সোমবার, ২৩ জুলাই, ২০১২

যাওয়া তো নয় যাওয়া

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
তুমি কোন অভিমানে চলে গেলে সব ফেলে?
তোমার শূন্যতায় ‘ময়ূরাী’র বুকে চর জাগে।
হারানোর বেদনায় নিঃসঙ্গ বসে থাকে হিমুÑ
অযতেœ ঝরে পরে ‘হিমুর হাতে সাতটি নীলপদ্ম’।
মিসির আলী, বাকের ভাই হয়ে যায় নিরুদ্দেশ,
নিস্তব্ধ নুহাশপল্লী-কুতুবপুর,শোকাহত বাংলাদেশ।
‘যাওয়া তো নয় যাওয়া’-তবুও কী চলে যেতে হয়?
চলেই যদি যাবে ণিকের তরে কেন এসেছিলে তবে?
তুমি কী আর ফিরবে না এই ‘শ্যামল ছায়া’র মাঠে।
কেন ‘নন্দিত নরকে’ রেখে গেলে ‘আগুনের পরশমনি’,
এত বেহেশতি সুখ ছোঁয়ার পরেও ‘সবাই গেছে বনে’।
তুমিও কী তাই চলে গেলে আজ একাকী আনমনে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কালকিনি, মাদারীপুর
০১৭২৫৪৩০৭৬৩।

মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই, ২০১২

এখানে আমি একা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
আসলে এখানে আমি একা, এখানে আমার কেউ নেই।
আমি বারবার ভুলে যাই- এখানে আমি শুধুই পরবাসী।
এখানে স্বার্থের বাইরে এক চিলতে সম্পর্ক নেই।
এখানে নেই ভালোবাসার লেনদেন- সবাই জয়ী হতে চায় ।
এখানে স্বার্থের কাছে ভালোবাসাও মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এখানে কর্মকে লুটপাট করে আমাকে ছুঁড়ে দেয় শূন্য ভাগাড়ে।
এখানে আমার অহংকার থাকতে নেই, তাই প্রতিনিয়ত মা চাইতে হয়।
এখানে আমি কার- কে আমার? রক্তের বন্ধন এখানে তুচ্ছ।
এখানে আমি ণিকের অতিথি তাই সূর্যাস্তের পূর্বে ফিরে যেতে হয়।
বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়-রক্তের বন্ধনই আমার শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।

কালকিনি, মাদারীপুর।
17.07.2012

বুধবার, ৪ জুলাই, ২০১২

জাতীয় নাট্যোৎসবে ‘একটাই চাওয়া’

আ জ ম কামাল:
‘স্বাধীনতার ৪০ বছর ও শিল্পের আলোয় মহান মুক্তিযুদ্ধ’- স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্যোৎসবে মাদারীপুর সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ ও কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে গত ৩ জুলাই রাত সাড়ে আটটায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনে কলেজ পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক ‘একটাই চাওয়া’ মঞ্চস্থ হয়।
আজিজুল ইসলাম স্বপনের রচনায় আ জ ম কামালের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন মাহমুদা খান লিটা, আজিজুল ইসলাাম স্বপন, সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সাজ্জাদ হোসেন, লুবনা জাহান নিপা, আশিষ রায়, শাকিলা আক্তার, নাহিদুল ইসলাম মুকুল, সঞ্জীব তালুকদার, শান্ত কুমার, আসাদুজ্জামান রুপম, বি এ কে মামুন, মাইনুল ইসলাম ও সাইদুল ইসলাম।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুর জেলায় ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা ফুটে ওঠে‘ একটাই চাওয়া’ নাটকে। সোলেমান বয়াতির সংসারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যেতে থাকে নাটকের কাহিনী। সোলেমান বয়াতীর স্ত্রী আমিরনের সম্ভ্রম হারানো। পাক হানাদারের নির্যাতনে সাজুর মৃত্যু। যুদ্ধে গিয়ে শেষ অবধি রফিকের ফিরে না আসা। কিশোর বাচ্চুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ। রাজাকার ওয়াজেদ আলী ও কেতর আলীর কুদৃষ্টি একাত্তরের পৈশাচিক দৃশ্য ফুটে উঠবে। সুফিয়া, বেনু, পান্না ও নুরুল ইসলামের আত্মত্যাগ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। সবশেষে বাচ্চুর বাবা, বয়াতী, বাদল ও মানিকের কন্ঠে দৃঢ়তার সাথে উচ্চারিত হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। অভিনেতাদের সাথে সাথে দর্শকরাও গর্জে ওঠে।
নাটক শেষে নির্দেশক আ জ ম কামালের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মৃণাল কান্তি দে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব শংকর সাওজাল, ঝুনা চৌধুরী ও তৌফিক হোসেন ময়না প্রমুখ।

বুধবার, ২৭ জুন, ২০১২

মাদক বিরোধী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

নুরুদ্দিন আহমেদ:
মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কালকিনি এডিপি’র উদ্যোগে গত ২৬ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জারী গান পরিবেশন করেন আঃ সাত্তার বয়াতী ও তার দল, সংগীত পরিবেশন করেন ইব্রাহীম, জামাল ও শান্তা ইসলাম। আবৃত্তি করেন সুবর্ণা, জারিন তাসনিম রাইসা ও জান্নাতুল ফেরদাউস মীম। নৃত্য পরিবেশন করেন রোজিনা, সুমী, মিতু, নিপা, তামান্না, নাসিমা, রিয়া, রুহুল াামিন, মাসুম ও লিমা।
সবশেষে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনায় মাইনুল ইসলামের পরিচালনায় মেহেদী হাসানের নির্দেশনায় আ জ ম কামালের রূপসজ্জায় ও প্রথম আলো কালকিনি বন্ধুসভার পরিবেশনায় মাদক বিরোধী নাটক ‘আলোর পথে’ মঞ্চস্থ হয়। এতে অভিনয় করেন বি এ কে মামুন, লিমা, মাইনুল ইসলাম, মহিউদ্দিন, সিমন, মেহেদী হাসান, সাইফুল ইসলাম, সজল নন্দী ও মাসুম।

মাদকবিরোধী দিবস পালিত

আফিয়া মুন:
মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কালকিনি এডিপি’র উদ্যোগে গত ২৬ জুন শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।সকাল ১০টায় কালকিনি এডিপি কার্যালয় থেকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে শেষে কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ডা. শামীম চৌধুরীর সভাপতিত্বে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের সমাজ কর্ম বিভাগের প্রধান জাহাঙ্গীর হোসেন ও উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মোঃ এনামুল হক। বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল হোসেন, মনিরুল ইসলাম ও মোঃ সেলিমুল্লাহ প্রমুখ।

