বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ, ২০১৩

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ-এর দু’টি কবিতা

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ

যা কিছু চেয়েছিলাম; হয়তো পেয়েছি বা পাইনি।
অদূরে দাঁড়িয়ে হাতছানি দেয় সৌভাগ্য,
হতাশার সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে গেছি ঈশ্বরের মনোনীত স্বপ্নচূড়া দ্বীপে।

কী আছে অজানা জনারণ্যেÑ যাবতীয় প্রেম, প্রেমের অসুখ
উচাটন মন, মনের দূরত্ব। কিংবা সাফল্যের শেষ উপাদান হাতড়ে হাতড়ে
ঈশ্বরের তীক্ষè দৃষ্টিতে রমণীর কামনার সুরসুরির নিষেধাজ্ঞা
উপেক্ষা করে ছিটকে পড়েছি ভাগাড়ে।

ঈশ্বরের সাথে শেষ হিসাব-নিকাশ চুকাতে গিয়ে বারবার ঠকেছি।
জিতেছেন ঈশ্বর; ঈশ্বরেরা বরাবরই জয়ী হন-
জয়ী হবার বদলে আমাকেই ক্ষমা চাইতে হয়।
এবার আমার হিসাবের পালা শেষ,     স্বার্থপর ঈশ্বরের সাথে কোন আপোষ নেই।
কড়ায়-গন্ডায় কষে নেব সব হিসাব-নিকাশ। আমার জয়ের হিসাব,
আমার প্রেমের হিসাব, আমার সীমাহীন প্রাপ্তীর হিসাব।

ঈশ্বরেরর সাথে এ আমার শেষ হিসাব-নিকাশ।

ঈশ্বর বনাম তুমি

তোমাকে ভালোবাসি বহু বছর বহু কাল,
ঈশ্বরের মতো ভালোবাসি তোমাকে।
তোমাকে না পেলে হারাবো ঈশ্বর-
ঈশ্বরকে না পেলে তোমাকেও পাবো না।
তোমার মাঝে খুঁজে পাই নিজের অস্তিত্ব,
তোমার মাঝে ঈশ্বরের বসবাস।
তোমার ঠোটে ঈশ্বরের আনন্দের হাসি,
তোমার চোখে ঈশ্বরের বেদনার জল।
আমার ভালোবাসা শুধু দু’জনার জন্যÑ
ঈশ্বর বনাম তুমি। হয়ত তুমি গ্রহণ কর;
নয়ত ঈশ্বরকে দিতে দাও।

২৮.০৩.২০১৩
কালকিনি, মাদারীপুর।

মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ, ২০১৩

কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বাঙলা বিভাগের নবীন বরণ ও কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

রফিকুল ইসলাম মিন্টু,কালকিনি:
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের বাঙলা বিভাগের নবীন বরণ ও কৃতি শিক্ষার্থী সালাহ উদ্দিনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান গত ২৪ মার্চ সকাল ১০টায় কলেজ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়।
বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ইয়াকুব খান শিশিরের সভাপতিত্বে সদস্য সচিব অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামাসের সঞ্চালনে প্রধান অতিথি ছিলেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূতপূর্ব বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মোঃ শাহজাহান মিয়া ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবু আলম। বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক দেদারুল আলম মুরাদ, সন্ধ্যা রাণী বল, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী জাহিদ হাসান, সালাহ উদ্দিন, নুরুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
পুষ্পার্ঘ অর্পণ ও রাখিবন্ধন শেষে বরণপত্র পাঠ করেন কামরুন্নাহার, সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন সুমাইয়া আক্তার সামী। অনুষ্ঠানে সালাহ উদ্দিনকে ক্রেষ্ট ও অভিনন্দন পত্র দেওয়া হয়। উল্লেখ্য ১৯৯৩ সালে বাঙলা বিভাগ যাত্রা শুরু করে এই প্রথম এমএ শেষ বর্ষে প্রথম শ্রেণি পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয় সালাহ উদ্দিন।
সাংস্কৃতিক পর্বে আবৃত্তি করেন অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান, কবি আকন মোশাররফ হোসেন, সালাহ উদ্দিন, সাহিদা পারভিন লিপু ও সুমাইয়া আক্তার সামী। কৌতুক পরিবেশন করেন অধ্যাপক মোঃ শাহজাহান মিয়া, সংগীত পরিবেশন করেন অধ্যাপক ইয়াকুব খান শিশির, অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান, প্রভাষক সঞ্জয় মজুমদার ও আবুল কালাম আজাদ। সবশেষে সালাহ উদ্দিনের রচনায় নুরুদ্দিন আহমেদের নির্দেশনায় নাটক ‘কালচারাল ফ্যামিলি’ মঞ্চস্থ হয়। এতে অভিনয় করেন সালাহ উদ্দিন, সোহরাব হোসেন, নুরুদ্দিন, দবির হোসেন, শাহ আলম ও শহিদুল ইসলাম।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ কোন পথে?

মো: খবির উদ্দিন

৯০’র গণ অভ্যূত্থানের কথা কাউকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আজ হঠাৎ মনে পরে গেল ৯০’র গণ অভ্যূত্থানের ইতিহাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রতিদিনের মত বন্ধুদের সাথে মিরপুর পল্লবী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ‘চৈতালী’তে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গেলাম। ঐদিনকার প্রথম প্রিয়ড যথারীতি ১১ টায় শুরু হবে। সময় এদিক-সেদিক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। হলোও ঠিক তাই। এগারটা বাজার সাথে সাথে কলা অনুষদের দ্বিতীয় তলার পশ্চিম পাশে যেখান থেকে তাকালেই রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং ও মাষ্টার দা-সূর্যসেন হল চোখে পরে এমন একটি কক্ষে স্যারের লেকচার শুরু হলো। শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্বেয় ড. রুহুল আমীন স্যার। আমার খুব প্রিয় শিক্ষক ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বহু গল্প করেছি স্যারের সাথে। অনেক প্রাণবন্ত আলোচনা যা আজও ভুলতে পারিনা। একটু নিরবে নিভৃতে থাকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে প্রফেসর ড. হাবিবুর রহমান স্যার, প্রফেসর ড. রুইছউদ্দিন স্যার, প্রফেসর ড. আবদুস সাত্তার স্যার, প্রফেসর ড. আবদুল বাকী স্যার, প্রফেসর শামছুল হক স্যারসহ অন্যান্য শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের কথা। যাদের কাছ থেকে অ-নে-ক জ্ঞানগর্ভ কথা ও আলোচনা শুনেছি। যখন স্যারদের ক্লাশ শুরু হতো তখন মাঝে মধ্যে মনে মনে ভাবতাম আজ যদি এই ক্লাশটা কোন বিরতি না দিয়ে অবিরাম চালিয়ে যেতেন। মনে পড়লেই হারিয়ে যাই সেই মধুময় স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলোর মধ্যে।

যাক্ সে সব কথা, এখন যে উদ্দেশ্যে এই লেখা সে প্রসংগে আসা যাক। ড. রুহুল আমীন স্যার লেকচার শুরু করে এক পর্যায়ে বললেন, দেখেন গতকাল জহুরুল হক হলের উত্তর পাশের রাস্তায় চুন্নুকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। কার ভাগ্যে যে কোন সময় বিপদ এসে যায় বলা মুশকিল। তাই আপনারা একটু সাবধানে চলার চেষ্টা করবেন। যতটা সম্ভব সংঘাত এড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করে চলবেন। স্যারের কথার মধ্যে অনেক উপদেশমূলক ইংগিত বহন করছিল যা আমাদের বুঝতে অসুবিধা হলো না। স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ গুলির আওয়াজ হলো, গুলিটা যে খুব কাছে হচ্ছিল তা গুলির আওয়াজেই বুঝা গেল। এরপর শুধু গুলি আর গুলি। মনে হলো এ যেন সেই ছোট বেলার রমজান শেষে দীর্ঘ প্রতিক্ষিত ঈদের চাঁদ ওঠার পরে একযোগে গ্রামের শিশু-কিশোরদের বিভিন্ন রকম বাজি ফুটানোর আওয়াজের মত। স্যার আমাদের খুব জোর করে বললেন, তোমরা কেউ বেঞ্চ থেকে ঊঠোনা এবং জানালার পাশে এসোনা। এইতো পশ্চিম পাশের মাঠেই গোলাগুলির আওয়াজ চলতে লাগল অবিরাম। খবর শোনা গেল স্বৈরশাসক হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এর পালিত বাহিনীর নেতা অভি-নিরু মিডফোর্ট মেডিকেলের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে রেজিষ্ট্রার বিল্ডিং ও কলা ভবনের মাঝখানের মাঠে ঢুকে পড়েছে। প্রাণপণ গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও ক্যাম্পাস দখলে নেয়া। কিন্তু বহুদলীয় ছাত্র ঐক্যের পক্ষ থেকে পাল্টা জবাব দেয়া হলো। প্রায় এক ঘন্টার অধিক সময় ধরে উভয়পক্ষের মধ্যে আক্রমন ও পাল্টা আক্রমন চলতে থাকে। দীর্ঘক্ষণ সংগ্রাম করে টিকতে না পেরে স্বৈরশাসকের বাহিনী শেষমেষ বিফল হয়ে সরকারী প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়েছিল। আমরা যতটুকু তথ্য পেয়েছিলাম তাতে জানা গেল ঐদিন প্রায় ৫০০ রাউন্ডের মত গুলি ছোড়া হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ সমস্ত ক্লাস অনির্দিষ্টকালের জন্য Ÿন্ধ ঘোষণা করলেন।

দীর্ঘদিন যে সরকারবিরোধী একদফা আন্দোলন চলছিল তা আরও বেগবান হতে লাগল। সরকারের পক্ষ থেকে শুরু হলো সংঘাত, জুলুম, নির্যাতন, মিছিলের উপরে গুলিবর্ষণ। এর একপর্যায়ে ডা: মিলন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। আন্দোলন আরও তুমুল হতে লাগল। প্রতিদিনই সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রাম চলতে লাগল। অনেক রক্ত ঝরল, শেষমেষ রক্তের হলি খেলায় স্বৈরশাসক হেরে গেলেন। শেষ চেষ্টা করেও কোন কাজ হলোনা। অনেক তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত গদির লোভ তাকে ছাড়তে হলো এবং ১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর সাধারণ জনগণ ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কঠোর প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। অবসান ঘটল নয় বছরের স্বৈরশাসনের। দেশের মানুষ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন।

সংকটকালিন মুহূর্তে দায়িত্ব এসে পড়ল বিচারপতি সাহাব উদ্দিনের কাঁধে, দায়িত্ব পড়ল একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করার। নির্ভেজাল চরিত্রের মানুষ বিচারপতি সাহাব উদ্দিন তাঁর শ্রম ও নিষ্ঠা দিয়ে জাতিকে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য মানের একটি নির্বাচন উপহার দিলেন এবং প্রত্যেকটি দল এ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছিলেন ।

১৯৯১ এর নির্বাচনে সাধারণ জনগণের মধ্যে স্বতস্ফূর্ত ভাব লক্ষ করা গিয়েছিল। জনগণ তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। নির্বাচনী ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের সমমনা দলগুলো নিয়ে সরকার গঠন করলেন। বছর না ঘুরতেই আবার আন্দোলন দানা বেধে ঊঠতে লাগল, হরতাল মিছিল মিটিংসহ সংসদ বর্জনও চলতে লাগল। অনেক চড়ই-উৎরাই পেরিয়ে বিএনপি অনেকটা হঠকারী সিন্ধান্ত নিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্র“য়ারী বিরোধীদলবিহীন জাতীয় সংসদের নির্বাচন করলেন। প্রধান বিরোধী দল না থাকায় একচেটিয়া সংসদের প্রায় সকল আসন পেয়ে গেলেন তারা। কিন্তু বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উক্ত নির্বাচনকে অবৈধ নির্বাচন আখ্যা দিয়ে তত্তাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে পূন নির্বাচনের দাবি জানিয়ে তারা রাজ পথে তুখোড় আন্দোল গড়ে তুললেন। প্রচন্ড আন্দোলনের মুখে বিএনপি বিরোধীদলের দাবী মেনে নিয়ে তত্তাবধায়ক সরকার বিল পাশ করে ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৬ ক্ষমতা থেকে নেমে পরলেন। প্রমাণ হলো, জনগণের যে কোন যৌক্তিক দাবি সংসদের সংখ্যা গরিষ্ঠতার বলে অবহেলা করে মোটেও পার পাওয়া যায়না।

এবার জনগণ খুব স্বস্তি বোধ করলেন। ভাবলেন এবার বুঝি ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য সংঘাত আর হানাহানি থেকে বাঁচা গেল, ভবিষ্যতের জন্য আর কোন হানাহানির অবকাশ থাকলনা। যেহেতু ভবিষ্যতে প্রতিটা সরকারের মেয়াদ শেষে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¦াবধায়ক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অতএব স্বাভাবিকভাবেই বোধগম্য হল যে, নির্বাচন অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের ও জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে। এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¦াবধায়ক সরকারের বিষয়টি সাংবিধানিক ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেল। 

যেহেতু বিএনটি সংসদ ভেংগে দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তাই নিয়মানুযায়ী নির্দিস্ট (তিন মাস) মেয়াদের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। সে অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো এবং নির্বাচন হলো তত্ত্বাবধায় সরকারের মাধ্যমে। এবার সংখ্যা গরিষ্ঠতার বলে ক্ষমতায় এলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এভাবেই ক্ষমতার পালা বদলে আবার ২০০১ সালে সংসদের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন বিএনপি। কিন্তু বিএনপির মেয়াদ শেষে তত্ত্বাধায়ক সরকারে প্রধান ব্যাক্তি কে হবেন এ নিয়েই অনেক নাটক ঘটে গেল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এ নিয়ে প্রচন্ড রকমের সংঘাতময় পরিস্থিরি সৃষ্টি হলো। এ অরাজক পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণ আবার অসহায় হয়ে পড়লেন। প্রতিদিনই নৃশংসতা চলতে লাগল। পল্টনের ঘটনা আমাদের অজানার কথা নয়। দেখা গেল চেহারা না চেনার কারনে নিজ দলের লোকদের হাতে নিজেরাই মার খাচ্ছে। যেমন আওয়ামীলীগের এ আমলেও বিশ্বজিৎ এর বেলায় ঘটল। এমনি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে এক এগারোর সৃষ্টি হলো। এক এগারোর সময় বিএনপি ও আওয়ামীলীগের উপরে যে খড়গ নেমে এসছিল সে ইতিহাস আমাদের সকলকেই নাড়া দেয়। আজ এ লেখায় এক এগারোর ভালো মন্দ বিশ্লেষণে যাবনা এবং উদ্দেশ্য আমার সেটা নয়।

পাঠক হয়ত মনে করতে পারেন এই পুরনো ইতিহাস সকলেরই জানা আছে তাহলে কেন অহেতুক এই বাসি গল্প আলোচনায় আনা হলো? ঊদ্দেশ্য অবশ্যই আছে। যে ঊদ্দেশ্যে এত পেছনে ফিরে তাকাতে হলো সেটা  হলো আমরা আজ কোথায় ফিরে যাচ্ছি। যেহেতু ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ আন্দেলনের মাধ্যমে অর্জিত তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি মিমাংসিত হয়েছিল এবং বর্তমান সংসদের মাধ্যমে তত্ত্বধায়ক আইন বাতিল করা হয়েছে তাই ভবিষ্যত নির্বাচন নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম অনিবার্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এখন সহসাই প্রশ্ন আসতে পারে, আসলে আমাদের ভবিষ্যত রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে?  আমরা দেশ ও জাতিকে আবার সেই পিছনের দিকে অর্থাৎ ১৯৮২, ১৯৯০-এর অভ্যূত্থান, ১৯৯৬’র মাত্র ১৫ দিনের সংসদ না কি এক-এগারোর দিকে নিয়ে যাচ্ছি? জানি, এ উত্তর রাজনীতিবিদরা মিলাতে পারলেও মিলাবেন না।

