সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৩

সাম্যবাদী চেতনার কবি নজরুল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
বাঙলা সাহিত্যে ধুমকেতুর ন্যায় আগমন যার। বিদ্রোহ-প্রেম-সাম্যবাদের মশাল হাতে যিনি আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নানাবিধ সমস্য-সংকটে যখন সারা বিশ্ব আলোড়িত। কাজী নজরুল ইসলামের(১৮৯৯-১৯৭৬) তখন আবির্ভাব। যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবীতে যখন মানবতা ধুলায় লুন্ঠিত তখন তাঁর কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছে সাম্যবাদের গান। একই কন্ঠে হামদ- নাত এবং শ্যামা সংগীতের সুরের মূর্ছনায় মানব জাতিকে উপহার দিয়েছেন সাম্যবাদের মূলমন্ত্র। মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসায় কবি হয়ে উঠেছেন মানবতাবাদী।

নজরুলের সাম্যবাদের প্রধান ক্ষেত্র মানুষ। কে কুলি-মজুর আর কে সাহেব? সবাই তার দৃষ্টিতে সমান। আশরাফ আর আতরাফের কোন ভেদাভেদ নেই এখানে। সবাই সৃষ্টির সেরা। সবাইকেই তিনি গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। নজরুলের সাম্যবাদ তাঁর অন্তরের প্রেরণালব্ধ বস্তু। কবি কল্পনার রঙে রঙিন। মানবতাবোধই তার সাম্যবাদের ভিত্তি।  তিনি সকল ধর্মের উর্ধে মানবধর্মকেই উচ্চাসনে বসিয়েছেন। মানবের মাঝে তিনি স্রষ্টাকে আবিস্কার করেছেন। তাঁর সাম্যবাদ স্রষ্টাকে অস্বীকার কওে নয়। কাল মার্কসের মত তাঁর সাম্যবাদ নাস্তিক্য সাম্যবাদ নয়। তাঁর সাম্যবাদ আস্তিক্য সাম্যবাদ। অসাম্প্রদায়িক হলেও তিনি পুরোপুরি আস্তিক ছিলেন।

নজরুলের সাম্যবাদ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে। ১৯৫২ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে মোট ১১টি কবিতা স্থান পেয়েছে। যেমন- ‘সাম্যবাদী’, ‘নারী’, ‘মানুষ’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘রাজা-প্রজা’, ‘ঈশ্বর’, ‘পাপ’, কুলি-মজুর’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘সাম্য’ ও ‘কান্ডারী হুশিয়ার’। মূলত  ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের কবিতাগুলোতে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রভাব রয়েছে।
তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের ‘নারী’ কবিতাটি বহুল প্রশংসিত। ‘নারী’ কবিতায় কবি নারী-পুরুষে সাম্যের বাণী উচ্চারণ করেছেন। কবি নারী-পুরুষের ভেদাভেদ অস্বীকার করেছেন। কবির ভাষায়-
“বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
আর ‘বারাঙ্গনা’ কবিতাটি অধিক সমালোচিত। কবিতায় কবি বলেছেনÑ
“কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?
হয়ত তোমায় স্তন্য দিয়াছে সীতা-সম সতী মায়ে।”
তিনি মন্দির-কাবার চেয়ে মানুষের হৃদয়কে বড় জ্ঞান করেছেন। কবি বলেছেনÑ
“এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই।”

‘সাম্য’ কবিতায় কবি বলেছেন-
“হেথা স্রষ্টার ভজন আলয় এই দেহ এই মন,
হেথা মানুষের বেদনায় তার দুঃখের সিংহাসন।
সাড়া দেন তিনি এখানে তাঁহারে যে নামে যে কেহ ডাকে,
যেমন ডাকিয়া সাড়া পায় শিশু যে নামে ডাকে সে মাকে।”

নজরুল মানুষের কবি। সাম্যের কবি। নজরুলের বড় পরিচয় তিনি সাম্যবাদী কবি। নজরুলের সাম্যবাদ সকল মানবের মহামিলন।
‘‘গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’’
কবি মানবতার জয়গান গেয়েছেন। মানুষকে কখনো তিনি ঘৃণার চোখে দেখেন নি। কবি বলেছেনÑ
“বন্ধু, তোমার বুক ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলি।”

মানুষকে তিনি সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। হিন্দু- মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কারো আসল পরিচয় হতে পারে না। আসল পরিচয় হলো- আমরা সবাই মানুষ। ‘কান্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায় বলেছেন-
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’
এছাড়াও তার কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছে-
‘জাতের চাইতে মানুষ সত্য
অধিক সত্য প্রাণের টান
প্রাণ ঘরে সব এক সমান।’

‘ঈশ্বর’ কবিতায় নজরুল ইসলাম ঈশ্বর অন্বেষণের ব্যাপারে বলেছেন, বনে- জঙ্গলে, পর্বত চূড়ায় ঈশ্বর অন্বেষণের কোন প্রয়োজন নেই। ঈশ্বর মানব মনেই অধিষ্ঠিত। আর শাস্ত্র অন্বেষণে না গিয়ে সত্যের সন্ধানে অগ্রসর হতে বলেছেন। ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই বিরাজিত, তাকে বাইরে না খুঁজে নিজের মধ্যে ডুব দিতে হবে। কবি বলেছেন- “স্রষ্টারে খোঁজো - আপনারে তুমি আপনি ফিরিছ খুঁজে।”

