শনিবার, ১৮ মে, ২০১৩

কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহ ও প্রেম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘বল বীর
চির উন্নত মম শীর।’
মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহসী উচ্চারণে সূচনা করলেন বিদ্রোহের বাণী। তিনি আর কেউ নন। আমাদের প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম। একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর করে তার সমসাময়িক অবস্থা বা প্রেক্ষাপটের ওপর। কোন সচেতন শিল্পী তার সময় ও সমাজকে কখনোই অস্বীকার করতে পারেন না। কবি কাজী নজরুল ইসলামও তার ব্যতিক্রম নন। কাজী নজরুল ইসলাম দেশের এমন এক সংকটময় মুহূর্তে আবির্ভূত হয়েছেন; যখন মুক্তি সংগ্রামের স্লোগান আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে। ফলে এ আন্দোলন সংগ্রামের প্রভাব পড়েছে তাঁর কাব্যে। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার নেশায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন উন্মাদ। দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে হয়েছেন মহা বিদ্রোহী। কিন্তু তারপরও মানব মনের চিরন্তণ প্রেমের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে তাঁর কাব্যে। কখনো তাঁর বিদ্রোহের মাঝে প্রেম; আবার কখনো প্রেমের মাঝে বিদ্রোহ। দু’টোই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়েছিল প্রিয়তমার মতো।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্বমহিমায় বাংলা সাহিত্যে চির ভাস্বর হয়ে আছেন। তাঁর ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ঘুমভাঙার গান’, ‘ফণিমনসা’, ‘সর্বহারা’, ‘জিঞ্জির’, ‘সন্ধ্যা’, ‘প্রলয় শিখা’, ‘সাম্যবাদী’ ইত্যাদি কাব্যের মাধ্যমে তিনি জাগরণের গান শুনিয়েছেন মানুষকে। জাতির বন্দীত্ব মোচনের জন্য তাঁর প্রচেষ্টা ছিল অকৃত্রিম। তিনি বিক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেনÑ
‘লাথি মার ভাঙরে তালা,
যতসব বন্দীশালা,
আগুন জ্বালা আগুন জ্বালা।’
তাঁর এ বিদ্রোহ অনাসৃষ্টির জন্য নয়। পুরাতনকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বিদ্রোহ। দেশ-জাতি-সমাজকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তাঁর বিদ্রোহ শাসক যাজক ও সমাজপতিদের বিরুদ্ধে। তার এ বিদ্রোহ নিরন্তর। যতদিন না এর কোন প্রতিকার হবে। তাইতো তিনি বলেছেনÑ
    ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
             আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে    উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে নাÑ
    বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত।
    আমি সেই দিন হব শান্ত।’
নিপীড়িত মানুষের মুক্তির পর কবির এ বিদ্রোহ সমাপ্ত হয়ে যাবে। বাস্তবিক অর্থে মানুষকে কতটা ভালোবাসলে এমন বিদ্রোহী হয়ে ওঠা যায়?

নিঃসন্দেহে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্যই তিনি আজ সর্বত্র ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসাবে সমাদৃত। বিদ্রোহী অভিধায় অভিসিক্ত হলেও কাজী নজরুল ইসলাম একজন খাঁটি প্রেমিক। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য কারাবরণ করলেও প্রেমের মহিমার ক্ষেত্রে আরো বেশি সমুজ্জ্বল তিনি। অন্তরে প্রেম না থাকলে কখনো এমন বিদ্রোহ আসেনা। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য’- এ যেন কবি নজরুলের অন্তরের কথা। এছাড়া নারীর প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গানে ও কবিতায়। নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন তিনি। নারীকে যথাযথ মর্যাদা দিতে গিয়ে কবি বলেছেনÑ
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কথা আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারি না।

‘আলগা করো গো খোপার বাঁধন’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’- এধরণের গানে তার অপার্থিব প্রেমের উৎসরণ লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রে তাঁকে প্রেমিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি করা হবে না। বিদ্রোহী রূপের আড়ালে তাঁর চিরায়ত কামনা-বাসনা-প্রেমকে ঢেকে রাখার সাধ্য আছে কার? কবি এও বলেছেন-
‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।’
মূলত নারীর উৎসাহ-প্রেরণা ও প্রেমের মহিমা তাঁকে বিদ্রোহী হতে উৎসাহ যুগিয়েছে।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায়ও তার প্রেম প্রকাশিত হয়েছে। নারী হৃদয়ের ব্যর্থতা, ক্ষোভ ও বাসনাকে কবি নিজের বিদ্রোহের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাইতো কবি বলেছেন-
‘আমি     বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি,
আমি     ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!’
কিংবা
‘আমি     অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়,
চিত-     চুম্বন-চোর-কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!
    আমি গোপন-পিয়ার চকিত চাহনী ছল ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির কন-কন্।’

কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে যেমন বিদ্রোহী; অপরদিকে আবার রোমান্টিক কবি। দীর্ঘাকৃতির ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মধ্যেও প্রেমের মহিমাকে তিনি উচ্চকিত করে তুলেছেন। কবির ‘মানুষ’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘আমার কৈফিয়ত’ প্রভৃতি কবিতায় বিদ্রোহ ফুটে উঠলেও সেখানে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, অবহেলিত, অসহায় মানুষের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহিন দরদ স্বার্থহীন ভালোবাসা। ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থে প্রেমের নিবিড়তা, চিরন্তনতা এবং বিচ্ছেদের তীব্র জ্বালার প্রকাশ দেখা যায়। সিন্ধুর অশান্ত রূপ কবিচিত্তের বিচ্ছেদ জ্বালা পথিকের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কবি বলেছেন-
‘এক জ্বালা, এক ব্যথা নিয়া
তুমি কাঁদ আমি কাঁদি, কাঁদে মোর হিয়া।’

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে প্রেম বা রোমান্টিসিজম সম্পর্কে বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেনÑ
“প্রকৃতির মাঝে আত্মভাবের বিস্তার এবং একই সাথে প্রকৃতির উপাদান সান্নিধ্যে অন্তর ভাবনার উন্মোচন রোমান্টিক কবির সহজাত বৈশিষ্ট্য। ‘চক্রবাক’ কাব্যে নজরুলের এই রোমান্টিক সত্ত্বার প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইতঃপূর্বের কাব্যসমূহেও আমরা নজরুলের প্রকৃতি চেতনার পরিচয় পেয়েছি কিন্তু ‘চক্রবাক’-এ এসে লক্ষ্য করছি, এখানে প্রকৃতি নজরুলের প্রজ্ঞাশাসিত ও অভিজ্ঞতালব্ধ মানসতার স্পর্শে এসে হয়ে উঠেছে সংযত, সংহত এবং শূন্যতা তথা বেদনার প্রতীকী ধারক।”

কবি কাজী নজরুল ইসলাম কবিতা ছাড়াও বহুবিচিত্র গান রচনা করেছেন। প্রেম-বিরহ, বিদ্রোহ-বিপ্লবের ওপর তাঁর অসংখ্য গানও রয়েছে। গানে কী কবিতায় মানুষের কল্যাণে কবি পুরাতনকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। ধ্বংসের ভেতর থেকেই তিনি দেখেছেন নব সৃষ্টির উন্মাদনা। কবি সমস্ত অসুন্দরকে ধ্বংস করতে চেয়েছেন। তাইতো বিদ্রোহের পাশাপাশি আবার প্রেম সৌন্দর্যের সমন্বয় করেছেন। বিদ্রোহ করেছেন অন্যায়কে ধ্বংস করার জন্য, আর প্রেমের কথা বলেছেন মানবতাকে মজবুত করার জন্য। তাইতো নিঃসন্দেহে বলা যায়, এমন খাঁটি প্রেম-বিদ্রোহের কবি নজরুল ইসলাম ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর।
১৮ মে ২০১৩
রাত ১১.৩৭ টা।

শুক্রবার, ১৭ মে, ২০১৩

স্বপ্ন ও দ্রোহের জাতীয় নাট্যোৎসবে ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ

বি এ কে মামুন:
‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধন’- শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় স্বপ্ন ও দ্রোহের জাতীয় নাট্যোৎসবে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় ‘বৈচাপাগল’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। গত ১৫ মে সন্ধ্যা ৮টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের ব্যবস্থাপনায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটি মঞ্চস্থ হয় ।
এতে অভিনয় করেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, বি এ কে মামুন, শান্ত কুমার, সঞ্জীব তালুকদার, মেহেদী হাসান মাসুদ, শফিকুল ইসলাম জীবন, মাহমুদা আক্তার, ঝুমা আক্তার, শাকিলা আক্তার, মমগীব, সাকিব মাহমুদ মাসুম, আহসান হাবীব, রুমা ও তনিমা বাগচী।
নাটক শেষে নির্দেশকের হাতে ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। এসময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, নাট্যব্যক্তিত্ব আরিফ হায়দার ও নৌমন্ত্রীর স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া বেগম প্রমুখ।

সোমবার, ৬ মে, ২০১৩

আমি আজ নির্বাক হবো

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে তুমি ভাবো কবিতা লিখবো কি না
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে বাইরে গেলে তুমি ভাবো নিরুদ্দেশ হবো কি না

সত্যি বলছি আজ তোমাকে ছুঁয়েÑ আমি আর কবিতা লিখব না
তোমার আঁচলে হাত বেঁধে বলছিÑ আমি আর নিরুদ্দেশ হবো না

আমি আজ নির্বাক হবো, আমি অপদার্থ হয়ে যাবো...

তবেই তো আর আমাকে নিয়ে তোমাকে এতো ভাবতে হবে না,
আমার জন্য ভেবে ভেবে রাত্রি জাগবে না।
তুমি পেয়ে যাবে পুরোদস্তুর গৃহপালিত এক মানুষ,
পেয়ে যাবে শয্যা পাশে কামনার আকাক্সিক্ষত পুরুষ।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর।
০৩ মে ২০১৩

শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৩

পাবনা থেকে হাসনাত আবদুল হাই’কে বলছি

মোশাররফ হোসেন মুসা:
মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে কখনও কখনও নিজের অজান্তে নিজের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করে ফেলে। সম্ভবত ব্যক্তিগত রাগ বিরাগের বশবর্তী হয়ে সাবেক আমলা ও কথা সাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইও একটি গল্পের মাধ্যমে নিজের ভিতরকার প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেছেন। তিনি অতীতে সরকারের ব্রাহ্মণরূপী একটি চাকুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবার ব্রাহ্মণদের পত্রিকা নামে খ্যাত ‘প্রথম আলো’র ১লা বৈশাখ সংখ্যায় ‘টিভি ক্যামেরার সামনে মেয়েটি’ নামক একটি গল্প লিখে আগের মর্যাদায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি উক্ত গল্পে পাবনা থেকে যাওয়া ‘সীমা’ নামে নিম্ন মধ্যবিত্তের একটি মেয়ে ঢাকায় গিয়ে কিভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা করছে তার বর্ণনা দিয়েছেন। লেখক সীমারূপী মেয়ের মাধ্যমে কিছু রাজনৈতিক দলের শহরকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান নির্ভর রাজনীতিকে বুঝাতে গিয়ে প্রকারান্তরে শাহবাগ আন্দোলনের শ্লোগান কন্যাসহ প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছেন। বর্তমান সংকটময় মুহুর্তে গল্পটি যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের অবস্থানকেই শক্তিশালী করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। গল্পটি সম্পর্কে প্রগতিশীল মহল থেকে ব্যাপক প্রতিবাদ আসায় ইতোমধ্যে ‘লেখক’ ও ‘প্রথম আলো’ ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। গল্পটিতে শাহবাগ, গণজাগরণ মঞ্চ, জাতীয় যাদুঘর, আর্ট ইনস্টিটিউট, শিশুপার্ক শব্দগুলি একাধিকবার স্থান পেয়েছে। সেজন্য বলা যায়, পত্রিকাটি সুদূর প্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে গল্পটি ছেপেছে। পত্রিকাটি এই-ই প্রথম নয়, এর আগেও স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখার কারণে একাধিকবার ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। অনেকে বলেছেন- এ গল্পের মাধ্যমে বর্ণচোরা উপাধিপ্রাপ্ত পত্রিকাটির নিরপেক্ষতার পোশাকটি আবারও খসে পড়ল।
লেখক এর আগে ‘ যখন ডিসি ছিলাম’ নামে এক প্রবন্ধে বিশিষ্ট শিল্পী ও গবেষক মুর্তজা বশিরকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। তিনি চট্টগ্রামের ডিসি থাকাকালীন সময়ে মুর্তজা বশিরকে সরকারি ফ্ল্যাট পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ হওয়ার পরও মুর্তজা বশির না কি সামান্য সৌজন্যও দেখান নি। একই প্রবন্ধে তিনি জনৈক বিভাগীয় কমিশনারের আঞ্চলিক কথন ও একটি ঘরোয়া প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরল উক্তি নিয়েও উপহাস করেছেন। যতদূর জানা যায়, এরশাদের উপজেলা সৃষ্টির পিছনে যে কয়জন আমলার অবদান রয়েছে তার মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনি ‘বিকেন্দ্রিকরণ, স্থানীয় সরকার ও সম্পদ আহরণ’ নামক এক গবেষণা গ্রন্থের ভূমিকায় উপজেলাকে কার্যকর করতে সম্পদ আহরণের জন্য কতকগুলো উৎসের কথা বলেছেন। আমি একদিন টেলিফোনে তাঁকে বলার চেষ্টা করি- এভাবে উপজেলাকে কার্যকর করা হলে ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষতি হবে। উপজেলা হলো মধ্যবর্তী স্তর। একই সেবার জন্য জনগণ একাধিক স্তরকে কেন ট্যাক্স দিবে। তিনি উত্তরে বলেন- তাকে যেন জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা না করা হয়। তখন মনে মনে ভেবেছি- স্থানীয় সরকারের বাহুল্য স্তর সম্পর্কে যদি সামান্য জ্ঞান থাকত, তাহলে তিনি এভাবে উপজেলার জন্য ওকালতি করতেন না। এখন গল্পটি পড়ে ধারণা জন্মেছে, তিনি দেশের প্রগতিও বুঝেন না। একজন বোদ্ধা পাঠক তার সম্পর্কে বলেছেন- একজন সুসাহিত্যিক  সরকারি চাকুরিতে বেশি দিন টিকে থাকতে পারেন না , সচিব হওয়া তো বহু পরের কথা । বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুরোধা কাজী আবদুল ওদুদ বহু আগেই বলেছেন- ‘যা আছে শুধু তা-ই সত্য নয়, যা হওয়া উচিত তা-ই মানুষের জন্য বিশেষভাবে সত্য।’ একইভাবে ‘প্রগতির জন্য যা হওয়া উচিত’ দাবিগুলি কোথা থেকে এলো, কার মুখ থেকে বের হলো, সেটা বড় কথা নয়। দাবিগুলো যথার্থ কি না সেটাই বিচার্য বিষয়। সে সঙ্গে আরও মনে রাখা দরকার- সীমাদের অসহায় অবস্থার জন্য কেবল রাজনীতিবিদরাই দায়ী নন, তার মতো আমলারাও দায়ী।
লেখক ঃ
গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।
ঈশ্বরদী, পাবনা।
সেল ঃ ০১৭১২-৬৩৮৬৮২

শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এর দু’টি কবিতা

## ঝড়কে আমি করিনা ভয়-

ঝড়কে আমি করিনা ভয়-
কী আছে আমার?
কিইবা ধ্বংস হবে?

