শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

নাটক: দাদুর স্মৃতি

                                            (কবর কবিতা অবলম্বনে)
                                    মূল: পল্লীকবি জসীমউদদীন
নাট্যরূপ: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
নির্দেশনা: আ জ ম কামাল ও সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

চরিত্র:
১. দাদা: যুবক
২. দাদা: মধ্যবয়সী
৩. দাদা: বৃদ্ধ
৪. নাতি: ৬ বছর বয়সের
৫. নাতি: ১০ বছর বয়সের
৫. দাদী: ১২ বছর বয়সের
৬. ছেলে: ৩৫ বছর বয়সের
৭. পুত্রবধূ: ২৫ বছর বয়সের
৮. নাতনী: ১১ বছর বয়সের
৯. মেয়ে: ৭ বছর বয়সের

‘(সুয়াচান পাখি, আমি দাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি......।’ গান বেজে উঠবে। আশি বছরের বৃদ্ধের এক হাতে লাঠি। অন্যহাতে নাতির কাধ ধরে মঞ্চে আগমন। গুটি গুটি পায়ে একটি কবরের সামনে দাঁড়াবে।)
বৃদ্ধ: এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে। এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ, সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা! সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরিএমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে, ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।
নাতি: আর ওই কবরগুলো কার কার, দাদা?
বৃদ্ধ: তোর বা, মা, ফুফু আর বোনের কবরএকে একে সবাই চইলা গেল।
নাতি: কি হইছিলো তাগো?
বৃদ্ধ: তহন মানুষ এত কিছু বুঝত না। অশিক্ষিত, মূর্খ মানুষই ছিল বেশি। না আছিল ভাল ডাক্তার, না আছিল হাসপাতাল। অল্প বয়সে বিয়া অইত। যৌতুক, নির্যাতন, কুসংস্কার ছিল পান্তাভাতের মত। তাইলে শোন, কইতাছি......  
(আলো নিভে যাবে)
সকালের আলো জ্বলে উঠবে। মঞ্চে ২০ বছর বয়সের দাদার আগমন।
দাদা: কইগো, কই গেলা? কও দেহি। কেমন লাগে? ছোট মানুষ ইয়া আছি মহা ঝামেলায়। ( আড়ালে কান্নার শব্দ) কানতাছে কেডা? (এদিক-ওদিক খুঁজে কাছে গিয়ে) কিরে বউ, কি অইছে তর। কিরে বউ? কানতাছো ক্যান? আমারে ক’। কেউ মারছে?
দাদি: অরা আমার পুতুলের বিয়া ভাইঙ্গা দিছে। অ্যা.......।
দাদা: থাউক, কান্দিস না। আমি অগো বকা দিমুনে। তু আবার পুতুলের বিয়া দিবিচল বাড়ি চল (উভয়ের প্রস্থান)
(চোখ মুছতে মুছতে দাদির আগমন। কোণায় একটা পিঁড়িতে বসবে। কাধে লাঙল নিয়ে দাদার আগমন)
দাদাঃ বউরে আমি ক্ষেতে গেলাম। আহারে আমার সোনা মুখ। কানলে কি ভাল লাগে? দেখত সারা বাড়ি যেন সোনায় ভইরা গ্যাছে। (এদিক-ওদিক তাকিয়ে) ভাবিসাব কই?  যাইগা, ভাবিসাব দ্যাখলে আবার তামাশা করবো।
দাদি: যা অইছে, তাড়াতাড়ি আইয়েনআমি কিন্তু বাপের বাড়ি যাইমু।
দাদা: আইচ্ছা, কাইল সকালে যাই
দাদি: আইচ্ছা, ঠিক আছে। এইবার সপ্তাখানি থাকমু।
দাদাঃ থাকিস। আমি গেলাম রে বউ। খেতে ভাত দিয়া জাইছ।
(দাদার প্রস্থান। দাদিও পেছন পেছন যায়দাদা ঘুরে ঘুরে বারবার তাকায়।)

‘কে যাসরে ভাটির গাং বাইয়া, আমার ভাইধন রে কইয়ো নায়র নিত বইলা...’ গানের সাথে সাথে সকালের আলো জ্বলে উঠবে একটা পোটলা হাতে নিয়ে দাদির আগমন। পোটলা গুছগাছ করে। এমন সময় দাদার আগমন।
দাদা: সব ঠিকঠাক ইছো তো।
দাদি: হ, লইছি। বেশিদিন থাহুম না। মাত্র এক সপ্তাহ।
দাদা: আইচ্ছা, তাড়াতাড়ি আহিছ কাউরে দিয়া জাইতে কইছ। আমার অনেক কাম হাতে। একদিন ক্ষেতে না গেলে ফসল মাইর খাইয়া যাইব।
দাদি: (পা ধরে) আমারে দেখতে যাইয়েন উজানতলীর গা।
দাদা: দেহ দেহ করে কি? আমি না যাইয়া পারিশনিবার দিন শাপলার হাটে তরমুজ বেইচা তোর লাইগ্যা একছড়া পুতির মালা লইয়া যামুনে। চল তোরে একটু আগায়া দিয়া আহি। ছলেমান রে কইছি, তরে বাড়ি পর্যন্ত দিয়া আইতে। পথে যাইতে যাইতে চ্যাংড়ামি করবিনা।
দাদি: অইছে, করুম না। , যাই।