এ প্রসংগে আমার একটা উদহরণ মনে পড়ে গেল, সেটা হলো- আমাদের দেশের স্বাধীনতার বয়স ৪২ পেড়িয়েছে অর্থাৎ ৪২ বছর পূর্বে আমাদের দেশের জন্ম হয়েছে। এই ৪২ বছর পরেও আমরা কোথায় অবস্থান করছি। শিশু অবস্থায় না-কি ৪২ বছর বয়সের এক সুঠাম দেহের অধিকারীর ন্যায়। জন্মের পরে এক সময় মানুষ হাটতে শিখে। তারপরে একটু জোরে হাটে। তারপরে একা একা দৌঁড়াতে পারে। সারা জীবনতো আর মানুষ হাটা শিখেনা। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের অবস্থা প্রকৃত অর্থে ঐ শিশুটির ন্যায়। যে জন্মের ৪২ বছর পার হওয়ার পরেও বাপের হাত ধরে হাটা শিখছে।

আমি এ দেশের একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের দেশের শ্রদ্ধাভাজন দুই নেত্রীকেই বিনয়ের সাথে অনুরোধ জানাচ্ছি, আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমরা আর অন্যের হাত ধরে হাটা শিখতে চাইনা। আমরা আর হানাহানি চাইনা, আমরা এক ভাই আরেক ভাইয়ের রক্ত দেখতে চাইনা। আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে চাই। সর্বোপরি আমরা সহাবস্থান চাই। আমি বিশ্বাস করি, আপনারা উভয়েই এই মহান স্বাধীনতার মাসকে শ্রদ্ধা করেন। বিশেষ করে এই স্বাধীনতার মাসের উপরে শ্রদ্ধা রেখে আপনারা পিছনের সব অপ্রীতিকর ইতিহাস ভুলে গিয়ে জনগণের ও দেশের কথা চিন্তা করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একটি যৌক্তিক সিন্ধান্তে এসে উপণীত হবেন। এদেশের সাধারণ জনগণ যারা কম শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা বিভিন্ন পর্যায়ের উচ্চ শিক্ষিত আছেন তাদেরকে আর শ্রমিক বানিয়ে বিদেশে না পাঠিয়ে যাতে করে এ এদেশের মাটিতেই কর্মক্ষেত্র তৈরী করে দিতে পারেন তার জন্য প্রয়োজনে একটি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করুন এবং এ দেশের জনগণের হাতকেই কাজে লাগিয়ে দেশকে স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিন। এদেশের ষোল কোটি মানুষ আপনাদেরকে আমরণ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দিয়ে যাবে। আমরা এই অপরাজনীতি থেকে বেড়িয়ে আসতে চাই।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক তিলোত্তমা ও সহকারী ব্যবস্থাপক, দৈনিক করতোয়া।

শুক্রবার, ১৫ মার্চ, ২০১৩

মাতৃভাষার একাল-সেকাল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
আমরা ক’জন একালের স্মার্ট তরুণ। বন্ধুর জন্য বাসা খুঁজতে বেরিয়েছি রাস্তায়। দেয়ালে টানানো ‘টু-লেট’ দেখে তিলপাপাড়ার চিপাগলিতে বাসা খুঁজতে খুঁজতে এক বৃদ্ধের সাথে দেখা। আমরা বললাম,‘এক্সকিউজ মি আংকেল! ৩১২ নম্বর বাসাটা কোন দিকে?’ বৃদ্ধ অবাক চোখে পরখ করলেন আমাদেরÑ তারপর বললেন,‘আমাকে আঙ্কেল বললে কেন? বল চাচা। চাচা ডাকটি কী বিশ্রী লাগে শুনতে?’ তপু বিড়বিড় করে বলল,‘লোকটা বড্ড ব্যাকডেটেড।’ ইতস্তত হয়ে আমি বললাম,‘সরি!’ বিশ্বাস করুন, আমি বলতে চেয়েছিলাম.....। কিন্তু মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। ভেরি ভেরি সরি। নেক্সটাইম আর বলবনা।’ বৃদ্ধের চোখে-মুখে ক্ষোভের বিচ্ছুরণ। বললেন,‘আবার সরি কেন? বল দু:খিত। বাসাটা ওই দিকে।’ আমরা সমস্বরে বলে উঠলাম,‘থ্যাঙ্ক ইউ!’ বৃদ্ধ এবার রাগ সামলে দন্তবিহীন মুখে মলিন হাসি হাসলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-‘তোমাদের দোষ দিয়ে কী লাভ? এটাইতো আমাদের স্বভাব। তোমাদের যা শেখাই। তোমরা শিখছ তাই।’ বলেই হাতের লাঠি দিয়ে পথ ঠুকতে ঠুকতে অদৃশ্য হলেন। আমরা হতবাক! অণুকরণপ্রিয়তা আর পরনির্ভরশীলতার লজ্জায় মাতৃভাষার জন্য বেরিয়ে এল অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস!

## সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
     কালকিনি, মাদারীপুর।
     আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৩

শীত কালের খেজুর রস হতে পারে সারা বছরের আয়ের উৎস


শীত কালের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ খেজুর রস বা গুড়। গ্রামাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ মাত্র ২-৩ মাস খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বারো মাসের সাংসারিক খরচ জোগাতে পারেন। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কিংবা গুড় তৈরি করে এ আয় করা সম্ভব। খন্ডকালীন এ পেশায় যারা নিয়োজিত হন গ্রামবাংলায় তাদের বলা হয় ‘শিউলি বা গাছি’। খেজুর রস বা খেজুর গুড় পরিবারে এনে দিতে পারে সচ্ছলতা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।
যা যা প্রয়োজন: রস সংগ্রহ করতে প্রথমত নিজের বা অন্যের খেজুর গাছ নির্বাচন করতে হবে। রসের উপোযোগি গাছ ঝোরতে (পরিস্কার) হবে। এরপর বাঁশের তৈরি ঠুই বা ঠুলি (ঝুড়ি) দরকার। খলা তৈরি করতে দুইটি ছেনদা ও একটি কোপাদা। আবার দা ধারালো রাখতে বালু আর বালিকাচা (সুপারি কাঠ)। কোমড়ে বাঁধতে একটি পাটের চট বা বস্তা। ৫-৬ হাত লম্বা কাছি (রশি)। যা শিউলিকে গাছের সাথে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে। ৩ হাত লম্বা একটি বাঁশ, যেটা গাছের ডাল-পালা পরিস্কার করার সময় আড়াআড়ি বেঁধে দাঁড়াতে প্রয়োজন হয়। সবশেষে রস পড়ার উপযোগি খলা তেরি করে বাঁশের নলি(নল) ও দুইটা খিল দিয়ে হাড়ি দিতে হবে। 
খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ: বাঙলা কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গাছের একদিকের কাঁটা ফেলে দিয়ে কিছুদিন বিশ্রামের পর অগ্রহায়নের মাঝামাঝি খলা তৈরি করে রস সংগ্রহ করতে হবে। সংগ্রহ চলবে চৈত্র মাস পর্যন্ত। তবে যে গাছে খেজুর হয়না তাকে বলে ‘চুমুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস সংগ্রহ শুরু করতে হবে অগ্রহায়নের শেষের দিকে। আর সংগ্রহ শেষ হবে মাঘ মাসের শেষের দিকে। যে গাছে খেজুর ধরে তাকে বলে ‘খাজুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহ করা যাবে। সপ্তাহের চারদিন বিকেলে গাছ কাটতে হবে। রাতের জমানো রস সকাল বেলা সংগ্রহ করতে হবে। গাছকে অবশ্যই সপ্তাহে ৩ দিন বিশ্রাম দিতে হবে।
যেভাবে তৈরি হয় গুড়: শিউলিরা ইচ্ছা করলে রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে পারেন। রস দিয়ে গুড় তৈরি করতে হলে সকালে রস সংগ্রহের পর বাড়ির আঙিনায় স্থায়ী বা অস্থায়ী চতুর্ভূজ আকৃতির বিশেষ চুলার ওপর সিলভারের তাফালে (চতুর্ভূজ আকৃতির পাত্র) আগুনে জাল দিয়ে চিট (আঠাল) হলে ছোট ছোট মাটির গর্তের ওপর কাপড় রেখে কিংবা পরিস্কার প্লেট বা থালায় ফেলে তার ওপর ঢেলে গুড় তৈরি করতে হবে। শক্ত হলে গুড় তুলে নিতে হবে। আকারে ছোট গুড়কে ‘পাটালি’ আর বড় গুড়কে ‘মধুখন্ড’ বলা হয়।
বিক্রি ও আয়: বাজারে এক হাড়ি রস ১০০-১৩০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। রস ক্রেতারা সকাল বেলা আপনার বাড়ি এসে নিয়ে যাবেন বা স্থানীয় বাজার থেকেও কিনে নিতে পারবেন। আপনার অধীনে ৩৫-৪০টি গাছ থাকলে আপনি প্রতিদিন ৪০০-৫০০টাকার রস বিক্রি করতে পারবেন। আর বর্তমানে বাজারে খেজুর গুড় বিক্রি করতে পারেন প্রতি কেজি ৮০-১৩০ টাকা দরে। যারা গুড় তৈরি করবেন তারা অন্য শিউলি বা গাছির কাছ থেকে অতিরিক্ত রস কিনে নিতে পারবেন। গুড় বিক্রেতারা স্থানীয় ব্যবসায়ি বা পাইকারের কাছে গুড় বিক্রি করতে পারেন। তবে পাইকারি বিক্রি করলে লাভ একটু কম হবে। তবে হাটে বসে খুচরা বিক্রি করলেই লাভবান হবেন বেশি।
শিউলি বা গাছির কথা: শিউলি বা গাছি আবুল কালাম জানান,‘মোর ৩০টা গাছ মুই কাটি। ভালোই আয় অয়। আরেক জনের গাছ কাটা লাগে না। আরেক জনেরটা কাটলে তারে তিনভাগের একভাগ দেওয়া লাগে। তিন বছর অইলো পোলা দুইডা বিদাশ আছে। অগো টাকা মোর লাগেনা। মোরা খাইয়া-লইয়া ভালোই আছি।’

অথবা: আবুল কালামের সংসার চলে খেজুর রস বিক্রি করে

শীত কালের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ খেজুর রস বা গুড়। গ্রামাঞ্চলের স্বল্প আয়ের মানুষ মাত্র ২-৩ মাস খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে বারো মাসের সাংসারিক খরচ জোগাতে পারেন। খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে কিংবা গুড় তৈরি করে এ আয় করা সম্ভব। খন্ডকালীন এ পেশায় যারা নিয়োজিত হন গ্রামবাংলায় তাদের বলা হয় ‘শিউলি বা গাছি’। তাই ২০ বছর যাবৎ খেজুর রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন আবুল কালাম। দুই ছেলেকে তিন বছর আগে দুবাই পাঠিয়েছেন। কাজ-কর্ম বোঝার পর থেকেই খেজুর গাছ কাটাকে নিজের পেশা হিসাবে নেন তিনি। এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার উত্তর রাজদী কাঠেরপুল গ্রামের শিউলি বা গাছি আবুল কালামের কথা জানাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন মাহমুদ।
‘তেমন কিছু করি না। মাঝে মাঝে মানুষের বাড়ি কামলা খাটি। আর শীতকাল আইলে খাজুর গাছ কাটি। রস বেইচ্যা যা আয় অয় তাতেই হারা বছর পার অইয়া যায়।’ কথাগুলো বললেন আবুল কালাম। তিনি ২০ বছর যাবৎ এ পেশায় যুক্ত রয়েছেন। তার একমাত্র আয়ের উৎস খেজুর রস।
বাঙলা কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গাছের একদিকের কাটা ফেলে দিয়ে কিছুদিন বিশ্রামের পর অগ্রহায়নের মাঝামাঝি খলা তৈরি করেন। যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে পৌষ মাসের শুরু থেকেই পুরোদমে রস সংগ্রহ করতে থাকেন। এ সংগ্রহ চলে চৈত্র মাস পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে গাছের ধরণ অনুযায়ি দুইটি সময় উল্লেখযোগ্য। আর তা হলো- যে গাছে খেজুর হয় না তাকে বলে ‘চুমুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস সংগ্রহ শুরু করেন অগ্রহায়নের শেষের দিকে। আর সংগ্রহ শেষ হয় মাঘ মাসের শেষের দিকে। যে গাছে খেজুর ধরে তাকে বলে ‘খাজুইর‌্যা’ গাছ। এ গাছের রস পৌষ মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংগ্রহ করেন। সপ্তাহে চারদিন বিকেলে গাছ কাটেন। সারারাতের জমানো রস সকাল বেলা সংগ্রহ করে বিক্রি করেন ।
বর্তমান বাজারে এক হাড়ি রস ১০০-১৩০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। রস ক্রেতারা সকাল বেলা তার বাড়ি এসে নিয়ে যায় বা স্থানীয় বাজার থেকেও কিনে নেয়। তার নিজেরই ৩০টি খেজুর গাছ আছে। সপ্তাহে তিন দিন গাছ কাটেন না। বাকি চার দিনে তার দৈনিক ৩০০-৪০০ টাকার রস বিক্রি হয়। ২-৩ মাস রস বিক্রি করে টাকাটা জমিয়ে রাখেন। শীতকালের ২-৩ মাসের আয়ে তার সারা বছর চলে যায়। এছাড়া মাঝে মাঝে কামলা খাটেন। তার জমানো টাকা ও নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিছু ধার করে দুই ছেলেকে ৩ বছর আগে দুবাই পাঠিয়েছেন। তবুও ছাড়েননি এ পেশা। খেজুর গাছ কাটা তার নেশায় পরিণত হয়েছে।
আবুল কালাম জানান,‘মোর ৩০টা গাছ মুই কাটি। ভালোই আয় অয়। আরেক জনের গাছ কাটা লাগে না। আরেক জনেরটা কাটলে তারে তিনভাগের একভাগ দেওয়া লাগে। তিন বছর অইলো পোলা দুইডা বিদাশ আছে। অগো টাকা মোর লাগেনা। মোরা খাইয়া-লইয়া ভালোই আছি।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
১৭.০১.২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সোমবার, ১১ মার্চ, ২০১৩

পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস ‘হোগলা’ শিল্প

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘হোগলা’ গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এ শিল্পের কারিগর নারীরা। গ্রামের নারীরাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। পারিবারিক বিভিন্ন কাজে হোগলা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশেষ করে গ্রামে হোগলার ব্যবহার লক্ষণীয়। ঘরের বিছানা, খাদ্যশস্য রোদে শুকানো, মিলাদ-মাহফিল, পূজা-পার্বণে অনেক মানুষকে বসতে দেওয়ার ক্ষেত্রেও হোগলা ব্যবহৃত হয়। আর এতে সাবলম্বী হচ্ছে নারীরা। পরিবারে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বাড়তি উপার্জন করে সচ্ছলতা সাবলম্বী হয়েছে। পরিবারে এনে দিয়েছে সচ্ছলতা।
হোগলা পাতা সংগ্রহ:
নদীর পাড়ে বা চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা হোগলা কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাসের মধ্যে কেটে শুকিয়ে বিক্রির জন্য হাট-বাজারে নিয়ে আসা হয়। পরিবারের পুরুষরা বাজার থেকে হোগলা পাতা কিনে নিয়ে যান। বাকি কাজ করতে হয় নারীদের। এক মুঠি হোগলা পাতা ৫০-১০০ টাকায় কিনতে হয়। এক মুঠিতে ২টা হোগলা হয়। প্রতিটি হোগলা পাইকারি ৬০-১২০ টাকা বিক্রি করা যায়।
যেভাবে তৈরি হয়:
হাট-বাজার থেকে কিনে আনা শুকনো হোগলা পাতা দেখতে ত্রিকোণাকৃতির। মাদুর তৈরির জন্য প্রথমে শুকনো পাতাগুলো ‘কেচতে’ হয়। অর্থাৎ ত্রিকোণাকার পাতার এক পিঠে তিন-চার ইঞ্চি মাপের একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ফাঁড়ার জন্য দাগ দিতে হয়। এরপর পাতা চ্যাপ্টা করে শুরু হয় মাদুর বোনার কাজ। বুনন শেষে ‘মুড়ি ভাঙা’ দিয়ে কাজ শেষ করতে হয়। দক্ষ হাতে ১০ বাই ১২ ফুট বড় একটি হোগলা পাতার মাদুর তৈরি করতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। বারো মাসই হোগলা তৈরি করা যায়।
বিক্রি হয় যেভাবে:
হোগলা পাতার মাদুর বিক্রি হয় হাট-বাজারে। ব্যবসায়িরা পাইকারি দরে হোগলা কিনে বরিশাল, স্বরূপকাঠি, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় ট্রলার বা লঞ্চ যোগে পাঠিয়ে দেন। মাদুর প্রতি তাদের দুই-তিন টাকা লাভ হয়। প্রতিটি চালানে কয়েক হাজার মাদুর পাঠাতে পারেন।
হোগলার জন্য প্রসিদ্ধ:
হোগলার জন্য প্রসিদ্ধ মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পৌর এলাকার তিনটি গ্রাম পাতাবালী, জুরগাও ও নয়াকান্দি; সিডিখান ও নবগ্রাম ইউনিয়নের ১০টি, এনায়েতনগর ইউনিয়নের ফাঁসিয়াতলা ও বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে হোগলা তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি মাদুর কেনাবেচা হয় জুরগাঁও হাটে। রোববার ও বুধবার সপ্তাহে দুই দিন বসে হাট। পাতা সংগ্রহ ও হোগলা বিক্রি করা জয় ঐদিন।
হোগলা শিল্পীদের কথা:
হোগলা শিল্পী মালতী মন্ডল ও সুমিত্রা সরকার জানান, ঘরে বসে থেকে কি করবো? হোগলা বুনে ভালো আয় হয়। সংসারও ভালো চলে। শুধু কী পুরুষের আয় দিয়েই সংসার চলে? তাই আমাদের গ্রামের নারীরা বাড়িতে বসে হোগলা বুনে বাড়তি আয় করে। তাতে সংসারের অভাব দূর হয়। তবে যত বেশি চালান খাটানো যায়; তত বেশি লাভ হয়। ব্যবসাটা ভালোই। পরিশ্রমও কম। সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে আমরা হোগলা বুনি।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, কালকিনি
০৫.০১.২০১৩
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