সর্বোপরি কবি ‘সাম্য’ কবিতায় স্বপ্নের দেশ- আদর্শ দেশের করেছেন। এমন দেশ যেখানে রাজা প্রজা নেই, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। ‘সাম্যবাদী’ এ স্থানে বর্ণবৈষম্য নেই, এখানে সাদা ও কালোদের জন্য আলাদা গোরস্থান বা গির্জা নেই। এখানে কোন ধর্মের বা শাস্ত্রের ভেদ নেই, নেই কোলাহল। সেখানে পাদ্রী পুরুত মোল্লা এক পাত্রে জল খেলেও জাত যাবে না, স্রষ্টা বাতিল হবে না।
‘সাম্য’ কবিতায় কবিতায় স্রষ্টাকে মহিমাময় এবং মানুষের দেহ মনকেই তার ভজনালয় রূপে বিবেচনা করেছেনÑ
“সাড়া দেন তিনি এখানে তাঁহারে যে নামে কেহ ডাকে
যেমন ডাকিয়া সাড়া পায় শিশু যেই নামে ডাকে সে মা’কে।”

সাম্যবাদ বাঙলা সাহিত্যে নতুন কোন বিষয় নয়। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম যে মমতায় মানবতা মিশ্রিত সাম্যের প্রসঙ্গ তুলে এনেছেন তা একান্তই অভিনব। এখানেই নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে।    

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী
কালকিনি, মাদারীপুর
২৩.০৮.২০১৩

রবিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৩

তেঁতুল রাজ্য

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

সম্মানিত সভাসদ!
নারী জাগরণ সভায় আপনাদের অভিনন্দন!
আজ আমি একক বক্তা এখানে।
অনেক মুখরোচক আলোচনা হবে।
হবে তেঁতুল বিষয়ক লালা ঝরানো ভাষণ।
ধৈর্য ধরে বসুন এবং উপলব্ধি করুন।
সভায় আসার সময় স্ত্রীকে ঘরের ভেতর রেখে
দরোজার তালা সতর্কভাবে লাগিয়েছেন কিনা?
দেশটাকে আজ আমরা তেঁতুল রাজ্যে পরিণত করেছি-
সর্বত্রই লালা ঝরানো পিচ্ছিল পথ।
বাড়ি ফেরার পথে সাবধানে পা ফেলবেন।
নয়তো হোচট খাবেন কিংবা ভাঙবে কোমড়।
তেঁতুল গাছে ধরবে তেতুল। ঝরবে শুধু লালা।
ঝরতে ঝরতে একদিন দেখবেন লালা শূন্য হবে পুরুষ।
আমার বক্তব্য সেইদিন শেষ হবে-
ততদিন এসভায় আপনাদের উদার আমন্ত্রণ!

বন্ধন

(ছোট কাকার ফোন পেয়ে পারিবারিক জটিলতা নিয়ে)
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

বন্ধন কী এতোই তুচ্ছ- এতোই শিথিল?
ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেওয়া যায়?
জীবনের খুঁটি-নাটি দুঃখবোধ হাসি-কান্না
ফেলনা কোন ময়লা নয়Ñ
ইচ্ছে করলেই ভাসিয়ে দেওয়া যায়।

বন্ধন কী রান্না শেষে চুলার ছাঁই?
ভাও বাতাসে উড়িয়ে দিলাম কুয়োর জলে।
চাওয়া-পাওয়া কিংবা হতাশা-ব্যর্থতার
হিসেব কষে বলে দেওয়া যায় লাভ
কিংবা ক্ষতির পরিমাণ।

বন্ধনে বন্ধনে অটুট করে জীবনের গতিপথ
আমাদের চলতে হবে বহুদূর।
ভালোবাসা- শ্রদ্ধা- ত্যাগের মহিমায়
টুকরো টুকরো স্মৃতির লুক্কায়িত বোধের
অন্তরালে অঙ্কুরিত হোক যাবতীয় লেনদেন।

বন্ধন কোন তুচ্ছ- শিথিল বস্তু নয়.. ..
ইচ্ছে করলেই তাকে ছুঁড়ে ফেলবে ভাঁগাড়ে।

হ্যালো, রবীন্দ্র্রনাথ!

