকিনিবাসী। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৮ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে উপজেলা গেট সংলগ্ন সুরভী সিনেমা হলের পাশে স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তার কাজ শুরু হয়নি। ঠিক তেমনি অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসার পরও উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। দানবীর, শিক্ষাণুরাগী স্থানীয় সাংসদ সৈয়দ আবুল হোসেনও পরপর চার বার নির্বাচিত হয়েও কর্ণপাত করেননি স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে। অথচ নিজের নামে, বাবার নামে অনেক কিছু করলেও এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদদের নামে কিছুই করেন নি।
কিন্তু ২০১০ সালে উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর স্থাপিত হয়। ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কিন্তু অর্থাভাবে ঢিমেতালে চলছে তার কাজ। কাজ শেষ না হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে ক্ষুব্ধ কালকিনির মুক্তিযোদ্ধারা। যার ফলে গত ২৫ মার্চ কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত ‘স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তি’ অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সৈয়দ আবুল হোসেন তাদের শান্ত করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আকন মোশাররফ হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। স্বাধীন দেশের স্রষ্টারাই আজ ধুুকে ধুকে মরে। এমনকি তাদের স্মৃতিটুকুও সংরক্ষণ করা হয়নি। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসকান্দার আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর আগে। এখনো ফাসিয়াতলা গণহত্যা, স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় সবই কালের ধুলায় বিলীন হতে চলেছে।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে শত্র“মুক্ত হয়েছে আমাদের স্বদেশ। আজ স্বাধীন দেশের মাটিতে পালিত হয় না কালকিনি মুক্ত দিবস। গড়ে ওঠে না স্মৃতিস্তম্ভ। সংরক্ষিত হয় না গণহত্যার স্মৃতি। এ লজ্জা রাখবো কোথায়? এ দীনতা কাদের? তবে কী জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞ। হয়তো একদিন মরতে মরতে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা শূন্য হয়ে যাবে। সেদিন কী আমরা তাদের স্মরণ করবো? আগামী প্রজন্ম কী মনে রাখবে তাদের কথা। কীভাবেই বা রাখবে? আমরা যদি তাদের স্মৃৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করি তবে সেই ব্যর্থতা কেবল আমাদের।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

বৃহস্পতিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১২

বালেশ্বর যুদ্ধের কথা

দুলাল সরকার

বালেশ্বর যুদ্ধের কথা বলব তোমাকেÑ
১৯১৫ সাল, বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয়
মনোরঞ্জন, নীরেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিষচন্দ্র নামের চার বিপ্লবী
যুদ্ধাস্ত্র গ্রহণে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত অপেক্ষমান অবসরে
চিন্তামনি নামের ছদ্মবেশী দারোগার বিশ্বাসঘাতকতায়
সকলের মৃত্যু হলে বাঘা যতীন সব সাথীদের
মৃত্যুর দায় স্বীকার করে চিরবিপ্লবী যতীন সেই অসম যুদ্ধে
প্রাণ হারালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
হত্যাকারী পুলিশ কমিশনার টেগার্টকেও তাঁর
দেশপ্রেম ও বীরত্বের কাছে মাথা নোওয়াতে দেখে ভাবি
’৭১ এর হত্যাকারী, লুণ্ঠনকারী, ধর্ষক
পাকিস্তানীরা আজো
বাঙালির কাছে মাথা নত না করে
যে অপরাধ করে চলেছে
তা কত ক্ষমাহীন ও মানবতাবিরোধী।

২২.১১.২০১২

বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

ডা. জোহরা বেগম কাজী উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :
উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজীর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৭ নভেম্বর। যে মহিয়সী নারী জীবদ্দশায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করছি তাঁকে। অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। তিনিই প্রথম ধাত্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে অজ্ঞ ও অবহেলিত নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন। অবগুন্ঠিত নারী সমাজের উন্নত চিকিৎসার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামির শক্ত বাধাকে অতিক্রম করে নারী সমাজের মুক্তিদাত্রী হিসেবে ধূমতেুর মত আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের অনগ্রসর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন।
এ মহিয়সী নারী ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজনানগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার তৎকালীন পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার গোপালপুর গ্রামের প্রভাবশালী সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ও আধুনিক চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। তিনি দেশভাগের ঘোরবিরোধী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তিনি পছন্দ করতেন না। ফলে বাবার মানবতাবাদী রাজনৈতিক আদর্শ ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হলে থাকে অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত কিশোরী জোহরার মননে ও চেতনায়। মাতা আঞ্জুমান নেছা রায়পুর পৌরসভার প্রথম মহিলা কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কর্মনিষ্ঠ সাদাসিধে এক নারী।
তখন ‘ব্রিটিশ খেদাও’ আন্দোলনের উত্তাল সময়। এ সময় ডা. জোহরা বেগম কাজীর শৈশব-কৈশোর কাটে মানবতাবাদী পিতার কর্মস্থল মহাত্মা গান্ধী প্রতিষ্ঠিত সেবাশ্রম ‘সেবাগ্রাম’-এ। রাজনানগাঁওয়ের রানি সূর্যমুখী প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের টোল ‘পুত্রিশালায়’ তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ছাত্রজীবনে তিনি বরাবরই মেধাবী ছিলেন। ক্লাসে সব সময় প্রথম হতেন। ফলে সাফল্যের সাথে মেট্রিক পাস করেন। ১৯২৯ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে আইএসসি পাস করে কলেজ জীবন সমাপ্ত করেন। এরপর উপমহাদেশের প্রথম মহিলা মেডিকেল কলেজ দিল্লির লেডি হার্ডিং গার্লস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজে তিনিই প্রথম মুসলিম বাঙালি ছাত্রী। এখান থেকে ১৯৩৫ সালে এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। তখন তাকে সম্মানজনক ‘ভাইস রয়’ পদক প্রদান করা হয়।
ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মহাত্মা গান্ধীর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা জোহরা বেগম কাজীর গান্ধী সেবাশ্রমে কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। এছাড়া অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩ বছর কাটিয়েছেন তিনি। পরে বৃত্তি নিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্য লন্ডনে পড়াশুনা করেছেন এবং চিকিৎসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি এফআরসিওজি লাভ করে ভারতে ফিরে আসেন। গান্ধী পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে নাগপুরে অবস্থিত গান্ধীর সেবাশ্রম ‘সেবাগ্রাম’-এ তিনি অবৈতনিক চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশবিভাগের পর তিনি বড়ভাই অধ্যাপক কাজী আশরাফ মাহমুদ ও ছোটবোন ডা. শিরিন কাজীর সাথে বাংলাদেশের ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যোগদান করেই গাইনি (স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা) বিভাগ চালু করেন। এছাড়াও তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান ও অনারারি প্রফেসর ছিলেন। পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অনারারি কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
সাতচল্লিশ- পরবর্তী বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তিনি একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্রে বাঙালি নারী চিকিৎসকদের অগ্রপথিক, মানবতাবাদী ও সমাজ-সংস্কারক ছিলেন। গর্ভবতী মায়েরা হাসপাতালে এসে যেন চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন, সে জন্য তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নারীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। পিছিয়ে পড়া নারীদের জাগরণ তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে নারীদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তারই দেখানো পথে আজ বাংলাদেশে অসংখ্য নারী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর জ্বালিয়ে দেওয়া আলোক বর্তিকা হাতে নিয়ে আজ অনেক নারী চিকিৎসক আলোকিত করছে গ্রামবাংলার অবহেলিত জনপদের চিকিৎসা জগতের অন্ধকার প্রকোষ্ট।
শুধু তা-ই নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন। এছাড়াও একজন ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিনির্মাণের লক্ষে তিনি ২০০১ সালের ১১ জুলাই তাঁর কাছে সংরক্ষিত মহাত্মা গান্ধীর ব্যক্তিগত ঐতিহাসিক পত্র, ভাইস রয় পদক, সনদসমূহ এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি-স্মারক আমাদের জাতীয় জাদুঘরে দান করে গেছেন।
ডা. জোহারা বেগম কাজী জীবনের শুরু থেকেই সময়ের ধারাবাহিকতায় কর্মময় জীবনে মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর স্ত্রী কন্তুরাবার øেহসিক্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ও মহাত্মা গান্ধীর øেহভাজন কংগ্রেসের অন্যতম কর্মী ডা. সুশীলা নায়ারসহ অসংখ্য মানবতাবাদী বিপ্লবী মানুষের সাহচর্য লাভ করেছেন।
জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে ডা. জোহরা বেগম কাজী বিভিন্ন খেতাব ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘তখমা-ই পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি ‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) তাকে বিএমএ স্বর্ণপদক প্রদান করে। ২০০২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘রোকেয়া পদক’ প্রদান করেন। ২০০৮ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) প্রদান করে সম্মানিত করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩২ বছর বয়সে তৎকালীন আইনজীবি ও সংসদ সদস্য রাজু উদ্দিন ভূইয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আজীবন মানব সেবায় নিয়োজিত জোহরা বেগম কাজী ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর ৯৫ বছর বয়সে ঢাকার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে ঢাকায় মাদারীপুর জেলা সমিতির উদ্যোগে স্মরণ সভা ও পৈতৃক নিবাস মাদারীপুরের কালকিনির মানুষ স্মরণ সভা ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করে। এ মহিয়সী নারী আমাদের মাঝে চিরদিন চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর, ২০১২