রবিবার, ২৪ জুন, ২০১২

বাচ্চু মিয়ার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরাম পুর ইউনিয়নের আন্ডার চর গ্রামে পৌঁছতেই দেখা গেল সারিবদ্ধভাবে দাাঁড়িয়ে আছে কিছু দরিদ্র মানুষ। লাইনের সামনে একটা কাঠের টেবিলে কিছু ঔষধ নিয়ে বসে আছেন একজন। তিনি রোগী দেখছেন আর রোগ নির্ণয়ের পর বিনামুল্যে ঔষধ দিচ্ছেন। পিছনে ঝোলানো একটি ব্যানার। তাতে ‘শৃঙ্খলা ও সুস্থ্যতাই সুন্দর জীবন’ স্লোগান লেখা। এরপর ‘মানব স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচী’ ও ‘বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা’সহ বিস্তারিত বিবরণ।
লোকটির নাম বিএম বাচ্চু মিয়া। এ নামটি এখন হতদরিদ্র মানুষের মুখে মুখে। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত তিনি দরিদ্র মানুষদের বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ঔষধ দিয়ে থাকেন। তার এ কর্মকান্ডে উপকৃত হচ্ছে নিজের গ্রামসহ পাশ্ববর্তী আরও ৪টি ইউনিয়নের মানুষ। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রায় ৫ শতাধিক অসহায় মানুষ ছুটে আসে তার কাছে স্বাস্থ্য সেবা নিতে। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি মানুষকে সুস্থ্য থাকার নানাবিধ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তার এ কর্মকান্ডের খবর পেয়ে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ মসিউর রহমান স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম পরিদর্শণ করেন। এবং ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবর একটি প্রত্যয়ন পত্র দেন। সবাইকে তিনি একটা কথাই বলেন,‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়। রোগ হওয়ার আগে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো ও সচেতন হওয়া জরুরী।’ তিনি সুস্থ্য থাকতে রীতিমত শাক-সবজি ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ছোটবেলা থেকে অসহায় অবহেলিত মানুষের জন্য কিছু করার কথা চিন্তা করতেন। বিশেষ করে হতদরিদ্র মানুষ যখন বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। তখন তিনি খুব ব্যথিত হতেন। সে চিন্তা ও দর্শন থেকেই নিজের উপার্জিত অর্থ থেকে ব্যয় করে শুরু করেন তার কার্যক্রম। কেমিস্ট প্যারাডাইস কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ থাকাকালীন ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মানব সেবা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠন। ঐ বছর ৩ ডিসেম্বর শুক্রবার দিন তিনি তার স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচী আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। সেদিন ২০ জন মেডিকেল অফিসার এনে দিনভর এলাকার অসুস্থ্য মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেন। তার এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন প্রফেসর আসাদুজ্জামান। পরে রিপ্রেজেন্টিটিভের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকার আইয়ূব মোহাম্মদ ফাউন্ডেশনের সাথে ঠিকাদারি ব্যবসা শুরু করেন। আর নিজের উপার্জিত অর্থ ব্যয় করে চালিয়ে যান মানব সেবা। চিকিৎসার স্বার্থে ২০১০ সালের ৩০ জুন পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রায় একযুগ ধরে তিনি মানুষকে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
প্রতি বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত প্রত্যেক রোগীকে ৪০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত মূল্যের ঔষধ দিয়ে থাকেন। শুরুর দিকে প্রতি শুক্রবার ক্রোকির চর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম চালালেও প্রতিষ্ঠানের নিষেধাজ্ঞায় এখন পাশ্ববর্তী আন্ডার চর গ্রামের আনোয়ার হোসেন মাস্টারের বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার এ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কোন মেডিকেল কলেজে পড়াশুনা না করেও কেন এমন কাজের প্রতি বাচ্চু মিয়ার আগ্রহ। এটা তো একটা জটিল বিষয়। রোগ নির্ণয় কিভাবে করবেন। এমন সব প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘আমি মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ থাকাকালীন রোগসংক্রান্ত যে বিদ্যা অর্জন করেছি। তা-ই আমাকে সহায়তা করে। এরপর পল্লী চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তাছাড়া আমিতো জটিল রোগের চিকিৎসাও করি না, ঔষধও দেই না। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে থাকি। তাতে ইনশাআল্লাহ শতকরা নব্বই জন লোকই আমার ঔষধে আরোগ্য লাভ করেছে।’
স্বাস্থ্য সেবা কর্মসূচি ছাড়াও তার আরো কয়েকটি কর্মসূচি রয়েছে। তার মধ্যে বাচ্চু মিয়া নিজ অর্থায়নে সাহেবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও ক্রোকির চর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের পরিচয়পত্র তেরি করে দিয়েছেন। তার দর্জি বিজ্ঞান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে অর্ধশতাধিক নারী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ঘরে বসে অর্থ উপার্জন করছে। এছাড়াও বিভিন্ন সময় গরিব মানুষদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তাও করেন।
বিএম বাচ্চু মিয়া এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন সমবায় সমিতি। সমিতির সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ২০ টাকা করে চাঁদা দেন। সমিতির বর্তমান সঞ্চয় হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। এ সমিতির মাধ্যমে বিনা সুদে বিপদগ্রস্ত মানুষকে ঋণ দিয়ে থাকেন। যাতে উপকৃত হয় হতদরিদ্র মানুষ।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা গেল, অনেক মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চিকিৎসার জন্য। নিবিষ্ট মনে রোগী দেখছেন বাচ্চু মিয়া। তাকে সহযোগিতা করছেন দুই নারী। তারা এই মানব সেবা ফাউন্ডেশনের কর্মী। একজন রুনু কাওসারি। তিনি আগত রোগীদের তালিকা করছেন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। আরেকজন পল্লবী বিশ্বাস। তিনি রোগীদের ঔষধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে রুনু কাওসারি জানান,‘প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। পাশ্ববর্তী কয়ারিয়া, রমজানপুর, চর দৌলতখান, শিকার মঙ্গলসহ প্রায় ৫টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রামে এ সেবা কার্যক্রম চলে। ২০০১ সাল থেকে এপর্যন্ত প্রায় ২৬ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে।’
চিকিৎসা নিতে আসা আন্ডার চর গ্রামের ফরনা বেগম জানান,‘ এর আগেও দুই বার আইছি। কোন টাহা পয়সা লাগে না। রোগও ভালো অয়। উপকার পাই, তাই আহি। মোগোতো আর অত টাহা খরচ কইরা বড় ডাক্তার দেহানোর ক্ষমতা নাই। তাই মোগো বাচ্চু মিয়াই ভরসা।’ এছাড়াও রিণা বেগম, ওয়াজেদ হাওলাদার, লিলি, সুখী, সুমি ও স্বপন ঘরামিসহ বেশ কয়েকজন বলেন,‘আমাগো অসুখ-বিসুখে বাচ্চু মিয়ার কাছে ছুইট্টা আহি। উপকারও পাই। বিনা পয়সায় ওষুধ দেয়। একযুগ ধইরা এই কাম কইরা আইতাছে। আইজ পর্যন্ত কোন মাইনষের অপকার বা সমস্যা অয় নাই।’ ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ বাহারুল ও ৫নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আজাহার মীর জানান,‘বাচ্চু মিয়া একটি মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা তাকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করি। তার মতো এরকম কাজ আরো হওয়া উচিৎ।’
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেব রামপুর ইউনিয়নের ক্রোকির চর গ্রামে ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিএম বাচ্চু মিয়ার জন্ম। পিতা এসকান্দার আলী ও মা আমেনা বেগম। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে বাচ্চুই সবার বড়। ব্যক্তি জীবনে বিবাহিত। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক। স্ত্রী আরজু বেগম ও সন্তানদের নিয়ে মাদারীপুর শহরে বসবাস করেন। সাদা মনের এ আলোকিত মানুষটি প্রথম আলোকে জানান,‘ রাজনৈতিক বা অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মানব সেবা করছিনা। নিজে পরিবারসহ খেয়ে পড়ে যা থাকে তাই দিয়ে মানুষের উপকার করার চেষ্টা করি। বর্তমানে বসার জায়গা নিয়ে সমস্যায় আছি। পাশাপাশি আরো কিছু অর্থ দরকার। তবে সকলের সহযোগিতা পেলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারব। আমি চাই আমার এলাকার একটা মানুষও যাতে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়।’
বিএম বাচ্চু মিয়ার বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ও মানব সেবা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোঃ মসিউর রহমান বলেন,‘বাচ্চু মিয়ার এ কার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আমি তার কার্যক্রম পরিদর্শণ করেছি। আমার মতে, তার মতো আমাদের প্রত্যেককেই এরকম জনসেবা মূলক কাজে এগিয়ে আসা উচিৎ।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ শাহরিয়াজ বলেন,‘এমন জনসেবা মূলক কাজের জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই। তার মতো প্রত্যেক গ্রামে বা ইউনিয়নে তা নাহলে অন্তত উপজেলা পর্যায়ে আরো অনেকের এগিয়ে আসা উচিৎ। আমি তাকে যে কোন ধরণের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিচ্ছি। যাতে সে তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারে।’

বুধবার, ২০ জুন, ২০১২

বৃষ্টি নয় খরা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

ভেবেছিলাম- তোমায় নিয়ে যাব বৃষ্টিøানে;
কিন্তু বৃষ্টি কোথায়? সারাটা দিন খরা।
বর্ষা এলো তবু দেখ শুকিয়ে যায় কদম,
এমন সময় এর আগে দেখিনি কোন জনম।

তাইতো তোমায় একটুখানি
চাইতে গেলেই চতুর্মুখী বাঁধা।
এখন আর মৌসুমও নেই ভালোবাসার,
জগত জুড়েই হতাশা আর হাহাকার।

বৃষ্টির আশায় আকাশ পানে চাইতে গেলে
মরার খরা পোড়ায় এ দেহটারে।
তার চেয়ে সেই কি নয় ভালোÑ
তোমার চোখের জলে আমি ভিজি,
আমার চোখের জলে তুমি।