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলো। গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল। অন্ধকার হাতরে খাটের কোণায় পানির বোতলের অস্তিত্ব টের পেলাম। ঢক-ঢক করে গলা ভিজিয়ে নিলাম। চোখ বন্ধ করলাম আবার।
তবু স্বপ্নটা আমার পিছু ছাড়ছে না। ফোন করলাম রবীন্দ্রনাথকে।
- হ্যালো, রবীন্দ্রনাথ!
- হ্যা বৎস! বলো।
- তুমি গুরু মরিয়া প্রমাণ করিলে তুমি মর নাই। কাদম্বিনী রোজ সকালে আমার ঘুম ভেঙে দেয়।
- ও তাই। আর...
- গোরা প্রতিনিয়ত ভর্ৎসনা করে। আমাদের নোংরা রাজনীতির জন্য তার সেকি খিস্তিখেউর।
- তুমি কি বলো?
- আমি আর কী বলবো। আহাম্মকের মতো সব শুনি। মুখ বুজে থাকি। কোন উত্তর নেই।
- তুমি আসলে কী করো?
- বছরখানেক হলো, একটা ডিগ্রী কলেজে বাংলা পড়াই।
- ভালোতো।
- কিসের ভালো? সমস্যাতো ওখানেই।
- কী সমস্যা?
- ‘হৈমন্তির এত কষ্ট কেন?’ ‘অপু কেন বাবার আচরণের প্রতিবাদ করে না?’ নানাবিধ প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের।
- তুমি কী বলো?
- তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার দোষ দেই। তা শুনে ছাত্রীরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। বলে, আমরা তখন থাকলে দেখিয়ে দিতাম।
- তুমি কী বিবাহিত?
- নারে বাবা। তোমাদের মত অল্প বয়সে বিয়ে করার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই। এন্ট্রান্স পড়লেই বাবা বিয়ে দেবেন। এমন ভাগ্য আমাদের নেই। সতের বছরের হৈমন্তি বয়সে দাদি-নানিকে হার মানালেও বাংরাদেশ সরকার আঠারো বছরের আগে মেয়েদের বিবাহ নিষিদ্ধ করেছে।
- সে যাই হোক। যখন যে নিয়ম। আমাদের সময় আট বছরে বিয়ের নামে ‘গৌড়ি দান’ করা হতো। বিয়ে না করতে পারো। প্রেমতো নিশ্চয়ই করো। ওটাতে তো আর বয়সের বালাই নেই।
- হা- হা- হা। তা বলতে পারো। ডজন খানেক তো হবে। জলের মতো আসে আর যায়। তবে এ ক্ষেত্রে তোমার গানগুলি বেশ সহায়ক।
- যেমন?
- কাউকে দেখলেই গেয়ে উঠি-‘আমারও পরাণও যাহা চায়’ কিংবা ‘ভালোবাসি- ভালোবাসি...’
- তাতে কাজ হয়?
- হবে না মানে। রবীন্দ্রনাথকে কে না জানে। তার গান কে না শোনে। তবে মাইন্ড করলে বলি, তোমাকে কিছু বলিনি। রবীন্দ্র সংগীত গাইছি।
- হা- হা- হা। ভালো তো। দারুণ বুদ্ধি তোমার।
- তোমার চেয়ে কমই।
- অনেক দিন পরে হাসলাম। তুমি আমাকে হাসালে।
- কেন?
- ফটিকের জন্য মন খারাপ হয়। আমার ফটিকরা কেমন আছে?
- আগের মতোই দুষ্টু। খালি ছুটির জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।
- তা না হয় মানলাম। তুমি লেখালেখি কর নাকি?
- চেষ্টা করি। হয় কি না জানি না। তবে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে দু-চার লাইন। হাতে হাতে দিতে পারি না। ফলে পত্রিকায় পাঠাই। সম্পাদক মহাশয় সদয় হলে প্রকাশ হয়। পত্রিকার কপিটা নিয়ে ভালোবাসার মানুষটির হাতে দেই। হাতে পেয়ে বলে, ‘বাহ! চমৎকার কবিতা তো।’ কিন্তু মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। যার জন্য লিখলাম- সে বোঝল না। আর প্রেমে পড়লো কি না অন্যজন। বল, এটা মহামুশকিল না?
- চালিয়ে যাও। একদিন বুঝিবে বাছাধন। আমার ‘শেষের কবিতা’ পড় নাই?
- আরে মহাশয়! সেতো কয়েকবার পড়েছি। কিন্তু আমার বাবারও সাধ্য নাই বোঝার। না বুঝলেও শেষের কবিতাটা কয়েকবার আবৃত্তি করেছি। শ্রোতারা বড্ড হাততালি দেয়।
- তাই নাকি? তুমি আবৃত্তি করো? আমি না ভালো আবৃত্তি করতে পারতাম না। মিনমিনে কন্ঠ ছিল তো।
- হ্যা, তা ঠিক বলেছো। তোমার কন্ঠে ‘সোনার তরী’ শুনে আমি অনেক হেসেছি। কেমন কাতর-কাতর কন্ঠ। মেয়েলি-মেয়েলি ভাব।
- তুমি আমাকে অপমান করছো?
- দুঃখিত, সে স্পর্ধা আমার নেই। ক্ষমা করবেন জাহাপনা! তবে আপনার ‘হঠাৎ দেখা’, ‘বাঁশি’, ‘দেবতার গ্রাস’, ‘দুই বিঘা জমি’, ‘সোনার তরী’, ‘অপমানিত’, ও ‘রক্ত করবী’র অংশবিশেষ বহুবার আবৃত্তি করেছি। পুরস্কারও পেয়েছি।
- বাহ- বাহ! তোমরাইতো আমাকে বাঁচিয়ে রাখলে। তা নাহলে কবেই পঁচে যেতাম। মিশে যেতাম মাটির সঙ্গে।
- কী বলেন? আপনি আছেন বলেইতো আমরা আছি। আজো বাংলা সাহিত্য আছে। বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে বাংলা সাহিত্য স্থান করে নিয়েছে। ‘নোবেল’ পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছি আমরা।
- ও কথা আর বলো না। পেলাম একটা নোবেল। তা নিয়ে কত সমালোচনা। শেষমেষ আবার নোবেলটা চুরিও হয়ে গেল।
- দুঃখিত! অনাকাক্সিক্ষত এ ভুলের জন্য।
- না থাক, ঠিক অছে। তবে আমার একটা অনুরোধ। সাহিত্যটাকে কলুষিত হতে দিও না। বিখ্যাত হওয়ার বাসনা নিয়ে লিখতে বসো না। বরং লিখে বিখ্যাত হও। সহজ-সরল পাঠককে ঠকিও না। তোমারা লিখে যাও। তাতেই আমি বেঁচে থাকবো। বাংলা সাহিত্য বেঁচে থাকবে। মানুষ বেঁচে থাকবে। সর্বোপরি মানুষের জন্য কিছু করো।
‘আজি ঝরোঝরো মুখোড়ও বাদল দিনে’ গানের সুরে হঠাৎ মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো।
ঘুম ভেঙে গেল। সাথে স্বপ্নটাও। মোবাইল স্ক্রীনে ‘অনিন্দিতা কলিং’ দেখে রাগটা সামলে নিয়ে ফোন রিসিভ করলাম। ---
- হ্যালো, রবীন্দ্রনাথ!
অনিন্দিতা বললো- পাগল নাকি? রবীন্দ্রনাথ এলো কোত্থেকে?
- ও তাইতো, তুমি অনিন্দিতা। আসলে এতক্ষণ রবীন্দ্রনাথের সাথে কথা বলছিলাম তো।
অনিন্দিতা হাসলো।
- তোমার মাথা একেবারে গ্যাছে। আমার মনে হয় কি জানো? বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবার্ষিকী। তুমি হয়তো ভাবছিলে কিছু লিখবে। কিন্তু কি লিখবে খুঁজে পাচ্ছিলে না। তাই ভাবতে- ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছো। আর অমনি ঘুমের ঘোরে রবীন্দ্রনাথকে ফোন করেছো। হা- হা- হা।
ফোন কানে ধরে আছি। অনিন্দিতার হাসির লহরী বেজে যাচ্ছে অবিরাম। আসলে রবীন্দ্রনাথ আমাকে স্বপ্ন দেখায়। রবীন্দ্রনাথ আমাকে বাঁচতে শেখায়।
তুমি কেন চলে গেলে রবীন্দ্রনাথ? আর কিছুদিন থাকতে পারলে না? কিংবা আবার কেন ফিরে আসো না!