বৃহস্পতিবার, ৭ মার্চ, ২০১৩

কবিতার জন্য কবিকে প্রেমে পড়তে হয়

সালাহ উদ্দিন মাহমুদঃ
বাঙলা সাহিত্যে কাব্য সাহিত্যের শাখাটি সর্বাধিক সমৃদ্ধ। সেই প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ হয়ে আধুনিক যুগে এসেও একচ্ছত্রভাবে বরাবরই আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। ঠিক তেমনিভাবে বাঙলা কবিতায় আধিপত্য বিস্তার করে আছে প্রেম। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মীয় মনোভাব, যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক অস্থিরতা ও সমকালীন সমস্যার পাশাপাশি মানবীয় প্রেম-বিরহও স্থান কওে নিয়েছে কাব্যে। নিঃসঙ্গ কবির ব্যক্তি জীবনের দুঃখদুর্দশা তাকে প্রেমের কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
 
কবিতা লিখতে গিয়ে কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। অথবা প্রেমে পড়ে তাকে কবিতা লিখতে হয়েছে। দুটাই চিরন্তন সত্য। কবি মনে প্রেম জাগ্রত না হলে কবিতা হয় না। কাব্যচর্চার জন্য প্রেম অনিবার্য। আর সে চর্চাকে অব্যাহত রাখতে হলে বেছে নিতে হয় বিরহকে। কারণ মিলনের চেয়ে বিরহই কবিকে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করে। নব সৃষ্টির উন্মাদনা জাগ্রত করে। কবি বলেছেন-‘প্রেমের পরশে প্রত্যেকেই কবি হয়ে উঠেন।’ কবিতার সাথে যেন প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। লোকে বলে- কবি মানেই প্রেমিক। আর প্রেমিক মানেই কবি। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর যিনি জীবনে অন্তত এক লাইন প্রেমের কবিতা বা ছন্দ রচনা করেন নি। সবার জীবনে একবার প্রেম আসে- কথাটা যেমন সত্য; ঠিক তেমনি জীবনে অন্তত একবার কাব্য রচনা বা সাধনা করেন নি একথাও অস্বীকার করার জো নেই। কেউ যদি মনে-প্রাণে,ধ্যানে-জ্ঞানে কবি হন তবেতো কথাই নেই।

বাঙলা সাহিত্যে প্রেমের কবিতা বা কবিতায় প্রেম বিষয়ে পরিসংখ্যান করা খুবই দুঃসাধ্য। দ্রোহ-সংঘাত বা অস্থিরতার মধ্যেও বাঙলা কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ অগণিত। মধ্যযুগের পদাবলি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অধিকাংশ কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ এসেছে অসংখ্য বার। বর্তমানে যারা খ্যাতনামা কবি বা যারা প্রতিষ্ঠার জন্য কাব্যচর্চা করছেন প্রত্যেকেই হয়তো প্রথম জীবনে কোন বালিকার উদ্দ্যেশ্যে প্রেমকাব্য রচনার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছেন।

প্রাচীন যুগের(৬৫০-১২০০খ্রিস্টাব্দ) বাঙলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে কিঞ্চিৎ প্রেমের আভাস পাওয়া যায়। সেটা কূলবধুর পরকীয়ার অভিসার। বাহ্যিক দৃষ্টিকোণে পরকীয়া প্রেমের নিষিদ্ধ আনন্দ থাকলেও এর গূঢ়ার্থ ভিন্ন। চর্যার ২ নম্বর পদে পদকর্তা উল্লেখ করেছেন-
‘দিবসহি বহুড়ী কাউ হি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরূ জাই ॥’
Ñ‘দিনে বধূ কাকের ভয়ে ভীত আর রাতে কামরূপ (অভিসারে) চলে যায়।’

মধ্যযুগে (১২০১-১৮০০খ্রিস্টাব্দ) ধর্মাশ্রিত কাব্য সাধনা থেকে বেরিয়ে এসে কবিরা মানবাত্মার জয়গান গাইতে শুরু করলেন। সে সময়কার বৈষ্ণব পদাবলীর কবিদের ধর্মÑ প্রেমধর্ম। যে প্রেমের কোন হেতু নেই, যে প্রেম কোন বাধা মানে না, কোন প্রতিদান চায় না, যে প্রেমে আত্মসুখের কামনা নেই, যে প্রেম ইন্দ্রসম ঐশ্বর্যকেও তুচ্ছজ্ঞান করে, যে প্রেম মৃত্যুকেও ভয় করে না। বৈষ্ণব কবিদের প্রেম সেই প্রেম। কবি চন্ডিদাস বলেছেন-
‘সই, কেমনে ধরিব হিয়া
আমার বঁধুয়া            আন বাড়ি যায়
আমার আঙিনা দিয়া।’
-এরকম প্রেমের অনুষঙ্গ সেই বৈষ্ণব কবিতাতেই প্রথম উচ্চারিত হয়।

জীবের মধ্যে যে সুখ বাসনা আছে, তা ইন্দ্রিয়জ বা সাংসারিক সুখভোগে চরিতার্থতা পায় না। ভগবানের প্রেম হৃদয়ে লাভ করতে পারলেই মানুষ যথার্থ আনন্দিত হতে পারে। তাই শ্রীকৃষ্ণকে পরমাত্মা ও রাধাকে জীবাত্মার প্রতীকে বৈষ্ণবেরা এ প্রেম ব্যক্ত করেছেন। কবি চন্ডীদাস বলেছেন-
‘এমন পিরীতি কভূ দেখি নাই শুনি
পরাণে পরাণে বান্ধা আপনা-আপনি।
দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া
আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া।’

মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার ছবি আঁকতে গিয়ে কবিরা বরাবরই প্রেমকে করেছেন উপজীব্য। এমনকী মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণও প্রেমের ভারে আক্রান্ত হয়েছে। ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারের চেয়ে বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তা হয়ে উঠেছে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনী। পরমাত্মা ও জীবাত্মার প্রেমকাহিনী প্রতীকি ব্যঞ্জনার কারণে তৎকালীন সাহিত্য সমালোচকদের কাছে অশ্লীলতার দোষেও দুষ্ট হয়েছে।

আধুনিক যুগে এসে সমকালীন বিভিন্ন উপাদানের মধ্যেও প্রেম হয়ে উঠেছে কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের আড়ালে প্রেমকেই উচ্চকিত করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন বিদ্রোহের জন্য প্রেম অনিবার্য। তাই বাংলা কবিতায় অনিবার্যভাবেই প্রেম তার জায়গা দখল করে নিয়েছে। কবিরা সুন্দরের পূজারি। প্রেমের সৌন্দর্য অপরিসীম। প্রকৃতি ও নারী কবি মনে প্রেমের উন্মেষ ঘটান। কবিরা ভালোবাসতে গিয়ে নারী ও প্রকৃতিকে একাকার করে ফেলেন। যেমনটা করেছেন জীবনানন্দ দাশ। ‘বনলতা সেন’ তার অমর কাব্য। হোক সে নারী বা প্রকৃতি। কবি ভালোবেসেছেন। প্রেমে পড়েছেন- তারই অভিব্যক্তিÑ
‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু’দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’

বাংলা কবিতার প্রেমকেও বিভাজিত করা যায়- হতে পারে সেটা প্রকৃতি প্রেম, দেশপ্রেম, স্রষ্টার প্রতি প্রেম, মানবপ্রেম ও নারীর প্রতি প্রেম। প্রেম সার্বজনীন। ভালোবাসার অধিকার সকলের। কবি ত্রিদিব দস্তিদার ‘ভালোবাসতে বাসতে ফতুর হয়ে যাবার’ কথা বলেছেন। হতে পারে সেটা ক্ষেত্র বিশেষ। জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনির্বার। সৃষ্টিকর্তাও নারীকে সৃষ্টি করেছেন অপরিমেয় সৌন্দর্যের সমন্বয়ে। সংগত কারণেই পুরুষ নারীর প্রেমে পড়ে। নারী পুরুষের প্রেমে পড়ে। আর এজন্যই যুগে যুগে রচিত হয় প্রেম কাহিনী। প্রেমের কবিতা পাঠককেও আকৃষ্ট করে তাড়াতাড়ি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ কেউ কথা রাখেনি’ কবিতারÑ
‘ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম’
Ñএর মত প্রেমের কবিতার লাইন প্রচারিত হয় প্রেমিক পুরুষের মুখে মুখে। একজন নেহায়েত বেরসিক মানুষও প্রেমের কবিতা পাঠে অপ্লুত হন। এটা স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তাই কবিরাও প্রেমের কবিতা লেখাতেই বেশি মনোযোগি হন। কখনোবা সাম্প্রতিক বা ঐতিহাসিক ঘটনাবলিও কবিতার উপজীব্য হয়। তবুও যুগ যুগ ধরে পাঠকের হৃদয়ে গতিবেগ সঞ্চার করে প্রেমের কবিতা।

বাঙলা কাব্যে উল্লেখযোগ্য বা বিখ্যাত যত কবিতা রয়েছে তার বেশির ভাগই প্রেমের কবিতা। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণ, বৈষ্ণব পদাবলি, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানের মধ্যে লাইলি-মজনু, পদ্মাবতী, ইউসুফ-জুলেখা প্রভৃতি প্রেমের উল্লেখযোগ্য কাহিনীকাব্য। আধুনিক যুগের কাহিনী কাব্যের মধ্যেও জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ উল্লেখযোগ্য প্রেমকাহিনী। ‘নকশী কাঁথার মাঠ কবি জসীম উদদীনের প্রথম কাহিনীকাব্য। গ্রামবাংলার দুটি তরুণ-তরুণী রূপা আর সাজুর অনাবিল প্রেম আর করুণ পরিণতি এ কাব্যে উপস্থাপিত হয়েছে।’ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাহিনীকাব্যে দুটি ভিন্ন সমাজের দুটি কিশোর-কিশোরী সোজন ও দুলীর প্রণয়কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।

এছাড়াও মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন মিত্র, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, পূর্ণেন্দু পত্রী, মহাদেব সাহা, অসীম সাহা, দাউদ হায়দার, হুমায়ুন আজাদ, শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, সমুদ্র গুপ্ত, সৈয়দ শামসুল হক, হেলাল হাফিজ, দুলাল সরকার, ফারুক মাহমুদ, টোকন ঠাকুর, হেনরী স্বপন, রেজাউদ্দিন স্টালিন, আসলাম সানী প্রভৃতি কবিরা অনবদ্য প্রেমের কবিতা রচনা করেছেন। তাদের বিখ্যাত প্রেমের কবিতার মধ্যে বিদায় বেলা, অভিশাপ, পত্র লেখা, বিদায়, হঠাৎ দেখা, আকাশলীনা, বনলতা সেন, পাহাড় চূড়া, কেউ কথা রাখেনি, প্রেম, উল্লেখযোগ্য স্মৃতি, ফেরীঅলা, হে আমার বিষণœ সুন্দরসহ অসংখ্য কবিতায় মানব-মানবীর প্রেম হয়েছে উচ্চকিত।

সবশেষে বলা যায়, পৃথিবী যতদিন থাকবে; ততদিন মানুষ থাকবে। মানুষ যতদিন থাকবে; ততদিন ভালোবাসা থাকবে। এসব কিছু যতদিন থাকবে; কবিরাও ততদিন থাকবে। সুতরাং নির্দ্বিধায় বলা য্ায়, কবিরা যতদিন থাকবে; প্রেমের কবিতা ততদিন থাকবে। তাই একথার সাথে সবাই একমত হবেন যে, কবিতা মানেই প্রেম, প্রেম মানেই কবিতা। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ কবিদের হাতে প্রেম হয়ে উঠবে আরো বি¯তৃত। বাঙলা কবিতায় প্রেম হয়ে উঠবে পবিত্রতম আরাধনা। জয় হোক প্রেমের, জয় হোক কবিতার। কবিরা দীর্ঘজীবি হউন। প্রেমের কবিতা ছড়িয়ে পড়–ক সর্বত্র।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, সুনীল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত গল্পকার,কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।
কালকিনি প্রেসক্লাব, কলেজ রোড, কালকিনি, মাদারীপুর। আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সহায়িকা:     বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস: মাহবুবুল আলম
বাংলাদেশের সাহিত্য(কবিতা): মাহবুবুল আলম
        শ্রীকৃষ্ণ কীর্তণ: বড়– চন্ডীদাস
        জসীমউদদীন,জীবনীগ্রন্থমালা-১৫: মুহম্মদ ইদরিস জলী
        সাহিত্য-সন্দর্শন: শ্রীশচন্দ্র দাশ
        বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত: অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায়


বুধবার, ৬ মার্চ, ২০১৩

স্বপ্ন ও দ্রোহের নাটক’:



নাট্যকার: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
নির্দেশনায়: আ জ ম কামাল

পরিবেশনায়: কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ
ব্যবস্থাপনায়: জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুর
আয়োজনে: বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী

চরিত্র:
১.    বৈচাপাগল
২.    খান সাহেব
৩.    দাদি
৪.    আসিফ
৫.    ফ্যাচাং আলী
৬.    দারোগা
৭.    পুলিশ-১
৮.    পুলিশ-২
৯.    মেজর
১০.    পাক সৈন্য-১
১১.    পাক সৈন্য-২
১২.     বৈচাপাগলের বাবা
১৩.     বৈচাপাগলের মা
১৪.     বৈচাপাগরের বোন
১৫.     মুক্তিযোদ্ধা-১
১৬.    মুক্তিযোদ্ধা-২
১৭.     কতিপয় প্রতিবেশি
১৮.     কতিপয় বালক-বালিকা


প্রথম দৃশ্য:

‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ গানের সাথে সাথে মঞ্চে আলো জ্বলে উঠবে। দু’ জন কৃষক জমিতে যায়। একজন বাজার করে বাড়ি ফেরে। তিন-চারটি ছেলে-মেয়ে কানামাছি খেলবে। চোখ বাধা মেয়েটিকে রেখে অন্যরা পালাবে। এসময় খান সাহেবের নাতি আসিফ বহু বছর পর গ্রামের মাটিতে পা রাখে। কাধে ও হাতে একটি করে ব্যাগ। হাতের ব্যাগটা রাখে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বিস্ময়ে হা- হয়ে থাকবে। দাদু বাড়িটা খোঁজে। মেয়েটা আসিফকে ধরে ফেলে। চোখ খুলে অবাক হয়Ñ
মেয়ে: এই মিয়া আপনে ক্যাডা? কইত্তোন আইছেন?
আসিফ: আমি খান সাহেবের নাতি। ঢাকা থেকে আসছি।
মেয়ে: (লজ্জা পেয়ে) ও আপনে...।
আসিফ: আমি আসিফ। বহু বছর পর এসেছি। আচ্ছা, আমার দাদু বাড়িটাতো এদিকেই তাই না?
মেয়ে: হ, একটু আগায়া যাইতে অইবো। লন, আমি আপনারে লইয়া যাই। (দু’জন চলে যায়।)
আসিফ এসে দাদা-দাদিকে ডাকতে থাকেÑ
আসিফ: দাদা, দাদা তুমি কোথায়?
(খান সাহেব বেরিয়ে আসেন)
খান সাহেব: (চশমাটা চোখে দিয়ে) আরে আসিফ দাদু ভাই যে। আমি স্বপন দেখতাছি নাতো। (হাতে চিমটি কেটে) না, সত্যিই তো আমার নাতি আইছে। বহু বছর পর আইলা। আমাগো মনে অয় ভুইল্যাই গ্যাছো?
আসিফ: না দাদা, তা নয়। তাছাড়া তোমাদের ভুলবো কেন? আমার শেকড়তো এখানেই। শেকড়ে টান পড়লো- তাই চলে এলাম। আচ্ছা দাদীকে দেখছি না। দাদী কোথায়?
খান সাহেব: কৈ গো, কৈ গ্যালা? আরে দেইক্যা যাও কেডা আইছে।
(তড়িগড়ি করে দাদী আসে।)
দাদি: (আঁচল দিয়ে হাত- মুখ মুছতে মুছতে) আরে দাদু ভাইযে, কী সৌভাগ্য আমার। থালা-বাসন ধুইতে গিয়া হাত থেইক্যা যহন পইরা গ্যাছে, তহনই মনে মনে কইছিলাম ঘরে মেহমান আইব। তা দাদু ভাই, তোমার আইতে কোন কষ্ট অয় নাই তো।
আসিফ: না কোন কষ্ট হয় নি। তা এখন বলো, তোমরা কেমন আছ?
খান সাহেব: আমরা ভালো আছি।
দাদি: তা আসিফ, তোমার বাবা- মা ক্যামন আছে?
আসিফ: আব্বু- আম্মু ভালো আছে। ও ভালো কথা, আব্বু বলছিল...। আচ্ছা দাদু, আমাদের বাড়িতে একটা পাগল আছে না। কি যেন নাম?
খান সাহেব: (শুকনো মুখে) বৈচাপাগল। সারা রাইত খালি চিল্লায় আর দিনের বেলা ঘুমায়। ব্যাটা বদের হাড্ডি।
আসিফ: হ্যা, বৈচাপাগল। তা ওনার কি খবর?
খান সাহেব: আহা, বাদ দাও তো ওর কতা। শোন দাদু ভাই, ভুলেও ঐ পাগলের কাছে যাইবা না। যাও তুমি ভিতরে যাও। আগে জিরায়া লও, তারপর কতা। আমি এই ফাকে একটু বাজার থেইক্যা আহি। (এদিক-ওদিক তাকিয়ে) কইরে ফ্যাচাং, কই গেলি? (ফ্যাচাং দৌঁড়ে আসে)
ফ্যাচাং: (হন্তদন্ত হয়ে) খানসাব ডাকছেন?
খান সাহেব: ল, বাজারে যাই। দেহস না আমার শরীক আইছে। ভালো-মন্দ বাজার করতে অইবো তো। (সবাই হেসে ওঠে। খান সাহেব ও ফ্যাচাং আলী চলে যায়)
দাদি: চলো ভাই, ভেতরে চলো। তোমার দাদা বাজার থিক্যা তোমার লাইগ্যা ভাল-মন্দ কিছু নিয়া আসুক।
আসিফ: চলো। ( চলে যায়।)
(বাজারের ব্যাগ হাতে ফ্যাচাং পিছন পিছন হাটে।)
খান সাহেব: বুঝলি ফ্যাচাং।
ফ্যাচাং: না কইলে বুঝমু ক্যামনে?
খান সাহেব: তাইতো কই। হোন, বৈচাপাগলের ব্যাপারে আসিফরে কিচ্ছু কওন দরকার নাই। বুঝলি। কারণ হুনছি ও নাকি সাংবাদিকতা করে।
ফ্যাচাং: ওরে বাবা, খানসাব সাংঘাতিক আবার কি!
খান সাহেব: আরে সাংঘাতিক না, সাংবাদিক। বিয়ানে যেই পত্রিকা আহে না। ওগুলাতে অরা ল্যাহে। কারো বিরুদ্ধে ল্যাকলে হ্যার বারোটা বাইজ্যা যায়। হোন, পাগলের ব্যাপারে তোরে কিছু জিগাইলে কবি- তুই কিছু জানছ না।
ফ্যাচাং: খানসাব, হঠাৎ কইরা আপনে পাগল সম্পর্কে সজাগ অইলেন ক্যান?
খান সাহেব: দ্যাশে ওইযে কি বিচার-ফিচার শুরু অইছে। হুজুরগো আটকাইতাছে।
ফ্যাচাং: হুজুরগো না, রাজাকারগো।
খান সাহেব: আরে একটা অইলেই অইলো। আমার ক্যান জানি সন্দেহ অইতাছে। আর ও আইসাই যে পাগলের কতা জিগাইল। যদি কেউচ্যা খোড়তে গিয়া যদি সাপ বাইর করে।
ফ্যাচাং: ক্যান হুজুর, পাগলের ঘরে কি সাপ আছে?
খান সাহেব: আরে গাধা, এতো বছর ধইরা আমার লগে আছস, এহনো চালাক অইলি না। বলদই রইয়া গেলি। ক্যান মনে নাই, গন্ডগোলের সময় আকাম-কুকাম কী কম করছোস?
ফ্যাচাং: উঁ, আমি কি আকাম করছি। তহনও কামলা আছিলাম এহনও কামরাই রইয়া গেলাম। চালাক অইলে কি আর আপনের কামলা খাটতাম? তাইলে তো কবেই এমপি-মিনিস্টার অইয়া যাইতাম। আর তহন যা করছি সব তো আপনের কতায়।
খান সাহেব: রসিকতা বাদদে। চুপ কর। বাতাসেরও কান আছে। হাটের কাছে আইয়া পড়ছি। (প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য:

(বৈচা শিকল ছিড়ে বেরিয়ে আসে। বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে করতে মঞ্চের এক কোনে গিয়ে ওৎ পেতে থাকে। এমন সময় খান সাহেব ও ফ্যাচাং আলী আসে। সুযোগ পেয়ে খান সাহেবকে ঝাপটে ধরে চিৎকার করে। ফ্যাচাং আলী দৌঁড়ে পালায়।)
বৈচাপাগল: আইজ খাইছি তোরে। তুই রাজাকার। তুই দ্যাশের শত্র“। তুই আমার সব কাইরা নিয়া আমারে পাগল বানাইয়া রাখছোস। তোরে আমি খুন করুম। তোর বাইচ্যা থাকনের কোন অধিকার নাই। তুই পাকিস্তানি খান কুত্তাগো পাও-চাডা গোলাম। ইয়াহিয়া খার দোসর। তুই আমার সব কাইরা নিছোস। তোরে আমি আইজ...।
(ফ্যাচাং দুইজন প্রতিবেশি ও আসিফকে সাথে নিয়ে এসে খান সাহেবকে উদ্ধার করে। বৈচাপাগলকে আরো মোটা ও শক্ত শিকল দিয়ে বেধে রাখে। খান সাহেব হাপাতে হাপাতে সকলের উদ্দেশ্যে বলে)
খান সাহেব: কি করুম কন? চল্লিশ বছর ধইরা পাগলডারে লইয়া আছি মহা ঝামেলায়। মানবতার খাতিরে নিজের বাড়িতে জায়গা দিছি। মনে অইতাছে খাল কাইট্টা কুমির আনছি। কেডা কইছিলো অরে যুদ্ধে যাইতে।
প্রতিবেশি: কি করবেন খানসাব? পাগল মানুষ। কহন কি কয় নিজেও জানে না। পাঞ্জাবি-টুপি দ্যাকলেই চিক্কর দেয়।
খান সাহেব: নিয়া যাও অরে। শক্ত আর মোটা ছেকল দিয়া বাইন্ধা রাহো।
(প্রতিবেশিরা বৈচাকে নিয়ে চলে যায়। আসিফ দাদুকে জিজ্ঞাসা করে)
আসিফ: আচ্ছা দাদু, বৈচাপাগল আসলে কে?
খান সাহেব: বৈচাপাগল আসলে জাতে হিন্দু। নাম আছিল বৈচিন্ত্য মন্ডল। বাপের নাম শুকলাল মন্ডল। বৈচা নামে ডাকে সবাই। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সব হারায়া মাথা খারাপ হইয়া গ্যাছে। তাই তারে শিকল দিয়া বাঁইন্ধা একটা ঘরে আটকাইয়া রাখতে হয়। যাতে পাগলামি কইরা মাইনষের ক্ষতি করতে না পারে। তোমার দাদি তিনবেলা খাবার দিয়া আসে। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। এত এত ভালো মানুষ মরে কিন্তু পাগলটা মরেও না।
আসিফ: ও তাই। চিকিৎসা করলে ভালো হতো কি না।
খান সাহেব: হ, কেডা কইছে তোমারে? অর পিছে বেহুদা পয়সা ঢালবো কেডা? তোমারা তো বাড়ি থাহো না। আইছ বহু বছর পর। দুইদিন পর আবার চইল্যা যাবা। বাদ দাও এইসব। তুমি ঘরে যাও। আমি হাত-মুখটা ধুইয়া আসি।
আসিফ: ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি এসো।
(দু’জন চলে যায়)

তৃতীয় দৃশ্য:

গভীর রাত। নিঝুম নিস্তব্ধতা। কোথাও কেউ জেগে নেই। বৈচাপাগল রাত্রির নিরবতা ভেঙ্গে মাঝ রাতে হঠাৎ গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে-‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে...।’ গান থামিয়ে বলেÑ
বৈচাপাগল: ছাইড়া দে, আমারে ছাইড়া দে। সাহস থাকলে একবার ছাইড়া দিয়া দ্যাক। তোর আল্লার দোহাই, আমার ভগবানের দিব্যি। একবার ছাইড়া দে। আমি আমার বাপ-মা আর বৈনরে ফিরায়া আনতে চাই। খান কুত্তার বাচ্চার রক্ত দিয়া গোসল করতে চাই... ...। দ্যাশটারে স্বাধীন করার লাইগ্যা যুদ্ধে গেছিলাম। নয় মাস যুদ্ধ কইরা কি পাইলাম? বুড়া বাপ-মা, আদরের ছোট বোন, সহায় সম্পত্তি সব হারাইলাম। দ্যাশ আমারে কি দিছে? কিছুই দেয় নাই। খানসাব আমার সব কাইরা নিছে। ক্যান ৭১ সালে আমি যুদ্ধে গেছিলাম। ক্যান এই হাতে অস্ত্র নিছিলাম... ...।
(গোলাগুলির শব্দ। মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদারের মধ্যে যুদ্ধের দৃশ্য। ফ্ল্যাশব্যাক)
দ্যাশ স্বাধীন অইলো। আমি বাড়ি ফিইরা আইলাম। খানসাব আমারে ডাইকা কয়- বৈচারে তুই আইছোস ভালোই অইছে। তোর বৈনেরে পাকবাহিনী তুইল্যা নিয়া গ্যাছে। দুঃখ-কষ্ট আর ভয়ে তোর বাপ-মা সব বেইচ্যা ইন্ডিয়া চইল্যা গ্যাছে। খান সাব বুকে টাইন্যা নিয়া কয়- সব গ্যাছে তো কি অইছে? আমিতো আছি। হ আছে, খানসাবতো আছে। খালি আমার কিছু নাই। কতদিন বুক ভাসায়া কানছি। ভগবানরে ডাকছি। চোউখের পানি হুগায়া চর পড়ছে। এহোন আর কান্দিনা। ভগবানরে ডাইক্যা হয়রান অইছি। এহোন আর ডাকিনা। ঐ কুত্তার বাচ্চায় কয়Ñ আমার বাপে যাওয়ার আগে নাকি সব বেইচ্যা দিয়া গ্যাছে। আমারে করুণা করোছ। আরে তুইতো একটা রাজাকার। একটা দেশদ্রোহী রাজাকার একজন মুক্তিযোদ্ধারে কী করুণা করবো ক? হা.. হা.. হা..। অস্ত্র জমা দিছি। ট্রেনিং জমা দেই নাই। একবার ছাইড়া দে। তোর রক্ত দিয়া গোসল করুম।
(প্রবেশ করে আসিফ। পায়ের আওয়াজে বৈচাপাগল থামে। তাকায় আসিফের দিকে। শরীরের ঝাঁকিতে শিকলের ঝনঝন আওয়াজ শোনা যায়। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ায় সে। পাগল এগিয়ে আসতে চাইলে শিকলে টান পড়ে। বৈচাপাগল প্রশ্ন করে।)
বৈচাপাগল: ক্যাডা, ক্যাডা তুই?
আসিফ: আমি.. ।
বৈচাপাগল: আমি ক্যাডা, নাম নাই।
আসিফ: আমি আসিফ।
বৈচাপাগল: আসলে তুই ক্যাডা?
আসিফ: আমি খান সাহেবের নাতি।
বৈচাপাগল: ও তুই বেঈমান রাজাকারের নাতি।
বৈচাপাগল: এতো রাইতে এইহানে ক্যান আইছোস?
আসিফ: জানতে এসেছি, আপনার এ অবস্থা কেন?
বৈচাপাগল: তুমি হালারপুত কই থাহো? দ্যাশের খবর কিছু রাহোনা। আন্ধারে আইছোস ক্যান? খানসাব পাডাইছে তোরে?
আসিফ: না, আমিই এসেছি। (বলতে বলতে মোবাইলের লাইট অন করে।)
বৈচাপাগল: ক্যান আইছোস?
আসিফ: আপনার সাথে কথা বলতে।
বৈচাপাগল: আমার লগে তোর কি কতা?
আসিফ: মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী শুনবো।
বৈচাপাগল: না, না। রাইতের বেলা কওন যাইবো না। ওই দ্যাক পাকবাহিনী আইতাছে। রক্তের ঢেউ আইতাছে। রক্তের জোয়ারে ভাইসা যাবি। চইল্যা যা। ভাটির সময় আইবি। আমারে একলা থাকতে দে। (বৈচাপাগল চুপ করে। কোন কথা নেই। আসিফ বের হয়ে যায়। আলো নিভে যাবে।)

চতুর্থ দৃশ্য:

সকাল বেলা উঠান ঝাড়– দিচ্ছে দাদি। চুপিসারে দাদির পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আসিফ।
আসিফ: দাদি ও দাদি।
দাদি: (ঝাড়– রেখে হাত মুছতে মুছতে) কি দাদাভাই?
আসিফ: দাদা কোথায়?
দাদি: তোমার দাদাতো বাজারে গ্যাছে। তুমি নাস্তা করবা না দাদু।
আসিফ: করবো, তার আগে গোসলটা সেরে আসি।
দাদি: তাইলে যাও, গোসলখানায় পানি দেওয়া আছে।
আসিফ: না, গোসলখানায় যাবনা। আমি নদীতে গোসল করব।
দাদি: দ্যাহো দেহি, এইয়া কয় কী? ইদীতে গোসল করলে ঠান্ডা লাইগ্যা যাইবো। জ্বর-জারি অইবো তো।
আসিফ: না, আমার কিচছু হবে না। ইস্ নদীর এরকম নির্মল ঠান্ডা পানি কতদিন ছুঁই না। লঞ্চে আসতে আসতে মনে হয়েছিল নদীতে ঝাপ দেই।
দাদী: ও খোদা এয়া কয় কী?
আসিফ: আমার কি ইচ্ছে হয় জান দাদী?
দাদী: কি ইচ্ছে হয়?
আসিফ: ‘আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়িটির তীরে এই বাংলায়
হয়ত মানুষ নয়Ñ হয়তোবা শঙ্খচিল শালিখের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব এ কাঁঠাল ছায়ায়;
হয়তোবা হাঁস হবোÑ কিশোরীর ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,
সারাদিন কেটে যাবে কল্মীর গন্ধ ভরা জলে ভেসে ভেসে
আবার আসিব আমি বাংলার নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে
জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙায়;