সন্ধ্যার সময়। দাদার শ্বশুর বাড়ি। কাশি দিয়ে প্রবেশ। ছুটে আসে দাদি। দাদা কোমরের গাট থেকে পুতির মালা, তামাক আর মাজন বের করে দেয়।
দাদি: (নথ নেড়ে) এতদিন পরে আইলেন?থের দিকে চাইয়া চাইয়া আমি কাইন্দা মরি আখি জলে।
(আরো নিভে যাবে। দুজনার হাসির আওয়াজ আসবে।)
(আলো জ্বলে উঠবে। বৃদ্ধ ও নাতির আগমন।)
বৃদ্ধ: আমারে ছাইরা এত ব্যথা যার কেমন কইরা হায়, কবর দেশেতে ঘুমাইয়া রছে নিঝঝুম নিরালায়। দাদু, হাত জোর কইরা দোয়া কর, আয় খোদা দয়াময়! আমার দাদির লাইগা যেন ভেস্ত নসিব হয়।
নাতি: আয় খোদা দয়াময়! আমার দাদির তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।
দাদা: (মোনাজাত শেষে) তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটাইছি, যেখানে যারে জড়ায়ে ধছি সেই ছাইরা ইলা গেছে। শত কাফনের, শত কবররের ঙ্ক হৃদয়ে আকি, গণিয়া গণিযা ভুল করে গুণি সারাদিন রাত জাগি এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে, গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে। মাটিরে আমি যে বড় ভালোবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক, আয়-আয় দাদু, গলাগলি রি কেঁদে যদি হয় সুখ।
(গলাগলি ধরে কান্না শেষে)
নাতি: আইচ্ছা দাদু, ওই কবর দুইটা কার কার?
বৃদ্ধ: খাড়া, কইতাছি। এই খানে তোর বা ঘুমায়, এইখানে তোর মা। কাঁন্দস তুই?
নাতি: কি করুম দাদু, পরাণ যে মানে না।
বৃদ্ধ: তাইলে শোন দাদু।
(আলো নিভে যাবে।)
(আলো জ্বলে উঠবে)
(বৃদ্ধের ছেলের আগমন। হাটতে কষ্ট হয়। অনেক কষ্টে একটু এগিয়ে দপ করে বসে পড়বে। বাবাকে ডাকবে। )
পুত্র: বাজান, আমার শরীলডা ক্যামন জানি করতাছে।
(বাবা ছুটে এসে)
দাদা: কি অইছে বাজান?
পুত্র: ক্যামন জানি দম বন্ধ অইয়া আইতাছে।
দাদা: (মাটিতে বিছানা পেতে দিয়ে) বাছা, এইখানে শোও। ভালো লাগবো। ও বউ কই গেলা? তাড়াতাড়ি এই দিকে আহো। তোরা কে কই আছোস জলদি আয়।
পুত্র: বাজান, এই শোয়াই মনে অয় আমার শেষ শোয়া। বাজান কবর সাজাও, কাফন সাজাও। আমারে কাধে করে নিয়ে যাও গোরে।
(বউ, মেয়ে, ছেলে, বোনের আগমন)
দাদা: কী সব আবোল-তাবোল কইতাছো বাজান। কিচ্ছু অইবো না তোমার।
পুত্র: না বাজান, আমার সময় শেষ।
বউ: কি কন আপনে। কবিরাজরে খবর দেই।
পুত্র: নারে বউ, খবর দিয়া মনে অয় লাভ অইবো না......।
দাদা: না, কস কি বাজান? (কপালে হাত রেখে) কথা কঅ বাজান। কিরে বাজান? কথা কস না ক্যান? বাজানরে.....। ও বউ পোলায় আমার কথা কয় না ক্যান?
(সমস্বরে কান্না)
(আলো নিভে যাবে। আবার জ্বলে উঠবে।)
বৃদ্ধ: তোর বাজানরে যহন কবর দিতে নিয়া যাইতাছি। তুই তহন কইলি, মোর বাজানরে কই লইয়া যাও দাদু? সেই দিন তোর কথার কোন জওয়াব দিতে পারি নাই।
নাতি: তারপর কি অইলো দাদু?
বৃদ্ধ: তোর বাপের মৃত্যুর পর তোর মাও জানি ক্যামন অইয়া গ্যালো। তোর বাপের লাঙল-জোয়াল দুই হাতে জড়ায়া ধইরা সারাদিন-রাত তোর মা কানতে লাগলো। তার কান্দনে গাছের পাতারা ঝইরা পড়তো। গায়ের পথিকরা তার কান্দন শুইনা চোখ মুছতে মুছতে যাইতো। আথালের দুইটা জোয়ান বলদ সারাক্ষণ হাম্বা-হাম্বা কইরা ডাকতো। তাগো গলা ধইরা তোর মায়ও কানতো।
নাতি: (চোখ মুছতে মুছতে) তারপর?
বৃদ্ধ: কানতে কানতে তোমার মারও অসুখ করলো। একদিন.......
(আলো নিভে যাবে। আবার জ্বলে উঠবে।)
(পুত্রবধূ একটা মাদুর পেতে শুয়ে আছে। পাশে একটা কলস আর গ্লাস। এমন সময় দাদা ও নাতির আগমন।)
পুত্রবধূ: বাছারে, একটু আমার ধারে আয়আহারে, পোলাডা আমার ক্যামন হুগায়া যাইতাছে। মার অসুখ বইলা ঠিকমতো খায়ও না। বাজান, আমি বোধ অয় আর বাঁচুমনা।
দাদা: কও কি বউ মা। আজেবাজে কথা কইও না। আমার নাতিনডা রইলো অর শ্বশুর বাড়ি। খাড়াও আমি খবর পাডাইতাছি।
পুত্রবধূ: না বাজান, খবর পাডায়া লাভ অইবো না। আইয়া আমারে আর পাইবোনা মনে অয়। বড় দু:খ অয়, আমার মাইয়াডা সংসারে শান্তি পাইলো না। তহনই কইছিলাম, অতো ছোডো মাইয়া বিয়া দিম না। আপনেরা আমার কথা হোনলেন না।
দাদা: তহন কি জানতাম, অরা এতো কসাই-চামার। জামাইর বাপ-মা সুবিধা না। সব কপালের ফ্যার।
পুত্রবধূ: বাবা, আমার মাইয়াডার দিকে একটু খেয়াল রাইখেন। অর যাতে কষ্ট না অয়। আমি মনে অয় মইরাও শান্তি পাইমু না।
দাদা: তুমি চিন্তা কইরো না বউ মা। আমি অর খোঁজ নেই মাঝে মাঝে।
পুত্রবধূ: (ছেলেকে) াছারে আমি চইলা যাইতাছি। বড় দু:খ রইলো। দুনিয়াতে তোর মা বলতে কেউ রইলো না। দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষ্মী আমার। অনেক কষ্ট অইতাছে তোরে ছাইড়া যাইতে। (শ্বশুরকে উদ্দেশ্য করে) বাবা, স্বামীর মাথার মাথাল খানি আমার কবরের বাম দিকে ঝুলাইয়া দিয়েন।
(কান্নার শব্দ)
(আলো নিভে যাবে। আবার জ্বলে উঠবে।)
(বৃদ্ধ ও নাতির আগমন।)
বৃদ্ধ: সেই মাথাল গইলা-পইচা মাটির সাথে মিইশা গেছে। কিন্তু পরাণের ব্যতা কমেনা। ক্ষণে ক্ষণে তা জাইগা ওঠে। জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু­ছায়, গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়। জোনকি ­মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালায়া দেয় আলো, ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো। হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়; ভেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!
(দাদা ও নাতি হাত তুলে মোনাজাত করে। মোনাজাত শেষ করে।)
নাতিঃ আইচ্ছা দাদু, অই কবরটা কার?
বৃদ্ধঃ ওইটা তোমার বুজির কবর পরীর মতন আছিল দেখতে বিয়া দিছিলাম কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে। এত আদরের বুজিরে তারা মোটেও ভালবাসত না, হাতে যদিও মারত না তারে, ঠোঁটে মারত শতবার খবরের পর খবর পাঠাইত, দাদু যেন কাল আইসা দুই দিনের লাইগা মোরে বাপের বাড়ির নিয়া যায় তার শ্বশুর কসাই-চামার, সহজে দিতে চায়না। অনেক কইয়া সেইবার তারে এক শীতে বাড়ি আনছিলাম