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর।
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০১৩

কালকিনিতে সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’র মোড়ক উন্মোচন

জান্নাতুল ফেরদাউস মীম:
জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম কালকিনির উদ্যোগে গত শুক্রবার সকালে স্থানীয় প্রেসক্লাবে সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’র মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ফ্রেন্ডস ফোরামের আহ্বায়ক আকন মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে ‘রচয়িতা’র সহ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনে মোড়ক উন্মোচন করেন সাংবাদিক এইচ এম মিলন। বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক বি এম হানিফ, শিক্ষিকা শামীম আরা ডলি, সহ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ও কবি-কথাসাহিত্যিক আকন মোশাররফ হোসেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন রচয়িতার কবি আলী ইদ্রিস, সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন, নাফিজ সিদ্দিকী তপু, মেহেদী হাসান শান্ত, আবৃত্তি শিল্পী জান্নাতুল ফেরদাউস মীম, জেবা ফারিহা, নাট্যকর্মী আহসান হাবীব, দবির হোসেন, সাব্বির, উথান, রকিব ও জাবির প্রমুখ। সবশেষে উপস্থিত সকলের মাঝে ‘রচয়িতা’ বিতরণ করা হয়।
জামালপুর জেলার ইসলামপুরের রচয়িতা সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে কবি আরিফুল ইসলাম সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’ গত তিন বছর যাবৎ ষান্মাসিক হিসাবে প্রকাশিত হচ্ছে। তথ্য-প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় মাদারীপুরের কালকিনি বসে এর সহ-সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। দুই বাংলার একশ’ কবির কবিতা নিয়ে জুন মাসে তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এপার বাংলা- ওপার বাংলার উল্লেখযোগ্য বইয়ের দোকানে ‘রচয়িতা’ পাওয়া যাচ্ছে।

বুধবার, ৩ জুলাই, ২০১৩

হয়নি আজো বলা


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

বলি বলি করে একটি কথা
হয়নি আজো বলা,
চলি চলি করে একই পথে
হয়নি আজো চলা।

রোজ সকালে ডাকবাক্সে
হাতড়ে ফিরি কি একটা,
প্রাপক হয়ে আমার নামে
নেইতো সেই চিঠিটা।

যখন তোমার সামনে দাঁড়াই
ভাবছি এবার বলি,
তোমার ছাঁয়া সামনে এলেই
বলার আগেই ভুলি।

বলি বলি করে সেই কথাটা
ভুলে যাচ্ছি রোজ,
চলার পথে যে যার মতো
নেয়না কোন খোঁজ।

মাদারীপুরে ই-তথ্যসেবা কেন্দ্রের সেরা উদ্যোক্তা উম্মে কুলসুম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘জনগণের দোরগোড়ায় সেবা’-স্লোগানকে সামনে রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত একসেস টু ইনফরমেশনের(এ টু আই) আওতাধীন ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তাদের পুরস্কৃত করা হয়। সম্প্রতি মাদারীপুরের জেলা প্রশাসন আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলার সমাপনী দিনে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এবছর মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়ন তথ্যসেবা কেন্দ্রের উম্মে কুলসুম সেরা উদ্যোক্তা (মহিলা) হিসাবে পুরস্কার, ক্রেস্ট ও সনদপত্র লাভ করেন।
মাদারীপুর জেলার চারটি উপজেলার অন্তর্গত ৬১টি ইউনিয়ন পরিষদে তথ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। তথ্যসেবা প্রদানে বিশেষ অবদান রাখায় উম্মে কুলসুম সেরা ইউ আই এস সি উদ্যোক্তা(মহিলা) হিসাবে এ পুরস্কার লাভ করেন। কুলসুম দিনমজুর বাবা মতিউর রহমান ও গৃহিনী মা কমলা বেগমের তৃতীয় সন্তান। প্রায় একবছর আগে সাহেবরামপুর ইউনিয়ন পরিষদে উদ্যোক্তা হিসাবে কাজ শুরু করেন। তিনি কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বিএ শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। লেখাপড়ার পাশাপাশি এ কাজ করে তিনি সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন এবং জনগণের মাঝে ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জন্মনিবন্ধন, স্কাইপির মাধ্যমে যোগাযোগ, ই-মেইল ব্যবহার, অনলাইনে ভর্তি ও ইউনিয়ন ওয়েব পোর্টালসহ ইন্টারনেট সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ করে থাকেন। তার এ সেবায় উপকৃত হচ্ছে এলাকার জনগণ।
উম্মে কুলসুম জানান, এখানে কাজ করে মাসে ৬-৭ হাজার টাকা আয় হয়। মাসিক খরচ বাদে ৩ হাজার টাকার মতো লাভ হয়। পড়াশুনার পাশাপাশি কাজটি করতে পেরে আমিও লাভবান হচ্ছি। স্বপ্ন আছে ভালো কিছু করার। ইন্টারনেট নিয়ে অনেক বড় কাজও করার ইচ্ছা আছে।
সাহেবরামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুল আহসান সেলিম জানান, কুলসুম পরিশ্রমি মেয়ে। আমি ওকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি। ভালো কিছু করতে চাইলে আরো সহযোগিতা করবো।