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন কুন্ডুবাড়ির মেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন হিসাবে আখ্যায়িত করলে অত্যুক্তি করা হবে না। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালী পূজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত কুন্ডুবাড়ির মেলায় আগত দর্শনার্থীর সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানই কয়েকগুণ বেশি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-‘ গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান।’ এইতো ছিল আমাদের গ্রামবাংলার সম্প্রীতির চিরায়ত সংস্কৃতি। কিন্তু ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় গোড়ামী আজ যখন সাম্যের পথে বাধা হয়ে শক্ত প্রাচীর গড়তে যাচ্ছে সে সময়ে এমন মিলন মেলা আমাদের অবশ্যই স্মরণ করিয়ে দেয় ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ আমরা ফিরে পেতে চাই সোনালী দিন। আমরা বলতে চাই- আমরা জন্মসুত্রে বাংলাদেশী। জাতিগত পরিচয়ে আমরা এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়- মেলার একদিকে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। অন্যদিকে বিশাল এলাকা জুড়ে পণ্যের বিকি-কিনি। সর্বোপরি বাধভাঙা আনন্দ উপচে পড়ে বিনোদন মঞ্চে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসে তাদের পণ্যের পসার সাজাতে। দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ আসবাবপত্রের মেলা হিসাবে খ্যাত কুন্ডুবাড়ির মেলা শতবছর পেরিয়ে সহস্র-অযুত-লক্ষ-নিযুত-কোটি বছর কিংবা আজীবন টিকে থাকবে। টিকে থাকবে এ অঞ্চল তথা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ হিন্দুদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেলাকে সফল করতে নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসে স্থানীয় মুসলমানরা। সম্প্রতি রামু ও উখিয়ায় ঘটে যাওয়া সহিংসতাও দমাতে পারেনি আয়োজকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা । গ্রামবাংলার শতবছরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দলমত নির্বিশেষে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার কমতি নেই স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের।
কুন্ডুবাড়ির মেলার উৎপত্তির ইতিহাস দুর্বোধ্য হলেও ধারণা করা হয়- স্থানীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালীপূজা উপলক্ষে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার গোপালপুর গ্রামের কুন্ডুবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা। সঠিক দিন তারিখ কেউ না জানলেও ধরে নেওয়া হয় আনুমানিক আঠারো শতকের শেষের দিকে কুন্ডুদের পূর্বপুরুষরা ধর্মীয় উৎসব কালীপূজার আয়োজন করে। ক্রমান্বয়ে তাদের পূজাকে ঘিরে প্রথমে বাদাম, বুট, রয়্যাল গুলি, লাঠি লজেন্স, মন্ডা-মিঠাই ও খেলনা নিয়ে অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী বসতো। পরে আস্তে আস্তে প্রতিবছর ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় এখবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে স্থানীয়রা এর নামকরণ করেন ‘কুন্ডুবাড়ির মেলা’ নামে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থিরতার মধ্যে মেলা বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ মেলা জমজমাটভাবে হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও ১৩ নভেম্বর সকাল থেকে ১৭ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কুন্ডুবাড়ির মেলা। তিন দিনব্যাপী হওয়ার কথা থাকলেও ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে আরো দু’দিন বাড়িয়ে সমাপ্ত হলো। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা বাঁশ, বেত, ইস্পাত-কাঠের আসবাবপত্র, খেলনা ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে আসেন। অনেকে আসেন পণ্য সামগ্রী কিনতে। পাশাপাশি নাগর দোলা, পুতুল নাচসহ বিভিন্ন বিনোদনে আকৃষ্ট হয় দর্শনার্থীরা। বস্তুত বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেলা হয়ে ওঠে উপভোগ্য। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চাপ কম থাকলেও বিকেলের পরে বাড়তে থাকে জনস্রোত। বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয় মেলা প্রাঙ্গন। তবুও মেলার দীর্ঘ ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার নজির নেই।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা কেউ কেউ বাচ্চাদের জন্য খেলনা, আসবাবপত্র কিংবা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনছেন। আবার কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ব্যবসায়ীদের প্রচুর লাভ হয়। কোন ঝুট-ঝামেলাও নেই। মেলা উদযাপন কমিটিও যথেষ্ট আন্তরিক। কুন্ডুবাড়ির মেলা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ণ। তাই বংশ পরম্পরায় তারা এ ঐতিহ্যকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। তিনি আরো জানালেন, তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি আঠারো শতকের শেষের দিকে এ মেলার প্রবর্তন করেন। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ মিলন মেলা। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সব ধর্মের মানুষ আসে। হিন্দু-মুসলমান কে কোন জাত সে বিচারের উর্ধ্বে গিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন গড়াই সকলের উদ্দেশ্য। জাতিগত সীমাবদ্ধতার বাহিরে উদার মানসিকতার পরিচয় মেলে এখানে। বেচা-কেনা কেবল উপলক্ষ মাত্র। আমরা বাঙালি। আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার একাত্মতা ঘোষণার একটা প্লাটফর্ম বলা যায়।
মেলার অগণিত মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য পূজা মন্ডপের পাশে স্থায়ীভাবে একটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাদের সহযোগিতা করেন। ফলে বিশৃঙ্খলার কোন সুযোগ নেই। কুন্ডুদের পূর্বপুরুষদের প্রবর্তিত এ মেলা শতবছর পেরিয়েছে। মেলার আয়োজকরা হিন্দু হলেও এটা এখন এলাকার ঐতিহ্য ও সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ঐতিহ্য ও সম্পদ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের। ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা এ অঞ্চলের প্রাণের উৎসব। তাই পূর্ব নির্ধারিত তিনদিনের হলেও বর্ধিত আরো দু’দিন অর্থাৎ পাঁচদিনে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে এ উৎসব। কুন্ডুবাড়ির মেলা আমাদের শিক্ষা দেয়- রামুর মতো আর সহিংসতা নয়। মানুষে মানুষে হৃদ্যতাই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমরা বাঁচতে চাই- হাতে হাত রেখে। আমরা বাঁচতে চাই- কাঁধে কাঁধ রেখে।
বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গন ঘুরেও মনে হয় ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে/ যেন শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ জনসমুদ্র সাঁতরে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে পড়ে যায়- ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা/ অগ্রাণে নবান্ন উৎসবে/ আবার বাংলা ভরে উঠবে সোনায়/ বিশ্ববাসী চেয়ে রবে।’ আমাদের শুধু একটাই প্রার্থনা, শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা টিকে থাকুক মানুষের ভালোবাসা আর বন্ধনে। সাম্য ও মৈত্রী হোক এর একমাত্র লক্ষ। কোন অসাম্প্রদায়িকতা যেন এর পবিত্রতাকে বিনষ্ট করতে না পারে এ প্রত্যাশা সকলের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভরে উঠুক প্রিয় স্বদেশ। একই দুর্বা ঘাসের শিশিরে সিক্ত হোক সকলের চরণ। এক শীতল আবেশে সম্প্রীতির সুবাতাস বইয়ে দিক সবার অন্তরে। এক সামিয়ানার নিচে সব ব্যবধান ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে গেয়ে উঠুক মানবতার জয়গান। কুন্ডুবাড়ির মেলা দীর্ঘজীবি হোক। অটুট বন্ধনে চিরজীবি হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এর সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয় সবার উপরে সম্প্রীতি সত্য তার উপরে নাই।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১২

প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধির ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের বিচারের দাবীতে গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কালকিনি বন্ধুসভার উদ্যোগে স্থানীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে কালকিনি বন্ধুসভার সভাপতি সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে মিজানুর রহমানের সঞ্চালনে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক মোঃ জামাল উদ্দিন, খন্দকার মনিরুজ্জামান, আসাদুজ্জামান রিপন, সাইফুল ইসলাম, তপন বসু, ওমর আলী সানি, আঃ গফুর মোল্লা, জহিরুল ইসলাম খান, উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন, মাদারীপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী রতন কুমার দাস প্রমুখ। বক্তারা খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সকালে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলাল ও তার সমর্থকদের হামলায় প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলম গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১ নভেম্বর, ২০১২

