শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

:: অন্ধকারে বেশ্যা ও পথিক ::

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::

রোজ সন্ধ্যার পর থেকেই ওরা কাকরাইল মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ইদানিং অনেকেই বোরকা পরে দাঁড়ায় কে বেশ্যা, কে ঘরণি বোঝা মুশকিল পথেই হেঁটে যায় সুমন অফিস থেকে বাসায় যেতে এটাই একমাত্র পথ

যেতে যেতে দাঁড়িয়ে থাকা নিশিরমনীর শরীর দেখে বুকের উচ্চতা মাপে কোমরের ভাজ খোঁজে জিহ্বা দিয়ে ঠোট টেটে বাসায় গিয়ে বাথরুমে ঢোকে বের হয়ে বিছানায় মিনিট বিশেক নিথর হয়ে পড়ে থাকে

রোজই সুমনের ইচ্ছে হয় দরদাম করার সাহস হয় না আজ সাহস করে দাঁড়ায় অপেক্ষাকৃত কমবয়সী এক রমনীর সামনে দাঁড়াতেই- ‘কি লাগবো নাকি? এক্কেবারে টাইট এহনো
সুমন লজ্জা পায় আস্তে বলে, ‘হুম...কত?’
এক ঘণ্টা না সারারাইত?’
সুমন বলে, ‘বাসা খালি সারারাইত।’
‘বেশ, তাইলে তিন হাজার।’
দূর মাগি এত ক্যান? তাইলেতো সানি লিওনরেই আনতে পারি।’
তাইলে যা, আমার কাছে ক্যান?’
মাসে কামাই আট হাজার আর এক রাইতেই... ব্যবসাতো ভালোই।’

ক্ষেপে যায় স্বঘোষিত সুন্দরি চেচিয়ে বলে, ‘ওই খানকি মাগির পোলা, অ্যাতো চটাং চটাং কথা কস ক্যান? কামাই নাই তয় মাগি খোঁজস ক্যান? কয়জনরে তুই বিনাপয়সায় নষ্ট করছোস? চুতমারানির পো, কাম ফুরাইলেই খিস্তি-খেউর থুতু ছিটাস বেশ্যার গায়।’
‘চুপ শালি চিল্লাস ক্যান এক হাজার দিমু যাবি কিনা বল।’
বলতেই চারদিক থেকে সুমনকে ঘিরে ধরে রাতের অপ্সরীরা চেচিয়ে বলে, ‘দিনের বেলা সাধু, বড় বড় বুলি আওড়াও আন্ধার রাইতে চুপি চুপি খানকি মাগির শরীর তোগাও? তোরা ধর শালারে, ধর।’

তারপর আর কিছুই মনে নেই সুমনেরসকালে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙে চোখ মেলে তাকাতেই সুন্দরী সেবিকা দাঁড়িয়েআমি এখন কোথায়?’
আপনি হাসপাতালে রাস্তা থেকে তুলে এনে কারা যেন রেখে গেছেন আত্মীয়-স্বজন থাকলে খবর দিন।’
সুমন আসহায় চোখে সেবিকার দিকে তাকিয়ে থাকে
এই নিন, এ ওষুধগুলো আনতে হবে।’
সুমন সম্ভিত ফিরে পায়।

হাতের ঘড়ি, আংটি, পকেটে মানিব্যাগ, মুঠোফোন কিছুই নেই। তিন হাজারেরও বেশি লোকসান হয়ে গেল। ব্যথাটাও চিনচিন করে বেড়ে উঠছে।

মালিবাগ মোড়, ঢাকা।
আলাপ: ০১৭২৫৪৩০৭৬৩

:: মাউছ্যা ভূত ::


সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
রাত জেগে মাছ ধরার কারণে সবাই মোতালেবকে ‘মাউছ্যা ভূত’ বলে ডাকে।তাতে তার কিছু যায় আসে  না। সারাদিন রাজ্যের খাটাখাটুনির পরও রাতে মাছ ধরাই তার শখ।

প্রতিরাতে খেয়ে-দেয়ে খ্যাপ জাল আর একটা পাতিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে মোতালেব। গ্রামে রাত বলতে আটটাই অনেক রাত। উড়ার চর গ্রামে তখনো বিদ্যুৎ আসেনি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে তেলের বাতি বা হারিকেন নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে সবাই। শুধু শুধু তেল পুড়বে কেন? দু’চারটা ঘরে যারা পড়াশুনা করে তারা বড়জোর রাত ১০টা পর্যন্ত সজাগ থাকে। এছাড়া সবকিছু নিশ্চুপ নিঝুম। যেন এক ভুতুড়ে গ্রাম।