ভয় নেই কিছু ধ্বসে পড়ার
ভয় নেই কিছু উড়ে যাবার

বিরাণ পৃথিবী আমার,
বিরাণ বাড়ি-ঘর।
কাঁপাতে পারে না মন
কোন বৈশাখী ঝড়।

## আমি আজ আর প্রেমের কবিতা লিখিনা

আমি আজ আর প্রেমের কবিতা লিখিনা।
বিদ্রোহ গর্জে উঠেছে মনে,
অন্তরে অতৃপ্তি নিয়ে ভালোবাসা যায় কি কিছু?

ক্ষিপ্ততার অগ্নুৎপাতে ছাড়খাড় হয়ে গেছে প্রেম
জাগতিক স্বার্থপরতা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে মানবতা।
যেখানে এখনো ‘মানুষ মানুষের জন্য’
হতে পারেনি আলোর দিশারী
অন্ধকারে হাতড়ে চলে আমার প্রিয় স্বদেশ
স্বার্থান্বেষী ধর্মান্ধতা আর পোয়াবারো রাজনীতি
ঝরায় প্রতিনিয়ত রক্তধারা।

সেখানে প্রেমের কবিতা চুলায় যাকÑ
প্রেমিকারা সব মুখ লুকাক আড়ালে
এবার হবে দ্রোহের গান,
জেগে উঠুক ভয়হীন মৃত্যুহীন প্রাণ।

অস্ত্রের মতো শাণিত হোক সোনার দোয়াত
ক্লিক ক্লিক শব্দে জন্ম হোক ফটোগ্রাফÑ
যেখানে নেই কোন প্রেমিকার মুখ
যেখানে নেই যুগলবন্দী স্মৃতির আঁচড়।

কবিতার মঞ্চে এখন প্রিয়তমার স্তুতি ভালো লাগেনা
ফ্যাকাশে হয়ে আসে সকল আবেগ,
গর্জে ওঠে ফুসে ওঠে আর্ত শব্দাবলীÑ
কন্ঠে উচ্চারিত হয় দ্রোহের ভাষণ,
‘অজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই’ কিংবা
‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা...’
হয়ে ওঠে আরাধনার প্রথম পাঠ।

বি:দ্র: বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মাদারীপুরে অনুষ্ঠিত আবৃত্তি উৎসব থেকে  ফিরে।

আর পারছি না

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আর পারছি না- দৃশ্যগুলো দেখার মত না।
সারি সারি মৃতদেহ দেখেÑ চোখ জ্বালা করে ওঠে।

আর কত লাশের মিছিল। এ দেশ কী মৃত্যু উপত্যাকা?
মানতে পারি না- তবুও মানতে হয়।
কাঁদতে পারি না- তবুও কাঁদতে হয়।
মুখে ভাষা নেই- নির্বাক তাকিয়ে রই।

এ কেমন ট্র্যাজেডি জাতির ঘারে?
এ বোঝা হালকা হবার নয়।
এ কেমন বেঁচে থাকার প্রত্যয়?
কাফনের শিয়রে দাঁড়িয়ে এ কেমন স্বান্তনা?
আর পারছি না- আর পারছি না- আর পারছি না।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর
২৬ এপ্রিল ২০১৩

শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৩

কালকিনিতে জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরামের বর্ষবরণ


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘আইলো আইলো আইলোরে, রঙ্গে ভরা বৈশাখ আমার আইলোরে’- স্লোগানকে সামনে রেখে শুভ নববর্ষ ১৪২০ বঙ্গাব্দ উপলক্ষে যায়যায়দিন ফ্রেন্ডস ফোরাম কালকিনির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বর্ণাঢ্য আয়োজনে শোভাযাত্রা, বাঙলার চিরায়ত ঐতিহ্য পান্তা-ইলিশ ভোজন, আলোচনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রেসক্লাব চত্বর থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
যায়যায়দিনের কালকিনি প্রতিনিধি মোঃ শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে জাহিদ হাসানের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে আজিম। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ রায়, কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সমাজ কর্ম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকন মোশাররফ হোসেন, উপজেলা আওয়ামীলীগ নেতা সরদার লোকমান হোসেন ও মসিউর রহমান সবুজ। বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মোঃ মিজানুর রহমান, খায়রুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক খন্দকার শামীম হোসাইন। সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি করেন জাহিন, জাবির, মীম, রাইসা, ফারিহা ও সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। সংগীত পরিবেশন করে মানসী. আসমাউল ইসলাম, রাফিয়া, শফিউল, সিফাত, ফাহিম ও মুহিত। নৃত্য পরিবেশন করে রাফিয়া ও সায়মা। সবশেষে শিল্পীদের মাঝে উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
যুগ্ম আহ্বায়ক, ফ্রেন্ডস ফোরাম
কালকিনি।
০১৭২৫৪৩০৭৬৩