(আলো নিভে যাবে)
(মঞ্চে নাতনির আগমন। মুখ মলিন দু’টি চোখে অশ্রু বাবা- মায়ের কবরে বসে কাঁদে। এমন সময় দাদার আগমন।)
দাদুঃ (মাথায় হাত রেখে) এমন মন মরা অইয়া থাকলেতো তোমারও অসুখ করব। হারাদিন কান্নাকাটি করলে মরণ­ রোগ তোমারেও খাইব।
নাতনিঃ বাইচা থাইকা কি করুম দাদু? বাপ-মা নাই। শ্বশুর- শাশুরি উঠতে - বসতে গালমন্দ করে।
দাদাঃ (চমকে উঠে) হায় হায় রে, জ্বরে তোমার গা দি পুইরা যাইতাছে। তাড়াতাড়ি ঘরে লও।
নাতনি: দাদা, আমার ফুপু কই? ছোড ভাইডা কই গ্যালো?
দাদা: অরা মনে অয় পাশের বাড়িতে টোহাপাতি খেলে। তুমি ঘরে লও। অরা একটু পরই আইয়া পড়বো।
নাতনি: চলেন যাই। গায়ে তো জোর পাইতাছি না।
দাদা: হুজুরের পানি পড়া খাইলে ঠিক অইয়া যাইবো। কবিরাজের তোন বড়ি আনছি। খাইলে দ্যাখবা শরীরে জোর পাইবা।
(উভয়ের প্রস্থান)
(বৃদ্ধ ও নাতির আগমন।)
নাতি: তারপর আমার বুজির কী অইছিলো?
বৃদ্ধ: কী জানি পচানো জ্বরে ধরল আর সাইরা উঠল না, এই খানে তারে কবর দিছি দেখে যা দাদু (একটু থেমে) ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেউ ভালো কবরে তার জড়ায়ে আছে বুনো ঘাসগুলি কালো। বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন পাতায়-পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ। হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়। আমার বু­জীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।
(বৃদ্ধ ও নাতির মোনাজাত। মোনাজাত শেষে।)
নাতিঃ অই কবরডা কি আমার ছোট ফুফুর?
বৃদ্ধঃ হ, ওই খানে ঘুমায় তোর ছোট ফুপু সাত বছরের মেয়ে রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে। ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা অতটুকু বুকে লুকাইয়া আছিল কে জানিত কত ব্যথা! ফুলের মতন মুখখানি তার দেখতাম যবে চেয়ে তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে। বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।
নাতিঃ দাদা, কি হয়েছিল ফুফুর?
বৃদ্ধ: একদিন গজনার হাটে গেলাম। আইসা দেহি মা আমার পথের মধ্যে গড়াগড়ি খায়.......।
(আলো নিভে যাবে। আবার জ্বলে উঠবে।)
(রাস্তায় পরে আছে মেয়ে। ধুলার মধ্যে গড়াগড়ি খায়। দাদু সে পথ দিয়ে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ দেখতে পায়। এগিয়ে যায়।
দাদু: কিরে মা, কি হইছে তোর?
মেয়েঃ বাজান, ওই ঝোপের মধ্যে থেইক্যা কিতে জানি মোরে কামড় দিছে।
দাদা: কিতে কামড় দিছে? তুমি দেহো নাই।
মেয়ে: না, মনে অইলো খোঁচা খাইছি। আস্তে আস্তে দেহি শরীল জ্বালা-পোড়া করে।
দাদা: কস কি মা?
মেয়ে: হ বাজান, আমার জানি কেমন লাগতাছে। আমারে বাঁচাও বাজান, আমারে বাঁচাও।
দাদুঃ (কোলে নিয়ে) কিচ্ছু অইব না মা, তোর কিচ্ছু অইব না। আমি তোরে ওজার ধারে লইয়া যাইতাছি। বিষ নামাইলে তুই ভালো অইয়া যাইবা। (দ্রুত প্রস্থান)
(আলো নিভে যাবে আবার জ্বলে উঠবে।)
(ওজার বাড়ি প্রবেশ। উঠানে রেখে।)
দাদুঃ কবিরাজ, তাড়াতাড়ি বাইরে আস। আমার মাইয়াডারে বাঁচাও।
(ওজা বেরিয়ে আসে।)
কবিরাজঃ কি অইছে?
দাদুঃ আমার মাইয়ারে সাপে কাটছে। তাড়াতাড়ি বিষ নামানোর ব্যাবস্থা কর।
(বিষ নামানোর আয়োজন করে। আঙুলে ডোর পেচিয়ে বিষ নামানেরা চেষ্টা করে। মেয়ে বাবার কোলে ঢলে পড়ে।)
দাদুঃ কিরে মা কথা কস না ক্যান? ও কবিরাজ, মাইয়া তো ঢইলা পড়ছে?
কবিরাজঃ (পরীক্ষা করে) নারে ভাই, বাঁচাইতে পারলাম না। অনেক দেরি অইয়া গেছে।
দাদা: ক্যামন ওজা অইছো তুমি? আমার শেষ সম্বলডাও বাঁচাইতে পারলা না। কোন ক্ষমতা নাই তোমার হাতে।
কবিরাজ: বাঁচা-মরার মালিক আল্লাহ। আমিতো উছিলা মাত্র। কি আর করবা? যাও, আল্লার মাল আল্লায় নিয়া গ্যাছে। তোমার আমার এতে কোন হাত নাই।
(কাঁদতে কাঁদতে মেয়েকে নিয়ে প্রস্থান।)
(আলো নিভে যাবে আবার জ্বলে উঠবে। বৃদ্ধ ও নাতির আগমন।)
বৃদ্ধ: সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে। কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে। আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি দাদু! ধর­ধর­ বুক ফেটে যায় আর বুঝি নাহি পারি। এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু, কথা কস নাকো জাগিয়া উঠিবে ঘুম­ভোলা মোর যাদু।
নাতিঃ লও দাদু, বাড়ি যাইগা। সন্ধ্যা হইয়া গেছে।
বৃদ্ধ: ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে। মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুর, মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূর। জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান। ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু­ব্যথিত প্রাণ।
(দুজন মোনাজাত করে। মোনাজাত শেষে বেজে উঠবে-একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘর রে মন আমার, কেন বান্ধ দালান-ঘর।
(আলো নিভে যাবে।)
সমাপ্ত
বি:দ্র: পরিবেশনার স্বার্থে কিছু কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। মহড়া শেষে পূর্ণাঙ্গ নাট্যরূপ ফুটে উঠবে।

:: অন্ধকারে বেশ্যা ও পথিক ::

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::

রোজ সন্ধ্যার পর থেকেই ওরা কাকরাইল মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইদানিং অনেকেই বোরকা পরে দাঁড়ায় কে বেশ্যা, কে ঘরণি বোঝা মুশকিল পথেই হেঁটে যায় সুমন অফিস থেকে বাসায় যেতে এটাই একমাত্র পথ

যেতে যেতে দাঁড়িয়ে থাকা নিশিরমনীর শরীর দেখে বুকের উচ্চতা মাপে কোমরের ভাজ খোঁজে জিহ্বা দিয়ে ঠোট টেটে বাসায় গিয়ে বাথরুমে ঢোকে বের হয়ে বিছানায় মিনিট বিশেক নিথর হয়ে পড়ে থাকে

রোজই সুমনের ইচ্ছে হয় দরদাম করার সাহস হয় না আজ সাহস করে দাঁড়ায় অপেক্ষাকৃত কমবয়সী এক রমনীর সামনে দাঁড়াতেই- ‘কি লাগবো নাকি? এক্কেবারে টাইট এহনো
সুমন লজ্জা পায় আস্তে বলে, ‘হুম...কত?’
এক ঘণ্টা না সারারাইত?’
সুমন বলে, ‘বাসা খালি সারারাইত।’
‘বেশ, তাইলে তিন হাজার।’
দূর মাগি এত ক্যান? তাইলেতো সানি লিওনরেই আনতে পারি।’
তাইলে যা, আমার কাছে ক্যান?’
মাসে কামাই আট হাজার আর এক রাইতেই... ব্যবসাতো ভালোই।’

ক্ষেপে যায় স্বঘোষিত সুন্দরি চেচিয়ে বলে, ‘ওই খানকি মাগির পোলা, অ্যাতো চটাং চটাং কথা কস ক্যান? কামাই নাই তয় মাগি খোঁজস ক্যান? কয়জনরে তুই বিনাপয়সায় নষ্ট করছোস? চুতমারানির পো, কাম ফুরাইলেই খিস্তি-খেউর থুতু ছিটাস বেশ্যার গায়।’
‘চুপ শালি চিল্লাস ক্যান এক হাজার দিমু যাবি কিনা বল।’
বলতেই চারদিক থেকে সুমনকে ঘিরে ধরে রাতের অপ্সরীরা চেচিয়ে বলে, ‘দিনের বেলা সাধু, বড় বড় বুলি আওড়াও আন্ধার রাইতে চুপি চুপি খানকি মাগির শরীর তোগাও? তোরা ধর শালারে, ধর।’

তারপর আর কিছুই মনে নেই সুমনেরসকালে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙে চোখ মেলে তাকাতেই সুন্দরী সেবিকা দাঁড়িয়েআমি এখন কোথায়?’
আপনি হাসপাতালে রাস্তা থেকে তুলে এনে কারা যেন রেখে গেছেন আত্মীয়-স্বজন থাকলে খবর দিন।’
সুমন আসহায় চোখে সেবিকার দিকে তাকিয়ে থাকে
এই নিন, এ ওষুধগুলো আনতে হবে।’
সুমন সম্ভিত ফিরে পায়।

হাতের ঘড়ি, আংটি, পকেটে মানিব্যাগ, মুঠোফোন কিছুই নেই। তিন হাজারেরও বেশি লোকসান হয়ে গেল। ব্যথাটাও চিনচিন করে বেড়ে উঠছে।

মালিবাগ মোড়, ঢাকা।
আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

:: মাউছ্যা ভূত ::


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
রাত জেগে মাছ ধরার কারণে সবাই মোতালেবকে ‘মাউছ্যা ভূত’ বলে ডাকে।তাতে তার কিছু যায় আসে  না। সারাদিন রাজ্যের খাটাখাটুনির পরও রাতে মাছ ধরাই তার শখ।