রাতে বের হলে গা-টা একটু ছমছম করে। ঘর থেকে আড়িয়াল খাঁ নদ বেশি দুরে নয়। তবে একটা চর পার হতে হয়। একসময় আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে উড়ার চরের প্রায় অর্ধেকটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তারপর নাকি বাহাদুরপুরের পীর সাহেবেদের তাবিজ পড়ায় নদী ভাঙন রোধ হয়। কিছুদিন পরে এ চর জাগে।

চরে এখন কয়েকটা বাড়ি-ঘর হয়েছে। বান্দা গ্রাম যাদের জায়গা-জমি কম, তারা চরে গিয়ে বাড়ি করেছে।তাদের বেশির ভাগই মৎস্যজীবী। নদীকেন্দ্রীক তাদের জীবন। মোতালেব বান্দা গ্রামে থেকেও মাছের নেশায় বুদ হয়ে থাকে। মাছ ধরতে তার কোনো সঙ্গী লাগে না। একাই যায়, একাই মাছ ধরে, একাই বাড়ি ফেরে। কাউকে সাথে নিলে আবার ভাগ দিতে হবে। কেনো দিন পাতিল ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরে। যেদিন মাছ কম পায় সেদিন ভোর হয়ে যায়। বাড়ি ফেরার নামগন্ধ থাকে না। বাড়ি এলে বাবা-মার বকুনি শুনতে হয়। বাবা বলে, ‘অ্যাতো ডাঙ্গর অইছে তাও বোধ-বুদ্ধি নাই।’ মোতালেবের তাতে কী আসে যায়? মাছ রেখে পুকুরে যায় গোসল করতে। গোসল করে এসে যা পায়- তাই খেয়ে নেয়।

সকালে ওয়াজেদ বেপারীর দোকানের সামনে মাছগুলো নিয়ে বসে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। কী আনন্দ মোতালেবের। পকেট ভর্তি টাকা। অর্ধেক বাবাকে দিয়ে বাকিটা নিজের ব্যাংকে জমা রাখে। ব্যাংক বলতে বছর দুয়েক আগে বড় ফাইলের একটি বাঁশ কেটে একটা ব্যাংক বানিয়েছে। বাঁশের এক গিট থেকে অন্য গিট পর্যন্ত রেখে উপরে একটা ফুটা করে নিয়েছে। কত টাকা জমা হয়েছে আজও জানে না সে। কেবল রেখেই যাচ্ছে।

মাছ ধরা টাকা নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার। এখনো বিয়ে করেনি। বিয়ে করতে হলে টাকা জমাতে হবে। তাই জমায়। কয়েকটা মেয়ে ইতিমধ্যে দেখেছে। কিন্তু মনমতো হচ্ছে না। দেখুক না আরো। পছন্দসই হলে বিয়েটা করে ফেলবে।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে ভাবতে হিজল গাছটার কাছে এসে থমকে দাঁড়ায় মোতালেব। হঠাৎ একটা দমকা বাতাস লাগে গায়। শরীরের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। শরীরের মধ্যে শিরশির করে ওঠে। এদিক-ওদিক তাকায়। না, কিছুই না। তবে গা ছমছম করছে কেন? লুঙ্গির গাটে বাঁধা প্যাকেট থেকে একটা চাঁন বিড়ি বের করে ধরায়। আগুন দেখলে ভুত-পেত্নী কাছে আসার সাহস পায় না। হিজল গাছের ঝোপের মধ্যে খছখছ শব্দ হয়। কিছু একটা উড়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায়। মনে মনে ভাবে, ধুত্তরি, কোন পাখি-টাখি অইবো হয়তো।খালি খালি ভয় পাইতাছি ক্যান?