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;
হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে;
হয়তো খইয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;
রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেড়া পাল-এ
ডিঙা বায়, রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে
দেখিবে ধবল বক: আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে।’
-কী দাদু কিছু বুঝলে?
দাদি: (সম্বিৎ ফিরে পেয়ে) কি কও না কও কিছুই বুঝিনা। কি কাক-শালিক অইবা। কই শেখছো এইসব।
আসিফ: বই পড়ে।
দাদী: তোমরা শিক্ষিত পোলাপান। কলেজে পড়, পত্রিকায় কাম কর। আমি অতশত বুঝি না। তয়, তুমি একবার ক্যান? তুমি বারবার আইবা। এই সব কিছুতো তোমারি। আমরা বুড়া-বুড়ি আর বাচুম কয়দিন?
আসিফ: এগুলো আমার কথা নয় দাদী।
দাদী: কার কতা?
আসিফ: কবি জীবনানন্দ দাশের কথা।
দাদী: হেইডা আবার কেডা?
আসিফ: আমাদের রূপসী বাংলার কবি।
দাদী: জীবনানন্দ কেডা আমি চিনি না। ঐসব হিন্দু মানুষ আমার চিইন্যা কাম নাই। (লজ্জিত মুখে) আমি খালি চিনি তোমার দাদারে। বাদ দাও এইসব। ঠিক আছে তুমি গোসল করতে যাও। তয়, তাড়াতাড়ি আইসো। আমি রান্নাঘরে গ্যালাম।
(দাদী চলে যায়। আসিফ হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়।)

পঞ্চম দৃশ্য:

(আসিফ বৈচার ঘরে উঁকি দেয়। দরজা খোলা। বৈচাপাগল বসে বসে মাটি খুড়ছে।)
বৈচাপাগল: এই মাটির তলে তোরে জ্যান্ত কবর দিমু।
আসিফ: কি করছেন আপনি?
বৈচাপাগল: ক্যাডা তুই? (মাথা তুলে তাকায়)
আসিফ: ঐ যে, রাত্রে আসছিলাম।
বৈচাপাগল: ও গল্প শুনতে চাস? যুদ্ধের গল্প।
আসিফ: হ্যা যুদ্ধের গল্প। আপনার জীবনের গল্প।
বৈচাপাগল: যুদ্ধের কাহিনী শুইনা তুই কি করবি? আর আমার কাহিনীর কতা কস? আমি একটা জিন্দা লাশ। আমার কাহিনী কী শুনবি? কঅ। পারবি আমার বাপ-মা, আদরের বৈনডারে ফিরায়া দিতে? পারবি আমার জমি-জমা ফিরায়া দিতে? পারবি না।
আসিফ: তা হয়তো পারবো না।
বৈচাপাগল: তয় ক্যান শুনতে চাস? ক্যান কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে চাস?
আসিফ: আমিতো যুদ্ধ দেখিনি, তাই শুনতে ইচ্ছে হয়।
বৈচাপাগল: ক্যান, তোর দাদায় কয় না। একাত্তরে সে কি করছে। কয়ডা ঘর-বাড়ি পোড়াইছে। কয়ডা হিন্দু পরিবাররে ঘর ছাড়া করছে। কয়ডা যুবতি মাইয়া, পরের বউ লইয়া তামাশা করছে। কয় না, কয় না তোর কাছে।
আসিফ: কী বলছেন আপনি। কোন প্রমাণ আছে আপনার কাছে।
বৈচাপাগল: চুপ! একদম চুপ! কোন কতা কবি না। তুই কি বিশ্বাস করবি। তোর গায়ে তো বেঈমানের রক্ত।  নরপিশাচের রক্ত। তোর আল্লা সাক্ষী, আমার ভগবান সাক্ষী।
আসিফ: সবাই আপনাকে পাগল বললেও আপনাকে তো পাগল মনে হয় না।
বৈচাপাগল: হা.. হা.. হা..। আমি পাগল? আমি পাগল না। আমারে পাগল বানাইছে তোর দাদা। উচিৎ কতা কইলেই সবাই পাগল কয়। আমি পাগল সাইজা মাটি কামড়াইয়া পইড়া আছি। পাগলের ভান ধরছি। যাতে স্বাধীন দেশে বাপ-দাদার মাটিতে শুইয়া একটু নিঃশ্বাস নিতে পারি।
আসিফ: কী বলছেন আপনি?
বৈচাপাগল: হ, ঠিকই কইতাছি। ৭১ সালে দ্যাশে যুদ্ধ শুরু অইয়া গ্যালো। পঁচিশ মার্চ কাল রাইতে পাকবাহিনী ঝাপায়া পড়লো বাঙালির ওপর। আমরাও অস্ত্র তুইলা নিলাম হাতে। বুড়া বাপ-মা আর বৈনডারে রাইখ্যা যুদ্ধে গেলাম... ...।
(ফ্ল্যাশব্যাক: বৈচার বাড়িতে পাকবাহিনীর মেজর, পাকসেনা, খান সাহেব, ফ্যাচাং আলীসহ কয়েকজন। বাবা-মার সামনে বৈচার বোনকে নির্যাতনের দৃশ্য। অট্টহাসি..।)
না.. না..। নয় মাস যুদ্ধ অইল। ১৬ই ডিসেম্বর দ্যাশ স্বাধীন অইল। চাইর দিন পর বাড়ি আইলাম। অইয়া দেহি আমার সব শ্যাষ। বাপ-মা, বৈন কেউ নাই। শূন্য ঘর। তোর দাদার কাছে হোনলাম- বাপ-মা ভারত চইল্যা গ্যাছে। বৈনডারে পাকবাহিনী তুইল্যা নিয়া গ্যাছে। বৈনের খোঁজে বাইর হইলাম। কোতাও পাইলাম না। এমনকি লাশটাও না। কয়েকদিন পর বাড়ি আইলাম। ঠিক তহন মাথায় আকাশ ভাইঙা পড়লো। সারা দুনিয়া আন্ধার অইয়া আইল। (বৈচা থামে। বাকরুদ্ধ হয়ে আসে কন্ঠ। দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্র“। দু’হাতের তালু দিয়ে মুছে নেয়। চোখে মুখে ক্ষোভের বিচ্ছুরণ।)
আসিফ: কেন, কি হয়েছিল সেদিন?
বৈচাপাগল: তোর দাদায় কইল- বৈচা, তোর তো আর কিছু রইল না। তুই আর ফিইরা আইবি না ভাইবা তোর বাজানতো যাওয়ার সময় সব বেইচা দিয়া গ্যাছে। ইন্ডিয়া যাইতেও তো টাকা-কড়ি লাগবো। তাই.. ..। এহন তুই কোতাও না গেলে আমি তোরে ঠাঁই দিতে পারি? আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। স্বর্ণের দোকান, জমি-জমা, ভিটাবাড়ি সব গ্যালো। এহোন আমি কি করুম। দলিল দেইখ্যা বুঝলাম, জোর কইরা বাজানরে দিয়া টিপসই দেওয়াইছে। চোউখের জলে কিছু লেহা ঝাপসা অইয়া গ্যাছে। আর বাজানের রক্তের ফোটা দেখছি আমি দলিলে। আর কিছু মনে নাই। অজ্ঞান অইয়া পড়লাম। জ্ঞান ফেরার পর আবোল-তাবোল কইতে লাগলাম। কোমড়ে শিকল পড়লো। জায়গা পাইলাম এই ঘরে। বুকের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন লইয়া চল্লিশ বছর ধইরা এইহানে পইড়া আছি।
(এমন সময় বাড়ির সদর দরজায় দাদার কাশির আওয়াজ। আসিফ বেরিয়ে যায়।)
বৈচার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই দাদার সাথে দেখা।
খান সাহেব: নাস্তা করছো দাদু ভাই?
আসিফ: না, এখনো করিনি। তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একসাথে নাস্তা করবো।
খান সাহেব: তাইলে আহো আমার লগে।
আসিফ: তুমি গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। আমি ঝটপট গোসলটা করে আসি।
খান সাহেব: আইচ্ছা জলদি আইস। বাজার থিকা তোমার লাইগ্যা দেশি সবরি কলা আনছি।
আসিফ: ঠিক আছে দাদু। তুমি ভিতরে যাও। আমি তাড়াতাড়িই আসবো।
দু’জন দু’দিকে চলে যায়।

ষষ্ঠ দৃশ্য:

ফ্যাচাং বাজারের ব্যাগটা রেখে তালপাখা দিয়ে নিজের গায়ে বাতাস দিচ্ছে। গামছা দিয়ে মুখ-মন্ডল মোছে। মাটিতে বসে পড়ে। এমন সময় খান সাহেব আসে।
খান সাহেব: এ ফ্যাচাং আসিফরে দ্যাকলাম পাগলের ঘরের দিক থেকে আইতে।
ফ্যাচাং: মনে অয় উকিঝুকি দিয়া দেখতাছিল পাগল কী করে?
খান সাহেব: আমারতো কেমন জানি সুবিধার মনে অইতাছে না।
ফ্যাচাং: খান সাব বেহুদা চিন্তা কইরেন না।
(আসিফ এসে পাশে দাঁড়ায়।)
আসিফ: আচ্ছা দাদু, একটা কথা বলব।
খান সাহেব: একটা কেন দশটা কও।
আসিফ: দাদু, ঐ যে পাগলের মুখে যুদ্ধের গান, তুই রাজাকার, পাঞ্জাবি-টুপি সব মিলিয়ে কেমন যেন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।
খান সাহেব: কিসের রহস্য?
ফ্যাচাং: কই আমিতো কোন গন্ধ পাইনা। খান সাব আপনি পান?
আসিফ: বৈচাপাগলের যুদ্ধে যাওয়ার কাহিনী, পাগলামীর কারণ সব আমি জেনে গেছি। তোমার ওপর বৈচার এতো ক্ষোভ কেন তাও আমি জানি?
খান সাহেব: কৈ, আমি তো এই ব্যাপারে কিছুই জানি না। ওতো পাগল তাই.. ..।
আসিফ: দাদু, বিশাল এ বাড়িটা কার?
খান সাহেব: ক্যান
আসিফ: তোমার না বৈচাপাগলের?
খান সাহেব: আরে ও তো একটা পাগল।
আসিফ: আজ বৈচাপাগলের এ অবস্থা কেন?
খান সাহেব: ওর কথা বাদ দাও।
আসিফ: আচ্ছা দাদু, বৈচা কি সত্যিই পাগল?
খান সাহেব: পাগল তো পাগলই। এর সত্যি-মিথ্যা আবার কি?
ফ্যাচাং: খান সাব ঠিকই কইছেন।
আসিফ: না, তার কথা শুনেতো তাকে পাগল মনে হয় না।
খান সাহেব: আরে ধ্যাৎ, বাদ দাও তো ওই সব। পাগলে কি না কয়।
ফ্যাচাং: ছাগলে কি না খায়?
আসিফ: দাদু, একটা সত্যি কথা বলবে?
খান সাহেব: কি কতা? তোমার কাছে মিথ্যা কতা কমু ক্যান?
আসিফ: তার বাবা কি সত্যিই তোমার কাছে সব বিক্রি করে গেছে?
খান সাহেব: কও কি তুমি ? বিগত চল্লিশ বছরে কেউ এমন প্রশ্ন করে নাই আমারে। তোমার কি সন্দেহ হয়? এ ফ্যাচাং আমি নাতি এয়া কি কয়?
আসিফ: হতেও পারে।
খান সাহেব: কেন এমন সন্দেহ?
আসিফ: তুমি তো স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলে।
খান সাহেব: তুমি কি আমারে রাজাকার কইতাছ?
আসিফ: হ্যা, শুধু আমি বলছি না। তোমার আচার আচরণ বলছে। তোমার চোখ বলছে তুমি অপরাধী।
খান সাহেব: সাংবাদিকগো এই একটা সমস্যা, মানুষরে বিশ্বাস করতে চায় না। সব কিছুতেই খালি সন্দেহ।
ফ্যাচাং: খান সাব এই জন্যইতো কইছিলাম সাংঘাতিক।
আসিফ: আপনি চুপ করেন। আমাদের সন্দেহ অমূলক নয়। আমরা জানতে পেরেছি- চন্দ্রনগর গ্রামে আমার দাদা স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত ছিলো।
(খান সাহেবের মুখে কোন কথা নেই। দ্রুত উঠে পড়ে।)
ফ্যাচাং: খান সাব এয়া কয় কি? এয়া দিহি ঘরের শত্র“ বিভীষণ।
খান সাহেব: আমি দোকানে গেলাম। তোমার এতো কিছু জাইন্যা কাজ নাই। বেড়াইতে আইছ কয়দিন বেড়াও। তারপর চইল্যা যাও।
আসিফ: যাব, তবে যাবার আগে এর রহস্য আমি উদঘাটন করবই। বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই। তুমি যদি সত্যিকারের অপরাধি হও। তাহলে তুমিও বাঁচতে পারবে না।
খান সাহেব: আইছ্যা সময় অইলেই দ্যাহা যাইব।
(খান সাহেবের পেছন পেছন ফ্যাচাংয়ের প্রস্থানের পর দাদী গরম দুধ নিয়ে আসে।)
দাদী: দাদুভাই দুধটুকু খাইয়া নাও।
আসিফ: দাও। (ঢক ঢক করে দুধটুকু খায়)
দাদী: (গ্লাস নিতে নিতে) তোমার দাদু কই?
আসিফ: চলে গেছে।
দাদী: কোই গ্যালো?
আসিফ: মনে হয় বাজারে।
দাদী: এহনই চইল্যা গ্যালো। তোমারে একটু সময়ও দিলো না।
আসিফ: না থাক। ব্যবসায়ি মানুষ। দোকানে বসলে কর্মচারীদের সুবিধা হয়। (প্রসঙ্গ পাল্টে) আচ্ছা দাদী, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা তোমার মনে আছে না ?
দাদী: আছে না মানে। সব মনে আছে। তোমার বাপজান তহন ছোট। চৌদ্দ-পনের বছর বয়স। অরে নিয়া ভেতরের ঘরে লুকায়া থাকতাম। তোমার দাদার লগে পাক আর্মির ভালো সম্পর্ক আছিল। তাই আমাগো কিছু কইত না। মাঝে মাঝে পাকবাহিনীর লগে এদিক-সেদিক যাইতো।
আসিফ: যুদ্ধের সময় বৈচাপাগলের পরিবারের কি হয়েছিল?
দাদী: একদিন মাঝ রাইতে ওই বাড়িতে পাকবাহিনী হামলা করে। বৈচার বৈনরে ধইরা নিয়া যায়। বৈচার বাপ-মারে সকাল হওয়ার আগে দেশ ছাড়তে কইয়া যায়। রাগে ক্ষোভে দুঃখে তারা গ্রাম ছাইড়া চইল্যা গ্যালো। আশ-পাশের পুরুষ-মহিলারা ভয়ে পলায়া আছিল। হুনছি পাকবাহিনীর লগে মুখোশ পড়া কেউ একজন আছিল। কেউ চিনবার পারে নাই।
আসিফ: সেই মুখোশ পড়া লোকটা কে তাকি আর জানতে পেরেছ?
দাদী: আইজও জানতে পারি নাই। তা এতো বছর পর তুমি এগুলা নিয়া বাড়াবাড়ি করতাছো ক্যান?
আসিফ: আমি আমার দেশকে ভালোবাসি। এ দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। তাই দেশের শত্র“দের ঘৃণা করি।
দাদী: তুমি কি কইতে চাও তোমার দাদা দ্যাশের শত্র“?
আসিফ: অবশ্যই। সেই রাতের মুখোশ পড়া লোকটিই আমার দাদাভাই। আমি তাকে ক্ষমা করতে পারবো না।
দাদী: তা অইতেও পারে। আমার মনে অয়, তোমার বাবাও একই কারণে বাড়ি আহে না। লোকটা না হয় না বুইজ্যা ভুল করছে। মুসলমান বইল্যা পাকিস্তানিগো সাহায্য করছে।
আসিফ: ভুল ধারণা তোমার। কোন কিছু না জেনে করলে তা ভুল, আর জেনে করলে তা অপরাধ। সে তো জেনে শুনেই করেছে। তবে কি জানো দাদী, আগে তো দেশ। তারপর ধর্ম। দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ।
দাদী: তোমার দাদাই একলা বিরোধিতা কওে নাই। আরো তো মানুষ আছিল।
আসিফ: সবাইকেই আমি ঘৃণা করি। আমি আর এক মুহূর্তও এ বাড়িতে থাকবো না। আজই আমি ঢাকা চলে যাব। আর কোনদিন আসবো না।
বলে ব্যাগপত্র গুছিয়ে চলে যায় আসিফ। দাদী অশ্র“সজল চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছে চলে যায়।