প্রতিরাতে খেয়ে-দেয়ে খ্যাপ জাল আর একটা পাতিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মোতালেব। গ্রামে রাত বলতে আটটাই অনেক রাত। উড়ার চর গ্রামে তখনো বিদ্যুৎ আসেনি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে তেলের বাতি বা হারিকেন নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। শুধু শুধু তেল পুড়বে কেন? দু’চারটা ঘরে যারা পড়াশুনা করে তারা বড়জোর রাত ১০টা পর্যন্ত সজাগ থাকে। এছাড়া সবকিছু নিশ্চুপ নিঝুম। যেন এক ভুতুড়ে গ্রাম।

রাতে বের হলে গা-টা একটু ছমছম করে। ঘর থেকে আড়িয়াল খাঁ নদ বেশি দুরে নয়। তবে একটা চর পার হতে হয়। একসময় আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে উড়ার চরের প্রায় অর্ধেকটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তারপর নাকি বাহাদুরপুরের পীর সাহেবেদের তাবিজ পড়ায় নদী ভাঙন রোধ হয়। কিছুদিন পরে এ চর জাগে।

চরে এখন কয়েকটা বাড়ি-ঘর হয়েছে। বান্দা গ্রাম যাদের জায়গা-জমি কম, তারা চরে গিয়ে বাড়ি করেছে।তাদের বেশির ভাগই মৎস্যজীবী। নদীকেন্দ্রীক তাদের জীবন। মোতালেব বান্দা গ্রামে থেকেও মাছের নেশায় বুদ হয়ে থাকে। মাছ ধরতে তার কোনো সঙ্গী লাগে না। একাই যায়, একাই মাছ ধরে, একাই বাড়ি ফেরে। কাউকে সাথে নিলে আবার ভাগ দিতে হবে। কেনো দিন পাতিল ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরে। যেদিন মাছ কম পায় সেদিন ভোর হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার নামগন্ধ থাকে না। বাড়ি এলে বাবা-মার বকুনি শুনতে হয়। বাবা বলে, ‘অ্যাতো ডাঙ্গর অইছে তাও বোধ-বুদ্ধি নাই।’ মোতালেবের তাতে কী আসে যায়? মাছ রেখে পুকুরে যায় গোসল করতে। গোসল করে এসে যা পায়- তাই খেয়ে নেয়।

সকালে ওয়াজেদ বেপারীর দোকানের সামনে মাছগুলো নিয়ে বসে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। কী আনন্দ মোতালেবের। পকেট ভর্তি টাকা। অর্ধেক বাবাকে দিয়ে বাকিটা নিজের ব্যাংকে জমা রাখে। ব্যাংক বলতে বছর দুয়েক আগে বড় ফাইলের একটি বাঁশ কেটে একটা ব্যাংক বানিয়েছে। বাঁশের এক গিট থেকে অন্য গিট পর্যন্ত রেখে উপরে একটা ফুটা করে নিয়েছে। কত টাকা জমা হয়েছে আজও জানে না সে। কেবল রেখেই যাচ্ছে।

মাছ ধরা টাকা নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার। এখনো বিয়ে করেনি। বিয়ে করতে হলে টাকা জমাতে হবে। তাই জমায়। কয়েকটা মেয়ে ইতিমধ্যে দেখেছে। কিন্তু মনমতো হচ্ছে না। দেখুক না আরো। পছন্দসই হলে বিয়েটা করে ফেলবে।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে ভাবতে হিজল গাছটার কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় মোতালেব। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস লাগে গায়। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। শরীরের মধ্যে শিরশির করে ওঠে। এদিক-ওদিক তাকায়। না, কিছুই না। তবে গা ছমছম করছে কেন? লুঙ্গির গাটে বাঁধা প্যাকেট থেকে একটা চাঁন বিড়ি বের করে ধরায়। আগুন দেখলে ভুত-পেত্নী কাছে আসার সাহস পায় না। হিজল গাছের ঝোপের মধ্যে খছখছ শব্দ হয়। কিছু একটা উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। মনে মনে ভাবে, ধুত্তরি, কোন পাখি-টাখি অইবো হয়তো।খালি খালি ভয় পাইতাছি ক্যান?

সামনের দিকে এগিয়ে যায় মোতালেব। কিছুদূর যেতেই মনে হয় পেছনে পেছনে কেউ হেঁটে আসছে। পেছনে তাকালে কিছুই দেখা যায় না। ভাবে, পায়ের আওয়াজ আসে কোত্থেকে? কোনো উৎস খুঁজে পায় না। তবুও ভয়ে গা শিউরে ওঠে। গা ছমছম করে। মনে মনে একটু সাহসও পায়। সাথে লোহা থাকলে ভুত-পেত্নী আসে না। লোহাতো আছেই। কাধে ঝোলানো জালটাকে জোরে ঝাকি দেয়। জালের সঙ্গে থাকা লোহার কাঠিগুলো ঝনঝন শব্দে বেজে ওঠে। একবুক সাহস নিয়ে এগিয়ে যায় নদীর দিকে।

নদীর পাড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে জালটা ঠিক করে নদীর জলে খ্যাও মারে। দুহাতে টেনে তোলে। হঠাৎ পিছনে শো শো বাতাস। পাট-মেস্তা গাছগুলো বাতাসে হেলে পড়ে। পেছনে তাকাতেই সব স্বাভাবিক। আবারও একটু ভয় দানা বাঁধে মনে। জাল ততক্ষণে উপরে উঠে আসে।

আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। তারা জ্বলে মিটিমিটি। আলো-আঁধারির খেলা। হালকা আলোয় সাদা সাদা ছোট-বড় মাছগুলো চিকচিক করছে। মাছ পাওয়ায় আনন্দে মোতালেবের চোখও চিকচিক করে ওঠে। জাল থেকে মাছগুলো ছাড়িয়ে পাতিলে রাখে। মাছ পাওয়ার আনন্দে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মন থেকে ভয় নামক দানবটি সরে যায়। এগিয়ে যায় নদীর বাঁকে। যে বাঁকটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে সূর্যমনির দিকে। রাত বলেই ট্রলার চলাচল বন্ধ। একটু দূরে ছোট ছোট নৌকায় মিটমিট করে জ্বলছে আলো। যার নৌকা আছে- সে নৌকায় বসে মাছ ধরে।

নদীর বাঁকে গিয়ে পাতিলটা মাটিতে রেখে আরেকটা খ্যাও মারে। একটু দম ধরে। জালটা পানির নিচে মাটি অবধি পৌঁছে থিতু হওয়ার সুযোগ দেয়। লুঙ্গির কোচর থেকে একটা চাঁন বিড়ি বের করে ধরিয়ে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে টানতে থাকে। শুরু হয় জাল ওপরে তোলার পালা। জালটা মনে হলো হালকা। খুব সহজেই উঠে আসে। দুএকটা পুটি ও ট্যাংরা লেপ্টে আছে। একটা পুটি মাছ খুলে পাতিলে রাখতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া। একি? পাতিল শূন্য। মাছ গেলো কোথায়? ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। হাত-পা কাঁপতে থাকে।ভূতেরা মাছ খায়। পুরুষ হলে তাকে ‘মাউছ্যা ভূত’ আর স্ত্রী হলে ‘মাউছ্যা পেত্নী’ বলে। মোতালেব নিশ্চিত। এ তবে ভূতের কারবার। আজ তাহলে রক্ষা নাই।

ভয় আর উৎকণ্ঠায় দম খিঁচে বিড়ি টানতে থাকে মোতালেব। অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকায়। কোনো জনমানবের সাড়াশব্দ নাই। হঠাৎ মনে পড়ে মোতালেবের দাদা ইব্রাহীম বেপারি ভূতের গল্প বলতেন। তখন সেগুলোকে গল্প মনে হলেও এখন বাস্তব ভূতের খপ্পড়ে পড়েছে সে। বাড়ির পিছনে থেকেই তার পিছু নিয়েছে ভূত। বুঝতে বাকি নেই। বাড়ির পিছনে শিমুল গাছের সাথে আব্দুর রহিম শিকদার ভূত বেঁধে রেখেছিলেন। একথা তাহলে সত্যি। রহিম শিকদার বেঁচে নেই। তাই হয়তো ভূতগুলো মুক্তি পেয়েছে। 