কালকিনিতে ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ

অপর্ণা দাস :
‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেল বন্ধন’- শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের ব্যবস্থাপনায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এর রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক কেন্দ্রীক প্রযোজনা ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ হয়।
গত ১৬ এপ্রিল সোমবার রাত ৯ টায় কালকিনি উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত বৈশাখী মেলা মঞ্চে নাটকে অভিনয় করেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, বি এ কে মামুন, নাহিদুল ইসলাম মুকুল, শান্ত কুমার, সঞ্জীব তালুকদার, সাইফুল ইসলাম, আহসান হাবীব, পলাশ হোসেন, মাহমুদা খানম, ঝুমা আক্তার, শাকিলা আক্তার, অপর্ণা দাস, নিপা, রোমানা, সজল নন্দী ও সাকিব মাহমুদ।

বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৩

মাদারীপুরে স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক ‘বৈচাপাগল’ মঞ্চস্থ

মারজিয়া নিশি:
‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেল বন্ধন’- শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের ব্যবস্থাপনায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের পরিবেশনায় সালাহ উদ্দিন মাহমুদ এর রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক কেন্দ্রীক প্রযোজনা ‘বৈচাপাগল’ গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় মাদারীপুর মুক্তিযোদ্ধা মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয়।

শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর কবিতা

# উত্তরাধিকার

এ কেমন আচানক বিষণœ দুপুর, পাখির ডানার ভাঁজে ভাঁজে উড়ন্ত মেঘ।
আলো আঁধারির লুকোচুরি, ফিকে হয়ে আসে দিগন্তের হাসি।
কুয়াশার আড়ালে উঁকি মারেÑ প্রিয়তমার ফ্যাকাশে মুখ।
এ কেমন কর্মহীন অলস দুপুর, রমনীর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে সুখ।
শৃংগারে শিৎকারে কাতরতা, ভাবি প্রজন্মের প্রত্যাশিত আলো।
সঙ্গমের আড়ালে উঁকি মারেÑ আগামীর সুযোগ্য উত্তরাধিকার।

# তোমার স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে

তুমি বললে, আমার কোন স্বপ্ন নেই। আমি শুনে খুশি হলাম-
আশ্চার্যান্বিতও বটে। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে?
অবুঝ শিশু, অন্ধ-বোবা সবার যদি স্বপ্ন থাকে
তোমার কেন থাকতে নেই।
তুমিতো পরিপূর্ণ মানবীÑ কোন জড় পদার্থ নও।

সমীকরণটা কেমন এলোমেলো কোন সুত্রেই ঠিক মিলল না।
স্বপ্ন আছে বলে আমরা আছি, আমারা থাকলে স্বপ্নও থাকবে।
তুমি না চাইলেও ঘুরে ফিরে স্বপ্ন আসবে তোমার কাছে।
তোমাকে পথ দেখাবে, ঘুম পাড়ানি গান শোনাবেÑ
নিয়ে যাবে সীমাহীন গন্তব্যে।

একদিন তুমি স্বপ্নের দেখা পাবে, হবে স্বপ্নের সাথে খুনসুটি।
স্বপ্নের সাথে হবে ঘর-গেরস্থালি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
এখনো তোমার বুঝতে বাকি- তোমার স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে তোমার মনের গহীণে।

কালকিনি, মাদারীপুর
০৭ এপ্রিল ২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

বৃহস্পতিবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৩

শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার কৃতি সন্তান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ও দহন(সাহিত্যপত্র)- এর নির্বাহী সম্পাদক জাহিদ হাসান বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রিয় নির্বাহী সংসদের সদস্য হওয়ায় কালকিনিবাসীর পক্ষ থেকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

শুভেচ্ছান্তেÑ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সম্পাদক, দহন(সাহিত্যপত্র)।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর প্রেমের কবিতা

১. তোমাকে দিলাম

তোমাকে দিলাম ভালোবাসার প্রথম প্রহর-
ভোরের শিশির একখন্ড আকাশ।
তোমাকে দিলাম ফাগুনের রঙ- দখিনা বাতাস।
তোমাকে দিলাম সবটুকু অনুভূতি- জীবনের কিছু স্মৃতি।

তোমাকে দিলাম ডাহুকের লুকোচুরি,
মাছরাঙার শিকার স্বচ্ছ কালোজল দিঘির।
তোমাকে দিলাম সবটুকু আবেগ- জীবনের গতিবেগ।
তোমাকে দিলাম আকাশের নীল- সাগরের শঙ্খচিল।
তোমাকে দিলাম এই আমি সবটুকু প্রেম আমার
অনাকাক্সিক্ষত ছোঁয়া উষ্ণতার।

২. অপ্রত্যাশিত ভালোবাসা

একটি সুদৃশ্য মোড়ক আমায় বিহ্বল করে।
কি আছে এর অন্তর্নিহিত সারমর্ম?
প্রশ্নের পাহাড় বুকে নিয়ে ঝুকে পড়িÑ
প্রতিটি ভাঁজ খুলতে খুলতে আমি ক্লান্ত।
কাক্সিক্ষত বস্তুর কোন গন্ধ নেই।
মনে কল্পনার নানাবিধ জাল বুনি!
মোড়কের ভেতর মোড়কÑÑ
এক  
দুই   
তিন...
চতুর্দশ মোড়ক খুলতেই
বাতাসে উড়ে যায় ছোট্ট চিরকুট।
তাতে লেখাÑ
‘বাতাসে উড়িয়ে দিলাম আমার প্রথম ভালোবাসা।’