শুক্রবার, ২১ জুন, ২০১৩

তোমাকে ভালোবাসা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

তোমাকে ভালোবাসা অনেকটা খাবার টেবিলে
পাশাপাশি বসার প্রথম অনুভূতির মতো,
প্রবল বৃষ্টির মাঝে এক ছাতার তলে
পাশাপাশি হেটে যাওয়ার মতো।

শেষ বিকেলের বিলে আমি নৌকার মাঝি
তুমি তার সওয়ারি হওয়ার অভিজ্ঞতার মতো,
গাঢ় অন্ধকারে হাত ধরে হেটে যাওয়া
দু’জন দু’জনার অবলম্বনের মতো।

তোমাকে ভালোবাসা অনেকটা না বলা কথার
মাঝেও অনেক কিছু বলে ফেলার মতো,
পার্বণে-উৎসবে কাছে পাবার ব্যাকুল আগ্রহ
অথবা না পাবার মন খারাপের মতো।

তোমাকে ভালোবাসা অনেকটা ভালোবাসি
তবু বলতে না পারার কষ্টের মতো,
তবু ভালোবেসে যাওয়া কাছাকাছি এলে
দূরে গেলে মন কাঁদে তোমাকে না পেলে।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৩

কালকিনিতে নজরুলের জন্মজয়ন্তী উদযাপন

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের ১১৪ তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমী। গত ১৮ জুন সন্ধ্যা ৭টায় অফিসার্স ক্লাবে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিল্পকলা একাডেমীর সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে আজিমের সভাপতিত্বে সহকারি মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লিটু চ্যাটার্জির সঞ্চালনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপিকা তাহমিনা সিদ্দিকী। নজরুলের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য ও কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক দেদারুল আলম মুরাদ। আবৃত্তি করেন শিল্পকলা একাডেমীর সদস্য ও সাহেবরামপুর কবি নজরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের বাংলা প্রভাষক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সংগীত পরিবেশন করেন ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ জসিম উদ্দিন, শিল্পকলার সংগীত প্রশিক্ষক উমা দাস, মিলন বড়াল, শিশুশিল্পী রাফিয়া  ও সামিউন।

মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৩

একগুচ্ছ প্রেমের ছড়া

ইয়াকুব খান শিশির
১.
তুলতুলে গাল
ঠোট টুকটুকে লাল
পাখিঠোটা নাক তার
চন্দ্র কপাল
ঢেউ তোলা কালো কেশ
ডাগর আঁখি
মন বলে তার পানে
চেয়েই থাকি।

২.
প্রেয়সীর হাসি দেখে
কেউ যদি চমকায়
দু’চার কথা শুনে
বার বার দম খায়
কভু কি সে বুঝবে
প্রেম কি তা ছলনা
তার মত ভীতু যেন
প্রেম কভু করে না।

প্রেম যেন করে যার
ভয়হীন চিত্ত
হৃদয়ের নির্যাস
ভালবাসা বিত্ত
ত্যাগ আছে আছে যার
ধৈর্য ও বীর্য
প্রেম তারে খোঁজে তার
পেতে সাহচার্য।

৩.
ওটাকে চোখ বলা দায়
দৃষ্টি চোখের হানলে বুকের
পাজর ভেঙে যায়।

সাগরের গভীরতা কথার কথা
আছে তলদেশ
ও চোখের নাই কিনারা
মাপতে সারা
জীবন হবে শেষ

আকাশের নীল আর কত
সোভা কত কতই বা বিস্তৃত
কতইবা তার উদারতা
ওই চোখেরই মত

ও চোখে জাদু আছে মায়া আছে
আছে ভালবাসা
ও চোখে স্বপ্ন আছে আরো আছে
দুর্বাধ্য এক ভাষা।