ওয়াজেদ বেপারির দোকানের সামনে বসে একদিন শুনেছিলো- একবার নাকি মাছ ধরতে গিয়ে ভূতের সাথে ধস্তাধস্তি হয়েছে বশার রাঢ়ির। সেকি মারামারি। সারারাত কুস্তি। বশার রাঢ়িও কম না। পিছু না হটে ভূতের সাথে মারামারি জুড়ে দিলেন।প্রথমে নাকি বিশাল ষাড়ের মতো ছুটে আসলো। বশার রাঢ়ি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শিং দুটো ধরে হ্যাচকা টানে কাৎ করে ফেললেন ষাড়টাকে। গৎ করে একটা শব্দ হলো-তারপর উধাও।

হঠাৎ পেছনে ম্যাও ম্যাও শব্দে ডেকে উঠলো একটা কালো বিড়াল। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। তেড়ে আসছে কামড়াতে। বশার রাঢ়ির পায়ে প্লাস্টিকের জুতো। সজোরে লাথি মারলেন। বিড়ালটা ছিটকে পড়লো দূরে। বিড়ালের আর অস্তিত্ব নেই। যেই বাড়ির পথে পা বাড়াবেন অমনি সামনে ফোঁস করে উঠলো একটা সাপ। দৌড়ে পালাচ্ছেন, সাপও পেছন পেছন ছুটছে। দৌড়াতে দৌড়াতে পেয়ে যান কাফলা গাছের ডাল। ভেঙে দাঁড়ান। সাপ কাছে চলে আসে। বশারের নিশানা ভুল হয় না। এক আঘাতে কাৎ। তবু ফণা তুলে আসতে চায়। সপাৎ সপাৎ কয়েক ঘা মরে অর্ধেকটা নরম মাটির মধ্যে পুতে ফেলেন। তবে মজার বিষয় হলো- সকাল বেলা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেলো সেখানে মরা সাপের কোনো চিহ্ন নেই। পড়ে আছে একটা মরা কাক। মোতালেব জানে, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়।

মোতালেব মনে মনে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করে। জালটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় ধরে। এটুকু সাহস তার আছে। লোহার কাঠি সমেত জাল যতক্ষণ তার হাতে থাকবে ততক্ষণ ভূত-পেত্নী কাছে ঘেঁষতে পারবে না। দূর থেকে শুধু ভয় দেখাবে। শত সাহসের মধ্যেও বুকটা কেমন ধুকধুক করে। পেছনে কিছু একটা ভাঙার শব্দ হয়। তাকিয়ে দেখে পিছনের পাটখেত ভেঙে তছনছ করছে কালো রঙের একটা ষাঁড়।
মোতালেবের বুঝতে বাকি নেই- গল্পই এবার সত্যি হলো। এই রাতে একা নদীর ঘাটে। চিৎকার করারও প্রবৃত্তি হয় না। কেইবা শুনবে তার চিৎকার। ভূত আজ সহজেই তার পিছু ছাড়বে না। গলায় বাঁধা তাবিজটা একবার দেখে নেয়। সঙ্গেই আছে। তাবিজে একটা চুমু খায়। তাবিজটা খাদেম আলী শিকদার তাকে দিয়েছিলো। রাত বিরাতে চলাচলের জন্য। তাবিজেও আজ কাজ হচ্ছে না দেখে বিস্মিত মোতালেব। তাবিজের কার্যক্ষমতা কি শেষ হয়ে গেলো? নাকি ‘ছুইৎ’ লেগেছে? বাড়ি গিয়ে সোনা-রূপার পানি দিয়ে ধুয়ে নিবে। কিন্তু সেটা তো পরে। এখনতো রক্ষা পেতে হবে।

ভাঙচুরের শব্দ শেষ। ষাঁড়ও উধাও। পাটখেত আগের মতোই গোছালো। কোনো আলামত নেই। কাউকে বললেও বিশ্বাস করবে না। এমন সময় নারী কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ আসে। ডান দিকে তাকিয়ে অবাক। নদীর পাড়ে পা ছড়িয়ে বসে এক তরুণী কাঁদছে। চাঁদের আলোয় তার ঔজ্জ্বল্য মোতালেবকে হতবাক করে দেয়। মুহূর্তেই অন্য রকম ভালো লাগা অনুভূত হয়। মেয়েটি কাঁদছে কেন? এতরাতেই বা কোত্থেকে এলো? মেয়েটির জন্য মায়া হয়। এগিয়ে যায় মেয়েটির দিকে।

মোতালেব যতটুকু আগায় মেয়েটি ততটুকু দূরে সরে যায়। এভাবে ১০ মিনিট আগানোর পর মেয়েটি দাঁড়ায়। মোতালেব মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিকট হাসিতে মাঠ কাপিয়ে তোলে মেয়েটি। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে আগুনের ফুলকি। মোতালেব মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে মেয়েটি নেই। মোতালেব আস্তে আস্তে ঢলে পড়ে মাটিতে।

তখন ভোরের আলো ফুটেছে। নদীর পাড়ে যারা নৌকা ভিড়িয়েছে তাদের ভিড় এখন মোতালেবকে ঘিরে। মোতালেব চোখ তুলে তাকায়। তাকে ঘিরে আছে গ্রামের মানুষ। কিছুটা অবাক হয়। কিছুই মনে পড়ে না তার। কোথায় জাল আর পাতিল ফেলে এসেছে বলতে পারে না। কেউ একজন নদীর কিনারা থেকে কুড়িয়ে আনে। মোতালেবের বাড়ির লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। সোনা-রূপার পানি দিয়ে গোসল করায়। ফকির-কবিরাজ ডেকে আনে। ফকির বাবা বলেছে, ‘তাক্কুর তুক্কুর, তাকে বলে দিও। সে বাঁচবে কি বাঁচবে না। শক্ত সামর্থ ছোকড়া, তাকে রূপবতীর হাতে পানি পান করাও।’ যার সারমর্ম- ছেলেকে বাঁচাতে হলে শিগগিরই বিয়ে দাও। 

এবার জোরেশোরে চলছে মেয়ে খোঁজা। পাশের ভবানী শংকর গ্রামে এক মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেলো। মোতালেবকে সাথে নিয়ে চলল তার বাপ-চাচারা। নাস্তা-পানি খাওয়ার পর মেয়েকে আনা হলো সামনে। শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের মেয়েটির মুখখানা একনজর দেখানোর জন্য ভাবি জাতীয় কেউ মুখের ঘোমটাখানা সরালো। মোতালেব একনজর তাকিয়েই চিৎকার করে উঠলো। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘না, এইডাতো সেই মাইয়া। রাইতে যারে দেখছিলাম।’ বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে। মোতালেবকে ধরার জন্য পেছন পেছন ছোটে কয়েকজন। মোতালেবকে ছোঁয়ামাত্রই অজ্ঞান হয়ে যায়। 

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
বিজয় নগর, ঢাকা।
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