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন চিরদিন চিরকাল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
‘কেউ কথা রাখেনি’- কবিতাটি প্রথম শুনি খালাতো ভাই মহিউদ্দিনের কন্ঠে। খুব ভালো আবৃত্তি করতেন। কবিতার কবিকে চিনতাম না। তবে নাম শুনেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কবিতার সাথে সেই আমার প্রথম প্রেম। কবিতার বইটি খুঁজতে থাকি। নাম জানিনা। ২০০৩ সালে যখন ঢাকায় থাকি; তখন একদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদের পাশের রাস্তায় পুরনো বইয়ের দোকানে ‘সুনীলের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামের একটি পুরনো বইয়ের ওপর চোখ পড়ে। হাতে নিয়ে খুলে দেখি-‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতা আছে। একটি কবিতার জন্য বিশ টাকা দিয়ে বইটা কিনলাম। একদিন পত্রিকায় দেখি- কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর জন্মস্থান কালকিনিতে এসে নোংড়া রাজনীতির শিকার হয়েছেন। কালকিনিবাসী তাঁর কথা রাখেনি।
২০০৫ সালে বাংলা সাহিত্যে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য আসি কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে। তখন কলেজে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য বাছাই পর্বে ‘কেউ কথা রাখেনি’ আবৃত্তি করলাম। বাছাইতে টিকলেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারিনি। খুবই আহত হয়েছিলাম। কারণ বিচারকরা আমার কথা রাখেননি। এরপর আবৃত্তিটাকে আঁকড়ে ধরলাম। শিমুল মুস্তাফা, মাহিদুল ইসলাম, মেহেদি হাসানদের অডিও ক্যাসেট কিনে রোজ শুনতাম। তারপর অনেক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছি। আমার আবৃত্তি জীবনে ঐ একটা কবিতাই মুখস্থ। এরপর যত আবৃত্তি করেছি তা মুখস্থ করিনি। স্ক্রীপ্ট দেখে করেছি।
২০০৬ সালে কলেজের নোটিশ বোর্ডে সুনীল সাহিত্য ট্রাস্টের গল্পলেখা প্রতিযোগিতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছি। পুরস্কারে সুনীলের লেখা ‘কাকাবাবু’ পেয়েছিলাম। এরপর আত্মীয়ের বাড়িতে ‘সোনালী দুঃখ’ পড়েছি। আস্তে আস্তে সুনীলের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেয়। সেই থেকে বছরে একটা ছোটগল্প লিখে জমা দিতাম। তারমধ্যে ২০১০ ও ২০১১ সালেও ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ পেয়েছি। পুরস্কারের সাথে কবির হাতের লেখা আশির্বাদ পত্র দেওয়া হয়। সেখানে লেখা ‘আমি তোমাদের মাঝে বেঁচে রই চিরদিন চিরকাল!- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।’ কবির আর্শিবাদ আমাকে কবির কাছে ঋণী করে দেয়। এখন মনে হচ্ছে মাদারীপুরে প্রবর্তিত সুনীল সাহিত্য পুরস্কারকে জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। তবেই হয়তো কবির কথা না রাখার দীনতা ঘুচাতে পারবো।
২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার জন্মভিটায় পা রাখবেন। শুনে আনন্দিত হলাম। শরীরী কবিকে দেখব। এ যেন অন্যরকম অনুভূতি। অশরীরী সুনীলের সাথে প্রথম পরিচয় খালাবাড়ির ঘরোয়া আড্ডায়। দ্বিতীয় পরিচয় পল্টনের ফুটপাতের পুরনো বইয়ের দোকানে। তৃতীয় পরিচয় সুনীল সাহিত্য পুরস্কারে। কবির সাথে শেষ দেখা মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া গ্রামে। কবির কাছে গিয়েছি, পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছি। কবি মাথায় হাত রেখে আশির্বাদ করেছেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনেছি। কবিকে দেখার জন্য দূরদূরান্ত থেকে কবি-অকবিরা ছুটে এসেছেন। নির্জনে বা একান্তে কথা বলার সুযোগ কারোই হয়নি।
তবে সৌভাগ্য আরেক আবৃত্তি শিল্পী মেহেদী হাসানের। গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার ছেলে। চাকরি করতো পুলিশের বিশেষ শাখায়। পুলিশ হলেও রসবোধ চমৎকার। সংস্কৃতির চর্চা করেন। তার দায়িত্ব ছিল কবিকে বেনাপোল থেকে নিয়ে আসার। সাথে ছিলেন মাদারীপুর শিল্পকলা একাডেমীর নাট্যপ্রশিক্ষক আ জ ম কামাল ও উদ্ভাস আবৃত্তি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কুমার লাভলু। মেহেদী হাসানরা কবিকে একা পেয়ে ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার গোড়ার কথা জানতে চেয়েছিলেন। কবি অকপটে সব বলেছেন। মেহেদী হাসান আবৃত্তি করছেন আর কবি ব্যাখা করছেন। কবি বলেছিলেন, তাঁর বয়স যখন তেত্রিশ পেরিয়ে গেছে তখন এমন অনুভূতি তাকে তাড়িত করেছে। তাই তিনি লিখলেন ‘কেউ কথা রাখেনি।’ কবিতার কিছু অংশে কল্পনার সংমিশ্রন থাকলেও পুরো কবিতাটিই বাস্তবতার আলোকে লেখা। কবিতায় বোষ্টুমীর প্রসঙ্গ কাল্পনিক হলেও অবাস্তব নয়। কবি ১৯৩৪ সালে ৭ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার আমগ্রামের নানা বাড়িতে। তখন পৈতৃক নিবাস কালকিনির মাইজপাড়ায়। সম্ভবত ১০-১১ বছর বয়সে অর্থাৎ দেশভাগের আগেই পরিবারের সাথে চলে যান কলকাতা। সেখানেই কেটেছে তার পুরোটা জীবন। দেশভাগ তাকে আহত করেছে বারবার। যা তার বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। তবু তিনি ভুলতে পারেননি শৈশবের স্মৃতি। দেশভাগ করে কথা রাখেননি নেতারা। কিন্তু কবি বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ‘পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায়’ থেকেছেন। সে সময় মনে হয়েছে তার মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী তাকে বলেছিল,‘বড় হও দাদাঠাকুর তোমাকে আমি/ তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাব’। কবির আর সে বিল দেখা হয়নি।
তিন প্রহরের বিলে সাপ আর ভ্রমরের প্রসঙ্গ এলে কবি মুচকি হাসলেন। তিনি বললেন, তখন আমি ছোট ছিলাম। মামারা যখন নৌকা নিয়ে বিলে যেত। তখন আমিও বায়না ধরতাম। কিন্তু মামারা নিতেন না। ছোট্ট সুনীলকে ভয় দেখানোর জন্য বলতেন, সে বিলে যেতে- আসতে তিন প্রহর লেগে যায়। তুমি অতো দূরে কি করে যাবে। আর সেখানে ভয়ঙ্কর সাপ রয়েছে। সেই বোধ থেকেই বিলের নাম দেই তিন প্রহরের বিল। আর সাপ আর ভ্রমরের খেলাটা বাচ্চাদের ভয় দেখানোর জন্য বলা। এসময় আ জ ম কামাল অভিযোগ করে বললেন, কবি কবিতায় আপনি মুসলমানদের ছোট করেছেন। একটি মাত্র চরিত্র তাও আবার মাঝি। কবি তখনও হাসলেন। বললেন, আরে কামাল শোন, তখন মুসলমানরা এখনকার মতো এতো সচেতন ছিলেন না। আমি তাদের ছোট করিনি বরং তাদের পশ্চাৎপদতাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তখনও মুসলমানরা শিক্ষাদীক্ষায় অনেক পিছিয়ে ছিল। মামাবাড়ির আশপাশের মুসলমানরা হিন্দু জমিদারদের বাড়ির কামলা খাটত বা নৌকা বেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতো।
কবিরা আর্থিকভাবে অতটা স্বচ্ছল ছিলেন না। মার্বেল খেলার জন্য একটা রয়্যালগুলিও তিনি কিনতে পারেননি। তখন মাইজপাড়ার লস্কররা খুবই বিত্তবান ছিলেন। লস্কর বাড়ির ছেলেদের লাঠি লজেন্স খেতে দেখে কবি বাবার কাছে বায়না ধরতেন। বাবা বলতেন, পরে কিনে দেব। কবি অপেক্ষায় থেকেছেন। বাবা স্কুল মাস্টার। বেতন কম। তাই তার মা কবিকে বলতেন, জীবনে অন্য কিছু করবে তবু মাস্টারি করবে না। তাই কবি কখনো মাস্টারি করতে যাননি। রাস উৎসবের যে অনুসঙ্গ এসেছে এব্যাপারে কবির বক্তব্য হচ্ছে- কবি ছেলেবেলায় খুব ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন। তাদের গাঙ্গুলি বাড়িতে যখন রাস উৎসব হতো তখন ভেতর বাড়িতে মহিলারা নাচ-গান করতেন। কবি তার ব্যাঘাত ঘটাবেন বলে তাকে সেখানে ডুকতে দেওয়া হতোনা। নিচেকে অসহায় কল্পনা করে কবি এমন অভিব্যক্তি করেছেন। কবি তখন ভাবতেন, একদিন আমিও সব পাব। রয়্যাল গুলি, লাঠি লজেন্স আর রাস উৎসব সবই তিনি পেয়েছেন। কিন্তু তার বাবা এসব কিছুই দেখে যেতে পারেননি। আজ সুনীলের সব আছে কিন্তু তার স্কুলমাস্টার বাবা নেই। এই শূন্যতা তাকে বারবার গ্রাস করেছে।
তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে- কবিকে যখন বরুণার প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলো; কবি তখন মুচকি হেসে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেলেন। হয়তো তখন কবির সঙ্গে তার স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন বলে। কবি শুধু এইটুকু বললেন, এটা কল্পনা। বরুণা বলে কেউ ছিলনা। তবে পরে আমরা জেনেছি, কবির এক বন্ধুর বোনের প্রতি কবির দূর্বলতা বা ভালোবাসা জন্মেছিল। কবি তার কোন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সে সময়ে একমাত্র বন্ধুর সুবাদে কেবল বন্ধুর বোনের সাথেই কথা বলার বা ভাববিনিময়ের সুযোগ ছিল। হবে হয়ত বরুণা তার কল্পনার নারী। কিন্তু বরুণা বেঁচে আছে সব প্রেমিকের অন্তরে।
কবি কুমার লাভলুকে একটা প্রশ্ন করেছিলেন, লাভলু তুইতো বিয়ে করলি না। চিরকুমার থেকে গেলি। আচ্ছা, তুই কি নাস্তিক হতে পেরেছিস? কুমার লাভলু বলেছিল, ভয় পাই। পূর্ব পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করি কিভাবে? কবি বললেন, জানিস লাভলু ‘আস্তিক হওয়া খুব সহজ; কিন্তু নাস্তিক হওয়া বড়ই কঠিন।’ কথাটায় হাস্যরসাত্মক পরিবেশটা হঠাৎ গুরুগম্ভীর হয়ে উঠলো। গাড়ি বেনাপোল থেকে চলে এল মাদারীপুর। ৭৫ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করতে কবি এলেন তার জন্মভিটায়। এটা কবির জন্য যতটা আনন্দের; মাদারীপুরবাসীর জন্য ততটা গর্বের। তিন দিন অবস্থান করে কবি আবার চলে গেলেন তার গড়িহাটির পারিজাতে। রেখে গেলেন স্মৃতি। অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশভাগের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে সৌহার্দের মিলনরেখা। কিন্তু সব ছেড়েই তাকে চলে যেতে হলো ২২ অক্টোবর। পড়ে রইল পারিজাত। পড়ে রইল জন্মভিটার সুনীল আকাশ। কেউ কথা না রাখলেও আমরা আগলে রেখেছি তার সুনীল আকাশ সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র এবং সুনীল সাহিত্য পুরস্কার। কবি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন তার কর্মে। কবি বেঁচে থাকবেন আমাদের মর্মে। আমাদের চিন্তা-চেতনায়, আমাদের উপলব্ধিতে। তিনি বেঁচে থাকবেন চিরদিন চিরকাল।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
সুনীল সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।