সোমবার, ১৮ জুন, ২০১২

মঞ্চ নাটক: একটাই চাওয়া

রচনাঃ মোঃ আজিজুল ইসলাম স্বপন
নির্দেশনায়: আ.জ.ম কামাল
প্রশিক্ষকঃ জেলা শিল্পকলা একাডেমী মাদারীপুর
সার্বিক তত্ত্বাবধানে:
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
ছাত্র, নাটক বিভাগ
 জেলা শিল্পকলা একাডেমী মাদারীপুর
চরিত্রলিপি:
বয়াতী, আমীরন,সাজু , রফিক, বাদল, মানিক , রফিকের মা , বাচ্চুর বাবা, ওয়াজেদ আলী, কেতর আলী, মেজর. আরও কিছু আর্মি ও মুক্তিযোদ্ধা।
প্রথম দৃশ্য:
স্থান: বয়তীর বাড়ী
সময়ঃ সকাল
সারারাত গানবাজনা করে ভোর বেলা বাড়ী ফেরে সোলেমান বয়াতী। সোলেমান বয়াতীর স্ত্রী আমিরন তখন উঠান ঝাড়– দিচ্ছিল। সোলেমান বয়াতী উঠানে গান গাইতে পা রাখতেই আমিরনের তাছ্যিলের সুর।
আমিরনঃ আইজ কি সূর্য্য পশ্চিম দিক দিয়া উঠল নাকি? ব্যাপার কি? বয়াতী যে সাত-সকালে দোতারা হাতে নিয়া বাড়িীতে হাজির। গানের আসর কি ভালো জমে নাই?
বয়াতীঃ তুমি মনে হয় ভূল দ্যাখতাছো। সূর্যতো তোমাগো বাড়ীর পিছন দিয়া উঠছে।
আমিরনঃ সংসার চালানোর মুরদ নাই, আবার মুখে মুখে তর্ক, ভালো হইবোনা কইয়া দিতাছি।
বয়াতীঃ কেউ তর্ক করতে চাইলে কি মুখ বন্ধ কইরা থাকুম। তর্ক করলে কি করবা তুমি? কিছুই করতে পারবানা  আমার। আমি বিজয়ের ডাক শুনতে পাইতাছি(উদাস ভঙ্গি)পরাধীনতার শিকল ছেড়ার আওয়াজ শুনতাছি।
আমিরনঃ কথা ঘুরাইবানা কইতাছি, ইসস.. রে আমার জুয়ান মরদ, কথা হুইন্না মনে অইতাছে দ্যাশটারে একেবারে স্বাধীন কইরা আইছো
বয়াতীঃ বউরে একলা যদিও পারুম না, তবে চেষ্টা করতে দোষ কি? আহারে, খুব মনে চায় দেশটা যদি স্বাধীন করতে পারতাম(দীর্ঘশ্বাষ)। হের লাইগ্যাইতো মুখে বানছি দেশের গান, হাতে নিছি দোতারা
আমিরনঃ কতায় আছে না, গুজায় চায় চিৎ অইয়া হুইতে বয়াতীর অইছে হেই দশা।
বয়াতীঃ তুমি কিন্তু আমারে অপমান করতাছো। তুমি জানো, প্রয়োজনে আমি দোতারা ছাইরা হাতে রাইফেলও নিতে পারি।
আমিরনঃ হ......... যার মানই নাই তার আবার অপমান, ভাত পায় না আবার চা খায়, হাটতে পারে না বন্দুক ঝুলায়
বয়াতীঃ এই, মান নাই মানে? তুই কি কইতে চাস।
আমীরনঃ কি কইতে চাই বোঝ না? একজন জোয়ান মরদের বউ মাইয়া মাইনষের বাড়ীতে কাম কইরা প্যারে খুদা মিডায়। হেইয় মনে থাকে না
বয়াতীঃ তাও তো তোর বাপের বাড়ী থিকা ভালো আছোস।
আমীরনঃ তোমার ভালোর খ্যাতা পুরি। সারাদিন রাইত পইড়া থাকে দোতারা লইয়া, আর বাড়ী আইয়া করে ঝগড়া, আগে জানলে এমন পোড়া কপাইল্যার সংসারেই আমি আইতাম না।
বয়াতীঃ অহন তো জানছোস, তয় যা গিয়া, আমার লগে আমার মাইয়া আছে, আর আছে দোতারা, তোর মতন অমন বান্দরনীরে আমার লাগবোনা, তোর তোন আমার দোতারা অনেক বেশি সুন্দর। আহারে কি সুন্দর সুর দেয়, এই দোতারা আমারে দ্যাশের মাটিতে মিশাইয়া দেয়, যার তারে বাইজা উঠে দ্যাশের গান। (একটি দেশের গান)
আমীরনঃ কি কইলা আমার তোনে তোমার দোতারা সুন্দর, তোমার দোতারা আমি ভাইঙ্গাই ছাড়–ম, (এমন সময় ঘর থেকে মেয়ের প্রবেশ,মেয়ে বলে উঠে)
সাজুঃ ওমা তোমরা এ কি শুরু করলা, কাম কাইজ বাদ দিয়া শুধু ঝগড়া করো
আমীরনঃ থাক তুমি তোমার দোতারা লইয়া, আমি ও দ্যাখতে চাই তোমার প্যাডের যোগান কেডা দেয়, তোমার দোতারা  না আমি।
সাজুঃ মা,থাম তো, বাজান তুমিও থামো
বয়াতীঃ আয় মা, আমার কাছে আয় , দ্যাখ তোর মায় সকাল বেলা আমার মেজাজটা বিগরাইয়া দিছে। (আমীরন নিজের কাজে মন দেয়)
সাজুঃ বাজান, হুনছো-দ্যাশে না-কি আগুন লাগছে, পাকিস্তানি মেলেটারিরা নাকি খালি বাঙ্গালিগো ধইর‌্যা ধইর‌্যা মারতাছে।
বয়াতীঃ তোর কাছে কেডা কইল?
সাজুঃ শহরের মানুষ লাইন ধইরা গেরামে আইতাছে, শহরে নাকি মেলা গন্ডগোল অইতাছে।
বয়াতীঃ আমি ও একটু একটু হুনছি। তয় এহনতো মনে অইতাছে ঘটনা আসলেই হাছা।(আমীরন ভয় পেয়ে এসে বলে)
আমীরণঃ এই সব কতা হুইন্যা আমার খুব ডর করতাছে। হোনেন আমনে আর গান গাইতে দুরে দুরে যাইয়েন না, মাইডা বড়ো অইছে, কহন কি অইয়া যায় আমার কিন্তু আসলেই ডর করতাছে।
বয়াতীঃ ডরের কিছু নাই,(আনমনে ......... ভয় কি মরনে গান ধরে)
আমীরনঃ রাখেন আমনের গান, আমনে সব কিছুতেই খালি হেলামী করেন
বয়াতীঃ আইচ্ছা, আমি দুরে চইল¬া গ্যালেইতো তুমি খুশি অইবা, ঠিক না?
আমীরনঃ (অভিমান নিয়ে), আমনে খালি আমার বাহিরডাই দ্যাখলেন, ভিতরডা দ্যাখলেন না, ভিতরে ভিতরে যে আমার মনডা আমনের লাইগ্যা পুইড়া ছারখার হয়,হেইডা কোনদিন বুজলেন না।
বয়াতীঃ হেইডাতো তুমি ও বুজলানা।
আমীরনঃ হোনেন, আসল কতা কইতেই ভুইল্যা গেছি,  কাইল সন্ধ্যাকালে মানিক ভাই আইছিলো, আমনেরে দ্যাহা করতে কইছে।
বয়াতীঃ কও কি?এই কতা আরও আগে কইবা না, আমি অহোনি যাইতাছি....(দ্রুত প্রস্থান)
আমীরনঃ কিছু মুখে দিয়া যান....... হায়রে মানুষ( সবার প্রস্থান)
২য় দৃশ্য:
*( কোন এক গোপন স্থানে কয়েকজন মুক্তিকামি যুবক বসে আলোচনা করছে, এমন সময় বয়াতীর আগমন)
বয়াতীঃ মানিক ভাই তুমি আমারে আইতে কইছো?
মানিকঃ শোন বয়াতীভাই দ্যাশের অবস্থা ভালো না, গত ২৫ শে মার্চ রাইতে পাক আর্মিরা ইয়াহিয়া খানে নির্দেশে নিরীহ বাঙ্গালীর উপর ঝাপাইয়া পড়ছে, জাগায় জাগায় আগুন ধরাইয়া দিছে।
বাদলঃ হ বয়াতী ভাই, হুনলাম বাশগাড়ীর নুরুল ইসলাম শিকদার তখন ইপিআরে আছিলো, সে পিলখানা থেকে পালইয়া আইছে, যুদ্ধ শুরু অইয়া গ্যাছে, এহন আর সময় নাই, আমরা দ্যাহাইয়া দিমু আমাগো ভারী অস্ত্র নাথাকলেও মনোবল আছে, আছে দ্যাশের প্রতি ভালোবাসা, মাটির প্রতি আছে গভীর টান, আর থাকবোইবা না ক্যান? বঙ্গবন্ধু কইছে না যার যা কিছু আছে তাই শত্র“র বিরুদ্ধে ঝাপাইয়া পড়ো, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।
বয়াতীঃ হ, ঠিকই কইছো, আমরা ও দেখাইয়া দিমু এখনোই আমাগো উপযুক্ত সময়। কিন্তু কীভাবে কি করবা? ঠিক করছো কিছু?
বাদলঃ শোন, আগে আমাদের মনোবল বাড়াতে হবে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ঘর থিকা বাহির হইয়া আসতে হবে, আমাগো যুদ্ধের প্রস্তুুতি নিতে হইবো, আমাগো এহন ট্রেনিং দরকার, লিডারদের সাথে যোগাযোগ অইতাছে। তারা সবাই আসমত আলী খান সাহেবের বাসায় আছে, ইলিয়াস চৌধুরী, শওকত ছ্যার, স্টুয়ার্ড মুজিব ও ফনি বাবু ও আছে।
মানিকঃ বাদল ভাই তুমি না কইলা, শওকত ছ্যার আর স্টুয়ার্ড মুজিব নাকি আমাগো দ্যাখা করতে কইছে।
বাদলঃ হ, হাতে সময় খুব কম, তোমরা যার যার বাড়ী থিকা বিদায় নিয়া আসবা। আগামীকাল সকালে আমরা নাজিমুদ্দিন কলেজে হইমু, জাগো জাগো বাছাই করবো তারা আমরা ট্রেনিং এ যামু।
বয়াতীঃ এহন তয়লে উডি, কাইল সকাল সাতটার মধ্যে কলেজ মাডে থাকুম।
মানিকঃ হ, স্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে একটা টিম ইন্ডিয়ায় ট্রেনিং এর জন্যে পাঠানো অইবো, শোন, যারা ট্রেনিং এ যাইতে চায় তাগো আসতে কইবা
বয়াতীঃ বুজছি, আমি তাইলে পোটলা পাটিলি লইয়া হাজির অইয়া যামু, তয় সবাই খুব সাবধান, আমাগো সলা পরামর্শ য্যান কেউ জানতে না পারে, হুনছি আমাগো এলাকার কয়েকজন বেঈমান নাকি গোপানে পাকিস্তানিগো সাহায্যে করে, খোজ-খবর দেয়,
বাদলঃ ঠিক আছে, আমরা এহন তাইলে, সবাই যার যার বাড়ী যাই (সকলের প্রস্থান)
৩য় দৃশ্য:
স্থানঃ বয়াতীর বাড়ী
সময়ঃ ভোরবেলা
(বয়াতী পোটলা পাটলি বাধছে, আমীরনের প্রবেশ)
আমীরনঃ আমনে পোটলা পাটলি বান্ধেন ক্যান, কই যাইবেন, দ্যাহো দেহি, মুখখান ক্যামোন হুগাইয়া আমসীর মতো অইয়া গ্যাছে। কতা কন না ক্যান?
বয়াতীঃ (সম্বিৎ ফিরে পেয়ে) আমারে কিছু কও?
আমীরনঃ হ, কই, সাত সকালে আমনে কই যান? সারাদিন কিছু খান নাই, রাইতে খান নাই, এহনো না খাইয়া পোটলা পাটলি বাইন্ধা আমনে কই যান।  কাইলকের রাগ বুঝি এহনো আছে? ইচ্ছা কইর‌্যা কি আমনের লগে অমন করি,
বয়াতীঃ নারে, সাজুর মা তুই যা ভাবতাছোস, আসলে তা না, আমি তোর লগে রাগ যাইতাছি না। হুনছোস পাকিস্থানীরা আমাগো উপর অত্যাচার করতাছে, অগো আমার ঘেন্যা ধইরা গ্যাছে। অগো খতম কইরা আমি বাড়ী ফিরুম।
আমীরনঃ আমনে কই যাইবেন, আমনে গ্যালে আমাগো কেডা দ্যাখবো?
বয়াতীঃ তোগো আল¬ায় দ্যাখবো, তোগা লাইগ্যা আমি কিছুই করতে পারি নাই। তয় এইবার মনে অয় কিছু করতে পারুম, খালি তোগো লাইগ্যা না দ্যাশের লাইগ্যাও কিছু করতে পারুম। বউরে যদি বাইচ্যা আহি তো আইলাম, না আইলে তুই গর্ব কইরা কবি তোর স্বামী দ্যাশের লাইগ্যা যুদ্ধ কইরা শহীদ অইছে।
আমীরনঃ সাজু তো ঘুমাই রইছে, অর লগে কতা কইয়া যাইবেন না, আমি অরে ডাইক্যা দেই।
বয়াতীঃ না, অরে ডাকোনের কাম নাই, হাতে সময় কম, অয় ওটলে অরে কইবা, তোর বাজানে যুদ্ধে গ্যাছে। আমি অহোন যাই (আমীরন পিছু পিছু কাদতে কাদতে যায়, পিছন থেকে মেয়ে সাজু ডাকে)
সাজুঃ মা তুমি কান্দ কেন? বাজান কই?
আমীরনঃ তোর বাজানে গ্যাছে গা।
সাজুঃ মা বাজানে কই গ্যাছে?
আমীরণঃ তোর বাজানে যুদ্ধে গ্যাছে।
সাজুঃ মা-রফিকের মা চাচি কইলো। রফিক ভাই নাকি যুদ্ধে যাইবে, চাচি পাগোলের মত কানতাছে।
আমীরনঃ কছকি? তুই তইলে ঘরের কাম কর। আমি একটু ঐ বাড়ি যাই।
সাজুঃ আইচ্ছা যাও। তাড়াতাড়ি আই ও। (আমীরনের প্রস্থান। রফিকের প্রবেশ)
রফিকঃ চাচী, চাচী ও চাচী বাড়িতে আছেন?
সাজুঃ ক্যাডা?  (বের হয়ে) ও আপনে? মায় তো এই মাত্র আপনা গো বাড়ী গেল। বাজানে যুদ্ধ গ্যাছে। আপনিও নাকি            যাইবেন।
রফিকঃ হ, যাইতাছি। তয যাওয়ার আগে তোমারে একটা কতা বলার আছিল।
সাজুঃ কি কতা কইবেন। আমনে আমার দিকে ওমনে চাইয়া রইছেন ক্যান।
রফিকঃ চাইয়া রইছি ক্যান তুমি বুঝ না।
সাজুঃ  না বুঝি না। বুঝলে কি জিগাইতাম।
রফিকঃ আমি তোমারে খুব পছন্দ করি। কইতে পার ভালোও বাসি।
সাজুঃ আপনার কি সরমলজ্জা নাই। আসারে এইসব কইতাছেন।
রফিকঃ তোমার কাছে আমার শরম কীসের। জানিনা সাজু জান লইয়া ফিরতে পারুম কিনা যদি ফিরি তাইলে তোমারে আমার জীবন(সঙ্গী/সাথী) করুম।
সাজুঃ ঠিক আছে আগে দ্যাশটারে রক্ষা করেন। দেশের এই বড় বিপদে আমাগো সকলেরই উচিৎ দ্যাশের কথা চিন্তা করা। যদি ঠিকমতো দ্যাশ স্বাধীন হয় আর আমরা সবাই বাইচ্চা থাকি তয় অবশ্যই আমি আমনের হমু।
রফিকঃ সাজু তোমার উৎসাহ আমার শক্তি আরও বাড়াইয়া দিছে। তুমি দোয়া কইরো আমি যেন তোমার লাইগা স্বাধীন দ্যাশের পতাকা লইয়া ফিরতে পারি। (আবেগ জরিত কন্ঠে রফিকের বিদায়) আমি তাইলে এইবার া আসি সাজু।