ভাব ও অভাবের তাড়নায় আমি লিখি

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::
মাদারীপুরের প্রথম শ্রেণির আলোচিত ‘সাপ্তাহিক আনন্দবাংলা’য় নিয়মিত লিখতে গিয়ে অনেক প্রশংসা পেয়েছি আবার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। মাদারীপুরের যৌনকর্মীদের ওপর লেখার জন্য পত্রিকার প্রকাশক শহীদুল কবির খোকন, সম্পাদক ইয়াকুব খান শিশির ও প্রধান সম্পাদক সুবল বিশ্বাস বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি সম্পাদকের ছাত্র বা শিষ্য। তার দয়ায় লেখার অনুমতি পাই। তাই পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য লিখি। মূলত অন্যরা যা নিয়ে মাথা ঘামায় না আমি তা নিয়েই উঠে-পড়ে লাগি।
কেন লিখি? এমন প্রশ্ন করলে বলব, ভালো লাগে তাই। এছাড়া আমি চাঁপা স্বভাবের মানুষ। সব কথা বলতে পারিনা তাই লিখে প্রকাশ করি। ভালো লাগা থেকে শুরু হলেও এখন তা ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। আর ভালোবাসার প্রতি একটা দায়িত্ববোধ এসে যায়। মূলতো আমি আশাবাদী ও স্বপ্নবিলাসী। তবে আমার কোন উচ্চাশা নেই। আমার আশাবাদ ও স্বপ্নবিলাসই আমাকে লেখক হতে উৎসাহ যুগিয়েছে। লেখকের মাঠে আমি কচ্ছপগতীর একজন প্রতিযোগী। অনেকের চেয়ে অনেক পেছনে। তাই বলে আমি থেমে নেই। লিখছি এবং লিখব। এটাই আমার দৃঢ় প্রত্যয়।
সেই তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন একটা গল্প লিখেছিলাম। লিখে লুকিয়ে রাখলাম। তবুও তা পরিবারের কর্তাব্যাক্তিদের হাতে পৌঁছে গেল। স্কুল থেকে ফিরে দেখি সবাই আমাকে দেখে মুচকি হাসছে। মা জানালেন আসল ঘটনা। আমি লজ্জা পেলাম। আমার লেখালেখির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার মরহুম নানাজান মাওলানা আফসার উদ্দিনের। ছোটবেলায় নানার কাছে থাকতাম। নানা রাত জেগে কী সব বই পড়তেন। আমিও পড়তে শুরু করি।
কবি-লেখকদের জীবনী আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে। নিজেও লিখতে চেষ্টা করি। সে সময়ের লেখাগুলো এখন আমার কাছে নেই। থাকলে হয়তো নিজেই লজ্জা পেতাম। এখনো খুব ভালো লিখি কি না জানিনা। তবে প্রতি সপ্তাহে দু’একটা লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাঁপা হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন পাঠ্য বইয়ের একটা কবিতাকে নকল করে একটা কবিতা লিখেছিলাম। আমার মামা মাওলানা মেজবাহ উদ্দিন সেটা দেখে বললেন,‘অন্যেরটা নকল করে কেন? নিজে লেখার চেষ্টা করো।’ তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়। আমার নানা-মামা দু’জনেই ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও সাহিত্যকে সমাদর করতেন। নিজেরাও প্রচুর পড়তেন।
এক বালিকার প্রেমে পড়ে ডজনখানেক প্রেমের কবিতা লিখলাম। বন্ধুরা কবিতা ধার নিত। কাউকে আবার প্রেমপত্র লিখে দিতাম। নিজেও একটা প্রেমপত্র লিখে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম। ‘প্রিয় নদী, নদ যেমন নদীর কাছে ছুটে যায়। আমিও তেমন তোমার কাছে ছুটে যাই।’ এটা নিয়ে বকুনি খেতে হয়েছে। যদিও পত্রটা পাত্রীর কাছে পৌঁছানোর আগেই বড়ভাই মোসলেহ উদ্দিনের হাতে পড়ে। মূলত কবি বলেই ভেতরে একটা প্রেমিক প্রেমিক ভাব চলে আসে। এই ভাব থেকেই লেখক হওয়ার বাসনা আরো তীব্র হয়।
অভাব একটা মূল কারণ। দাদার মৃত্যু ও নদী ভাঙন আমাদের অভাবের মুখে ফেলে। টেনেটুনে সংসার চলছে। কোন আবদারই বাবা পূরণ করতে পারেন নি। অভাবের কারণেই নানা বাড়ি থাকতে হয়েছে আমাকে। এক কথায়, ভাব আর অভাবের সংমিশ্রণে কবিসত্ত্বা জেগে উঠেছে।
এখন ভাব আছে অভাব নেই। তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে শূন্য মনে হয়। কখনোই মানুষের জীবনে পূর্ণতা আসে না। কিছু না কিছুর অভাব থেকে যায়। বা লেখক-কবির অন্তরে অভাব থাকতে হয়। সেটা হতে পারে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অভাব। এসএসসি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে লেখার ভাবটা তীব্র হয়ে ওঠে। আমার মেজভাই নুরুদ্দিন আহমেদ বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। রাতে ঘুমুতে গেলে তিনি বকতে থাকেন। ‘রবীন্দ্রনাথ-নজরুল হবা। লেখা-পড়া নাই। সারাদিন কবিতা’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। আমি চুপ। কথার জবাব দিলেন বড়ভাই। ‘লিখুক না। সমস্যা কী লিখলে। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলতো একদিনেই বিখ্যাত হননি।’ আমি মনে মনে আন্দোলিত হই। উৎসাহ পাই। যা হোক অন্তত একজন আমার পাশে আছে। পরীক্ষার রাতেও কবিতা লিখেছি। অনেক টেনশন হলে কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়।
এইচএসসি পড়ার সময় একটা টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে যাই। সবাই ধরে নিয়েছিল- আমাকে দ্বারা লেখা-পড়া হবে না। অবস্থাটাও তেমন। ভর্তি হয়ে ক্লাসে যাইনা। ঢাকা থেকে চলে আসি গ্রামের বাড়ি। উপন্যাস লিখতে শুরু করি। দু’তিনটা লিখেও ফেলি। কিভাবে ছাঁপানো যায়? চিন্তাটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। উপায় খুঁজে পাইনা। বাংলাবাজারের অনেক প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করি। তাতে টাকার প্রয়োজন। ফিরে আসি। তবুও থেমে নেই। লিখে যাই প্রতিনিয়ত। আমার কবিতার খাতার কিছু পাঠক তৈরি হয়। তারা পড়ে উৎসাহ দেন। ভালো লাগে। পোশাক-আশাক, চলা-ফেরায় পরিবর্তন আসে। চটের ব্যাগ কিনি। পাঞ্জাবী-পাজামা পড়ি। সবাই ‘কবি’ বলে ডাকে। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়। একটা লেখাও প্রকাশ হলোনা।
লেখা প্রথম প্রকাশ হয় খালাতো ভাই লুৎফর রহমানের সাহায্যে। ২০০৩ সালে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায়। ছাপার হরফে আমার কবিতা দেখে সেদিন যে আনন্দ পেয়েছিলাম। তা আজ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সম্মান শ্রেণিতে পড়তে এসে শ্রদ্ধেয় স্যার ইয়াকুব খান শিশিরের সান্নিধ্যে লেখালেখির তাড়নায় যুক্ত হয়ে যাই মফস্বল সাংবাদিকতায়। সংবাদের পাশাপাশি লেখালেখির একটা প্লাটফর্ম পেয়ে যাই। কলেজের নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম গল্পেই বিশেষ পুরস্কার পেয়ে গেলাম। পুরস্কারের সুবাদে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিশ্লেষণ’ ও ‘সাপ্তাহিক আনন্দবাংলা’য় লেখার জন্য অনুমতি পেলাম। ২০০৮ সালে দৈনিক দেশবাংলার সাহিত্য পাতায় কবিতা ছাপা হলো। এরপর থেমে থাকতে হয়নি। জেলার গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় দৈনিকসহ সাহিত্যের ছোটকাগজে লেখালেখি শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লেখা আহ্বান করে। খুলনা, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, নীলফামারি, জামালপুর, হাতিয়া, আগৈলঝাড়াসহ বিভিন্ন শহর থেকে আমার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সর্বোপরি দেশের বাইরে ভারতের কোলকাতার ‘কারক’ সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হওয়ার আনন্দে এখনো চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। আর এ লেখাটা মূলত সম্পাদকের নির্দেশে। নির্দেশ বলবো একারণেই যে, আমার কাছে লেখা চেয়ে অনুরোধ করার মতো ক্ষুদ্র মানুষ তিনি নন। বরং আমার মতো ক্ষুদ্র লেখককে লেখার জন্য বরং নির্দেশ করা যায়।