নেই

দুলাল সরকার
(সদ্যপ্রয়াত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণে)

গৃহপালিত সকল শব্দের মধ্যে
‘নেই’ শব্দটি বড় বেশি কাছের
ও একি সাথে দূরের যেন দিগন্তের ওপাড়ে
এক বাস্তুভিটার ’পর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা
এক পথের চুপচাপ, স্তব্ধতার হাসি;

‘নেই’ মানে শূন্যের আভাসÑ দৃশ্যান্তরে
বিমূর্ত সত্তার কারুকার্যখচিত পাথরÑ
পাথরে চুম্বন সদৃশ্য কিছু তন্ময় বেদনা,
কিছু অনুভূতি, ধূ ধূ রাত, তেপান্তর নামের বিরহ।
স্বাতীর কপাল লগ্ন চুলের বিদ্রোহÑ
কেউ ছিল, এইমাত্র উঠে যাওয়া
ঘামের গন্ধ নিয়ে ভাঙা বাতাস, অশ্লীল উত্তাপ;
চোরাগুপ্ত হামলার শিকার
অথবা কতটা সত্যÑ ‘নেই’ মানে
বিশ্রী সহ্যের শেষে গুমোট আঁধারে বসে পীড়িত জোছনা;

‘নেই’ মানে গন্ধহীন গোলাপের ভাজ
বিষণœ ত্বকের নিচে বাস্তুহারা ‘নেই’ এর সংবাদ
হারানো চাবির গোছাÑ
অনুমোদনহীন আত্মসমর্পণের দৃশ্য মঞ্চের উপর।
২৪.১০.২০১২

মঙ্গলবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১২

কথা না রাখার দু:খ নিয়ে প্রস্থান সুনীলের

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সকালে ঘুম ভাঙে সাংবাদিক বন্ধু রফিকুল ইসলামের ফোন পেয়ে। কিছুক্ষণ পর কবি দুলাল সরকারের ফোন। তারপর নাট্যব্যক্তিত্ব আ জ ম কামাল। কবি আকন মোশাররফ হোসেনও ফোন দিলেন। সবার একই কথা- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর নেই। অনেকটা বিদ্যুতাড়িত হওয়ার মত। ঝিম মেরে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম তাঁকে। তাঁর জন্মস্থানে শেষবারের মত যখন এলেন। অনেক হাসি-আনন্দের স্মৃতি রয়েছে প্রত্যেকের অন্তরে। বন্ধনের সুতোয় যেন টান পড়েছে। কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয়-তাই ছুটে গেলাম তার জন্মভিটায়। একটু স্বান্তনা, একটু শেষ শ্রদ্ধা জানাবার তাগিদে।
‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি’- এভাবেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন দুই বাংলার বিখ্যাত কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমরা তার কথা রাখার চেষ্টা করেছি। কতটুকু পেরেছি জানি না। ‘আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’- এভাবে অঅর নিখিলেশকে ডাকবেন না তিনি। তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
২২ অক্টোবর রাত ২টায় কলকাতার নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুর খবর চলে আসে তাঁর জন্মস্থান মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত পুরো উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ। ভোর থেকেই তাঁর জন্মস্থানে ছুটে আসেন স্থানীয় কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিককর্মী ও সাংবাদিকসহ তাঁর ভক্ত অনুরাগিরা। সবাই শোকাহত। শোকে স্তব্ধ তার সুনীল আকাশ (সুনীল সাহিত্য চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র)। তাঁর হাতে লাগানো নারিকেল গাছের চিড়ল পাতা বেয়ে ভোরের শিশির হয়ে ঝরে পড়ছে কবি হারানোর শোক। গাঁয়ের আকা-বাঁকা মেঠো পথে শোকাহত মানুষের দীর্ঘ সারি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার কাজী বাকাই ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দেশবিভাগের আগেই ১০-১১ বছর বয়সে কষ্ট আর অভিমান নিয়ে পরিবারের সাথে চলে যান ভারতের কলকাতায়। অনেক বছর পর প্রথম এসেছিলেন ২০০৩ সালে। চারিদিকে তখন অনেক খ্যাতি। তবু তিনি ভোলেননি তাঁর জন্মস্থানের মাটি। তখন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের একাডেমিক ভবনের শুভ উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নোংরা রাজনীতির শিকার হন তিনি। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করেই অনেক কষ্ট নিয়ে চলে যান কলকাতায়।
এরপর সর্বশেষ ৭৫তম জন্মদিনে ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর এসেছিলেন নিজ গ্রামে। তাঁর জন্মবার্ষিকী ও আগমন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপি সুনীল মেলা বসেছিল। চারিদিকে অফুরন্ত উচ্ছ্বাস। নাচ, গান, আবৃত্তি ও নাটক দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর সফর সঙ্গী হয়েছিলেন স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, কবি বেলাল চৌধুরী ও আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনসহ বাংলাদেশ ও কলকাতার অনেক গুণীজন।
তিন দিন অবস্থান করেছিলেন কালকিনির মাইজপাড়ায়। ঘুরে ঘুরে দেখেছেন আর বাল্যকালের স্মৃতি হাতড়ে বেরিয়েছেন। যাবার সময় বলে গিয়েছিলেন-‘কালকিনির মানুষের ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি শুধু ওপার বাংলার কবি নই। আমি বাংলা ভাষার কবি।’
আজ তাঁর প্রস্থানে ছুটে গিয়েছিলাম মাইজপাড়ায়। অযতœ অবহেলায় জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে সুনীল আকাশ গবেষণা কেন্দ্র। লতায় জড়িয়ে আছে কবির রোপন করা নারিকেল গাছ। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠল। তবে কি তার স্মৃতিবিজড়িত এসব কালের গর্ভে একদিন বিলীন হয়ে যাবে? আমাদের কি কিছুই করার নেই। তিনি হয়তো আর আসবেন না। তার পদস্পর্শ আর স্মৃতিময় তিনটি দিনকে কি আমরা স্মৃতির ফ্রেমে আটকে রাখতে পারবো না? এমন আকুতি আর সংশয় আজ সবার মনে।
কবির বাল্যবন্ধু আব্দুর রাজ্জাক কাজী বললেন, সুনীল ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির ছিল। আজ সে চঞ্চলতা চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। বাবারা তোমরা ওর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য একটু ব্যবস্থা করো। আমরা চাই সুনীল মেলা প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হোক। তার স্মৃতি অম্লান থাকুক। তিনি জানালেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় জন্মস্থানে এসে গ্রামসহোদর কানাডা প্রবাসী লেখক রাজ্জাক হাওলাদারের বাড়িতে ছিলেন। তারা তাঁর পছন্দের খাবারের ব্যবস্থা করতেন। কবি খাল-বিলের মাছ খুব পছন্দ করতেন। কৈ, শিং ও মাগুর মাছ ছিল তাঁর প্রিয়।
আমাদের পেয়ে এলাকাবাসী একটি দাবি জানায়। আমরাও তার সাথে ঐকমত্য পোষণ করি। সে দাবিটি হলো- তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বালিগ্রাম ইউনিয়নের পাথুরিয়া পাড় থেকে মাইজপাড়া পর্যন্ত সড়কটি ‘সুনীল সড়ক’ নামে নামকরণ করা হোক। তিনি বেঁচে থাকুক আমাদের মাঝে। সুস্থ্য থাকলে এবারের সুনীল মেলায় তাঁর আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন। তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে সুনীল আকাশ গবেষণা কেন্দ্রের সংস্কার প্রয়োজন। সুনীল মেলা যাতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মেলা থেকে যেন আমরা কিনতে পারি কবির প্রিয় রয়্যাল গুলি, লাঠি-লজেন্স। তাহলে হয়তো আমরা তাঁর কথা রাখতে পারবো। যে কথা বরুণা রাখতে পারেনি। আমরা তা রাখার চেষ্টা করবো। দুরন্ত ষাড়ের চোখে বাঁধবো লাল কাপড়। খুঁজে এনে দেব একশ’ আটটা নীল পদ্ম। জয়তু সুনীল দা। আশির্বাদ করো- আমরা যাতে তোমার কথা রাখতে পারি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১২