শেষ দৃশ্য:

গভীর রাত। বৈচাপাগলের কোন সাড়াশব্দ নেই। নিঝুম নিস্তব্ধতা ভাঙ্গে ভাড়ি বুটের আওয়াজ। খান সাহেবের দরোজায় বার কয়েক কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে আওয়াজ আসে-
খান সাহেব: এত রাইতে দরজা ধাক্কায় কেডা ?
দারোগা: আমরা থানা থেকে এসেছি।
খান সাহেব: দারোগা সাব, এত রাইতে আমার বাড়ি।
দারোগা: খান সাহেব দরজা খুলে বাহিরে আসুন। জরুরী দরকার আছে।
(খান সাহেব বেরিয়ে আসেন। বাইরে দারোগার সাথে দু’জন সিপাহি দাঁড়ানো।)
খান সাহেব: দারোগা সাব আমার নাতি রাগ অইয়া চইল্যা গ্যাছে। অর কি কোন বিপদ অইছে?
(পুলিশের আড়াল থেকে বেড়িয়ে আসে আসিফ ও বৈচাপাগল। খান সাহেব হতবাক। মসজিদে মসজিদে তখন ধ্বনিত হচ্ছে ফজরের আজান।)
দারোগা: আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।
খান সাহেব: ক্যান, থানায় যাইতে অইবো ক্যান? কোন অঘটন ঘটছে না কি ?
দারোগা: হ্যা, অঘটন ঘটেছে। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে। সেই অঘটনের নায়ক আপনি।
খান সাহেব: কী কন, চল্লিশ বছর আগে.. ..। নায়ক আমি.. ..।
দারোগা: হ্যা, আপনার বিরুদ্ধে থানায় একাত্তরে মানবতাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।
খান সাহেব: ফালতু কতা। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে কেডা ? কার এত বড় সাহস।
দারোগা: সময় নষ্ট করছেন কেন? থানায় গেলেই সব জানতে পারবেন।
খান সাহেব: ঠিক আছে খাড়ান। আমি জামাডা গায় দিয়া আহি।
(খান সাহেব ভেতর থেকে জামা গায় দিয়ে বেরিয়ে আসে। পেছনে তার স্ত্রী। খানসাব একবার নাতির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে একটু দাঁড়ায়। দু’গন্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোটা লবণাক্ত জল। দাদি পাথরের মূর্তির মত নির্বাক।)
খান সাহেব: শ্যাস পর্যন্ত তুমি আমারে।
আসিফ: সরি দাদু। সারাদেশেই আজ যুদ্ধাপরাধীদের ধরা হচ্ছে। যুদ্ধের পরপরই কে বা কারা তোমার বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও হত্যাসহ মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ করে রেখেছে। আজ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমাদের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। আমার কষ্টটা এখানেই যে, আমি তোমার গর্বিত বংশধর হতে পারিনি। আমার দাদা মুক্তিযোদ্ধা না হয়ে হলো একজন যুদ্ধাপরাধী।
দারোগা: চলেন। সময় নষ্ট করবেন না।
(পুলিশ খান সাহেবকে নিয়ে চলে যায়। আসিফ চলে যেতে উদ্যত হয়।)
দাদী: খাড়াও আসিফ। তুমি আমারে আমার ছেলের ধারে লইয়া যাও। আমি আর এই নরকে থাকতে চাইনা। এই পাপের ফসল ভোগ করতে চাই না। বৈচারে তোর সহায় সম্পত্তি তুই বুইজ্যা লঅ।
(বৈচাপাগল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। দাদী ও আসিফ দুপাশ থেকে বৈচার দুই কাধে হাত রাখে।সবাই ফ্রিজ।)

(সমাপ্ত)

শুক্রবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৩

এইচআইভি/এইডস: প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি

‘১ ডিসেম্বর- বিশ্ব এইডস দিবস’
এইচআইভি/এইডস: প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
এক সময় মানুষ জানতো না এইচআইভি/এইডস কী? শুরু হলো প্রচার-প্রচারণা। আন্তর্জাতিক, সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এসে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে সোচ্চার হলেন। ফলে কিছু সংখ্যক শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেল এইডস এর ধারণা। কিছু সংখ্যক মানুষকে শেখানো হলো কিভাবে এইডস প্রতিরোধ করতে হবে। বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে চলল কাজ। প্রকল্প শেষ; সচেতনতার কাজও শেষ। সচেতনতা আশানুরূপ বৃদ্ধি পায়নি। কারণ আমরা প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে শতভাগ সফলতা অর্জন করতে পারিনি। বাংলাদেশে এইডস সনাক্ত হওয়ার বিশ বছর পরও ৬৮হাজার গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে তার ধারণা পৌঁছে দিতে পারিনি। যে কারণে এখনো মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা, অসচেতনতা ও উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়।
এইচআইভি/এইডস একটি মরণব্যাধি। এটা মানব জাতির মধ্যেই সংক্রমিত হয়। যথাযথ কোন প্রতিকার ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরোপুরি নির্মূল করেতে না পারলেও অবদমিত করার কিছুটা উপায়ও তারা এ পর্যন্ত আবিস্কার করেছেন। তবে আশা করি একদিন তারা এর নির্মূলের গবেষণায় সফল হবেন। বিজ্ঞরা গবেষণা করছেন আর অজ্ঞরা একে অবজ্ঞা করছেন। তাই এখনো এইচআইভি/এইডসকে অনেকে অভিশাপ হিসাবেও গণ্য করেন। তারা মনে করেন শুধু মানুষের নৈতিক অধ:পতনই এর জন্য দায়ি। ধর্মের অনুশাসন মেনে চলার জন্য প্রত্যেক ধর্মের পক্ষ থেকে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এ রোগের গোড়ার ইতিহাস সমকামীতাকে দায়ি করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের তথ্য মতে, ১৯৮১ সালের জুন মাসে লস এ্যাঞ্জেলস শহরে পাঁচ জন সমকামীর মধ্যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্বাভাবিক ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। যে কারণে গবেষকরা ১৯৮২ সালে প্রথম একে এইডস হিসাবে নামকরণ করেন। ১৯৮৩ সালে ড. লুক মন্টাগনিয়ের এর নাম দেন লিম্ফোঅ্যাডেনোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েটেড ভাইরাস। ১৯৮৪ সালে ড. রবার্ট গ্যালো নিশ্চিত করেন যে, মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংসকারী ভাইরাসই এইডস রোগের কারণ। ১৯৮৫ সালে হলিউডের অভিনেতা রক হাডসন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন বিশ্বব্যাপি হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। ১৯৮৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ট্যাক্সোনমি এইডস এর জীবাণুর নাম রাখেন এইচআইভি। ১৯৮৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘লন্ডন ঘোষণা’ অনুসারে ১ ডিসেম্বরকে ‘বিশ্ব এইডস দিবস’ হিসাবে পালন করা হয়।
বাংলাদেশে এইচআইভি/এইডস ১৯৮৯ সালে প্রথম সনাক্ত করা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় ২০৮৮ জন এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২৪১ জন। বাংলাদেশে এইডস এখনো মহামারি আকারে দেখা না দিলেও অসতর্ককা, অসচেতনতা ও উদাসীনতার ফলে অচিরেই এ মরণব্যাধি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কারণ এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সব রকমের নমুনা বা ঝুঁকি বাংলাদেশে বিদ্যমান। তাছাড়া ইতোমধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে এইডস বিস্তারের জন্য বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠি যেমন পতিতালয়ের যৌনকর্মী, ভাসমান যৌনকর্মী, মাদকসেবী, হিজড়া, প্রবাসী, যুবক-যুবতীর নৈতিক অবক্ষয়, কারখানা ও পরিবহণ শ্রমিক সংখ্যায় অনেক। এছাড়া যৌন মিলনে কনডম ব্যবহারে অনিহা, সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করা ও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা এইডস বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সঙ্গত কারণে আমাদের নারী শিশু ও যুবক-যুবতীরা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। তাই এখনই আমাদের একটি মজবুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
যেহেতু আমাদের হাতে এইডস রোগ প্রতিকারের কোন উপায় নেই। গবেষকরা মাত্র মানবদেহে এইচআইভি জীবাণু নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ঔষধ আবিস্কার করেছেন। যা কেবল মৃত্যুটাকে বিলম্বিত করতে পারে। আক্রান্তকে কেবল চিকিৎসা হিসাবে এন্টি রেট্রোভাইরাল থেরাপি দেওয়া হয়। ঔষধ হিসাবে রয়েছে জাইডোভুডিন, নেভিরাপিন, ডাইডেনোসিন, লেমিভুডিন ইত্যাদি। কিন্তু এ থেরাপির আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও লক্ষ্য করা যায়। এতে অগ্নাশয়ে প্রদাহ, হাত-পা শুকিযে যাওয়া, পরিপাকতন্ত্রে জটিলতা, বৃক্কে পাথর হওয়া, অরুচি, মুখে বিস্বাদ, স্বপ্ন, ঘুমের অভাব ও যকৃতে প্রদাহ ইত্যাদি হতে পারে। তবুও উন্নত দেশগুলোতে এ থেরাপির কারণে মৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ব্রাজিলে মৃত্যুর হার শতকরা আশি ভাগ কমে এসেছে। একজন আক্রান্ত এ থেরাপি গ্রহণের ফলে গড়ে প্রায় ৬-৭ বছর বেশি বাঁচতে পারে। তবে মৃত্যু অবধারিত।
তাই প্রতিকারের চেয়ে আগে আমাদের শরীরে এইচআইভি আছে কি না? তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া জরুরী। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে এইচআইভির উপস্থিতি সনাক্ত করা যায়। মূলত এইচআইভি পরীক্ষার জন্য শরীরে এন্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য যে পরিমাণ এন্টিবডির প্রয়োজন সে পরিমাণ এন্টিবডি শরীর তৈরি করতে পারেনা। ফলে  এসময় পরীক্ষায় এইচআইভির উপস্থিতি ধরা পড়ে না। এ সময়কালকে দি উইনডো পিরিয়ড বলা হয় যা কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস হতে পারে। এছাড়া যদি শরীরে জীবাণু পাওয়া যায় তখন তাকে এইডস রোগী বলা যায় না। তখন তাকে এইচআইভি পজেটিভ বা এইচআইভি বাহক বলা হয়। ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশের পর থেকে সাধারণত ৮-১০ বছর পর আক্রান্ত হয়। যদিও তখন আক্রান্তকে সুস্থ্য সবল দেখায়। এমন অবস্থাতেও তার থেকে অন্যজন আক্রান্ত হতে পারে। তাই প্রথমে এ্যালাইজা টেস্ট করতে হয়। তাতে যদি জীবাণু ধরা না পড়ে তবে তিনি নিশ্চিন্তথাকতে পারেন। আর যদি ধরা পড়ে তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সাথে সাথে ওয়েস্টার্ন ব্লট টেস্ট করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে কেউ আক্রান্ত হলে সাধারণত তিন বছরের মধ্যে মারা যায়।
কেবল সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষণের মাধ্যমে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এইডস সনাক্ত করতে পারেন। বাংলাদেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূলে গোপনীয়তা রক্ষা করে এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। ঢাকার শাহবাগের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজী বিভাগ, মহাখালীর মাইক্রোবায়োলজী ল্যাবরেটরী জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, মহাখালী রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনিষ্টিটিউট, ক্যান্টনমেন্ট আর্মড ফোর্সেস প্যাথলজী ল্যাবরেটরী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, খুলনা মেডিকেল কলেজ ও সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের প্যাথলজী বিভাগ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ল্যাবরেটরীতে এইচআইভি পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। অন্তত বৈবাহিক বন্ধনের পূর্বে উভয়ের রক্ত পরীক্ষা করে নেওয়া উচিৎ।
এ মরণব্যাধির হাত থেকে রক্ষা পেতে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়া আরো কার্যকরি ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু দিবস ভিত্তিক সচেতনতা নয়। প্রত্যেকটি টিভি চ্যানেল ও বেতার কেন্দ্রের সৌজন্যে এইডস সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও নাটক প্রচার করতে হবে। পত্রিকাগুলোকে বিজ্ঞাপন ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রত্যেক ধর্মের প্রতিটি উপাসনালয়ে এইডস সংক্রান্ত আলোচনা হতে পারে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গ্রামে অন্তত মাসে একবার হলেও এইডস বিষয়ক ভিডিও প্রদর্শন, সিনেমা স্লাইড প্রদর্শন, মঞ্চ বা পথনাটক, জারি বা গণ সংগীত পরিবেশনসহ পোস্টার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিলবোর্ড, হাট-বাজার বা পরিবহণে লিফলেট ও বুকলেটস বিতরণ করতে হবে। তাহলে হয়তো সচেতনতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।
মোট কথা এইডস বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমাদের প্রতিমুহূর্তে কাজ করতে হবে। আর যারা এইডস আক্রান্ত হয়েছেন তাদের ঘৃণা না করে ভালোবাসতে হবে। তাদের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যদিও কিছু স্পর্শকাতর বিষয় এর সাথে জড়িত। তাই যে কারণে এইচআইভি ছড়ায় সে কারণগুলো সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যেহেতু এ রোগ সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এখনো স্বচ্ছ ধারণার অভাব রয়েছে। মানুষ এইডস সম্পর্কে নানা রকম ভুল ধারণা পোষণ করে থাকেন। ফলে এইডস রোগীরা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে ঘৃণার বস্তু হয়ে যান। তাদের প্রতি করা হয় অমানবিক আচরণ। এইডস রোগিরা যেন সমাজের অন্য রোগিদের মত সেবা পেতে পারে। সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে এইডস কোন ছোঁয়াচে রোগ নয়। সবচেয়ে বড় কথা আমরা যে কেউ যে কোন সময়ে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারি। তাই রোগিকে ঘৃণা না করে রোগকে ঘৃণা করতে হবে। সংক্রমিতের প্রতি সহনশীলতা এবং মানবিক আচরণ করতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার পরে প্রতিকার না খুঁজে। আক্রান্ত হওয়ার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা করি।
 