কেন লিখি? এমন প্রশ্নের জবাবে এতক্ষণ নিজের ঢোল নিজে পেটালাম। আমার ঢোল আমি পেটালে অন্যরা পিটাবে কী? আমি শুধু বলবো- মনের তাগিদেই লিখছি। লেখাটা একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে মন থেকে যখন ভাব ও অভাব দূর হয়ে যায়; তখন কিছুই লিখতে পারিনা। চেষ্টা করেও পারি না। সে সময় অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগি। মনে হয় আমি আমার লেখক সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলেছি। নিজেকে অসহায় মনে হয়। ভাবের জন্য বিরহের দরকার। অভাবের জন্য ঔদাসিন্য দরকার। তখন দু’টাকেই অর্জনের চেষ্টা করি।
‘প্রেমের পরশে প্রত্যেকেই কবি হয়ে ওঠে’ কিংবা কবিতার জন্য কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। আমি প্রেমে পড়ি। কিন্তু আগলে রাখতে পারিনা। সঙ্গত কারণেই বিরহ অবধারিত। তখনই প্রত্যেকটি কথা হয়ে ওঠে একটি কবিতা বা গল্প। সাম্প্রতিক সমস্যাগুলো যখন নাড়া দিয়ে ওঠে- হয়ে যাই বিদ্রোহী। আত্মার প্রশান্তির জন্য রচনা করি নাটক। এবং তাতে নিজেই অভিনয় করি।
লেখালেখি করি ঠিক কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়েনা। মফস্বল শহরে থাকি বলে লেখার জন্য কোন পারিশ্রমিক জোটেনা। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য কাজও করতে হয়। কিন্তু কোন কাজই আমার জন্য স্থায়ী হয়না। কবিতার কারখানায় যেমন শ্রমিক- জীবিকার তাগিদেও শ্রমিক হতে হয়। এখনো পরিবারের গঞ্জনা রয়েছে। রয়েছে প্রিয়তমার তিরস্কার। ‘কিছু একটা করো’র তাগাদা। আমিতো কিছু একটা করছি। কিন্তু তাতে অর্থ নেই। আর সবাইতো অর্থই চায়। তবে আমি বিশ্বাস করি, অর্থ ও খ্যাতি একসাথে আসেনা। লেখালেখির ক্ষেত্রে অর্থ আশা করাটাও অরণ্যে রোদন মাত্র। দেশে হূমায়ুন আহমেদ আর ক’জন?
এবার মূল কথায় আসি। বাংলা সাহিত্যে প্রেম রোমান্স এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবিতা লিখতে গিয়ে কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। অথবা প্রেমে পড়ে তাকে কবিতা লিখতে হয়। দু’টাই চিরন্তন সত্য। কবি মনে প্রেম জাগ্রত না হলে কবিতা হয় না। সাহিত্যচর্চার জন্য প্রেম অনিবার্য। আর সে চর্চাকে অব্যাহত রাখতে হলে বেছে নিতে হয় বিরহকে। কারণ মিলনের চেয়ে বিরহ কবিকে নতুন স্বপ্ন দেখায়। নব সৃষ্টির উন্মাদনা জাগ্রত করে। কবিতার সাথে যেন প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। লোকে বলে- কবি মানেই প্রেমিক। আর প্রেমিক মানেই কবি। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর যিনি জীবনে অন্তত এক লাইন প্রেমের কবিতা বা ছন্দ রচনা করেন নি। সবার জীবনে একবার প্রেম আসে- কথাটা যেমন সত্য; ঠিক তেমনি জীবনে অন্তত একবার কাব্য রচনা বা সাধনা করেন নি একথাও অস্বীকার করার জো নেই। কেউ যদি মনে-প্রাণে,ধ্যানে-জ্ঞানে কবি হন তবেতো কথাই নেই। বর্তমানে যারা খ্যাতনামা কবি বা যারা প্রতিষ্ঠার জন্য কাব্যচর্চা করছেন প্রত্যেকেই হয়তো প্রথম জীবনে কোন বালিকার উদ্দ্যেশ্যে প্রেমকাব্য রচনার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছেন।
পড়নে পাঞ্জাবী-পায়জামা আর পায়ে চটি জুতো পড়ে কাধে একটা চটের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে প্রথম দর্শনেই সবাই তাকে কবি বা লেখক ভাববেন। ভাবাটাই স্বাভাবিক। বেশ-ভূষায় কবি বা লেখক হলেই কী প্রকৃত লেখক হওয়া যায়? যায় না। লেখকের প্রাণশক্তি তার লেখনী। লেখনীর মাধ্যমেই সে পাঠক মহলে কবিখ্যাতি বা লেখক হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন। আসলে লেখক হওয়ার উপায় কী? শুধু কি কালি-কলম-মন দিয়েই লেখা যায়? নাকি আরও কিছু দরকার হয়? আপনারা যারা লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তারা নিশ্চয় এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজছেন।
খালাতো ভাই মহিউদ্দিনের দেখাদেখি লেখালেখি করার সাধ জাগে। তার কন্ঠে আবৃত্তি শুনতাম। সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ বহুবার শুনেছি। তার লেখা একাধিক কবিতাও পড়েছি। তার স্টাইল আমাকে আকৃষ্ট করে। তাকে অনুসরণ করতে শুরু করি। কিন্তু আজ তিনি লেখালেখি জগতে নেই। পারিবারিক সংঘাতে বিপর্যস্ত এক দিকহারা নাবিক। জীবন-জীবিকার সন্ধানে তার কবি প্রতিভা আজ বিলুপ্ত এক ঐতিহ্য। আমি কিন্তু থেমে যাইনি। হেরে যেতে চাইনি বা হেরে যাইনি। আমি এর শেষ দেখবো। লেখালেখির প্রসঙ্গ এলে খুব বেশি মনে পড়ে নানাজান, মামা, বড়ভাই, মেজভাই, বড়দা, শিশির স্যার, ঢাকার কবি মুনশী মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ, জামালপুরের কবি ও রচয়িতা সম্পাদক আরিফুল ইসলাম ও হারিয়ে যাওয়া কবি সেজভাইকে। আমার পিছনে তারা প্রত্যেকেই অনুপ্রেরণা। আমার মাথার ওপরে তারা বটবৃক্ষের ছায়া।
বিশেষ করে আমার বাবা আমার একনিষ্ঠ পাঠক। আমার শুভাকাঙ্খি। তিনি আমাকে ব্যাপক উৎসাহ দেন। যদিও একসময় বিরোধিতা করতেন। কারণ তাকে বোঝানো হয়েছিল- বাংলায় পড়ে ছেলেটা উচ্ছন্নে যাবে। চটের ব্যাগ নিয়ে ঘুরবে। বিশ্রী অর্থে- দাঁড়িয়ে প্রসাব করবে। ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করবেনা। আজ ভুলে গেছি সে সব কথা। বরং সে সমস্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়। কারণ তাদের তিরস্কারের কারণেই আজ আমি অনেক পুরস্কার পাচ্ছি। অনেক ভালোবাসা পাচ্ছি।
লেখা-লেখিটা প্রধানত সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এক ক্ষমতা। ইচ্ছে করলেই লেখক হওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও অধ্যবসায়। ত্যাগের মানসিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। সর্বোপরি লিখতে হলে পড়তে হবে। বিশিষ্ট কবি-লেখকরা অবশ্য একথার সাথে একমত যে, ‘এক লাইন লিখতে হলে দশ লাইন পড়তে হবে।’ পড়ার বা জানার কোন বিকল্প নেই। তথ্য বা শব্দ ভান্ডার হতে হবে সমৃদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাক বা না থাক তাতে কিছু যায় আসে না। সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা একান্ত আবশ্যক। এছাড়া লিখতে গেলে অগ্রজ কাউকে না কাউকে অনুসরণ করতে হয়। অনেকেই অনেক কবি-লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে লেখকের কল্পনা শক্তি হতে হবে প্রখর। লেখকের ‘তৃতীয় নয়ন’ বলে একটা বিষয় আছে। যা আর দশজন সাধারণ মানুষের নেই। কবি ও অকবিদের মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। সাধারণ মানুষ যে জিনিসটি সাধারণ ভাবে দেখে; একজন অসাধারাণ মানুষ সেটাকে অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে। একজন লেখকের দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে আলাদা হতে হয়।