অসমাপ্ত কথা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

১.
যার সাথে তোমার আজন্ম শত্র“তা
তার সাথে তোমার চির বসবাস,
যাকে দেখলে তুমি আঁৎকে ওঠ
পুলকিত করবে তার পরশ।

২.
ছাই ভেবে যেই ছুঁতে গেলাম
হয়ে গেল সোনা,
ভালোবাসি তোমায় শুধু
আর কিছু বলবো না।

৩.
চিটচিটে বালিশ
খিটখিটে মেজাজ
ছেঁড়া কাঁথা-কম্বল,
ফুটো মশারী
বিরহী সুখ
এসবই আজ সম্বল।

কালকিনি, মাদারীপুর
২২.১০.২০১২

মঙ্গলবার, ৯ অক্টোবর, ২০১২

অবহেলিত আজ মানুষ গড়ার কারিগর

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
বাদশাহ আলমগীর তাঁর ছেলেকে বিদ্যা অর্জনের জন্য দিল্লীর এক শিক্ষকের কাছে দিয়েছিলেন। একদিন সকাল বেলা তিনি ছেলেকে দেখতে শিক্ষকের বাড়ি গেলেন। গিয়ে দেখলেন তাঁর ছেলে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর শিক্ষক নিজ হাতে পা ধুয়ে নিচ্ছেন। এটা দেখে তিনি কিছু না বলে চলে এলেন। পরে শিক্ষককে ডাকলেন। বললেন, আপনি কাজটি ঠিক করেন নি। এ কথায় শিক্ষক ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, বাদশাহর ছেলেকে দিয়ে কাজ করিয়েছি। নিশ্চয়ই মহা অন্যায় হয়ে গেছে। তিনি তার অপরাধ জানতে চাইলেন। বাদশাহ আলমগীর তখন বললেন, আপনি আমার ছেলেকে আদব-কায়দা কিছুই শেখান নি। আমার ছেলে শুধু আপনার পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছিল। তার তো উচিৎ ছিল নিজ হাতে আপনার পা ধুইয়ে দেওয়া।
এতো অনেক আগের কথা। গল্পের মতো মনে হয়। আমরা কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতায় এ ঘটনা জেনেছি। ইতিহাসও সাক্ষী। এখন বাদশাহ আলমগীরের যুগ নেই। তাই বলে কি শিক্ষকদের মর্যাদাও নেই। ইতিহাস আজ ভিন্নভাবে লিখতে হয়। সে ইতিহাস শিক্ষকদের অবহেলার ইতিহাস। লাঞ্ছনা আর নির্যাতনের ইতিহাস। আমরা অতীত ভুলে যাচ্ছি। সরকার বাহাদুরই শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে জানেন না। তার পোষা সন্তানেরা কীভাবে শিক্ষকের মর্যাদা দিবে। তা নাহলে গত চার অক্টোবর সরকার বাহাদুরের পোষা পেটোয়া পুলিশ সন্তানেরা কীভাবে শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে। এ কথা লিখতে গিয়ে যেখানে আমাদের হাত কেঁপে উঠছে। সেখানে তাদের বুক এতটুকুও কাঁপলো না।
নিয়তির নির্মম পরিহাস! যে পুলিশের হাতে আজ শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছে, তারা কোন না কোন শিক্ষকের ছাত্র ছিল। তাদের মানুষ করার দায়িত্ব ঐ শিক্ষকরাই নিয়েছিল। আজ প্রাক্তন ছাত্রদের ছোড়া কাদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও লাঠিপেটার যন্ত্রণা নিয়ে পরদিন চোখের জলে পালন করতে হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকরা দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তাঁরা হয়ত তাঁদের বেয়াদব ছাত্রদের বরাবরই ক্ষমা করে দেন। কিন্তু বিবেকবান মানুষ এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের যথাযোগ্য শাস্তি কামনা করেন। বাকিটা নির্ভর করে সরকার বাহাদুরের ওপর। কারণ এ ব্যর্থতা তার এবং এমন আচরণের দায়ভারও তার। জাতির এমন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের যেন আর পুণরাবৃত্তি না ঘটে- এ প্রত্যাশা সকলের। 
‘যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত’-কথাটাকে আজ উল্টে বলার সময় চলে এসেছে। তাই অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয়-‘যে জাতি যত বেশি শিক্ষকদের পেটায় সে জাতি তত বর্বর।’ এটাই আজ নির্মম বাস্তব সত্য। এটা অস্বীকার করার কোন পথ বা উপায় নেই।
সরকার বাহাদুর আইন করে শিক্ষকদের হাত থেকে বেত বা লাঠি কেড়ে নিয়েছেন। সে লাঠি আজ তাদের পিঠেই। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়-‘বাহ! কী চমৎকার দেখা গেল।’ শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীকে পেটানো বা কোন রকম সাজা দেওয়া আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। শিক্ষকরা তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু রাজপথে পুলিশ দ্বারা শিক্ষক পেটানো কি অপরাধ নয়? এমন অপরাধও কি মুখ বুজে সহ্য করতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বাইরে প্রাইভেট পড়ানো কিংবা কোচিং করানো সরকার বাহাদুর অবৈধ ঘোষণা করেছেন। শিক্ষকরা তাও মেনে নিয়েছেন। তাহলে শিক্ষকদের দাবি সরকার বাহাদুর কেন মেনে নেবেন না। মেনে নিলে তো আজ এ রকম লজ্জাজনক ইতিহাস লিখতে হতো না।
শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। একজন শিক্ষার্থীর মানুষের মতো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার পেছনে বাবা-মার চেয়ে শিক্ষকের অবদানই বেশি। এ কথা আমরা স্বীকার করি কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে তা মানতে চাই না। ভুলে গেলে চলবে না- শিক্ষকেরা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ পুলিশি নির্যাতনের পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসে শিক্ষকরা তাদের আন্দোলন স্থগিত করে দিলেন। তারা ইচ্ছা করলে অনির্দিষ্টকালের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে পারতেন। শুধু শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার টানে বুকে-পিঠে ক্ষত নিয়েও পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কী মেনে নেবেন তাদের দাবিগুলো? গত রোববার বা সোমবার শিক্ষকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বসার কথা ছিল। কিন্তু বসা হয় নি। কেন বসা হয় নি, সে কারণ হয়ত অজ্ঞাত। তবে কেন এই মিথ্যা আশ্বাস? নাকি জাতির প্রধান চালিকাশক্তির চাঁকা স্তব্ধ করে দেবার প্রয়াস। তাঁর আশ্বাসের ফলাফল কী হবে? এটাই এখন দেখার বিষয়।
আমাদের শিক্ষকরা এতো অবহেলিত কেন? যুগ যুগ ধরে তাদের দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে কেন? জাতির মেরুদন্ডকে সচল রাখতে নিরলস পরিশ্রম করেও যথাযোগ্য পারিশ্রমিক হতে তারা বঞ্চিত কেন? যদিও শিক্ষকতাকে অপরাপর পেশার মানদন্ডে পরিমাপ করা যায় না বলে অনাদিকাল থেকে এটি মহান পেশা হিসাবে সমাজ-সংসারে পরিগণিত। তারপরও সেই ‘তালসোনা পুরের তালেব মাস্টারের অবস্থার’ আর পরিবর্তণ হয় না। শিক্ষকদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটে না। যুগের সাথে, দ্রব্য মূল্যের উর্দ্ধগতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হয়।
সামাজিক দায়িত্ব ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকতা গুরুত্বপূর্ণ পেশা হলেও জাতীয়ভাবে শিক্ষকদের তেমন সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয় না। যুগের পর যুগ বহতা নদীর মতো বয়ে গেলেও শিক্ষকদের নির্মম ভাগ্যের কোন পরিবর্তণ আজও ঘটে নি। শিক্ষকদের প্রতি কেন এই উদাসীনতা? অথচ তাঁরা প্রদীপের মতো অন্যকে আলোকিত করে নিজেরা জ্বলে জ্বলে নিঃশেষিত হন। একথা এজন্য বলতে হয়- যখন বিশ্ব শিক্ষকসমাজ যুগোপযোগী ও উন্নত শিক্ষার কথা ভাবছেন, তখন আমাদের দেশের শিক্ষকসমাজ অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলন করছেন। কারণ গোটা শিক্ষাব্যবস্থার নব্বই ভাগ নিয়ন্ত্রণকারী বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থান অনেকটাই অবহেলিত। ফলে ইউনেসকো-আইএলও সনদের ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকের দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ এবং অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিভিন্ন সময়ে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হলেও আমাদের স্বাধীনতার চল্লিশ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও কোন শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন তো দূরের কথা গ্রহণযোগ্যতাও পায়নি। একটি স্বাধীন জাতির জন্য এ অবস্থা যেমন দুর্ভাগ্যজনক, তেমনই লজ্জার। বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ প্রণয়ন করলেও এর বাস্তবায়ন সে অর্থে শুরু হয় নি। শিক্ষানীতিতে অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য অবসানের কোন দিকনির্দেশনা নেই।ূ
বর্তমান সরকার যদি শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল, বেসরকারি শিক্ষদের বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, পদোন্নতির সুযোগ, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর জীবনে পেনশনের ব্যবস্থা ও পরিপূর্ণ উৎসব ভাতার মতো শিক্ষানীতির কল্যাণমূলক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে তা হবে জাতির জন্য মঙ্গলজনক। শিক্ষকদের জন্য আশাব্যঞ্জক। পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা না করে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তবেই শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা ফিরে পাবেন। সুতরাং আর কোন বঞ্চনা নয়, আর কোন হতাশা নয়। সরকারি-বেসরকারি বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক- এ প্রত্যাশা গোটা শিক্ষকসমাজের।
 