সোমবার, ১০ জুন, ২০১৩

বাবার কাছে খোলা চিঠি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
পরম শ্রদ্ধাভাজন পিতা,   
পৃথিবীর সবটুকু অনুভূতি দিয়ে আজ উপলব্ধি করছি তোমায়। তোমার মাঝেই আমার অস্তিত্ব। আর আমার মাঝে সুপ্ত তোমার আগামী দিনের স্বপ্ন। তুমি আমার স্বপ্নদ্রষ্টা। আর আমি তোমার স্বপ্নবিলাসী রাত। এখনো কী রাত জেগে জেগে ঝাপসা চোখে আগামীর স্বপ্ন দেখো? হাজার রঙের ছবি আঁকো মনে মনে। এখনো হয়তো বসে বসে ভাবো, ফেলে আসা অতীত। বার্ধক্যের মাঝে আজ খুঁজে ফেরো শৈশব ও যৌবনের সার্থকতা।
বাবা, আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে তুমিই ছিলে প্রধান। তুমি পরিবারের বড় সন্তান। সকলের মিয়া ভাই। তোমাকে নিয়ে হয়তো তোমার বাবারও অনেক স্বপ্ন ছিলো। আজ তুমি পেশাগত জীবনে একজন শিক্ষক। সমাজে আলো ছড়ানোর দায়িত্ব নিয়েছিলে। অথচ তেলের অভাবে তোমার প্রদীপই ছিল নিভূ নিভূ। যৌবনে তুমি তোমার বাবাকে (আমার দাদা) হারিয়েছ। ছয় বোনকে পাত্রস্থ করাসহ তিনভাইকে মানুষ করার গুরুভার ছিলো তোমার ঘাড়ে। তুমি সফল হয়েছো। নদী ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েও তুমি তোমার আস্থায় অবিচল ছিলে। আদর্শ আর নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হওনি কখনো।
বাবা, আমার মনে আছে- কাকারা বিবাহ করার পরপর আমাদের একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে যায়। সেদিন তুমি অঝোরে কেঁদেছিলে। আমি তখন থেকে বুঝতে শিখেছি- বিচ্ছেদ মানুষকে কতটা কষ্ট দেয়। আলাদা হবার মত বা নতুন সংসার গড়ার মত তেমন কোন উপাদান তোমার হাতে ছিলো না। তবুও আলাদা সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মত অবস্থার মধ্য দিয়ে অনেক কষ্টে আমাদের মানুষ করেছো। আসলে মানুষের মত মানুষ হতে পেরেছি কিনা সে মাপকাঠি তোমার হাতে। ছয় ভাই-এক বোনের বিশাল সংসারের দায়িত্ব তোমার মত ছাপোষা শিক্ষকের ঘাড়ে।
বাবা, ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি- মায়ের অনেক আব্দার তুমি রক্ষা করতে পারোনি। তখন অনেক তিক্ত কথাও শুনতে হয়েছে তোমাকে। তিক্ততা রিক্ততা টানাপড়েন আর হতাশার গ্লানি নিয়েই কেটে গেছে তোমাদের সুদীর্ঘ দাম্পত্য জীবন। অনেক কষ্টে টেনে-টুনে আজো হাল ধরে আছো সংসারের। সন্তানের চাওয়াগুলো তুমি হাসিমুখে মেনে নিয়েছ। সাধ্যমত চেষ্টা করেছো সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে। তোমার মধ্যে আমি হতাশা দেখেছি তবে তোমাকে অধৈর্য হতে দেখেনি।
বাবা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু কখনো তা প্রকাশ করতে পারিনি। প্রকাশের কোন সুযোগ বা উপলক্ষও পাইনি। বাবা এখন তুমি আমাদের আনন্দে আনন্দিত হও। আমাদের ব্যথায় ব্যথিত হও। আমাদের আনন্দ-বেদনার সমান অংশীদার তুমি। তুমি বলতে,‘তোমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।’ আমি জানিনা, কখনো কিছু করতে পারবো কিনা। তবে যেদিন এমএ শ্রেণির ফলাফল পেয়ে তোমাকে ফোন করেছিলাম, সেদিন তুমি মহাখুশি হয়েছিলে। তোমার ছেলে ফার্স্ট ক্লাশ পেয়েছে- তুমি তা মহল্লার সবাইকে গর্বের সাথে জানিয়েছিলে। এ যেন তোমার বিশাল পাওয়া। বাবা তুমি উপজেলা শহর থেকে চার কেজি মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরেছিলে। আনন্দে সেদিন তোমার চোখের কোণে চিকচিক করছিল আনন্দ অশ্রু।
বাবা, বিশ্বাস করো, আমি প্রতিষ্ঠিত হয়ে তোমার সব ক্লান্তি মুছে দিতে চাই। তুমি শুধু সে অবধি বেঁচে থাক। সৃষ্টিকর্তার কাছে তা-ই প্রার্থনা করি। সৃষ্টিকর্তা যেন আমাকে একটু সুযোগ দেন। আমার জীবনে জন্মদাতা তুমি, আভিভাবক তুমি, এমনকি বন্ধুও তুমি। ঘৃণা যত করেছো তার চেয়ে বেশি ভালোবেসেছো আমায়। যখন কিছু না পারার ব্যর্থতার কারণে আমাকে বকতে; তখন বড্ড রাগ হতো তোমার ওপর। কিন্তু আজ বুঝতে পারি, সন্তানের সফলতায় প্রত্যেক বাবাই গর্বিত হয়। তুমিও তার ব্যতিক্রম নও।
বাবা, তুমি দীর্ঘজীবী হও। তোমার সুস্থ্যতা সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায়Ñ
ইতি, তোমার আশির্বাদ প্রত্যাশী।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর।
০৯.০৬.২০১৩

রবিবার, ২৬ মে, ২০১৩

ক্যাম্পাসের প্রিয় মুখ: শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকেই লালন করতে চান আজীবন