৪র্থ দৃশ্য:
(চারদিকে গোলাগুলির শব্দ। চিৎকার ধ্বনি।)

মানিকঃ (ফিস ফিস গলায়) বাদল ভাই, আমরা যারা ট্রেনিং নিয়া আইছি। তারা এহন কী করুম। একটা কিছু ভাবা দরকার।
বাদলঃ হ, তা-ই ভাবতাছি। দুইডা ব্রীজ ধংসের পরে আমাগো হাতে এহন তেমন কোন অস্ত্র নাই। তাই প্রথমে কৌশলে পোষ্ট অফিস পাটের গুদাম, তফসিল অফিস, টেলিফোনের লাইন এগুলা ধ্বংস করতে হবে। অস্ত্র হাতে পাওয়ার পর যামু অন্য কোন অপারেশনে।
বয়াতীঃ হ-তয় খুব সাবধান। জুটমিল, কুলপদ্দি বাজারসহ কয়েকটা জায়গায় আর্মিরা ক্যাম্প বসাইছে। আর তগো সাহায্য করতাছে আমাগো দ্যাশের কিছু বেঈমান কুত্তারা।
মানিকঃ জানেন বাদল ভাই আমার পিচ্চি ভাইর ব্যাটা বাচ্চু আছেনা? ও আমাগো লগে লগে থাকতে চায়। হেদিন আমারে কয় চাচা আমারে একটা অস্ত্র দ্যাও। আমি দ্যাশের শত্রুগুলা শ্যাষ কইরা দেই।
বয়াতীঃ শোন মানিক, বয়াতী ঠিকই কইছে। আরে কবি-কাগজে-কাগজে স্লোগান লেইখ্যা পোষ্টার বানাইয়া গোপনে সবখানে লাগাইয়া দিতে।
রফিকের প্রবেশ।
বয়াতীঃ আচ্ছা বাদল ভাই সমাদ্দারে ব্রীজটা উড়াইয়া দিলে ক্যামন হয়। নুরুল ইসলামরা নাকি কালকিনির গোপালপুর ব্রীজ উরাইয়া দিছে। তয় নুরুল ইসলাম হানাদারগো গাত থেইক্কা বাঁচতে পারে নাই। ব্রীজ উরাইয়া যাওয়ার সময় আর্মিগো গুলিতে শহীদ হইছে।
বাদলঃ হ- নুরুর লেইগ্যা খুব খারাপ লাগতাছে। তয় জীবনের ঝুকি নিয়া হইলেও সমাদ্দারের ব্রীজ উড়াইতে হইবো। তাইলে আর্মি আর মাদারীপুর এর ভিতরে ঢুকতে পারবোনা।
রফিক ঃ হ-হেইডাই ভালো হয়। চোকদার ব্রীজ, আমগ্রাম ব্রীজতো ধ্বংস করা হইছেই। তয় সমাদ্দারের ব্রীজটাই হইলো আসল।
বাদল ঃ শোন, আজকে আমাগো দুই দলে ভাগ হইয়া যাইতে অইব। একদল চরমুগরীয়ার জেডিসি পাটের গুদাম ধ্বংস করব। আর একদল এ আর হাওলাদার জুট মিল ধ্বংস করবো। শোন, আইজ ১৪ই আগষ্ট। পাকিস্তান দিবস। আমাগো প্রান থাকতে বাংলার মাটিতে পাকিস্তান দিবস পালন করতে দিমু না।
বয়াতীঃ তয় সাবধান। আমাগো খলিল বাহীনির সবার চোখ কান খোলা রাখতে হইবো। শুনলাম কুলপদ্দিতে দুই জন মুক্তিযোদ্ধারে কারা য্যান ধারাইয়া দিছে।
মানিকঃ রাজৈর, শিবচর, কালকিনির খবরাখবর ও একটু লইও কোখায় সকি অবস্থা। বাদল ভাই এহন তইলে আমরা উডি। মূল অপারেশনের দিকে যাই। আর বাচ্চুরে পাঠাইয়া দেই কুলপদ্দিতে আটক দুইজনের নাম জাইন্না আসতে।
বয়াতীঃ চলো সবাই। জয় বাংলা। (সকলের প্রস্থানঃ গোলাগুলির শব্দ)