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

বুধবার, ৩ অক্টোবর, ২০১২

আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম, আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’- বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গানের এ কথাগুলো আজ মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। হাজার রছরের পুরনো আইয়ামে জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগকেও হার মানিয়েছে রামুর সহিংসতা। রামুর ঘটনার জন্য আমরা কাকে দায়ি করবো? নিশ্চয়ই উগ্রতা আর ধর্মান্ধতাকে। আর ব্যর্থতা প্রশাসনের। দায়ভার অবশ্যই সরকারের। এক বৌদ্ধ যুবকের ফেসবুকের কারণে নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ সংঘটিত হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্কজনক অধ্যায়। তবে অবাক হতে হয় যখন রাজনৈতিকভাবে এ ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। যা অনভিপ্রেত। রামুর সহিংসতা নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দল এখন দাবা খেলায় মেতে উঠেছে। দাবার গুটি বানানো হচ্ছে নির্যাতিত সংখ্যালঘু বৌদ্ধ সম্প্রদায়কে।
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ ধর্মীয় সম্প্রীতি আমাদের উজ্জ্বল ঐতিহ্যের অংশ। পৌষ-পার্বণে কিংবা ঈদ উৎসবে বুকে বুক মিলানোর ইতিহাস আমাদের পুরনো। অথচ অতি উৎসাহি কিছু ধর্মান্ধ মানুষের জন্য সে সম্প্রীতি ভেঙ্গে চুড়মাড় হয়ে গেল। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত আটটার দিকে কক্সবাজারের রামু উপজেলার মেরুংলোয়া বড়–য়া পাড়ার উত্তম কুমার বড়–য়ার ফেসবুকে কে বা কারা পবিত্র কুরআন শরিফ অবমাননার একটি ছবি যুক্ত (ট্যাগ) করে। ছবিটি অন্যান্যরাও শেয়ার করে। ফলে রাত দশটার দিকে কয়েক হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে রামুর চৌমুহনী চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।
শুধু প্রতিবাদেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। সমাবেশ শেষে সংঘবদ্ধ লোকজন সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের শত বছরের পুরনো ১২টি বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করে। পুড়িয়ে দেয় চল্লিশটির মতো বসতবাড়ি এবং ভাঙচুর করেছে শতাধিক ঘরবাড়ি। একই কারণে ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পটিয়ায় দু’টি বৌদ্ধবিহার ও একটি হিন্দু মন্দিরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে।
হযরত মুহম্মদ(স:) কে নিয়ে নির্মিত ব্যঙ্গ চলচ্চিত্র ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’ ও ফ্রান্সের পত্রিকায় প্রকাশিত ব্যঙ্গ কার্টুনের কারণে এমনিতেই মুসলিম বিশ্ব ছিল উত্তপ্ত। ফলে জ্বলন্ত আগুনে তেল ঢেলে দেওয়ার মতোই রামুর এ ঘটনা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভাঙন ধরাতেই এমন কর্মকান্ড করা হয়েছে বলে বিজ্ঞজনের ধারণা। তবে এ ক্ষেত্রে মুসলমানদের আরো ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিৎ ছিল কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ কোন এক যুবকের অপরাধের জন্য শতাধিক মানুষের জান ও মালের ক্ষতি সাধন করার ব্যাপারে ইসলামি শরীয়াও হয়ত সমর্থন করবে না। যেহেতু বিষয়টি জানার সাথে সাথে যুবক তার ফেসবুক একাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। তাছাড়া সে নিজেতো আর ছবি পোস্ট করেনি। কে বা কারা ট্যাগ (যুক্ত) করেছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে এটা বড় ধরনের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। যা তৃতীয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত হওয়াটা অমূলক নয়। ঐ যুবক যদি স্বেচ্ছায় করে থাকে তবে তার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেত। এতবড় সহিংস ঘটনার পিছনে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল এটা নিশ্চিত। কারণ একটি অপরাধ হাজারো অপরাধের জন্ম দেয়। কোরআন অবমাননার বিষয়টি মোটেই ছোট কোন অপরাধ নয়। কিন্তু যে ঘটনা ঘটলো তাকেও ছোট করে দেখার উপায় নেই। তাই আমরা বাধ্য হয়েই দু’টি ঘটনাকে অনাকাঙ্খিত ঘটনা বলছি। তবে এভাবে অনাকাঙ্খিত ঘটনার পুণরাবৃত্তি ঘটলে সংঘাতময় পরিস্থিতি কোনভাবেই প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ফলে বিশ্বজুড়ে অশান্তির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। কিন্তু আমরা শান্তির পক্ষে-আমরা সম্প্রীতির পক্ষে।
অনাকাঙ্খিত ঘটনা পরিদর্শণে গেলেন সরকারের দুই মন্ত্রী। তাদের বক্তব্যে উচ্চারিত হয় ভিন্ন সুর। সেখানে না আছে শান্তির বাণী না আছে সম্প্রীতির জয়গান। প্রথমেই তাদের দৃষ্টি মৌলবাদী ও বিরোধীদলের ওপর। বিরোধী দলও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তারাও অভিযোগ আনেন ক্ষমতাসীন দলের ওপর। ফলে ঘটনা মোড় নিতে থাকে ভিন্ন খাতে। যেটা সাধারণ নিরীহ মানুষের কাছে কাম্য নয়। দায়িত্বশীল দু’টি দল বা ব্যক্তির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। সহিংসতা দীর্ঘজীবি হোক- এটা কারোই কাম্য নয়। এতে হয়ত প্রকৃত দোষিরা ছাড়া পেয়ে যাবে। আর দুর্ভোগ পোহাবে নিরীহ শান্তিপ্রিয় কিছু মানুষ। গ্রামীণ প্রবাদের মতো-‘পাটা-পুতায় ঘঁষাঘঁষি মরিচের শ্যাষ’ হওয়ার মতো অবস্থা ছাড়া আর কি হতে পারে। তবে ধর্মপ্রাণ মানুষের দাবি- এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার হোক। যাতে এমন কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুণরাবৃত্তি না ঘটে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর ঘটনাস্থল পরিদর্শণ শেষে এক সমাবেশে বলেছেন,‘সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মন্দিরে হামলা করেছে।’ কিন্তু জামায়াতের সেক্রেটারি জি এম রহি মোল্লা বলেছেন,‘ফেসবুকে ছবি প্রকাশ হওয়ার পর রামুতে যেসব মিছিল-মিটিং হয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন আওয়ামীলীগের নেতারাই।’ বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বঙ্কিম বড়–য়া দাবি করেন,‘ পুলিশ শুরু থেকে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। রাত তিনটার পর সেনাবাহিনী ও বিজিবির সদস্যরা মাঠে না নামলে অবশিষ্ট মন্দিরগুলোও রক্ষা করা সম্ভব হতো না।’ রামু উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার বলেন,‘ জামাত-শিবির মৌলবাদী চক্র এঘটনার সাথে যুক্ত থাকতে পারেন’। তাই যদি হবে তবে আপনি ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কী ভূমিকা রেখেছিলেন। এ প্রশ্ন এখন সকলের মনে।
তাছাড়া পুলিশ যদি সময়মতো জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারে এমনকি চেষ্টাও যদি না করে তাহলে সরকারের এত টাকা ব্যয় করে পুলিশ পোষার দরকার কী? আর যারা এখন পরস্পর বিরোধী কথা বলেন; ঘটনা ঘটার আগে তারা কি কোন আলামত পাননি। তাহলে আপনারা বসে বসে কি করছিলেন? তামাশা দেখছিলেন। চোখের সামনে কীভাবে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতিগত সভ্যতা।
আসলে আমরা কেউ নির্দোষ নই। ‘উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে’ চাপাতেই আমরা ওস্তাদ। ধ্বংসলীলা দেখে আমরা মর্মাহত হইনা। আমাদের মানবতা আজ পাথরের নিচে চাপা পড়ে গেছে। ধর্মান্ধতা আর গোড়ামী আমাদের মনুষ্যত্বকে গলা টিপে হত্যা করেছে। এর কি কোন প্রতিকার নেই। সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত দোষিদের বিচারের আওতায় আনা কি সম্ভব নয়। ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নোংড়া খেলা কি কখনোই শেষ হবার নয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আসুন আমরা অসহায় নির্যাতিত মানুষের পাশে দাড়াই। খোলা আকাশের নিচে যে শতাধিক মানুষ অন্নহীন-বস্ত্রহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে-তাদের মাথার ওপরে একটু ছায়ার ব্যবস্থা করে দেই। আমার কী তাও পারবো না? আসলে মানুষ না ধর্ম; আমরা কোন দিকে যাবো? সবশেষে বাউল শাহ আব্দুল করিমের সুরে বলতে হয়-‘করি যে ভাবনা, সেদিন আর পাব না। ছিল বাসনা সুখি হইতাম। দিন হতে দিন, আসে যে কঠিন। করিম দীনহীন কোনপথে যাইতাম। আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম। আমরা আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