৩. কোথাও পাবি না খুঁজে প্রেম

তাকিয়ে দেখ জীবনের যত ছবি
খুঁজে পাবি হাজার রঙ,
জীবনের অলি-গলি পার হয়ে
সেজেছিস কতবার সঙ।

লাল-নীল-বেগুনি কিংবা হলুদ
স্বপ্নের রঙ শাদা-কালো,
রঙিন ছবির মাঝে জীবনের আড়ালে
কোথাও পাবি না খুঁজে আলো।

চেয়ে চেয়ে দেখ কত ঝরা ফুল
পেতে পারিস কত গন্ধ,
কোথাও পাবি না খুঁজে প্রেম
হলে চোখ থাকতে অন্ধ।

কালকিনি, মাদারীপুর
০৩ এপ্রিল ২০১৩

মঙ্গলবার, ২ এপ্রিল, ২০১৩

গান গেয়ে সংসারের খরচ জোগান

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘এক সময় পালাগান গাইতাম। এহোন আর পালাগানের চল নাই। তাই জারিগান বান্ধি। এতেই সংসার চলে। মাঝে মাঝে সংসারে একটু-আধটু টানাটানি হয়। কি করুম? বোঝার পর থিক্যাই গানরে সঙ্গী কইরা লইছি। আর ছাড়তে পারি নাই। চার পোলারে দলে রাখছি। বাপ-বেটারা মিইল্যা দল চালাই। আমার সুখ তাতেই। বাউল সম্রাট শাহ আ: করিমের মত কইতে অয়- ‘আর কিছু চাইনা মনে গান ছাড়া।’ কথাগুলো বলছিলেন গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আ: সাত্তার বয়াতী। তার পরিবারের সবাই শিল্পী। সংগীত তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। গান গেয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। বিশাল এ পরিবারের ভরন-পোষণ জোগান তারা গানে গানে।
এক সময় গ্রামবাংলায় পালাগান, সারি গান, পুঁথি পাঠ, যাত্রাপালা ও জারি গান ছিল অহরহ। সে সব গ্রামীণ সংস্কৃতি এখন বহুলাংশে লোপ পেয়েছে। জীবন-জীবিকার তাগিদে শিল্পীরা ছুটছে দিগি¦দিক। কিন্তু মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়নের কাচারিকান্দি গ্রামে ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করা আঃ সাত্তার বয়াতি তার পুরো পরিবার নিয়ে ধরে রেখেছেন সেই ঐতিহ্য। কেবল গান গেয়েই সংসারের খরচ জোগান তারা।
আঃ সাত্তার বয়াতী এনায়েতনগর জে.এম উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অর্থাভাবে আর লেখা-পড়ার সুযোগ হয়নি তার। ছোট বেলা থেকেই গানের প্রতি তার ঝোক ছিল। তাই পেশা হিসেবে বেছে নেন সংগীত। ১৯৬৫ সালে ২০ বছর বয়সে ওস্তাদ জালাল বয়াতির সাথে সারি গানের মাধ্যমে সংগীত জীবনে প্রবেশ করেন। তার সাথে কাজ করেন ৫ বছর। এরপর নিজেই একটি গানের দল তৈরি করেন। তার দলের নাম রাখেন ‘পল্লী কবিয়াল সাংস্কৃতিক দল’। শুরুর দিকে পালাগান করতেন। তখন শরীয়ত-মারেফাত, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলিম, রাত্রি-দিনসহ একাধিক পালাগান গেয়েছেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে থাকতেন জালাল বয়াতি. সফিজদ্দিন বয়াতী, রশিদ বয়াতী, জয়নাল বয়াতী, মঞ্জুরানী সরকার, রেখা বয়াতী, রুনা সরকার ও মাকসুদা বয়াতী।
পালাগানের কদর কমে গেলে অনেক শিল্পী দল ছেড়ে চলে যান। আঃ সত্তার বয়াতী শুরু করেন জারি গান। নিজের সন্তানদের শিক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখেন গানের দল। এরপর থেকে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, এনজিও ও ব্যক্তির উদ্যোগে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, দুর্নীতি, বৃক্ষ রোপন বা বনায়ণ, কৃষি, মৎস্য, এইডস, মাদক, দেশাত্মবোধক ও বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির নির্বাচনী জারী গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন।
দলের বর্তমান শিল্পীরা তার পরিবারের সদস্য। চার ছেলে ও মেয়ের ঘরের নাতিকে নিয়ে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ৬ জন। বড় ছেলে জামাল হোসেন হারমোনিয়াম বাদক এবং গায়ক। মেজ ছেলে রুবেল গান গাইতো। তিন বছর আগে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। স্ত্রী, ২ মেয়ে, ১ ছেলের দায়ভার এখন আঃ সত্তার বয়াতীর ওপর। সেজ ছেলে আক্তার হোসেন ঢোল বাদক। চার নম্বর ছেলে সুজন বাজায় মন্দিরা। ছোট ছেলে আকাশ দেওয়ান শিশুশিল্পী। মেয়ের ঘরের নাতি পান্নাও তাদের দলের শিশুশিল্পী।
তারা এ পর্য়ন্ত ঢাকা, ঝালকাঠি, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, খুলনা ও ভোলাসহ অনেক জেলা ঘুরে ঘুরে গান গেয়েছেন। প্রতিমাসে ৭-৮ টা জারি গানের অনুষ্ঠান করেন। প্রতি অনুষ্ঠানে সর্বনিু ২২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০০ টাকা পর্যন্ত পান। এছাড়া দুঃস্থ শিল্পী হিসাবে সরকারের কাছ থেকে একবছরে প্রতিমাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পেয়েছেন। বর্তমানে প্রতিমাসে ৫০০ টাকা করে ভাতা পান। এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, কালকিনি এডিপি’র তালিকাভূক্ত গানের দল হিসাবে মাসে চারটা অনুষ্ঠান করে প্রতি অনুষ্ঠানে ২২০০ টাকা করে মোট ৮৮০০ টাকা পান। 
গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহের ব্যাপারে আঃ সাত্তার বয়াতী বলেন,‘এরশাদের আমলে গানের জন্য সাটিভেট (সার্টিফিকেট) পাইছি। বর্তমানে কিছুটা দুরবস্থার মধ্যে আছি। অনুষ্ঠান না পাইলে সংসার চালাইতে একটু কষ্ট হয়। গান গাইয়া ছেলেগো ব্যবসা করার ব্যবস্থা কইরা দিতাছি। তবে আমার জীবন-মরণ গান। যতদিন আছি, গান লইয়াই আছি। মইরা গেলে পোলাপানে দল চালাইবো কি না জানিনা।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
১৩.০৩.২০১৩