খায়রুল আলম:
সারাদিন কাজ নিয়ে পড়ে থাকেন। নাওয়া-খাওয়া ভুলে যান। কাজটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি নেই। পড়াশুনার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, সাহিত্য চর্চা, নাটক ও আবৃত্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। লিখতে বসলে ভোর হয়ে যায়। ঘুমঘুম চোখে দিনের সব কাজ সারেন। কাজ পাগল এই মানুষটির নাম সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। অনেকের কাছে এস. মাহমুদ নামে পরিচিত। কেউ কেউ ডাকেন সালু বলে।
সংবাদ সংগ্রহ, নাটক লেখা, অভিনয় করা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি থেকে শুরু করে সবখানেই তার বিচরণ। বিভিন্ন পত্রিকায় কবিতা, উপ-সম্পাদকীয় ও ছোটগল্প লিখেও বেশ পরিচিতি লাভ করেছেন। তিনি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সবার পরিচিত জন। পড়ালেখা করছেন বাংলা সাহিত্যে। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ থেকে এবছর মাস্টার্সে(বাংলা) প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাই কলেজের বাংলা বিভাগ তাকে কৃতি শিক্ষার্থী হিসাবে সংবর্ধনা দিয়েছে।
সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। বাবা জেড এম এ মাজেদ মাদ্রাসা শিক্ষক ও মা হাসনে আরা গৃহিনী বলে সঙ্গত কারণেই পড়তে হয় মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করে নিজ উদ্যোগে ভর্তি হন বাংলা সাহিত্যে অনার্স করার জন্য। কলেজে এসে যুক্ত হন প্রথম আলো বন্ধুসভার সাথে। দৈনিক দেশবাংলার মাধ্যমে শুরু করেন সাংবাদিকতা। জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অভিনয় ও আবৃত্তিতে অংশ নিয়ে বরাবরই প্রথম হতে থাকেন। ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় ২০০৬, ২০১০ ও ২০১১ সালে ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। সম্পাদনা করেন সাহিত্য পত্রিকা ‘আলোর পথে’ ও ‘দহন’। ২০০৭ সালে ‘প্রথমা রঙ্গমঞ্চ’ নামে একটা নাটকের গ্র“প প্রতিষ্ঠা করেন। এ পর্যন্ত এক ডজনের বেশি নাটক রচনা ও মঞ্চস্থ করেছেন। ২০১১ সালে বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের ‘পথনাটক নির্মাণ কর্মশালা’য় অংশগ্রহণ করেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্যোৎসবে ‘একটাই চাওয়া’ নাটকে এবং ২০১৩ সালের মে মাসে ‘স্বপ্ন ও দ্রোহের জাতীয় নাট্যোৎসবে’ কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় নিজের লেখা ‘বৈচাপাগল’ নাটকে অভিনয় করেন। বর্তমানে অক্ষর আবৃত্তি একাডেমীর প্রশিক্ষক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কালকিনি শাখা সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক ও কালকিনি শিল্পকলা একাডেমীর কার্যনির্বাহী সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের অনুপ্রেরণা আর উৎসাহে এগিয়ে চলছেন তিনি। ধ্যানে-জ্ঞানে, চিন্তা-চেতনায় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকেই লালন করতে চান আজীবন।

সোমবার, ২০ মে, ২০১৩

কালকিনিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী উদযাপন

জান্নাতুল ফেরদৌস মীম:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫২ তম জন্মবার্ষিকী ও নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তীর শততম বছর উদযাপন করে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা প্রশাসন। গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় অফিসার্স ক্লাবে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে আজিমের সভাপতিত্বে লিটু চ্যাটার্জি ও মাজহারুল আলমের সঞ্চালনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপিকা তাহমিনা সিদ্দিকী। বরীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন কবি দুলাল সরকার ও অধ্যাপক দেদারুল আলম মুরাদ। আবৃত্তি করেন জারিন তাসনিম রাইসা, জান্নাতুল ফেরদৌস মীম, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, লিয়াকত হোসেন লিটন ও দুলাল সরকার। সংগীত পরিবেশন করেন অধ্যক্ষ মোঃ জসিম উদ্দিন, উমা দাস, সন্ধ্যা রানী বল, বন্ধন, একা, পৃথা, মানসী, অনিন্দিতা ও নন্দিতা।

শনিবার, ১৮ মে, ২০১৩

কালকিনিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্মরণ সভা

দুলাল সরকার :
দুই বাংলার বিখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রয়াণে তাঁর জন্মস্থান মাদারীপুরের কালকিনিতে গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় কালকিনি প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এক স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
কালকিনি প্রেসক্লাব সভাপতি শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান মীর গোলাম ফারুক। বক্তব্য রাখেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহরিয়াজ, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যাপিকা তাহমিনা সিদ্দিকী, কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামান, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক কবি দুলাল সরকার, পৌর মেয়র এনায়েত হোসেন, মাদারীপুর শিল্পকলা একাডেমীর নাট্য প্রশিক্ষক আ.জ.ম কামাল, মাদারীপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক রতন কুমার দাস, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি অহিদুজ্জামান বুলেট ও উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি অহিদুজ্জামান আব্দুল হাই। কবির কবিতা আবৃত্তি করেন মাদারীপুর উদ্ভাসের সাধারণ সম্পাদক কুমার লাভলু, টুঙ্গিপাড়া প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ও সংস্কৃতিকর্মী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। বক্তারা কবির  নামে সড়ক, সুনীল মেলা ও সুনীল স্মৃতি পদক প্রবর্তণের দাবি জানান।

কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ ও প্রেম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘বল বীর
চির উন্নত মম শীর।’
মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহসী উচ্চারণে সূচনা করলেন বিদ্রোহের বাণী। তিনি আর কেউ নন। আমাদের প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম। একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে তার সমসাময়িক অবস্থা বা প্রেক্ষাপটের ওপর। কোন সচেতন শিল্পী তার সময় ও সমাজকে কখনোই অস্বীকার করতে পারেন না। কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার ব্যতিক্রম নন। কাজী নজরুল ইসলাম দেশের এমন এক সংকটময় মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছেন; যখন মুক্তি সংগ্রামের স্লোগান আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। ফলে এ আন্দোলন সংগ্রামের প্রভাব পড়েছে তাঁর কাব্যে। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার নেশায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন উন্মাদ। দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে হয়েছেন মহা বিদ্রোহী। কিন্তু তারপরও মানব মনের চিরন্তণ প্রেমের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে তাঁর কাব্যে। কখনো তাঁর বিদ্রোহের মাঝে প্রেম; আবার কখনো প্রেমের মাঝে বিদ্রোহ। দু’টোই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়েছিল প্রিয়তমার মতো।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্বমহিমায় বাংলা সাহিত্যে চির ভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ঘুমভাঙার গান’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’, ‘জিঞ্জির’, ‘সন্ধ্যা’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘সাম্যবাদী’ ইত্যাদি কাব্যের মাধ্যমে তিনি জাগরণের গান শুনিয়েছেন মানুষকে। জাতির বন্দীত্ব মোচনের জন্য তাঁর প্রচেষ্টা ছিল অকৃত্রিম। তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেনÑ
‘লাথি মার ভাঙরে তালা,
যতসব বন্দীশালা,
আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা।’
তাঁর এ বিদ্রোহ অনাসৃষ্টির জন্য নয়। পুরাতনকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বিদ্রোহ। দেশ-জাতি-সমাজকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর বিদ্রোহ শাসক যাজক ও সমাজপতিদের বিরুদ্ধে। তার এ বিদ্রোহ নিরন্তর। যতদিন না এর কোন প্রতিকার হবে। তাইতো তিনি বলেছেনÑ
    ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
             আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে    উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে নাÑ
    বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত।
    আমি সেই দিন হব শান্ত।’
নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পর কবির এ বিদ্রোহ সমাপ্ত হয়ে যাবে। বাস্তবিক অর্থে মানুষকে কতটা ভালোবাসলে এমন বিদ্রোহী হয়ে ওঠা যায়?