৫ম দৃশ্য:
*সোলেমান বয়াতীর দাওয়ায় বসে আমীরন তার মেয়ে সাজুর মাথায় বিলি কাটছে। এমন সময় রফিকের মার প্রবেশ।)
রফিকের মাঃ মায়ে ঝিয়ে ক্যামন আছো?
আমীরনঃ হ-গো-বু আমাগো আর থাকা। দ্যাশের যা অবস্থা প্রত্যেকটা রাইত কাটে দুঃচিন্তায়, আর রাজাকারগো ভয়ে।
রফিকের মাঃ তুমি ঠিকই কইছো। মা সাজু ঘরে কি পান টান কিছু আছে? (সাজু ঘরে যায়)
রফিকের মাঃ বইনরে বুকটার মইধ্যে খালি ধক্্ ধক্্ করে। আমার রফিক ক্যামন আছে, খোদা মাবুদই জানে। সাজুর বাপের কোন খোজ খবর পাওনি বোইন।
আমীরনঃ নারে বু-কোন খোজ খবর পাই নাই। দোয়া করেন বু দোয়া করেন। আমাগো আপনজন যাতে দেশ স্বাধীন কইরা আমাগো বুকে ফিইরা আহে। মাইয়াডা আমার মনমরা অইয়া গ্যাছে।
রফিকের মাঃ বু- সাবধনে থাকিস। ওয়াজেদ আলী আর কেতর আলী পাকবাহীনিরে সাহায্যে করতাছে। বাড়ি বাড়ি ঘুইরা মুক্তিযোদ্ধাগো আর জুয়ান মাইয়া মানুষ ধইরা নিয়া মেলেটারীগো হাতে তুইল্লা দেয়।
আমীরনঃ আমি ও হুনছি। হের লেইগ্যাইতো ডর। ঘরে আমার ডাঙ্গর মাইয়া। (পান হাতে সাজুর প্রবেশ)
সাজুঃ নেন চাচী আমনের পান। পানও ক্যামন শুকাইয়া গ্যাছে। হাড়ে-ঘাড়ে কেন্ডা যাই কন? তিন বেলার খাওন এক বেলায় খাই।
রফিকের মাঃ হরে- মা। তোর মুখখান ক্যামন শুকাইয়া গ্যাছে। কী সুন্দর বউ আমার ক্যামন হইয়া গ্যাছে। (সাজু লজ্জা পায়) থাউক, আর কয়ডা দিন মা, পোলা আমার দ্যাশ স¦াধীন কইরা ফিরলেই তোরে লাল শাড়ী ফিন্দাইয়া আমার ঘরে নিমু।
আমীরনঃ দোয়া করো বু। দোয়া করো সব উপর আলার মর্জি।
রফিকের মাঃ আইজ যাইরে বইন। একটু সাবধানে থাকিস।
আমীরনঃ চলেন আপনেরে একটু আগায় দিয়া আহি। চল মা সাজু। (সকলের প্রস্থান)
ষষ্ঠ দৃশ্য:
স্থানঃ আর্মি ক্যাম্প
সময়ঃ বিকাল
*( পাক বাহীনির ক্যাম্পে মেজরের সাথে রাজাকার ওয়াজেদ আলী ও কেতর আলীর কথোপকথোন)
ওয়াজেদ আলীঃ মেজর সাব, মুক্তি বাহীনিরা যা শুরু করছে তাতে তো বেশি সুবিধার মনে হইতাছে না।
মেজরঃ (ভয় পেয়ে) তুম কিয়া বাত বোলা, মুক্তি কোনছে............ মুক্তি মিলেগা।
ওয়াজেদঃ না হুজুর এ ধারমে নেহী মিলেগা। তবে যেভাবে ক্ষ্যাপছে তাতে এ ধারমে আইতে কতক্ষন।
মেজরঃ (অট্রহাসি) মুক্তি এ ধারমে নেহি আয়েগা কাভি নেহি। তুম ঝুট বলতাহু। হামছে ডরমে লাগা থা। যা শালা মেজাজ মে বিগড়ে দিলে তো।
ওয়াজেদঃ হুজুর, খোশ আমদেদ হো এওগা ভি খুশির বাত বোলতাহু। মেজাজ ভি ঠান্ডা হোতা হায়।
কেতরঃ কিচু মনে না করলে একটা কথা কই। সুন্দরী জোয়ান মাইয়া আছে। আপনার মেজাজ এক্কেবারে ঠান্ডা হইয়া যাইবো।
মেজরঃ মাইয়া? মাইয়া কিয়া হ্যায় ?
কেতরঃ মাইয়া মানে হইলো মানে ....................... (আটকে যায়)
ওয়াজেদঃ মাইয়া মানে বহুত খুব সুরত লাড়কী।
মেজরঃ ও ঠিক হ্যায়, ঠিক হ্যায়। যাও ওকে লিয়ে  আসতা হ্যায়।
ওয়াজেদঃ হুজুর, জেলার সাহেবকা কিয়া বাদ হে।
মেজরঃ জেলার সাবকা লাড়কীকা বাদ মে সব খতম করতা হায়।
ওয়াজেদঃ হুজুর, জেলারের মেয়ে বাদে সব খতম?
কেতরঃ মানে ঐ সুন্দরী সুফিয়া?
মেজরঃ হা- হা- হা- হা ওকে হাম ধীরে ধীরে খতম করতাহু। ও হামার ক্যাম্পে ভি রাখতাহু।
ওয়াজেদঃ আমরা তাইলে এখন আসি হুজুর।
মেজরঃ ঙশ তুম যাও  মেজরের প্রস্থান)
ওয়াজেদঃ শোন কেতর আলী। বয়াতীর বাড়ীর দিকে নজর রহিস শুনলাম ও নাকি যুদ্ধে গ্যাছে। সালার কত্তবড় সাহস সালায় ভাত পায় না চা খায়।
কেতরঃ হুজুর দোতারা লইয়া যুদ্ধে যায়। হুজুর ঘরে কিন্তু সুন্দরী বউ আর মাইয়া আছে।
ওয়াজেদঃ কেতর আলী চল গায়েনের বাড়ীর দিকে যাই ওর যুদ্ধে যাওনের সাধ মিটাইয়া দিমু চল।
কেতরঃ চলেন তাইলে। (উভয়ের প্রস্থান)
সপ্তম দৃশ্য:
(স্থানঃ মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন আস্তানা)
বাদলঃ কিরে মানিক চারিদিকের খবর কী?
মানিকঃ ভাই আমগ্রাম আর পাথুরিয়াপাড় ব্রীজ ধ্বংস কইরা দিছি। মিলিটারিরা এহন আর সহজে ঢুকতে পারবো না। তয় সমাদ্দারের ব্রীজ ভাঙ্গতে পারলেই আমরা সফল।
বয়াতীঃ শোন গোপনে একটা খবর পাইলাম।
সবাইঃ কী খবর?
বয়াতীঃ রফিক, কাশেম আর সাইদুলরা মিল্লা ঘটকচর স্কুলে কয়েকজন রাজাকারগো আটক করছে। আমাগো এহন সে দিকে যাওয়া দরকার।
মানিকঃ তাইলে চল, আমরা এহনই যাই। শালাগো জনমের তরে বেঈমানীর সাধ মিটাইয়া দেই।
বয়াতীঃ সাবধানে যাইস, তোরা আইলে আমরা এ আর হাওলাদার জুট মিলে হামলা করুম। হুনলাম, কালকিনির ফাসিয়াতলা হাটে পাকবাহীনিরা আইজ গণহত্যা চালাইছে। ঘরে ঘরে আগুন ধরাইয়া দিছে। শত শত মানুষরে মিথ্যা কতা কইয়া বাজারে আইন্না গুলি কইরা মারছে। আমাগো গোপন সংবাদ দাতা নুরে আলম পান্নারে ধইরা লইয়া গ্যাছে।
মানিকঃ হ- গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ ধইরা আনছে জুট মিলে। তাগোরে মুক্ত করতে না পারলে হারামীর বাচ্চারা তাগো মাইরা জুট মিলের মধ্যেই গণকবর দিব। বেশি দেরি করন ঠিক অইবোনা।
বয়াতীঃ বাদল, মানিক আমার মনডা জানি ক্যামন করতাছে বউ মাইয়াডারে খুব দ্যাখতে মন চায়। না জানি ওরা ক্যামন আছে।
বাদলঃ বয়াতী তুমি এই অবস্থার মইধ্যে বাড়ীর কথা ভাবো?
বয়াতীঃ হ-ভাবি, তোমরা কি বুঝবা। তোমাগোতো আমার মতোন সংসার নাই, বউ নাই, শিয়ানা মাইয়া নাই। জানি না ওরা কোন বিপদে আছে।
মানিকঃ সব ঠিক অইয়া যাইব। দেইখেন আমাগোরই জয় অইবো। আপনে কোন চিন্তা কইরেন না। ওরা ভালোই আছে।
বাদলঃ না বয়াতী, তোমার বাড়ি যাওনের কাম নাই। আমার এখন উডি( সকলের প্রস্থান)