রবিবার, ৩১ মার্চ, ২০১৩

রচয়িতা: দুই বাংলার কবিদের মিলনমেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

ষান্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’ ৩য় বর্ষের ২য় সংখ্যা প্রকাশিত হলো ঢাকার একুশে বইমেলায়। ‘দুই বাংলার কবি ও কবিতা’ নিয়ে ৫০ পৃষ্ঠার মনভুলানো এ আয়োজন নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ সফলতা ‘রচয়িতা’র নিপূণ কারিগর আরিফুল ইসলামের। কবিরা উপলক্ষ মাত্র। কারণ কবিরা কেবল জন্মদাতা, সম্পাদক গর্ভধারিনী। গর্ভধারণের যন্ত্রণা ও প্রসবের বেদনা আমরা বুঝিনা। আমাদের মুখে শুধু তৃপ্তির হাসি। প্রচ্ছদ এঁকে শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন এম. আসলাম লিটন। অশেষ ধন্যবাদ জানাই তাকে।
বর্তমান অবক্ষয়িত যুব সমাজের জন্য আলোকবর্তিকা হাতে আবির্ভূত হয়েছেন আরিফুল ইসলাম। ‘সাহিত্য পরিবার গঠনের দৃঢ় অঙ্গিকার’ নিয়ে কন্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে চলেছেন ক্লান্তিহীন এক পথিক। তার কাফেলায় সামিল হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে আজ। নবীন-প্রবীণ কবিদের সমন্বয়ে সাজানো ‘রচয়িতা’ সর্বস্তরের পাঠকের মনে দাগ কাটতে পেরেছেÑ এ আমার বিশ্বাস। শুধু তা-ই নয়, ‘রচয়িতা’ জামালপুরের ইসলামপুর থেকে ছড়িয়ে পড়বে সারা বাংলাদেশ এমনকি ওপার বাংলায়। লিটল ম্যাগ প্রকাশ, প্রচার ও প্রসারের আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবেÑ এটাই আমার প্রত্যাশা।
নবীন কবিদের লেখালেখির সুতিকাগার ছোট কাগজ। প্রবীন বা প্রথিতযশা কবিদের পাশাপাশি নবীনরাও তাদের কাঁচা হাতের আঁকিবুকির প্রয়াস অব্যাহত রাখবে। তবেই আমাদের বাংলা সাহিত্য আরো সমৃদ্ধ হবে। কেননা, আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে সবকিছু এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। দুই হাতে লিখতে পারি। বাতাসে উড়িয়ে দিতে পারি যা কিছু তা-ই। মুহূর্তেই তা পৌঁছে যাচ্ছে সঠিক গন্তব্যে। সবকিছুই যখন হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক। তখন আমরা কেনইবা থাকবো স্থবির হয়ে।
‘রচয়িতা’ হাতে পাওয়ার পর আমি বিস্মিত অভিভূত। মফন্বলে বসেও এমন চমৎকার সৃজন সম্ভব। সাহিত্য চর্চা এখন কেবল নগরকেন্দ্রিক নয়। একথাই প্রমাণ করে ‘রচয়িতা’। কবিতা বাছাই, সম্পাদনা, প্রকাশ ও বিপণনের ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদক। ওপার বাংলার পাঠকরাও আগরতলা বইমেলায় রচয়িতার মুখ দেখেছেন। ১৩০ জন কবির পাঠানো কবিতার মধ্যে মাত্র বিয়াল্লিশ জন কবির কবিতা বাছাই করা আসলেই কষ্টসাধ্য। বিশাল এ দায়িত্ব তিনি সামলেছেন প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে। কায়মনো বাক্যে অপারগতাও প্রকাশ করেছেন। বাকী লেখা আগামী সংখ্যায় প্রকাশ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। হয়তো আগামী সংখ্যার জন্য আরো কবিতা জমা পড়বে। এভাবে পড়তেই থাকবে। দায়বদ্ধতা থেকে যাবে কবিদের কাছে। তবুও এগিয়ে যেতে হবে।
আরিফুল ইসলামের সম্পাদকীয় পড়ে মনে হয়েছে কবিতার বিপ্লব শুরু হয়েছে। বিস্ফোরক বারুদ স্পি­ন্টারের মত দিগি¦দিক কবিতার বিস্ফোরণ। প্রতিশ্র“তিশীল কবিদের উদাত্ত আহ্বান- কবিতার ভূবনে আসার। একটি সুন্দর আগামী বিনির্মাণেও প্রত্যয়দীপ্ত কন্ঠস্বর অনুরণন তুলছে চারিদিকে। কাঁটাতারের বেড়াকে উপেক্ষা করে এপার বাংলা-ওপার বাংলার কবিদের মিলন মেলার আয়োজক ‘রচয়িতা’। তাই অবলীলায় বলা যায়, ‘কবিতা কোন বাধাকে স্বীকার করে না, কবিতা সশস্ত্র কবিতা স্বাধীন।’
মৃণাল বসু চৌধুরী, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, জ্যোতির্ময় দাশ, মধুমঙ্গল বিশ্বাস, ইন্দ্রানী সেনগুপ্তা, চিরঞ্জিব হালদার, মনোজিৎ কুমার দাশ, শিবশংকর পাল, সুবীর সরকার, রহমান হেনরী, নজরুল জাহান, টোকন ঠাকুর, ধ্র“বজ্যোতি ঘোষ মুকুল, গোলাম মোস্তফা, কচি রেজা, রতœাদিপা দে ঘোষ, ড. আফরোজা পারভীন, ওয়াহিদুজ্জামান, আলী ইদ্রিস, ভোলা দেবনাথ, তালাত মাহমুদ, আমজাদ সুজন, অমিতাভ দাশ, রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, আদিত্য অনিক, সুচেতা রায়, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সুরঞ্জন রায়, আজিজ আহমেদ, ফয়সাল অভি, সৈকত আহমেদ বেল্লাল, রিপন ঘোষ, নাজমুল হাসান, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, অঞ্জন আচার্য, মৌ সেনগুপ্তা, সীমা রানী বন্দ্য, সৈয়দ সাদী, চঞ্চল মেহমুদ কাসেম, সুমন হাফিজ, সামীর রহমান ও আরিফুল ইসলামের কবিতা নি:সন্দেহে পাঠককে আকৃষ্ট করেছে। অনেকে অনেক ফোন পেয়েছেন। যেমন পেয়েছি আমি। কবি ও কবিতার স্বার্থকতা এখানেই।
ধন্য রচয়িতা, ধন্য আরিফুল ইসলাম।
কবিতার জয় হোক। ‘রচয়িতা’ দীর্ঘজীবি হোক।