নিঃসন্দেহে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্যই তিনি আজ সর্বত্র ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসাবে সমাদৃত। বিদ্রোহী অভিধায় অভিসিক্ত হলেও কাজী নজরুল ইসলাম একজন খাঁটি প্রেমিক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য কারাবরণ করলেও প্রেমের মহিমার ক্ষেত্রে আরো বেশি সমুজ্জ্বল তিনি। অন্তরে প্রেম না থাকলে কখনো এমন বিদ্রোহ আসেনা। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য’- এ যেন কবি নজরুলের অন্তরের কথা। এছাড়া নারীর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গানে ও কবিতায়। নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন তিনি। নারীকে যথাযথ মর্যাদা দিতে গিয়ে কবি বলেছেনÑ
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কথা আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারি না।

‘আলগা করো গো খোপার বাঁধন’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’- এধরণের গানে তার অপার্থিব প্রেমের উৎসরণ লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রেমিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি করা হবে না। বিদ্রোহী রূপের আড়ালে তাঁর চিরায়ত কামনা-বাসনা-প্রেমকে ঢেকে রাখার সাধ্য আছে কার? কবি এও বলেছেন-
‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।’
মূলত নারীর উৎসাহ-প্রেরণা ও প্রেমের মহিমা তাঁকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহ যুগিয়েছে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও তার প্রেম প্রকাশিত হয়েছে। নারী হৃদয়ের ব্যর্থতা, ক্ষোভ ও বাসনাকে কবি নিজের বিদ্রোহের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাইতো কবি বলেছেন-
‘আমি     বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি     ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!’
কিংবা
‘আমি     অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত-     চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
    আমি গোপন-পিয়ার চকিত চাহনী ছল ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন-কন্।’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে যেমন বিদ্রোহী; অপরদিকে আবার রোমান্টিক কবি। দীর্ঘাকৃতির ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যেও প্রেমের মহিমাকে তিনি উচ্চকিত করে তুলেছেন। কবির ‘মানুষ’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘আমার কৈফিয়ত’ প্রভৃতি কবিতায় বিদ্রোহ ফুটে উঠলেও সেখানে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, অবহেলিত, অসহায় মানুষের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহিন দরদ স্বার্থহীন ভালোবাসা। ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের নিবিড়তা, চিরন্তনতা এবং বিচ্ছেদের তীব্র জ্বালার প্রকাশ দেখা যায়। সিন্ধুর অশান্ত রূপ কবিচিত্তের বিচ্ছেদ জ্বালা পথিকের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কবি বলেছেন-
‘এক জ্বালা, এক ব্যথা নিয়া
তুমি কাঁদ আমি কাঁদি, কাঁদে মোর হিয়া।’

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে প্রেম বা রোমান্টিসিজম সম্পর্কে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেনÑ
“প্রকৃতির মাঝে আত্মভাবের বিস্তার এবং একই সাথে প্রকৃতির উপাদান সান্নিধ্যে অন্তর ভাবনার উন্মোচন রোমান্টিক কবির সহজাত বৈশিষ্ট্য। ‘চক্রবাক’ কাব্যে নজরুলের এই রোমান্টিক সত্ত্বার প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইতঃপূর্বের কাব্যসমূহেও আমরা নজরুলের প্রকৃতি চেতনার পরিচয় পেয়েছি কিন্তু ‘চক্রবাক’-এ এসে লক্ষ্য করছি, এখানে প্রকৃতি নজরুলের প্রজ্ঞাশাসিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ মানসতার স্পর্শে এসে হয়ে উঠেছে সংযত, সংহত এবং শূন্যতা তথা বেদনার প্রতীকী ধারক।”

কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা ছাড়াও বহুবিচিত্র গান রচনা করেছেন। প্রেম-বিরহ, বিদ্রোহ-বিপ্লবের ওপর তাঁর অসংখ্য গানও রয়েছে। গানে কী কবিতায় মানুষের কল্যাণে কবি পুরাতনকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। ধ্বংসের ভেতর থেকেই তিনি দেখেছেন নব সৃষ্টির উন্মাদনা। কবি সমস্ত অসুন্দরকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। তাইতো বিদ্রোহের পাশাপাশি আবার প্রেম সৌন্দর্যের সমন্বয় করেছেন। বিদ্রোহ করেছেন অন্যায়কে ধ্বংস করার জন্য, আর প্রেমের কথা বলেছেন মানবতাকে মজবুত করার জন্য। তাইতো নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন খাঁটি প্রেম-বিদ্রোহের কবি নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর।
১৮ মে ২০১৩
রাত ১১.৩৭ টা।