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

দেশপ্রেম কি কেবল দিবসভিত্তিক হয়ে যাবে

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
‘দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ’- এ ঘোষণা ইসলাম ধর্মের হলেও সকল ধর্মের মানুষই এ ঘোষণার সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। কে দেশদ্রোহী হতে চায়? কেউ না। যারা দেশদ্রোহী; তারা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে তৎপর। তারা মানুষের কল্যাণে নয়, নিজের কল্যাণে সব করে। তারা ঘৃণ্য ও অপাঙক্তেয়। দেশদ্রোহীতার পরিণতি সকলেরই জানা। দেশপ্রেমকে ধর্মাচার বললেও অত্যুক্তি হবে না। সকল ধর্মেই দেশপ্রেমের কথা বলা হয়েছে। তাই দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অন্তরে দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। কারণ, যে দেশের মাটি বায়ু জল বাতাসে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠি আমি। সে দেশতো আমার মা। আর মাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। যে করে সে অকৃতজ্ঞ ও মহাপাপী। তাই আমরা সবাই দেশপ্রেমিক হতে চাই। মনে-প্রাণে দেশকে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি বলেই ১৯৭১ সালে জীবনের বিনিময়ে দেশকে রক্ষা করেছিলাম। আমরা জাতির গর্বিত সন্তান।
কিন্তু আজকাল আমরা দেশপ্রেমের নামে প্রহসনে মেতে উঠেছি। ইদানীং দেশপ্রেম হয়ে গেছে স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার। হয়ে গেছে রাজনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ। শুধু রাজনীতিবীদরাই দেশপ্রেমের স্লোগান দেবেন। বাকিরা তাকিয়ে উপভোগ করবেন। সর্বোপরি দেশপ্রেম এখন দিবসভিত্তিক। প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ ও ২১ ফেব্র“য়ারি এলে নানাবিধ কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে তা পালন করি। পরদিন সকালেই দেশের বারোটা বাজানোর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠি। দেশকে ভালোবাসার নামে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে মরিয়া হয়ে উঠি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতাকে ফ্যাশনে রুপান্তরিত করি।
‘দেশ আমার, মাটি আমার’- স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করি আকাশ। বিভিন্ন রঙের বাহারি পোস্টারে, ফেস্টুনে, ব্যানারে ও দেয়াল লিখনে তখন দেশের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তির প্রচার। ‘ দেশদরদী, গরীবের বন্ধু অমুক নেতার পক্ষ থেকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা’ প্রভৃতি প্রচার-প্রচারণায় ছেয়ে যায় অলি-গলি, হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রাজপথ। এ আমাদের দেশপ্রেমের নমুনা। অথচ আমাদের আশপাশের হতদরিদ্র মানুষগুলো দু’বেলা দু’মুঠো না খেতে পেয়ে বেছে নেয় ভিক্ষাবৃত্তির মত জঘন্য কাজ। কবির ভাষায়-‘ঘাতক শিল্পের দেশ তাকে আমি কখনোই স্বদেশ বলি না।’ ক্ষুধার তাড়নায় নারী বেছে নেয় বেশ্যাবৃত্তির মত জঘন্য পেশা। তাইতো কবি বলেছেন,‘বেশ্যালয়কে কখনো আমি স্বদেশ বলি না।’ তাতে কি আমাদের দেশ সারা বিশ্বের কাছে লজ্জিত হয় না? ব্যক্তির প্রচারে অর্থ ব্যয় না  করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে কী দেশপ্রেম প্রকাশিত হয় না। কয়দিন থাকে ঐ ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার? একদিন, একসপ্তাহ, একমাস বা একবছর। অথচ ডিসেম্বর মাসের এ কনকনে শীতের রাতে কোন বস্ত্রহীন মানুষকে একটি শীতবস্ত্র দিলে সেটার স্থায়ীত্ব বহুদিন। দেশের মানুষকে ভালোবাসা কী দেশপ্রেম নয়?
আসলে প্রকৃত দেশপ্রেম কী? আমরা অনেকেই জানিনা বা বুঝতে চাই না। শুধু মুখেই বলি দেশ ও দশের কল্যাণে আমি নিয়োজিত। অথচ দেশ ও দশের কল্যাণ সাধনের চেয়ে আমরা নিজেদের কল্যাণেই নিয়োজিত থাকি। তাইতো দেশপ্রেমিকের সংজ্ঞাও আমরা পাল্টে ফেলেছি। দেশ ও দশের কল্যাণে ব্যর্থ হয়েও আমরা ‘দেশপ্রেমিক’ উপাধি পেতে পারি। বেয়াদবি মাফ করবেন, ‘আসল কথা হইতেছে- আমরা যে যত বেশি দেশ ও দশের বারোটা বাজাইতে পারিব। সে তত বড় দেশপ্রেমিক হিসাবে উপাধি লাভ করিয়া থাকিবেন।’
আমি দেশপ্রেমিক। তা ঘোষণা দেওয়ারতো কিছু নাই। সেদিন গাড়ীর জন্য এক বাস স্টপেজে অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় প্যান্ট-শার্ট পড়া এক ভদ্রলোকের মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো। রিংটোনে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সুর। আমি চমকে উঠলাম! এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম ভদ্রলোক ফোন রিসিভ করলেন। রিং থেমে গেল। জাতীয় সংগীতের সম্মান বা ব্যবহারের বিধিমালাও আমাদের জানা নেই। আমি যতটুকু জানি, তাতে জাতীয় সংগীতের সময় দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়। যত্রতত্র জাতীয় সংগীত বেজে উঠলে আমরা কী করতে পারি? এতো ‘অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ’র মতো।
কিছুদিন আগের ঘটনা। গত শারদীয় দূর্গা পূজায় ‘আনন্দধারা নাট্যগোষ্ঠী’র আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার নবগ্রাম ইউনিয়নের একটি গ্রামে। পূজার অনুষ্ঠান চলছে। সবশেষে নাটক মঞ্চস্থ হবে। নাটকের আগে পরিবেশিত হবে জাতীয় সংগীত। শিল্পীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন শুরু করলেন। কেউ দাঁড়ালো না। আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে একাই দাঁড়িয়ে গেলাম। আমার দেখাদেখি সাংবাদিক বন্ধু মিজানুর রহমানও দাঁড়ালেন। পরে আমাদের দেখাদেখি পূজামন্ডপ প্রাঙ্গনে যে যেখানে বসা ছিলেন; তারা সবাই দাঁড়িয়ে গেলেন। জাতীয় সংগীত সহযোগে দেশকে সম্মান জানানো হলো। জনগণ কি বুঝেছে জানি না। তবে আমার মনে হয়, যেহেতু আমরা অনুষ্ঠানের অতিথি। অতিথিরা দাঁড়িয়েছে তাই সবাই দাঁড়িয়েছে।
আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বসে পরীক্ষা পাসের জন্য পৃষ্ঠা ভরে ‘দেশপ্রেম’ রচনা লিখেছি। কিন্তু তার সারমর্ম কিছুই অনুধাবন করিনি। দেশপ্রেমকে কেবল রচনার জন্যই উপযুক্ত মনে করেছি। আমরা বলি-‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ কিন্তু আজ সেটা উল্টে গেছে। বলতে হবে- দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। তাই যদি না হবে তবে আমাদের দেশ আজ এত দুর্ভাগা কেন? দেশের অর্থ কেন বিদেশে পাচার হয়? কেন ‘নিবিড় পাটচাষের বদলে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে নিবিড় কোটিপতির চাষ।’ দেশি পণ্য না কিনে আমরা বিদেশি পণ্য কিনে ধন্য হই। দেশি পণ্য ব্যবহার করলে না কি প্রেসটিজ নষ্ট হয়। এছাড়াও দেশি সংস্কৃতির চেয়ে পরগাছা সংস্কৃতি লালন করি। আমার মনে হয় না- এবার শতকরা বিশজন মানুষ বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখেছে। তার কারণ, আমার আকাশ দখল করে রেখেছে স্টার জলসা, জি বাংলা, স্টার প্লাস আর জি টিভিরা। ‘টাপুর টুপুর’, ‘সাতপাকে বাধা’ আর ‘মা’ (ঝিলিক) আমাদের নারী সমাজের মগজ এমনভাবে ধোলাই করেছে যে, তারা ঐ সিরিয়াল দেখে ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাঁদবেন। ভুলেও চ্যানেল পাল্টে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠান দেখবেন না। ছি! আমরা কতটাই অকৃতজ্ঞ। অথচ ভারত সরকার তাদের টেলিভিশনে আমাদের কোন চ্যানেল প্রচারে অনুমতি দেন নি। কবি যথার্থই বলেছেন-‘ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো টিভি পর্দায় যখন পাশ্চাত্যের/ হাঙর-সংস্কৃতি এসে গিলে খাচ্ছে পদ্মার রূপালী ইলিশ।’
বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও মাতৃভাষা দিবস এলেই ফুল দেই। লাল-সবুজের রঙে নিজেকে সাজাই। একদিন পড়ে সে পোশাক তুলে রাখি আগামী বছরের জন্য। পত্র-পত্রিকাগুলো সাময়িকী ছাপে। পনের দিন দেশাত্মবোধ জাতীয় কলাম ও প্রতিবেদন ছাপে। ব্যাস, ঐ পর্যন্তই। টেলিভিশনগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, সিনেমা ও টকশো প্রভৃতি প্রচার করে। এরপর পাল্টে যায় সবার চেহারা। কেন? দেশপ্রেম কী কেবল দিবসভিত্তিক? দেশাত্মবোধকে কেন আমরা সঙ্কীর্ণ গন্ডির মধ্যে নিয়ে এসেছি। দেশাত্মবোধক নাটক, সিনেমা কী সারা বছর প্রচারিত হতে পারে না।
আসুন শুধু মুখেই নয় অন্তরেও ভালোবাসতে শিখি। রাজনীতির স্বার্থে নয়, ব্যক্তি স্বার্থে নয়, ক্ষমতার লোভে নয়। ঈমানী দায়িত্ব মনে করেই দেশকে ভালোবাসি। নিজের কল্যাণে নয়, দেশের কল্যাণে এগিয়ে আসি। দেশের প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানাই। ‘দেশ আমার, মাটি আমার’- স্লোগানকে অন্তরে ধারণ করে দেশের অভ্যন্তরের যাবতীয় ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দিতে ঐক্যবদ্ধ হই। দলের স্বার্থে দলাদলি না করে দেশের স্বার্থে সবাই এক হয়ে কাজ করি। তাই কবির ভাষায় বলতে হয়-‘যখন আমাদের শত্র“রা সংঘবদ্ধ, বন্ধুরা ঐক্যভ্রষ্টÑ/ তখন এই কবিতাটির ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু।’

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

চল্লিশ বছর পরও উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
৮ ডিসেম্বর মাদারীপুরের কালকিনি মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে কমান্ডার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা লালপোল সংলগ্ন ও থানার অভ্যন্তরে পাক হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে কালকিনিকে হানাদার মুক্ত করেন। এ দিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ বিজয়ের আনন্দে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে প্রকাশ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। কালকিনি মুক্ত করে মুক্তিযোদ্ধারা মাদারীপুর সদর মুক্ত করার জন্য রওয়ানা হন। ১০ ডিসেম্বর মুক্ত হয় মাদারীপুর সদর। কিন্তু স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও এ দিনটি কালকিনিবাসীর কাছে উপেক্ষিত বা অজ্ঞাত। মুক্ত দিবস উপলক্ষে নেই কোন কর্মসূচি।
শুধু তাই নয়, স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও কালকিনিতে নির্মিত হয়নি স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ। প্রবীণ থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মও জানে না কালকিনি মুক্ত হয় কত তারিখে। লজ্জার বিষয়, অনেক মুক্তিযোদ্ধাও দিনটির কথা বেমালুম ভুলে বসে আছেন। তার কারণ, কালকিনি মুক্ত দিবস উপলক্ষে চল্লিশ বছরে একবারও কোন কর্মসূচি পালিত হয়নি। এমনকি এনায়েত নগর ইউনিয়নের ফাসিয়াতলার গণহত্যা দিবসও ভুলে গেছে সবাই। ভুলে গেছে শহীদ বীর বিক্রম এম নুরুল ইসলাম ও শহীদ নুরুল আলম পান্নাসহ অনেক শহীদের নাম। তার কারণ, স্বাধীনতার চল্লিশ বছরেও নির্মিত হয়নি স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বা অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক।
বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার এনায়েত নগর ইউনিয়নের ফাসিয়াতলা বন্দর সাপ্তাহিক হাটের দিন বলে সরগরম। নিয়মিত নিয়মে চলছে বেচা-কেনা। হঠাৎ সন্ধ্যার ঠিক আগে দু’জন অপরিচিত লোক ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করল,‘মুক্তিবাহিনী আইছে। তারা আপনাগো লইয়া মিটিং করব। আপনারা বাজার ছাইড়া যাইবেন না।’ ঘোষণার ১৫ মিনিট যেতে না যেতেই রাজাকার ও আল বদর বাহিনী বাজার ঘেরাও করে ফেলে। এর ১০ মিনিট পর নদীতে গানবোটে চরে আসে পাক বাহিনী। রাজাকার ও পাক হানাদার বাহিনী সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র হাটুরে মানুষের ওপর। হানাদারদের অতর্কিত হামলায় শহীদ হয় প্রায় দেড়শতাধিক মুক্তিকামী মানুষ। অনেককে ভাসিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাজারের দোকানপাট। যাওয়ার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮ জনকে। এর মধ্যে ১০জন আজো ফিরে আসেনি।
১৯৭১ এর মে মাসে বর্তমান পৌর এলাকার দক্ষিণ রাজদী গ্রামের নুরুল আলম পান্না যোগ দেন ৩০৩ নম্বর রাইফেলে। মেজর মনজুর নেতৃত্বে ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে কালকিনি অঞ্চলে নুরু কবিরাজের কাছে প্রশিক্ষণ নেন। যুদ্ধকালীন তাঁর কাজ ছিল পাক বাহিনীর গোপন সংবাদ সংগ্রহ করা। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একাত্তরের ১০ অক্টোবর উপজেলার ফাসিয়াতলা বাজারে যান। সেখানে রাজাকারদের সহায়তায় পাক বাহিনী তাকে আটক করে মাদারীপুর এ.আর হাওলাদার জুট মিলের মিলিটারি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাঁকে। হত্যার পর নিশ্চিহ্ণ করে দেওয়া হয় মৃতদেহ। এরপর কেটে গেছে চল্লিশ বছর। অথচ নিখোঁজ শহীদ নুরে আলম পান্নার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই। আজ স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর তাঁর আত্মীয়-স্বজনের কাছে খোঁজ নিয়ে শুনতে হয় তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। বহুবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন শহীদের ভাই জহিরুল আলম সিদ্দিকী ডালিম।
১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে পাক বাহিনীর যাতায়াতে বিঘœ ঘটানোর জন্য গোপালপুর ব্রীজে মাইন বিস্ফোরণ শেষে ফেরার পথে রাজাকার ও পাক বাহিনীর নির্মম বুলেটে শাহাদাত বরণ করেন উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের পরিপত্তর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা এম নুরুল ইসলাম। তাঁর লাশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিজের ভিটায় দাফন করার সৌভাগ্য হয়নি স্বজনের। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর বীর বিক্রম উপাধীতে ভূষিত করেন। অথচ তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণেও আজ পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি স্মৃতিস্তম্ভ। কিংবা কোন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা স্থাপনার নামকরণও হয়নি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজ ভুলতে বসেছে কালকিনিবাসী। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৮ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে উপজেলা গেট সংলগ্ন সুরভী সিনেমা হলের পাশে স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও তার কাজ শুরু হয়নি। ঠিক তেমনি অযতœ অবহেলায় পড়ে আছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ক্ষমতায় আসার পরও উপেক্ষিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। দানবীর, শিক্ষাণুরাগী স্থানীয় সাংসদ সৈয়দ আবুল হোসেনও পরপর চার বার নির্বাচিত হয়েও কর্ণপাত করেননি স্মৃতি সংরক্ষণের ব্যাপারে। অথচ নিজের নামে, বাবার নামে অনেক কিছু করলেও এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদদের নামে কিছুই করেন নি।
কিন্তু ২০১০ সালে উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘর স্থাপিত হয়। ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। কিন্তু অর্থাভাবে ঢিমেতালে চলছে তার কাজ। কাজ শেষ না হওয়ায় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও বিভিন্ন কারণে ক্ষুব্ধ কালকিনির মুক্তিযোদ্ধারা। যার ফলে গত ২৫ মার্চ কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত ‘স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পূর্তি’ অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। পরে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সৈয়দ আবুল হোসেন তাদের শান্ত করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আকন মোশাররফ হোসেন ক্ষোভের সাথে বলেন, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। স্বাধীন দেশের স্রষ্টারাই আজ ধুুকে ধুকে মরে। এমনকি তাদের স্মৃতিটুকুও সংরক্ষণ করা হয়নি। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসকান্দার আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর আগে। এখনো ফাসিয়াতলা গণহত্যা, স্বাধীনতার স্মৃতিস্তম্ভ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় সবই কালের ধুলায় বিলীন হতে চলেছে।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে শত্র“মুক্ত হয়েছে আমাদের স্বদেশ। আজ স্বাধীন দেশের মাটিতে পালিত হয় না কালকিনি মুক্ত দিবস। গড়ে ওঠে না স্মৃতিস্তম্ভ। সংরক্ষিত হয় না গণহত্যার স্মৃতি। এ লজ্জা রাখবো কোথায়? এ দীনতা কাদের? তবে কী জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞ। হয়তো একদিন মরতে মরতে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা শূন্য হয়ে যাবে। সেদিন কী আমরা তাদের স্মরণ করবো? আগামী প্রজন্ম কী মনে রাখবে তাদের কথা। কীভাবেই বা রাখবে? আমরা যদি তাদের স্মৃৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করি তবে সেই ব্যর্থতা কেবল আমাদের।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী

বৃহস্পতিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১২

বালেশ্বর যুদ্ধের কথা

দুলাল সরকার

বালেশ্বর যুদ্ধের কথা বলব তোমাকেÑ
১৯১৫ সাল, বাঘা যতীন, চিত্তপ্রিয়
মনোরঞ্জন, নীরেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিষচন্দ্র নামের চার বিপ্লবী
যুদ্ধাস্ত্র গ্রহণে ক্লান্ত ক্ষুধার্ত অপেক্ষমান অবসরে
চিন্তামনি নামের ছদ্মবেশী দারোগার বিশ্বাসঘাতকতায়
সকলের মৃত্যু হলে বাঘা যতীন সব সাথীদের
মৃত্যুর দায় স্বীকার করে চিরবিপ্লবী যতীন সেই অসম যুদ্ধে
প্রাণ হারালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
হত্যাকারী পুলিশ কমিশনার টেগার্টকেও তাঁর
দেশপ্রেম ও বীরত্বের কাছে মাথা নোওয়াতে দেখে ভাবি
’৭১ এর হত্যাকারী, লুণ্ঠনকারী, ধর্ষক
পাকিস্তানীরা আজো
বাঙালির কাছে মাথা নত না করে
যে অপরাধ করে চলেছে
তা কত ক্ষমাহীন ও মানবতাবিরোধী।