কালকিনি, মাদারীপুর।
৩০.০৩.২০১৩

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর দু’টি কবিতা

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ

যা কিছু চেয়েছিলাম; হয়তো পেয়েছি বা পাইনি।
অদূরে দাঁড়িয়ে হাতছানি দেয় সৌভাগ্য,
হতাশার সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গেছি ঈশ্বরের মনোনীত স্বপ্নচূড়া দ্বীপে।

কী আছে অজানা জনারণ্যেÑ যাবতীয় প্রেম, প্রেমের অসুখ
উচাটন মন, মনের দূরত্ব। কিংবা সাফল্যের শেষ উপাদান হাতড়ে হাতড়ে
ঈশ্বরের তীক্ষè দৃষ্টিতে রমণীর কামনার সুরসুরির নিষেধাজ্ঞা
উপেক্ষা করে ছিটকে পড়েছি ভাগাড়ে।

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ চুকাতে গিয়ে বারবার ঠকেছি।
জিতেছেন ঈশ্বর; ঈশ্বরেরা বরাবরই জয়ী হন-
জয়ী হবার বদলে আমাকেই ক্ষমা চাইতে হয়।
এবার আমার হিসাবের পালা শেষ,     স্বার্থপর ঈশ্বরের সাথে কোন আপোষ নেই।
কড়ায়-গন্ডায় কষে নেব সব হিসাব-নিকাশ। আমার জয়ের হিসাব,
আমার প্রেমের হিসাব, আমার সীমাহীন প্রাপ্তীর হিসাব।

ঈশ্বরেরর সাথে এ আমার শেষ হিসাব-নিকাশ।

ঈশ্বর বনাম তুমি

তোমাকে ভালোবাসি বহু বছর বহু কাল,
ঈশ্বরের মতো ভালোবাসি তোমাকে।
তোমাকে না পেলে হারাবো ঈশ্বর-
ঈশ্বরকে না পেলে তোমাকেও পাবো না।
তোমার মাঝে খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব,
তোমার মাঝে ঈশ্বরের বসবাস।
তোমার ঠোটে ঈশ্বরের আনন্দের হাসি,
তোমার চোখে ঈশ্বরের বেদনার জল।
আমার ভালোবাসা শুধু দু’জনার জন্যÑ
ঈশ্বর বনাম তুমি। হয়ত তুমি গ্রহণ কর;
নয়ত ঈশ্বরকে দিতে দাও।

২৮.০৩.২০১৩
কালকিনি, মাদারীপুর।