লাবণ্যময়ী অন্ধকার

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

অন্ধকারের কী এমন বিশেষত্ব আছে?
আমি জানিনা। তবে এইটুকু জানি,
রোজ অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে পাইÑ
ফেলে আসা স্মৃতির টুকরো,
উঁইপোকায় খাওয়া সুখের বান্ডেল,
ইঁদুরে কাটা প্রেমের চাঁদর,
বানের জলে ভেসে যাওয়া আশা।
কভূ মনে হয়, অন্ধকার আছে বলে
তবুও তো কিছু পাওয়া যায়। তাই
অন্ধকারের লাবণ্যে আমি নিখোঁজ হইÑ
কারণ অন্ধকার আমাকে ঝাপটে ধরে
হারানো প্রেয়সি- øেহময়ী জননী-
অভিমানী বোন আর লাজুক খুকীর মতো।

মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২

আবুলের বাগানে গোলাপের সৌরভ

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বারবার হোচট খাওয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী এলাকা মাদারীপুর-৩ আসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারি আব্দুস সোবহান গোলাপ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠেছেন। হঠাৎ করে ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’র মতো নিজ এলাকায় গণসংযোগ, শুভেচ্ছা বিনিময়সহ বিভিন্ন কর্মকান্ড শুরু করেছেন। দল ক্ষমতায় আসার তিন বছর পরে হঠাৎ করে গোলাপের এমন কর্মকান্ডে স্থানীয় আওয়ামীলীগ পড়েছে মহা বিপাকে। গোলাপ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের দোহাই দিয়ে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। ফলে স্থানীয় আওয়ামীলীগ এখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যা আগামী নির্বাচনে কাল হতে পারে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সুত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি, মাদারীপুর-৩ (কালকিনি-সদর) নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামীলীগের বর্তমান সাংসদ ও সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের ২৪ বছরের দূর্গ ভাঙতে আব্দুস সোবহান গোলাপের সাথে স্থানীয় আওয়মীলীগ, বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন সংগঠনের বঞ্চিত নেতারা হাত মিলিয়েছেন। আবুল হোসেনের মন্ত্রিত্ব হারানো, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি ও মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন বলে দাবি আবুল হোসেন পন্থিদের।
স্থানীয় আওয়ামীলীগ এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদল সুবিধাভোগি অন্যদল সুবিধা বঞ্চিত। ফলে আওয়ামীলীগের বঞ্চিত নেতারা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চান, সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনির উন্নয়নের জন্য কিছুই করেন নি। তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবাসীদের মধ্যেও এ তথ্য প্রচার করছেন। কালকিনি ছাড়াও সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা দেখে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগে, সারাদেশের কথা বাদ দিলেও আবুল হোসেন তার নিজ এলাকার জন্যও কিছুই করেন নি। সঙ্গত কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও তার ব্যর্থতার চিত্র ফুটে ওঠে। বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা প্রতিদিন পত্রিকা পড়েন। টেলিভিশনে নিয়মিত খবর দেখেন। তারা এখন চায়ের দোকানে বসে সংবাদ দেখে স্বিদ্ধান্ত নিতে শিখেছেন। আবুল হোসেন না সোবহান গোলাপ। কে হবেন কালকিনির আগামী রাজনীতির কান্ডারী।
পদ্মা সেতুর ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ। সময় মতো প্রতিশ্র“তির বাস্তবায়ন না করা তার ব্যর্থতা। যা শুধু স্থানীয় রাজনীতি নয় জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন সবাই। দুর্নীতির কথা বাদ দিলেও এ ব্যর্থতার দায়ভার কখনোই এড়ানো সম্ভব নয়। যদিও লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৈয়দ আবুল হোসেনকে ‘একজন দেশপ্রেমিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দেশের বৃহৎ স্বার্থেই তিনি পদত্যাগ করেছেন। তবে জনগণ এখনো বুঝে উঠতে পারেনি যে, বিশ্ব ব্যাংক এত অভিযোগ করার পরও কেন প্রধানমন্ত্রী তাকে দেশ প্রেমিক বললেন। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে যাবে? স্থানীয় রাজনীতিইতো এখন হুমকির মুখে।
এদিকে আব্দুস সোবহান গোলাপের অনুসারিরা কালকিনির আওয়ামীলীগের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিরোধী দলের সাথে আওয়ামীলীগের কোন রকম সংঘাত-সংঘর্ষ না থাকলেও নিজ দলের সাথে সংঘর্ষের কারণে তিনটি মামলা হয়েছে। নিজ দলের নেতা-কর্মীরা মার খেয়েছেন, জেল খেটেছেন। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী আবদুস সোবহান গোলাপের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরা। তারা দাবি করেন, গোলাপ একটি সাজানো গোছানো দলের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। যেখানে সৈয়দ আবুল হোসেন চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন; সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হয়ে উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ ছাড়া বঞ্চিতদের নিয়ে কীভাবে ঈদ শুভেচ্ছা জানান।
যে কারণে গত ৩১ জুলাই কালকিনির এনায়েতনগরের খালেকেরহাটে আবদুস সোবাহানের গণসংযোগে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মীরা বাধা দিয়েছেন। স্থানীয় মহিলারা ঝাড়– মিছিল করে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এসময় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। যা কালকিনির রাজনৈতিক ইহিাসে প্রথম। তাই সচেতন মহল মনে করেন, আবুল হোসেনের সাজানো বাগানে এখন গোলাপ ফুল ফুটতে শুরু করেছে। হয়ত আগামীতে সে গোলাপ সৌরভ ছড়াবে। হতে পারে তা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে। এখন অপেক্ষা শুধু সময়ের। ‘কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়’ তা দেখার জন্য উৎসুক হয়ে আছে তৃতীয় পক্ষ।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