২২.১১.২০১২

বুধবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১২

ডা. জোহরা বেগম কাজী উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :
উপমহাদেশের প্রথম মুসলমান বাঙালি মহিলা চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজীর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ৭ নভেম্বর। যে মহিয়সী নারী জীবদ্দশায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মরণ করছি তাঁকে। অধ্যাপক ডা. জোহরা বেগম কাজী স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন। তিনিই প্রথম ধাত্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে অজ্ঞ ও অবহেলিত নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে এসেছেন। অবগুন্ঠিত নারী সমাজের উন্নত চিকিৎসার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামির শক্ত বাধাকে অতিক্রম করে নারী সমাজের মুক্তিদাত্রী হিসেবে ধূমতেুর মত আবির্ভূত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের অনগ্রসর চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনিই প্রথম আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন।
এ মহিয়সী নারী ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজনানগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার তৎকালীন পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার গোপালপুর গ্রামের প্রভাবশালী সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ডা. কাজী আবদুস সাত্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী ও আধুনিক চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। তিনি দেশভাগের ঘোরবিরোধী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তিনি পছন্দ করতেন না। ফলে বাবার মানবতাবাদী রাজনৈতিক আদর্শ ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হলে থাকে অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত কিশোরী জোহরার মননে ও চেতনায়। মাতা আঞ্জুমান নেছা রায়পুর পৌরসভার প্রথম মহিলা কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন কর্মনিষ্ঠ সাদাসিধে এক নারী।
তখন ‘ব্রিটিশ খেদাও’ আন্দোলনের উত্তাল সময়। এ সময় ডা. জোহরা বেগম কাজীর শৈশব-কৈশোর কাটে মানবতাবাদী পিতার কর্মস্থল মহাত্মা গান্ধী প্রতিষ্ঠিত সেবাশ্রম ‘সেবাগ্রাম’-এ। রাজনানগাঁওয়ের রানি সূর্যমুখী প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের টোল ‘পুত্রিশালায়’ তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ছাত্রজীবনে তিনি বরাবরই মেধাবী ছিলেন। ক্লাসে সব সময় প্রথম হতেন। ফলে সাফল্যের সাথে মেট্রিক পাস করেন। ১৯২৯ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে আইএসসি পাস করে কলেজ জীবন সমাপ্ত করেন। এরপর উপমহাদেশের প্রথম মহিলা মেডিকেল কলেজ দিল্লির লেডি হার্ডিং গার্লস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজে তিনিই প্রথম মুসলিম বাঙালি ছাত্রী। এখান থেকে ১৯৩৫ সালে এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। তখন তাকে সম্মানজনক ‘ভাইস রয়’ পদক প্রদান করা হয়।
ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মহাত্মা গান্ধীর সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা জোহরা বেগম কাজীর গান্ধী সেবাশ্রমে কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। এছাড়া অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩ বছর কাটিয়েছেন তিনি। পরে বৃত্তি নিয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করার জন্য লন্ডনে পড়াশুনা করেছেন এবং চিকিৎসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি এফআরসিওজি লাভ করে ভারতে ফিরে আসেন। গান্ধী পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে নাগপুরে অবস্থিত গান্ধীর সেবাশ্রম ‘সেবাগ্রাম’-এ তিনি অবৈতনিক চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশবিভাগের পর তিনি বড়ভাই অধ্যাপক কাজী আশরাফ মাহমুদ ও ছোটবোন ডা. শিরিন কাজীর সাথে বাংলাদেশের ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে যোগদান করেই গাইনি (স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা) বিভাগ চালু করেন। এছাড়াও তিনি মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান ও অনারারি প্রফেসর ছিলেন। পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) অনারারি কর্নেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
সাতচল্লিশ- পরবর্তী বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। তিনি একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্রে বাঙালি নারী চিকিৎসকদের অগ্রপথিক, মানবতাবাদী ও সমাজ-সংস্কারক ছিলেন। গর্ভবতী মায়েরা হাসপাতালে এসে যেন চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন, সে জন্য তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নারীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। পিছিয়ে পড়া নারীদের জাগরণ তথা চিকিৎসাশাস্ত্রে নারীদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। তারই দেখানো পথে আজ বাংলাদেশে অসংখ্য নারী চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। তাঁর জ্বালিয়ে দেওয়া আলোক বর্তিকা হাতে নিয়ে আজ অনেক নারী চিকিৎসক আলোকিত করছে গ্রামবাংলার অবহেলিত জনপদের চিকিৎসা জগতের অন্ধকার প্রকোষ্ট।
শুধু তা-ই নয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে তিনি একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন। এছাড়াও একজন ইতিহাস সচেতন মানুষ হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস বিনির্মাণের লক্ষে তিনি ২০০১ সালের ১১ জুলাই তাঁর কাছে সংরক্ষিত মহাত্মা গান্ধীর ব্যক্তিগত ঐতিহাসিক পত্র, ভাইস রয় পদক, সনদসমূহ এবং আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি-স্মারক আমাদের জাতীয় জাদুঘরে দান করে গেছেন।
ডা. জোহারা বেগম কাজী জীবনের শুরু থেকেই সময়ের ধারাবাহিকতায় কর্মময় জীবনে মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর স্ত্রী কন্তুরাবার øেহসিক্ত হয়েছেন। পরবর্তীতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ, অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন ও মহাত্মা গান্ধীর øেহভাজন কংগ্রেসের অন্যতম কর্মী ডা. সুশীলা নায়ারসহ অসংখ্য মানবতাবাদী বিপ্লবী মানুষের সাহচর্য লাভ করেছেন।
জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে ডা. জোহরা বেগম কাজী বিভিন্ন খেতাব ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘তখমা-ই পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি ‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) তাকে বিএমএ স্বর্ণপদক প্রদান করে। ২০০২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘রোকেয়া পদক’ প্রদান করেন। ২০০৮ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক ‘একুশে পদক’ (মরণোত্তর) প্রদান করে সম্মানিত করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩২ বছর বয়সে তৎকালীন আইনজীবি ও সংসদ সদস্য রাজু উদ্দিন ভূইয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আজীবন মানব সেবায় নিয়োজিত জোহরা বেগম কাজী ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর ৯৫ বছর বয়সে ঢাকার নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে ঢাকায় মাদারীপুর জেলা সমিতির উদ্যোগে স্মরণ সভা ও পৈতৃক নিবাস মাদারীপুরের কালকিনির মানুষ স্মরণ সভা ও মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করে। এ মহিয়সী নারী আমাদের মাঝে চিরদিন চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
সাংবাদিক, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর, ২০১২

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন কুন্ডুবাড়ির মেলা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন হিসাবে আখ্যায়িত করলে অত্যুক্তি করা হবে না। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালী পূজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত কুন্ডুবাড়ির মেলায় আগত দর্শনার্থীর সংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে মুসলমানই কয়েকগুণ বেশি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-‘ গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান।’ এইতো ছিল আমাদের গ্রামবাংলার সম্প্রীতির চিরায়ত সংস্কৃতি। কিন্তু ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় গোড়ামী আজ যখন সাম্যের পথে বাধা হয়ে শক্ত প্রাচীর গড়তে যাচ্ছে সে সময়ে এমন মিলন মেলা আমাদের অবশ্যই স্মরণ করিয়ে দেয় ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম।’ আমরা ফিরে পেতে চাই সোনালী দিন। আমরা বলতে চাই- আমরা জন্মসুত্রে বাংলাদেশী। জাতিগত পরিচয়ে আমরা এক ও অভিন্ন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।
দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়- মেলার একদিকে মন্দিরে চলে পূজা-অর্চনা। অন্যদিকে বিশাল এলাকা জুড়ে পণ্যের বিকি-কিনি। সর্বোপরি বাধভাঙা আনন্দ উপচে পড়ে বিনোদন মঞ্চে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা আসে তাদের পণ্যের পসার সাজাতে। দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ আসবাবপত্রের মেলা হিসাবে খ্যাত কুন্ডুবাড়ির মেলা শতবছর পেরিয়ে সহস্র-অযুত-লক্ষ-নিযুত-কোটি বছর কিংবা আজীবন টিকে থাকবে। টিকে থাকবে এ অঞ্চল তথা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ হিন্দুদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মেলাকে সফল করতে নির্দ্বিধায় এগিয়ে আসে স্থানীয় মুসলমানরা। সম্প্রতি রামু ও উখিয়ায় ঘটে যাওয়া সহিংসতাও দমাতে পারেনি আয়োজকদের উৎসাহ-উদ্দীপনা । গ্রামবাংলার শতবছরের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে দলমত নির্বিশেষে সবাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক্ষেত্রে আন্তরিকতার কমতি নেই স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের।
কুন্ডুবাড়ির মেলার উৎপত্তির ইতিহাস দুর্বোধ্য হলেও ধারণা করা হয়- স্থানীয় সংখ্যালঘু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কালীপূজা উপলক্ষে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর এলাকার গোপালপুর গ্রামের কুন্ডুবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা। সঠিক দিন তারিখ কেউ না জানলেও ধরে নেওয়া হয় আনুমানিক আঠারো শতকের শেষের দিকে কুন্ডুদের পূর্বপুরুষরা ধর্মীয় উৎসব কালীপূজার আয়োজন করে। ক্রমান্বয়ে তাদের পূজাকে ঘিরে প্রথমে বাদাম, বুট, রয়্যাল গুলি, লাঠি লজেন্স, মন্ডা-মিঠাই ও খেলনা নিয়ে অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী বসতো। পরে আস্তে আস্তে প্রতিবছর ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় এখবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যসামগ্রী নিয়ে আসতে শুরু করে। পরবর্তীতে স্থানীয়রা এর নামকরণ করেন ‘কুন্ডুবাড়ির মেলা’ নামে। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থিরতার মধ্যে মেলা বন্ধ থাকলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ মেলা জমজমাটভাবে হয়ে আসছে।
প্রতিবছরের মতো এ বছরও ১৩ নভেম্বর সকাল থেকে ১৭ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কুন্ডুবাড়ির মেলা। তিন দিনব্যাপী হওয়ার কথা থাকলেও ক্রেতাদের চাহিদা বিবেচনা করে আরো দু’দিন বাড়িয়ে সমাপ্ত হলো। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা বাঁশ, বেত, ইস্পাত-কাঠের আসবাবপত্র, খেলনা ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে আসেন। অনেকে আসেন পণ্য সামগ্রী কিনতে। পাশাপাশি নাগর দোলা, পুতুল নাচসহ বিভিন্ন বিনোদনে আকৃষ্ট হয় দর্শনার্থীরা। বস্তুত বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মেলা হয়ে ওঠে উপভোগ্য। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চাপ কম থাকলেও বিকেলের পরে বাড়তে থাকে জনস্রোত। বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয় মেলা প্রাঙ্গন। তবুও মেলার দীর্ঘ ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনার নজির নেই।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা কেউ কেউ বাচ্চাদের জন্য খেলনা, আসবাবপত্র কিংবা প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনছেন। আবার কেউ কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছেন। ব্যবসায়ীদের প্রচুর লাভ হয়। কোন ঝুট-ঝামেলাও নেই। মেলা উদযাপন কমিটিও যথেষ্ট আন্তরিক। কুন্ডুবাড়ির মেলা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্ণ। তাই বংশ পরম্পরায় তারা এ ঐতিহ্যকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। তিনি আরো জানালেন, তাদের পূর্বপুরুষরা নাকি আঠারো শতকের শেষের দিকে এ মেলার প্রবর্তন করেন। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা দক্ষিণবঙ্গের সর্ববৃহৎ মিলন মেলা। এখানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সব ধর্মের মানুষ আসে। হিন্দু-মুসলমান কে কোন জাত সে বিচারের উর্ধ্বে গিয়ে সম্প্রীতির বন্ধন গড়াই সকলের উদ্দেশ্য। জাতিগত সীমাবদ্ধতার বাহিরে উদার মানসিকতার পরিচয় মেলে এখানে। বেচা-কেনা কেবল উপলক্ষ মাত্র। আমরা বাঙালি। আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার একাত্মতা ঘোষণার একটা প্লাটফর্ম বলা যায়।
মেলার অগণিত মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য পূজা মন্ডপের পাশে স্থায়ীভাবে একটি পুলিশ কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তাদের সহযোগিতা করেন। ফলে বিশৃঙ্খলার কোন সুযোগ নেই। কুন্ডুদের পূর্বপুরুষদের প্রবর্তিত এ মেলা শতবছর পেরিয়েছে। মেলার আয়োজকরা হিন্দু হলেও এটা এখন এলাকার ঐতিহ্য ও সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। এ ঐতিহ্য ও সম্পদ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের। ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা এ অঞ্চলের প্রাণের উৎসব। তাই পূর্ব নির্ধারিত তিনদিনের হলেও বর্ধিত আরো দু’দিন অর্থাৎ পাঁচদিনে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সমাপ্ত হয়েছে এ উৎসব। কুন্ডুবাড়ির মেলা আমাদের শিক্ষা দেয়- রামুর মতো আর সহিংসতা নয়। মানুষে মানুষে হৃদ্যতাই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আমরা বাঁচতে চাই- হাতে হাত রেখে। আমরা বাঁচতে চাই- কাঁধে কাঁধ রেখে।
বিকাল পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গন ঘুরেও মনে হয় ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে/ যেন শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ জনসমুদ্র সাঁতরে বেরিয়ে আসতে আসতে মনে পড়ে যায়- ‘আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা/ অগ্রাণে নবান্ন উৎসবে/ আবার বাংলা ভরে উঠবে সোনায়/ বিশ্ববাসী চেয়ে রবে।’ আমাদের শুধু একটাই প্রার্থনা, শতবছরের ঐতিহ্যবাহী কুন্ডুবাড়ির মেলা টিকে থাকুক মানুষের ভালোবাসা আর বন্ধনে। সাম্য ও মৈত্রী হোক এর একমাত্র লক্ষ। কোন অসাম্প্রদায়িকতা যেন এর পবিত্রতাকে বিনষ্ট করতে না পারে এ প্রত্যাশা সকলের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভরে উঠুক প্রিয় স্বদেশ। একই দুর্বা ঘাসের শিশিরে সিক্ত হোক সকলের চরণ। এক শীতল আবেশে সম্প্রীতির সুবাতাস বইয়ে দিক সবার অন্তরে। এক সামিয়ানার নিচে সব ব্যবধান ভুলে গিয়ে হিন্দু-মুসলিম এক হয়ে গেয়ে উঠুক মানবতার জয়গান। কুন্ডুবাড়ির মেলা দীর্ঘজীবি হোক। অটুট বন্ধনে চিরজীবি হোক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এর সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয় সবার উপরে সম্প্রীতি সত্য তার উপরে নাই।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
কলাম লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১২

প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধির ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের বিচারের দাবীতে গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কালকিনি বন্ধুসভার উদ্যোগে স্থানীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন শেষে প্রতিবাদ সমাবেশে কালকিনি বন্ধুসভার সভাপতি সালাহ উদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে মিজানুর রহমানের সঞ্চালনে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক মোঃ জামাল উদ্দিন, খন্দকার মনিরুজ্জামান, আসাদুজ্জামান রিপন, সাইফুল ইসলাম, তপন বসু, ওমর আলী সানি, আঃ গফুর মোল্লা, জহিরুল ইসলাম খান, উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন, মাদারীপুর উদীচীর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার কর্মী রতন কুমার দাস প্রমুখ। বক্তারা খায়রুল আলমের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।
উল্লেখ্য, গত শনিবার সকালে মাদারীপুরের কালকিনি পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলাল ও তার সমর্থকদের হামলায় প্রথম আলো’র কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলম গুরুতর আহত হন। তাকে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরে-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।