জানি না আমি তেমন হতে পেরেছি কি না? হওয়ার চেষ্টা করছি। আমি যদি ভালো লেখক নাও হতে পারি তবুও আমার অনুরোধ-আপনারা এগিয়ে আসুন। প্রত্যেকটি সমাজে অন্তত একজন করে লেখক থাকা দরকার। যদি বলেন কিভাবে সম্ভব। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সবকিছুর মূলে চেষ্টা। সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা যায়। নিন্দুকের নিন্দা, মানুষের কটাক্ষ, সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেই এ সাধনা চালিয়ে যেতে হয়। দস্যু রতœাকর তপস্যা করে যদি বাল্মিকী হতে পারেন। আপনি কেন পারবেন না। রামায়ণ না হোক একটা নিটোল হাসির গল্পতো লিখে যান। তা পড়ে যদি অন্তত একজনের মুখে হাসি ফোটে তাতেই আপনার সার্থকতা। এবার বলি বিখ্যাত জনেরা লেখক হওয়ার ব্যাপারে কী পরামর্শ দেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতেন, যদি আজকের দিনই হয় আমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে আমার কোন কাজটি সবার আগে করা উচিত? একজন লেখকও এ রকমভাবে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেন শব্দে শব্দে কী লিখতে চান তিনি, কীভাবে লিখতে চান, কী কথাই বা বলতে চান? অমর একুশে বইমেলার বই-গন্ধ গায়ে মেখে তোমরা যারা লেখক হওয়ার পথ খুঁজছ, যারা স্বপ্ন দেখছ ভবিষ্যতের লেখক হওয়ার, তারা তো জানোই শব্দে শব্দে মিল- অমিল দিয়ে লেখক হওয়া এত সহজ কর্ম নয়। এর জন্যও লাগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, পড়াশোনা। তোমাদের জন্য দেশের তিন খ্যাতিমান লেখক এবার জানাচ্ছেন কেন লেখক হলেন তাঁরা, কীভাবে লেখক হলেন। অভিজ্ঞতার আদ্যপান্ত।
লেখক হওয়ার উপায় সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছেন- লিখতে হলে পড়তে হবে। তরুণ লেখকদের প্রতি প্রথমত এটিই আমার বলার কথা। মনে রাখতে হবে, লেখকের পথ বড়ই বিপদসঙ্কুল। এটা সম্পূর্ণ একার পথ। কঠিন এক সাধনা। কোনো লেখকের পক্ষে কি বলা সম্ভব, তিনি কেন লেখক হয়েছেন? মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, লেখক না হয়ে উপায় ছিল না বলেই শেষ পর্যন্ত লেখক হয়েছি। খুব ছোটবেলা থেকে কেন যে কবিতা, গল্প এসব লিখতাম, আজ সেটা স্মৃতি খুঁড়ে বের করা কঠিন। বলা যায়, যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি সেই পৃথিবীর একটা অর্থ ও ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারি লেখার মাধ্যমে। এটি হয়তো প্রত্যেক লেখকই পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে একজন লেখকের সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবী সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট একটা ধারণা থাকা জরুরি। লেখক হতে চাইলে তুমি যা কিছু করতে চাও, তার সবই তোমাকে লেখার ভেতর দিয়ে প্রতিফলিত করতে হবে। ব্যক্তিভেদে একেকজন লেখকের লেখার কৌশল একেক রকম। আমি যেমন সাধারণত একটি লেখা একবারেই লিখে ফেলি। কিন্তু লেখাটি লেখার আগে, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা থাকে বিস্তর। কীভাবে আগের লেখা থেকে নতুন লেখাকে আলাদা করা যায়। এই ভাবনাও থাকে। আমি মনে করি, প্রত্যেক লেখকই তাঁর নিজস্ব জগৎ তৈরি করে নেন একান্ত তাঁর মতো করে।
কবি মহাদেব সাহা বলেছেন, আমি কি কবি হতে পেরেছি? জানি না। মনে পড়ে, ১৯৭৬ সালে প্রেসক্লাব-সংলগ্ন ফুটপাতের ওপর বসে একটানে লিখেছিলাম ‘চিঠি দিও’ কবিতাটি। পরে সেটি প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়। শৈশবে আমার মা বিরাজমোহিনির মুখে রামায়ণ ও মহাভারত শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তখন মনে হতো, বাল্মীকি বা ব্যাসদেবের মতো যদি কবি হতে পারতাম!
তিনি আরো বলেছেন, একটি শব্দের জন্য বসে থেকেছি সারা রাত। জীবনানন্দ দাশ কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা পড়েছি উন্মাদের মতো। পড়েছি জন কিটস, রাইনার মারিয়া রিলকে, ডব্লিউ বি ইয়েটস। পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে হয়তো কবি হয়ে উঠেছি আমি। আমার মনে হয়, পৃথিবীতে কবি হচ্ছে একমাত্র অবিনাশী সত্ত্বা, রাজা, সম্রাট তাঁর কাছে কিছু নয়। তাই কবি বা লেখক হতে গেলে যেমন পড়াশোনা জরুরি, তেমনি দরকার লেখকের স্বাধীন সত্ত্বা। কারও পরামর্শ নিয়ে কেউ কোনো দিন কবি হতে পারে না।
অদিতি ফাল্গুনীর বক্তব্য এরকম, যদি মেয়ে না হতাম, তাহলে আমি হয়তো কখনোই লেখক হতাম না। কথাটি খোলাসা করি, মেয়ে হওয়ার কারণে আমার পৃথিবী সঙ্কুচিত হয়েছে। সেই শৈশব উত্তীর্ণকালে আমার বয়সী বন্ধুগোত্রীয় ছেলেরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখেছে, আমার দেখা ছিল তাঁদের থেকে ভিন্ন। শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে আমার পৃথিবী যে ছোট হয়ে এল, এই বেদনাবোধই আমাকে লেখক করে তুলেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতিকূলতা অনেক সময় আমাদের ভেতরের আগুনকে উসকে দেয়।
আমাদের বাড়িতে বড় একটি পাঠাগার ছিল। সেখানে ছিল রুশ সাহিত্যসহ নানা ধরনের বই। এ ছাড়া কলেজের গ্রন্থাগারে পড়েছি গ্রিক নাটক। এই পাঠ আমাকে পুষ্টি দিয়েছে। একসময় পাহাড়ে ওঠার খুব শখ ছিল, পারিনি। শেষমেষ দেখি, গল্প-কবিতা লিখতে লিখতে লেখকই হয়ে উঠেছি!
লেখালেখির জন্য প্রথমত ভাষাগত প্রস্তুতি থাকা খুব দরকার বলে আমার মনে হয়। আর ভাষাগত প্রস্তুতি গড়ে ওঠে মহৎ সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে। বাংলা ভাষায় লিখতে হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়া যেমন আবশ্যক তেমনি অন্য ভাষার মহৎ সাহিত্যিকদের লেখাও পাঠ করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে আমার নানার অনুপ্রেরণায়। তিনি রাত জেগে পড়তেন। দেশি-বিদেশি সবধরণের সংগ্রহ ছিল তার। মাঝে মাঝে লিখতেন। ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন। তার সংস্পর্শে আমিও পড়া ও লেখার অভ্যাস গড়ে তুলি। নানা বলতেন, লিখতে লিখতে লেখক হওয়া যায়। গ্রামীণ প্রবাদের মতো- ‘হাটতে হাটতে নলা/ গাইতে গাইতে গলা।’ সর্বোপরি কথা হচ্ছে- নিরলস চেষ্টা, চর্চা ও সাধনাই একজনকে লেখক হিসাবে গড়ে তুলতে পারে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কবি, কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

পুরনো স্মৃতি

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::

সেই পুরনো ঘর, পুরনো বিছানা
ছেড়া মশারি, কাঁথা-কম্বল।
সেই পুরনো স্মৃতি-
সারাদিন একই অনুভূতি
আর একগাদা মুখস্থ মানুষ।
বদলায় না কিছুই-
মাঝে মাঝে বদলে যাই আমি,
তবু বারবার ফিরে ফিরে আসি
সেই পুরনোর কাছাকাছি।

কী যে এক মায়া, অশরীরী ছায়া
দূর থেকে কাছে, টানে বারবার।
চোখের পলকে, সুখের ঝলকে
বদলে গিয়েও আগের মতোই
তোমাকেই ভালোবাসি।