শুক্রবার, ২৪ আগস্ট, ২০১২

শিশুতোষ মঞ্চ নাটক: উভয় সঙ্কট

রচনা- সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, 
পরিচালক, প্রথমা রঙ্গমঞ্চ, কালকিনি।
আলাপ- ০১৭২৫৪৩০৭৬৩, ০১৮২৯৭৬৭২৫৮
প্রযোজনা- ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ,কালকিনি এডিপি।
পরিবেশনা- শিশু ফোরাম, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ,কালকিনি এডিপি।
চরিত্র: অভি,রনি,নুসরাত,জাকির,রাজিয়া,পুলিশ,আকাশ ও আফিয়া
প্রথম দৃশ্য:
রাস্তায় অভি ও রনি দাঁড়িয়ে আছে। কারো জন্য অপো। এদিক ওদিক তাকায়। এমন সময় নুসরাতের আগমন।
অভি: দোস্ত, ওই যে তোর পেয়ারের নুসরাত আইতাছে।
রনি: কই, কই?
অভি: আরে ওইযে, দ্যাক্ চাইয়া।
রনি: ইয়েস, তাইতো। কিন্তু মাইয়ারতো অনেক দেমাগ। মা মারা মাইয়া, কেবল কাস নাইনে পড়ে। তাতেই ভাব কত দ্যাকছোস?
অভি: হ্যা, লাইনে আনতে সময় লাগবো। ছোট মানুষতো। তাছাড়া তোর তো আবার রেকর্ড ভালো না। (কাছাকাছি আসলে গতিরোধ করে)
অভি: দাড়াও নুসরাত, রনি তোমারে যা কইছে তার উত্তর দিয়া যাও।
নুসরাত: আমি তার সাথে কথা বলতে রাজি নই। আমিতো আগেই বলেছি আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না। তাহলে বাবার কাছে বলতে বাধ্য হব।
রনি: ডিস্টার্ব, কিসের ডিস্টার্ব। আমি তো তোমাকে ভালোবাসি। এতে বাবার কাছে বলার কি আছে?
নুসরাত: দ্যাখ তোমরা ডিস্টার্ব কর বলে এই অল্প বয়সে বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মেয়ে বলে কি এ সমাজে আমাদের কোন অধিকার নাই।
রনি: আমি তোমাকে বিয়ে করবো।
নুসরাত: অসম্ভব। তোমার মতো একটা বখাটেকে বিয়ে করবো আমি। মরে গেলেও না। তোমার জন্য তায়েবা আত্মহত্যা করেছে। তুমি জেল খেটেছো। জেল থেকে বের হয়ে আমার পিছু নিয়েছ। আর এখনোতো আমার বিয়ের বয়সই হয়নি।
রনি: তোমাকে পেলে আমি ভালো হয়ে যাব।
নুসরাত: যে ভালো হবার সে এমনিতেই হয়। আমার পথ ছাড়ো। বাবা আামার জন্য বসে অছে।
রনি: তুমি আমার সাথে চল। আমি আজ তোমাকে নিয়ে যাব। (হাত ধরে)
নুসরাত: অসম্ভব। ( থাপ্পড় দেয়) (নুসরাতের প্রস্থান)
রনি: (গালে হাত দিয়ে) আমি তোকে দেখে নেব শালি। তোর জীবন আমি তছনছ করে দেব। তোর সংসারে আগুন লাগিয়ে দেব। হু.. কত বড় সাহস, রনির গায়ে হাত তোলে।
অভি: আমি জানতাম, সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না, আঙুল একটু বাকা করতে হবে। চল, একদিন না একদিন এর খেসারাত ওকে দিতে হবে। রাজিয়ার সাথে কথা বলে প্ল্যান করতে হবে। আর সুযোগের অপোয় থাকতে হবে। (প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য:
নুসরাতের চুলের মুঠি ধরে নিয়ে আসে জাকির। ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। নুসরাত উবু হয়ে কাঁদতে থাকে।
জাকির: ইকটু খানি মাইয়া তার আবার বড় বড় কথা। আমার টাকা চাই টাকা। টাকা কই? আনতে পারোস নাই। পারবি কেমনে? বাপের থাকলে তো। বিয়ার সময় তো বড় বড় কতা কইছিলো তোর বাপ।
নুসরাত: আর কত দিব। দিতে দিতে তো বাপজান জমি-জিরাত সব বেইচ্যা দিছে। আর পাইবো কই।
জাকির: টাকা কই পাইবো, তা আমি কি জানি। টাকা দিতে না পারলে সোজা বাপের বাড়ি চইলা যা। ( জাকিরের প্রস্থান)
নুসরাত: হ যামু, এই নরকের মধ্যে আর এক মুহূর্তও থাকমু না। ( নুসরাতের প্রস্থান।)
(রাস্তায় পূর্ব পরিচিত রাজিয়ার সাথে দেখা।)
রাজিয়া: কিরে নুসরাত তোর খবর কি?
নুসরাত: আপা আমার সব শ্যাষ অইয়া গেছে।
রাজিয়া: ক্যান কি অইছে?
নুসরাত: দ্যাহো আপা, বখাটে রনির ভয়ে বাজানে অল্প বয়সে বিয়া দিলো। লেখাপড়া বন্ধ অইলো। এহন আবার যৌতুকের কারণে আমার স্বামী বাড়ি থিকা বাইর কইরা দিলো। আামি এহন কি করুম আপা। আমারতো উভয় সঙ্কট।
রাজিয়া: ও তাই। যাক, তুমি কোন চিন্তা কইরো না। আচ্ছা চাকরি করবা তুমি?
নুসরাত: চাকরি? কেডা দিবো আমারে চাকরি।
রাজিয়া: সেই ব্যবস্থা আমি করুম। শোন, শহরে আমার পরিচিত একজন আছে। একটা এনজিওর জন্য কিছু মেয়ে চাইছিলো। দাড়াও ফোন দিয়া দেখি। (ফোন দেয়)
হ্যালো, দাদা আমি রাজিয়া। হ হ । একটা মেয়ে আছে।  হ হ । পারবো।  না না ।  কোন চিন্তা নাই। হ হ । আমি কাইল নিয়া আসবো। হ হ  । রাখি। ( ফোন রেখে)
হ কাজ হয়ে গেছে। তোমাকে নিয়ে কালকে যেতে বলেছে।
নুসরাত: এহন তাইলে আমি কই যামু। এইভাবে বাজানের কাছে যাইতে পারমু না।
রাজিয়া: আচ্ছা তাইলে চল আমার বাসায়।
নুসরাত: হ, তাইলে তোমার বাসাতেই চলো।
রাজিয়া: হ, খালি এক রাইতের ব্যাপার। সকালে তো তোওে নিয়া শহরেই চইলা যামু। তারপর নতুন জায়গা, নতুন চাকরি, নতুন দুনিয়া। (প্রস্থান)

তৃতীয় দৃশ্য:
নুসরাত ও রাজিয়া শহরে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হয়। এমন সময় পুলিশসহ আকাশ ও আফিয়ার আগমন। পুলিশ দেখে রাজিয়া পালাবার পথ খোঁজে। পুলিশ রাজিয়ার পথ আগলে দাঁড়ায়Ñ
পুলিশ: দাঁড়ান, আপনি রাজিয়া?
রাজিয়া: (এদিক ওদিক তাকিয়ে) ক্যান বলুন তো।
নুসরাত: হ্যা সার, ওনার নাম রাজিয়া। আমারে চাকরি দিব। আমারে নিয়া শহরে যাইব।
পুলিশ: (নুসরাতের উদ্দেশ্যে) ও আপনাকে মিথ্যা বলেছে। (রাজিয়ার উদ্দেশ্যে) রাজিয়া নারী ও শিশু পাচারের অভিযোগে আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।
রাজিয়া: অফিসার আপনি ভুল করছেন।
পুলিশ: না সব প্রমাণ নিয়েই আমরা এসেছি। এর আগে আপনি পাঁচ জন নারী ও শিশুকে পাচার করেছেন। (আকাশকে উদ্দেশ্য করে) আকাশ তোমরা নুসরাতকে নিয়ে বাড়ি গিয়ে ওর বাবাকে নিয়ে থানায় এসো। রাজিয়া আপনি থানায় চলুন। (প্রস্থান)
আকাশ: নুসরাত তুমি অনেক বড় বিপদ থেকে বেঁচে গেছ। রাজিয়া ভালো মেয়ে নয়। ও কাজ দেওয়ার কথা বলে মেয়েদেও নিয়ে বিক্রি কওে দেয়।
আফিয়া: হ্যা নুসরাত, আকাশ ঠিকই বলেছে। তোমার বিপদের কথা আমরা শুনেছি । তুমি চিন্তা করো না। আমারা তোমাকে ওয়ার্ল্ড ভিশনে নিয়ে যাব। আমাদের সাথে তুমিও কাজ করবে।
নুসরাত: ( আফিয়াকে জড়িয়ে ধরে) তোমরা আমাকে বাঁচাও। আমি বাঁচতে চাই। বাঁচার মতো বাঁচতে চাই। অঅমি আমার অধিকার চাই।
আকাশ: সব হবে। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ অবহেলিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
আফিয়া: সে সব পরে হবে। আগে চলো ওর বাবার কাছে যাই। তার কাছে সব ঘটনা খুলে বলে তাকে নিয়ে থানায় যেতে হবে। থানার কাজ শেষ হলে তাকে নিয়ে আমাদের অফিসে যাব।
আকাশ: হ্যা চল, (দর্শকের উদ্দেশ্যে) আপনারা শুনুন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ শিশুদের পরিপূর্ণ জীবন গঠনের জন্য কাজ করে।
আফিয়া: আসুন, শিশু ফোরামে যুক্ত হোন। শিশু অধিকার নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসুন।
সবাই: ‘আর সইব না অত্যাচার, ফিরিয়ে আনবো অধিকার।’
(সবাই ফ্রিজ)