অষ্টম দৃশ্য:
(ঝি ঝি পোকার শব্দ)
* (সলেমান বয়াতীর বাড়ি। খন্দকার ও কেতর আলী আসে)
ওয়াজেদঃ বয়াতী ও সলেমান বয়াতী, বাড়ী আছ নাকি?
আমীরনঃ ক্যাডা, ক্যাডা জিগায়?
ওয়াজেদঃ আমি ঐ পাড়ার খন্দকার ওয়াজেদ আলী
আমীরনঃ তারে  কি দরকার? হে তো বাড়িতে নাই।
ওয়াজেদঃ না মানে,ওতো আমাগো গৌরব। মুক্তিযোদ্ধা- জয় বাংলার সৈনিক। মনে বড় আশা ছিল যুদ্ধে যামু। এই দ্যাহো আমি ট্রেনিং কইরাও যাইতে পারলাম না।
কেতরঃ হে- হে- হে। হুজুর আপনার আর কী আশা ছিল।
আমীরনঃ আমনেরা এহোন যান। হে আইলে আমি আমনের কতা কমু হানে।
ওয়াজেদঃ আহা........ । লক্ষী পায়ে ঠ্যালতে নাই। তারে দিয়া আমি কি করুম। দরকারতো তোমারে। ঘরে মেজবান আইলে একটু খাতির যতœ করতে হয় না?
আমীরনঃ সুন্নতী লেবাস পইরা  এইসব কি কতা কন? শয়তান বদমাইশ, এই দিকে আর একটু ও আগাই বিনা কইতাছি।।
ওয়াজেদঃ (অট্রহাসি দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে) কেতর আলী শালিরে আমি নিতাছি তুই মাইয়াডারে নিয়া চল মেজর সাব পাইলে খুশি হইবো।
আমিরনঃ ছাড় কুত্তার বাচ্চা। তগো মা বোন নাই। তগো উপর আল্লার গজব পরবো। তোরা শান্তিতে থাকতে পারবি না।
মেয়েঃ ছাড় শয়তান ছাড়, তোরা আমাগো ছাড় কইতাছি।
*একদিক দিয়া ওয়াজেদ আলী, গায়েনের বউ ও মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, অপর দিক দিয়ে আবার ওয়াজেদ কেতর আমীরন ও মেয়েকে নিয়ে ঢুকবে মেজর সাবে ক্যাম্পে।
ওয়াজেদঃ হুজুর, এই যে, আপনার সুন্দরী লাড়কী
মেজরঃ আও লারকী আও। হাম তুমকো সাদি করতাম। হাম তুমকো বিবি বানাইতাম। আও মেরা দিলের রানী। তুম বহুত সুরাত হে।
আমীরনঃ না- না- না। আমার গায় হাত দিবি না কইলাম, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের দোহাই দিয়া কইতাছি আমারে ছাইড়া দে।
মেয়েঃ বেঈমান, রাজাকার, আমাগো ছাইড়া দে। অবলা  মাইয়া মানুষ লইয়া টানাটানি করছ ক্যান। পারলে মুক্তিযোদ্ধার সামনে গিয়া খাড়া। আমার বাজানে হুনলে তোগো কাইট্টা কুত্তা দিয়া খাওয়াইব।
মেজরঃ গায়েনের বউকে অত্যাচার করতে উদ্যত হয় তখন সাজু কেতরের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মেজরের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বলে আমার মায়রে ছাইড়া দে কইতাছি। মেজর তখন রাগ হয়ে গলায় ফাস দিয়ে সাজু কে মেরে ফেলে।
(আমীরনকে টেনে নিয়ে ভিতরে নিয়ে যায় এবং সকলের প্রস্থান)
নবম দৃশ্য:
বাদলঃ হুনছনি তোমরা কালকিনি, রাজৈর ও শিবচর হানাদারমুক্ত অইয়া গ্যাছে। চিন্তুা কইরো না আমরাও শীঘ্রই মুক্ত অইয়া যাইমু। আমাগো দ্যাশ ও স্বাধীন অইয়া যাইব।
মানিকঃ ভাই, রফিকের তো কোন খোজ পাইলাম না।
বাদলঃ রফিকের ঐ দুঃসম্পর্কের বোন কি জানি অর নাম বেনু না কি জানি? অয়তো গোপনে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাগো অনেক সাহায্যে তরছে। অর খবর কী?
মানিকঃ হ- ভাই বোইনডা আমার দ্যাশের লাইগ্যা নিজের ইজ্জত পর্যন্ত হারাইছে। তয় হুনছি হানাদারগো খতম না কইরা বেনু  ও থামবো না।
বাদলঃ হ-বেনু পারবো। অর বুকের মধ্যে জেদ ধইরা গ্যাছে। ও এহোন জীবনের পরোয়া করে না। কি নিয়াই ও বাচবো মাইয়াডা।
মানিকঃ বয়াতী ভাই কি হইছে- তুমি এত অস্থির ক্যান?
বয়াতীঃ সাইদুলের কাছে হুনলাম ওয়াজেদ আলী নাকি আমার বউ আর মাইয়ারে ধইরা নিয়া গ্যাছে। বাদলরে আমার সব শ্যাষ হইয়া গ্যালো রে ভাই সব শ্যাষ হইয়া গ্যালো।
বাদলঃ আইজ এতগুলা দুঃসংবাদ আমারে দিলা। বয়াতী কান্দ ক্যান। কাইন্দা কোন লাভ নাই, এই ধরো অস্ত্র, এইডারে চাইপ্পা ধরো। মনটারে শক্ত করো, বাঁচতে অইলে লড়তে অইবো। সব কিছুর বিনিময়ে অইলেও দ্যাশ স্বাধীন কইরা ছাড়–ম। চলো তোমরা, আইজই সমাদ্দারের দিকে, ঐখানে আর্মিগো গাড়ি আইসা জড়ো হইছে। অগো খতম করতেই হইবো।
বয়াতীঃ বাদলরে না আমি আর কান্দুম না, আমি এইবার পাকিস্থানি ক্ত্তুার বাচ্চাগো কইলজা টাইন্না বাইর কইরা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু।
মানিকঃ চল সবাই (একদিকে দিয়ে বের হয়ে অন্য দিক দিয়ে ঢুকবে এবয় আর্মিদের সাথে যুদ্ধ করবে।
এক জন : আমাদের গোপন সংবাদ দাতা জানিয়েছে মাদারীপুর থেকে আর্মিরা সব কিছু নিয়ে যে কোন সময় পালিয়ে যাবে।
বাদল : ঘটকচর থেকে প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। এই যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতে হবে।
যুদ্ধের সময়
বাদলঃ বাচ্চু তুই গ্রেনেড সাবধানে মার। ওরা কিন্তু রাস্তার ওপারে বন্দুক তাক করে আছে।
মানিকঃ তুই যা বাচ্চু আমি তোরে কাভার দিতাছি।
 আর্মিঃ মুক্তির উপর গুলি ছোর দে। (বাচ্চুর মারা যাওয়ার শব্দ)
মানিকঃ বাদল ভাই বাচ্চু মনে হয়,,,,,,,,,,,,,,,,,,,
বাদল : মেজর খটক, তুমি আতœসমর্পন কর। মুক্তি যোদ্ধারা তোমাদের চারিদিক ঘিরে ফেলেছে।
 *যুদ্ধের ময়দানে মানুষ মরে পড়ে থাকবে ঐ দিকে বাদলের কাছে মেজর সাব সাদা রুমাল দেখিয়ে আত্মসমর্পন করবে।
(থমথমে পরিবেশ থাকবে)
শেষ দৃশ্য:
(যুদ্ধ শেষ। জয় বাংলার মিছিলে। বয়াতী ছুটে আসে তার বাড়ী অন্যদিকে জয়বাংলার মিছিলের  শব্দ শুনে রফিকের মাও ছুটে আসে বয়াতীর বাড়ী)
বয়াতীঃ আমীরন, সাজু তোমরা কই? এই দ্যাগো আমি আইছি। দ্যাশ স্বাধীন করে আইছি।
(বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)
রফিকের মাঃ সোলেমান ভাই তুমি আইছ? তয় বড় দেরি কইরা হালাইছো। তোমার মাইয়াডা আর ফিরতে পারে নাই, বউডা সব হারাইয়া পাগল হইয়া গ্যাছে। হয়তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতাছে........। (হাঠাৎ রফিকের কথা মনে হয়ে ব্যাকুল হয়ে গায়েনকে প্রশ্ন করবে)
রফিকের মাঃ গায়েন ভাই তুমি একলা আইছ ক্যান? আমার রফিক আহে নাই। আমার রফিক কই। গায়েন ভাই তুমি কথা কওনা ক্যান?(গায়েন শোকে বিহ্বল হয়ে কান্নাজরিত কন্ঠে বলে)
বয়াতীঃ ভাবীসাব তোমার রফিকের কোন খোজ পাই নাই(রফিকের মার চিৎকার কান্নায় আকাশ ভারী হয়ে আসবে) না........... আমার রফিক..............................
রফিকের মাঃ আমার বাজান, আয় বাব, তুই ফিরা আয় যুদ্ধ তো শ্যাষ তুই এহোনো কি করছ? সবাইতো ঘরে ফিইরা আইছে, তুই কবে আবি বাজান কবে? আয়.............বাবা আয়( বলে কানতে কানতে বেরিয়ে যাবে, গায়েন রফিকের মার পিছন পিছন গিয়ে আবার ফিরতে যাবে এমন সময় আমীরন পাগল বেশে প্রবেশ করবে এবং গায়েন দেখে আশ্চর্য হয়ে যাবে। বউকে ধরতে যায় সে ছিটকে দুরে সরে যায়)
আমীরনঃ না আমারে ছুইবিনা ছুবিনা কইতাছি, পর পুরুষ আমার সব কাইরা নিছে। তুই আবার কোন পুরুষ? তুই আবার কি চাষ(কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে)
বয়াতীঃ আমীর আমার আমীরন। আমি তোমার গায়েন আমীর। আমার সাজু মইরা গিয়া বাইচ্চা গ্যাছে। দ্যাশের জন্য শহীদ হইছে। এই দৃশ্য দেখার আগে আমি ক্যান শহীদ হইলাম না? আমু...... আমুরে কতা কও আমীর কতা কও। (বলে জোরে ঝাকুনী দেয়)
আমীরনঃ (স্মৃতি ফিরে পেয়ে) আমি মরি নাই? আমি বাইচ্চা আছি ক্যান? গায়েন কতা কও ক্যান আমি বাইচ্চা আছি? কি আছে আমার? তুমিতো দ্যাশ স্বাধীন করছো। কত মানুষের মুখে হাসি ফুটাইছো। হ্যারা কি পারবো আমাগো ইজ্জত ফিরাইয়া দিতে। জানো ওরা আমার আর সাজুর ইজ্জত একলগে নিছে। (আবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে গায়েনের বুকে।)
বয়াতীঃ চুপ করো, আমীরন চুপ করো, আর কইওয়ানা তুমি চুপ করো। (গায়েনের কোলে আমীর মারা যায়) আমির কতা কও, কতা কওনা ক্যান? চোখ খোল আমীরন চোখ খোল।( কান্নারত অবস্থায় আমীর কতা কও বলে জোরে চিৎকার করে)
বয়াতীঃ আমার আমীরন কতা কয়না। তোমরা কতা কওনা ক্যান? তোমরা চুপ কইরা রইছো ক্যান? দ্যাহো তোমরা, দ্যাশের লাইগ্যা আমি আমার সব হারাইলাম। তোমরা আমারে ফিরাইয়া দিতে পারবা? পারবানা। তোমাগো কাছে কিছু চাই না আমি, খালি আমার নিষ্পাপ মাইয়া আর বউরে যারা নষ্ট কইরা মারছে,যারা আমাগো মাছুম বাচ্চুরে মারছে, যারা এই দ্যাশের লগে বেঈমানী করছে যাগো হিং¯্র থাবায় দ্যাশ আর দ্যাশের মানুষ ধ্বংস হইয়া গ্যাছে, আমি হেইসব ওয়াজেদ আলী আর কেতরগো বিচার চাই। পারবানা তাগো বিচার করতে? আমি মরার আগে আমার “একটাই চাওয়া” একটা জিনিস দেইখ্যা যাইতে চাই আর কিছু চাই না (বলতে বলতে কান্নারত অবস্থায় পতাকা দিয়ে  বউকে ঢেকে কোলে নিয়ে এগিয়ে যায়)
* নেপথ্যে গান বাজবে-একসাগর রক্তের বিনিময় বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা)
:সবাই ফ্রীজ:

বুধবার, ১৩ জুন, ২০১২

মহাত্মা গুরুনাথ স্মরণে বসন্ত উৎসব

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
সত্যধর্মের প্রচারক কবিরতœ মহাত্মা গুরুনাথ সেন গুপ্ত স্মরণে সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের উদ্যোগে মাদারীপুরের কালকিনি অঞ্চলের নিভৃত পল্লী ঝুরগাঁও গ্রামে তিনদিনব্যাপী বসন্ত উৎসব পালিত হয়। প্রতিবছর ২৮ জানুয়ারি সকাল থেকে ৩০ জানুয়ারি গভীর রাত পর্যন্ত ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে  একেক বছর একেক স্থানে এ উৎসব পালিত হয়।
সন্ধ্যা নাগাদ উৎসবস্থলে পৌঁছে আমি হতবাক। সহস্র লোকের আনাগোনা। ভক্তরা মন্ডপের সামনে তাবুতে বসে আরাধনা করছেন। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। এরই ফাঁকে কথা হয় কয়েকজন ভক্তের সাথে। তারা সত্য ধর্মাবলম্বী। যুগ যুগ সাধনা করে মহাত্মা গুরুনাথ সত্য ধর্মকে আবিস্কার করেছিলেন। তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর এ দিনে পালিত হয় এ উৎসব। আয়োজন করেন সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি। একেক বছর একেক স্থানে পালিত হয়। এ বছর স্থান নির্ধারণ করা হয় কালকিনি। এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘সৃষ্টিস্থীতিলয় কর্তা সর্ব শক্তিমান মঙ্গলময় জগদীশ্বরের উপাসনা।’
উৎসবের তিনদিন স্রষ্টার গুণকীর্তণ, মহাত্মা গুরুনাথ রচিত ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও আলোচনা, সকল দেহত্যাগী আত্মার জন্য প্রার্থনা করা। সবশেষে সমাপনী রাতে কবিরতœ মহাত্মা গুরুনাথের পাদপদ্মে অর্চনার মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তী ঘোষণা করা হয়। উৎসবে বিভিন্ন জেলা থেকে মহাত্মা গুরুনাথের অগণিত ভক্ত অংশগ্রহণ করেন।
এ বছর সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রমেশ চন্দ্র বিশ্বাসের সভাপতিত্বে উৎসবকে অলংকৃত করতে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন সত্যধর্ম মহামন্ডল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক হারান চন্দ্র দাস, হবিগঞ্জ জেলার সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মলয় চৌধুরী, নেপালে কর্মরত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাঃ নীহার রঞ্জন বিশ্বাস ও গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তন্ময় কুমার সরকার।
উৎসবে মোট ৮টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন তিন ঘন্টা সময় নিয়ে তিনটি করে অধিবেশন হয়। পরিবেশিত হয় ধর্মীয় সংগীত। সংগীতের মূর্ছনায় কলুষিত অন্তর পরিশুদ্ধ হয়। সত্যধর্মের জয় কামনা করে বিদায় নিতে হয় আগত ভক্তদের। তখন সৃষ্টি হয় একটি ভ্রাতৃত্বময় পরিবেশের। যে দৃশ্য আজীবন প্রত্যাশা করেন সবাই।

নারীর প্রতি কেন এত সহিংসতা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ কথা আমরা কখনোই অস্বীকার করতে পারি না। কিন্তু কাজের বেলায় তার উল্টো। আমরা মুখে এ কথা বললেও তা অন্তরে লালন করি না। এ আমাদের মত পুরুষের দীনতা। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা এ জন্য বহুলাংশে দায়ি। আমরা কেবল নারীকে আমাদের ভোগের সামগ্রী হিসাবে পেতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করি।
আমাদের সমাজের নারী কারো মা কারো সন্তান কারো বোন কারো স্ত্রী। কিন্তু সে আমরাই আমাদেও লোলুপ দৃষ্টির কারণে তাদের আলাদা করে দেখি। পরিবর্তিত হয়ে যায় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। পুরুষমাত্রই এখন নারীর কাছে আজরাইল। আমাদের সমাজ এখন নারীর কাছে অনেকটা অভিশাপের মতন।
কবি বলেছেন-‘নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি প্রাণ,/ যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান।’ অথচ আমরা যখন বিরহে কাতর হই; তখন নারীর বুকে মাথা রেখে একটু উষ্ণতা খুঁজি। কামাতুর হয়ে নারীকে ভোগ করি। শেষে নিক্ষেপ করি আস্তাকুড়ে। মিলনে ব্যর্থ হলে ঝলসে দেই নারীর শরীর। উন্মত্ততায় খুন করতেও দ্বিধাবোধ করি না। প্রেমের ফাঁদে ফেলে লালসা মিটিয়ে ছাব্বিশ টুকরো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেই নারীর শরীর।
তাইতো মেয়ে যত বড় হয় পরিবারের দুঃশ্চিন্তা ততই বাড়ে। ফলে তার স্বাভাবিক বিকাশ তখন বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই নারীর প্রতি সহিংসতার নানাবিধ সংবাদ চোখে পড়ে। কারো চোখে জল, কারো মুখে বীভৎস হাসি।
ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, হত্যা ও নারী নির্যাতন এখন সমাজের জন্য বিভীষিকা হয়ে দেখা দিয়েছে। এর থেকে মুক্তি পেতে আমাদের কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক আচরণগত ধারণাই এর সমাধান হতে পারে। 

কালকিনির গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাসিয়াতলা বাজারের হাটের দিন । সরগরম প্রায় দোকানপাট। সন্ধ্যার ঠিক আগে হঠ্যাৎ দু'জন অপরিচিত মানুষ ঢোল পিটিয়ে ঘোষনা করলো মুক্তিবাহিনী আসছে মিটিং করবে আপনারা কেউ বাজার ছেড়ে যাবেন না। মিনিট ১৫ না পেরোতেই হাটটি ঘেরাও করে রাজাকার, আল-বদর বাহিনী। ১০ মিনিট পরই নদীতে গানবোটে চড়ে আসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। ততক্ষণে রাজাকাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী মানুষের ওপর।  একদিকে হানাদারদের গুলি অপরদিকে স্থানীয় রাজাকার, আল-বদরদের নির্মম হানায় হত্যা করা হয় অন্তত দেড় শত মুক্তিকামী মানুষকে। অনেককে ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে।  লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাটের দোকানপাট। যাওয়ার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮ জনকে। এরমধ্যে ১০ জন আজও ফিরে আসেনি। এরপর কেটে গেছে ৪০ টি বছর। তবে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ। ফলে নতুন প্রজন্ম মহান এই স্মৃতিকে ভুলে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর ২০০৮ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে উপজেলা গেট সংলগ্ন সুরভী সিনেমা হলের পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন। কিন্তু তারপর কেটে গেছে তিনুটি বছর। তবুও কাজ শুরু হয়নি স্মৃতিসৌধের। ঠিক তেমনিভাবে অবজ্ঞা-অবহেলায় পড়ে আছে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়। অর্থাভাবে সংস্কার বা পুণঃনির্মাণ কোনটাই সম্ভব হচ্ছেনা।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসকান্দার আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর আগে। অথচ দেশের জন্য যারা জীবন দিল, পঙ্গু হল, সর্বস্ব হারালো তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিন বছর আগে স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও কাজ শুরু হয়নি। ফাসিয়াতলার গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়টিও অর্থাভাবে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে। এরকম হলে আগামী প্রজন্ম স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলে যাবে।

অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা আকন মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসেরহাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপিত হয়। ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ ও মিউজিয়ামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মিউজিয়ামের সংস্কার কাজ চললেও স্মৃতিসৌধের কাজ শুরু হয়নি। অর্থাভাবে ঢিমেতালে চলছে মিউজিয়ামের কাজ। কাজ শেষ না হওয়ায় দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এখানে সংরক্ষিত আছে শহীদ বীর বিক্রম নুরুল ইসলাম শিকদারসহ ২৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবি, মুজিব নগর সরকারের গার্ড অব অনারের ছবি, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল ও ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত হেলমেট ও বিভিন্ন জিনিসপত্র।
মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা আকন মোশাররফ হোসেন জানান, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। শহীদ বীর বিক্রম নুরুল ইসলাম এ এলাকার সন্তান। তার জন্য কিছু করতে পারিনি। কেবল একটি স্মৃতিসৌধ ও মিউজিয়াম করার উদ্যোগ নিয়েছি। মিউজিয়ামের সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এখনো স্মৃতিসৌধের কাজ শুরু করতে পারিনি। অর্থাভাবে করতে পারছিনা। মন্ত্রী মহোদয় আশ্বাস দিয়েছিলেন। সরকারী বা বেসরকারী সাহায্য পেলেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের বিনিময়ে শত্র“মুক্ত হয়েছে এদেশ। স্বাধীনতার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। ইজ্জত হারিয়েছে মা-বোন। পঙ্গু হয়েছে অগণিত মানুষ। অথচ স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাসিয়াতলা গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি। এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে গড়ে ওঠেনি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়টিও সংস্কারের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবীর মুখে উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপিত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে প্রস্তাবিত স্মৃতিসৌধের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি এখন আপামর জনসাধারণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আর কালক্ষেপণ না করে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকরি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে কালকিনিবাসী।


সোমবার, ১১ জুন, ২০১২

অনুভূতির কথা

লাবনী আনোয়ার

তোমাকে তখন এক চিমটি সিঁদুর দিতে পারি নি।
আজ আমার বুকে সিঁদুরের নদী বইছে-
কিন্তু এতটুকু সময় নেই যে তোমার সিঁথিকে রাঙাবো।

তোমার সিঁথি আজ রঙিন অন্য কারো স্বপ্নে,
এ বুকে আজ রক্তিম সিঁদুর বইছে নিরবধি।
বুকের পাঁজরগুলো ভেঙে ভেঙে ঢেউগুলি আছড়ে পড়ছে-
কিন্তু দেখার মতো কেউ নেই।
তোমাকে তখন এক চিমটি সিঁদুর দিতে পারি নি
বলে ব্যাকুল ছিল মন।
ভেবেছিলাম একদিন তোমাকে ভাসিয়ে দেব সিঁদুর গঙ্গায়।
সেই দিনটি বুঝি আজ এল।

আমার কাছ থেকে তুমি চলে গেছ
অগ্নিকে সাক্ষী রেখে।
সেই অগ্নি দেখ আজ আমার চোখে ঝরে।
মেহেদীর রঙে রাঙাইনি বলে ব্যাকুল ছিল মন,
আজ বুকের রক্তে রাঙাব তোমার চরণ।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, ঢাকা।

কবিতার সংলাপ

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

-অন্ধকারে কী দেখছ অমন করে?
-কী?
-হয়তো আকাশের তারা
 নয়তো প্রিয়জনের মুখ।
-কবিতা?
-কবিতার মুখ বড়ই ফ্যাকাশে।
-এতো কঠিন কথা আমি বুঝিনা,
 আমিতো তোমার মতো কবি নই।
-কঠিনকে সহজ করে নিতে হয়।
  সবাইতো আর কবি হয না।
-কঠিনকে সহজ করার ক্ষমতা আমার নেই।
-এইতো হয়ে গেল একটি চরণ
  মানুষ যা বলে তা-ই কি কবিতা নয়?
-এত সহজ কবিতা?
-হা, কবিতা সহজ-
  আমরা না বুঝে তাকে কঠিন বলি।
 11.06.2012

অসময়ের কিছু অভিব্যক্তি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আমি এখন অসময়ে সময়ের প্রতিধ্বনি শুনি
হতাশার কাফনে মোড়ানো  জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখি
ব্যর্থতার মোড়কে আগামীর ছায়া দেখি
জেগে থেকে অলীক স্বপ্ন স্বপ্নের জাল বুনি।

সময়কে এখন অসময়ের পথে হাটতে দেখি
হতাশাকে আশার আলোয় জ্বলতে দেখি
ব্যর্থতাকে সার্থকতার বাজারে চড়াদামে বিক্রি করি
দু:স্বপ্নকে রাতের আড়ালে লুকিয়ে রাখি।
১১.০৬.২০১২

চাই ইউনিয়নে ‘ইউনিয়ন পুলিশ’ ও নগরে ‘নগর পুলিশ’

ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, ড. এ.কে.এম. রিয়াজুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন মুসা

এক. সরকারের গণতান্ত্রিক কিংবা অগণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে শাসন বিভাগের মাধ্যমে। শাসন বিভাগের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে থেকে পুলিশ বাহিনী জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়া সহ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তাই বলা হয়, একটি দেশের পুলিশের আচার-আচরণ দেখে সরকারের চরিত্র বোঝা যায়। গত ২৬মে ঢাকা আগারগাঁও মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রীদের আন্দোলনের ছবি তুলতে গিয়ে ফটো সাংবাদিকরা পুলিশের হাতে নির্মম প্রহারের শিকার  হন। একইভাবে গত ২৯ মে ঢাকা সিএমএম আদালত চত্বরে পুলিশ কর্তৃক একজন তরুণীর লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদ করলে সেখানেও দুজন সাংবাদিক পুলিশের হাতে প্রহৃত হন। পুলিশের হাতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও অনুরূপ নির্যাতনের বহু ঘটনা রয়েছে। তবে বর্তমান সরকারের আমলে এই নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।

দুই. সকলের জানা রয়েছে, বৃটিশ সরকার ১৮৬১ সালে পুলিশ আইন তৈরি করে তাদের শাসনকার্য পরিচালনার স্বার্থে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দেশ দু’দুবার স্বাধীনতা লাভ করলেও পুলিশ এখনও জনগণের বন্ধু হতে পারেনি। তবে বৃটিশ আমলে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের অধীনে পুলিশকে কাজ করতে হতো। ফলে কিছুটা হলেও জবাবদিহিতার মধ্যে থেকে তাদেরকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর কেন্দ্রীভূত সরকার ব্যবস্থায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার স্বার্থে গোটা পুলিশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে ন্যস্ত করা হয়। ফলে থানায় একজন জুনিয়র অফিসারের অন্যায় আচরণ দেখলে মানুষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে দায়ী করে। আমরা জানি, যাবতীয় অপরাধ ও বিশৃঙ্খলার সিংহভাগ ঘটে স্থানীয় পর্যায়ে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রকৃত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা না থাকায় পুলিশ বাহিনী স্থানীয় সরকারকে কোনো গুরুত্ব প্রদান করে না। যদিও ইংল্যান্ডসহ উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে পুলিশ বাহিনীকে স্থানীয় সরকারের অধীনে শুরু থেকেই ন্যস্ত করা আছে। সিডিএলজি দীর্ঘদিন আগে থেকে বলে আসছে বাংলাদেশে দু’প্রকারের সরকার ব্যবস্থা, তথা কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা চালু করে স্থানীয় সরকারের জন্য পৃথক পুলিশ বাহিনী গঠন করা অত্যাবশ্যক।

তিন. পূর্বে আমাদের দেশটি পুরোপুরি গ্রামকেন্দ্রিক ছিল। বৃটিশরা গ্রামের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে চৌকিদার নিয়োগ করে। তৎকালীন বৃটিশ সরকার গ্রাম চৌকিদারী আইন পাশ করে স্থানীয় শাসনকে আইনের কাঠামো প্রদান করে। পরবর্তীকালে ইউনিয়ন কমিটি, ইউনিয়ন বোর্ড, ইউনিয়ন কাউন্সিল ইত্যাদির হাত ধরে বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ নামে গ্রামীণ ইউনিটটি পরিচিতি লাভ করেছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এর মাধ্যমে গ্রাম পুলিশের ক্ষমতা ও কার্যাবলী নির্দিষ্ট করা হয়। উক্ত আইনে ২১ প্রকার অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা গ্রাম পুলিশদের হাতে দেয়া হয়। তার মধ্যে ১৮নং ক্রমিকে বলা হয়েছে, গ্রাম পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ও ওয়ারেন্ট বা গ্রেফতারী পরোয়ানা ছাড়াই কতিপয় অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করতে পারবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ গ্রাম পুলিশদের নিয়ন্ত্রণের একক কর্তৃপক্ষ না হওয়ায় কার্যত তারা থানা পুলিশের এজেন্ট হয়ে কাজ করতে বাধ্য থাকে। ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত নামে বিচার ও শালিসী বোর্ড রয়েছে। সেখানে ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের প্রয়োগ না থাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিচারিক কাজ করে থাকেন। তার ফলে বিচারে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ থাকে এবং মাঝে মধ্যে সংশ্লিষ্টদের আইন নিজ হাতে তুলে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়। তারপরেও সেখানকার শালিসী বোর্ড এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে একই ব্যক্তি গ্রাম আদালতে ভুল স্বীকার করে, অথচ উচ্চ আদালতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে। সেজন্য বিদ্যমান আদালতের সাক্ষী-সাবুদ ব্যবস্থাকে অনেকে আর্টিফিশিয়্যাল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। কেউ কেউ মনে করেন ছাগল হারিয়ে কোর্টের কাছে বিচার চাওয়া মানে গরু হারানোর ব্যবস্থা করা। সেজন্য ইউনিয়নে ‘ইউনিয়ন আদালত’ গঠন করা এখন সময়ের দাবী।

চার. বর্তমান সরকার পৌর এলাকায় ‘পৌর পুলিশ’ নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে। তবে যেসব পৌরসভা পৌর পুলিশদের বেতন-ভাতা প্রদান করতে সক্ষম হবে সেখানেই প্রথমে পৌর পুলিশ নিয়োগ দেয়া হবে। এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হলো, কেন্দ্রীভূত সরকার ব্যবস্থা বহাল রেখে সরকারের কোন উদ্যোগই কাজে আসবে না। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিদ্যমান ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন আর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডগুলোতে জনগণের একেকটি অংশ বসবাস করে। এই চারটি ইউনিটের মধ্যে ইউনিয়ন হলো গ্রামীণ এবং পৌরসভা/সিটি কর্পোরেশন/ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হলো নগরীয় স্থানীয় ইউনিট। প্রথমে উক্ত দুই প্রকারের স্থানীয় সরকারকে ভিত্তিমূল ধরে স্থানীয় সরকারের উচ্চতম ও মধ্যবর্তী ইউনিটগুলো নির্দিষ্ট  করে তাদের কাজ নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে সর্বপ্রথম ইউনিয়নে ‘ইউনিয়ন সরকার’ ও নগরে ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ইউনিয়ন সরকারের অধীনে ‘ইউনিয়ন পুলিশ’ (গ্রাম পুলিশ) এবং নগর সরকারের অধীনে ‘নগর পুলিশ’ দায়িত্ব পালন করবে। এখানে সংক্ষেপে নগর পুলিশের কার্যক্রম তুলে ধরা যেতে পারে। নগর প্রশাসন, নগর সংসদ ও নগর আদালত মিলে ‘নগর সরকার’ গঠিত হবে। নগর প্রশাসনের প্রধান হবেন ‘মেয়র’। কাউন্সিলররা নগর সংসদের সদস্য হবেন। আর পৃথকভাবে মনোনীত কিংবা নির্বাচিত ব্যক্তিরা ‘নগর আদালতে বিচারিক দায়িত্ব পালন করবেন। নগর পুলিশরা মেয়রের অধীনে থেকে দায়িত্ব পালন করবেন। নগর পুলিশ নগরকেন্দ্রিক যাবতীয় অপরাধের তদন্ত করবেন এবং অপরাধীকে বিচারের জন্য নগর আদালতে সোপর্দ করবে। নগর পুলিশ জাতীয় পর্যায়ে সংঘটিত কিংবা বড় ধরনের অপরাধ দমনে কেন্দ্রীয় সরকারের পুলিশকে সহযোগিতা দিবে। নগর পুলিশ নগরে বসবাসরত নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানসহ আবাসিক হোটেলগুলোর বোর্ডারদেরও নিরাপত্তা প্রদান করবে।

পাঁচ. বলা বাহুল্য, এই বাহিনী ফুটপাত, খাল, সরকারি জায়গা, পার্ক ইত্যাদি সহ নাগরিকদের স্বার্থে ব্যবহৃত সরকারি জায়গাগুলো অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত রাখবে। নগর সংসদে উন্নয়ন, প্রশাসন, শিক্ষা, যানজট, রাস্তাঘাট উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, আইন-শৃঙ্খলা, সবুজায়ন, বৃক্ষায়ন সহ যাবতীয় বিষয় আলোচনা করা হবে। আর সংসদে পাশকৃত প্রস্তাবাবলী নগর প্রশাসন বাস্তবায়ন করবে। অর্থাৎ নগর সরকারে ক্ষমতার পৃথকীকরণ তত্ত্বের পুরোপুরি প্রয়োগ ঘটবে। এই ব্যবস্থা গৃহীত হলে নগরে অপরাধ দমনে পুলিশ ব্যর্থ হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়ী না করে মানুষ মেয়রকে প্রথমে দায়ী করবে। সেইসঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিং এর শ্লোগান ‘আমি পুলিশ, আমিই জনগণ’ শুধু কথার কথা হয়ে থাকবে না, নিজেদের চর্চার মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষ সেটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।

লেখকবৃন্দ: প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, চেয়ারম্যান, জানিপপ; প্রফেসর ড. এ.কে.এম. রিয়াজুল হাসান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিসিএস শিক্ষা; এবং মোশাররফ হোসেন মুসা, সদস্য, সিডিএলজি।