সামনের দিকে এগিয়ে যায় মোতালেব। কিছুদূর যেতেই মনে হয় পেছনে পেছনে কেউ হেঁটে আসছে। পেছনে তাকালে কিছুই দেখা যায় না। ভাবে, পায়ের আওয়াজ আসে কোত্থেকে? কোনো উৎস খুঁজে পায় না। তবুও ভয়ে গা শিউরে ওঠে। গা ছমছম করে। মনে মনে একটু সাহসও পায়। সাথে লোহা থাকলে ভুত-পেত্নী আসে না। লোহাতো আছেই। কাধে ঝোলানো জালটাকে জোরে ঝাকি দেয়। জালের সঙ্গে থাকা লোহার কাঠিগুলো ঝনঝন শব্দে বেজে ওঠে। একবুক সাহস নিয়ে এগিয়ে যায় নদীর দিকে।

নদীর পাড়ে গিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে জালটা ঠিক করে নদীর জলে খ্যাও মারে। দুহাতে টেনে তোলে। হঠাৎ পিছনে শো শো বাতাস। পাট-মেস্তা গাছগুলো বাতাসে হেলে পড়ে। পেছনে তাকাতেই সব স্বাভাবিক। আবারও একটু ভয় দানা বাঁধে মনে। জাল ততক্ষণে উপরে উঠে আসে।

আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। তারা জ্বলে মিটিমিটি। আলো-আঁধারির খেলা। হালকা আলোয় সাদা সাদা ছোট-বড় মাছগুলো চিকচিক করছে। মাছ পাওয়ায় আনন্দে মোতালেবের চোখও চিকচিক করে ওঠে। জাল থেকে মাছগুলো ছাড়িয়ে পাতিলে রাখে। মাছ পাওয়ার আনন্দে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মন থেকে ভয় নামক দানবটি সরে যায়। এগিয়ে যায় নদীর বাঁকে। যে বাঁকটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে সূর্যমনির দিকে। রাত বলেই ট্রলার চলাচল বন্ধ। একটু দূরে ছোট ছোট নৌকায় মিটমিট করে জ্বলছে আলো। যার নৌকা আছে- সে নৌকায় বসে মাছ ধরে।

নদীর বাঁকে গিয়ে পাতিলটা মাটিতে রেখে আরেকটা খ্যাও মারে। একটু দম ধরে। জালটা পানির নিচে মাটি অবধি পৌঁছে থিতু হওয়ার সুযোগ দেয়। লুঙ্গির কোচর থেকে একটা চাঁন বিড়ি বের করে ধরিয়ে ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে টানতে থাকে। শুরু হয় জাল ওপরে তোলার পালা। জালটা মনে হলো হালকা। খুব সহজেই উঠে আসে। দুএকটা পুটি ও ট্যাংরা লেপ্টে আছে। একটা পুটি মাছ খুলে পাতিলে রাখতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া। একি? পাতিল শূন্য। মাছ গেলো কোথায়? ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। হাত-পা কাঁপতে থাকে।ভূতেরা মাছ খায়। পুরুষ হলে তাকে ‘মাউছ্যা ভূত’ আর স্ত্রী হলে ‘মাউছ্যা পেত্নী’ বলে। মোতালেব নিশ্চিত। এ তবে ভূতের কারবার। আজ তাহলে রক্ষা নাই।

ভয় আর উৎকণ্ঠায় দম খিঁচে বিড়ি টানতে থাকে মোতালেব। অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকায়। কোনো জনমানবের সাড়াশব্দ নাই। হঠাৎ মনে পড়ে মোতালেবের দাদা ইব্রাহীম বেপারি ভূতের গল্প বলতেন। তখন সেগুলোকে গল্প মনে হলেও এখন বাস্তব ভূতের খপ্পড়ে পড়েছে সে। বাড়ির পিছনে থেকেই তার পিছু নিয়েছে ভূত। বুঝতে বাকি নেই। বাড়ির পিছনে শিমুল গাছের সাথে আব্দুর রহিম শিকদার ভূত বেঁধে রেখেছিলেন। একথা তাহলে সত্যি। রহিম শিকদার বেঁচে নেই। তাই হয়তো ভূতগুলো মুক্তি পেয়েছে। 

ওয়াজেদ বেপারির দোকানের সামনে বসে একদিন শুনেছিলো- একবার নাকি মাছ ধরতে গিয়ে ভূতের সাথে ধস্তাধস্তি হয়েছে বশার রাঢ়ির। সেকি মারামারি। সারারাত কুস্তি। বশার রাঢ়িও কম না। পিছু না হটে ভূতের সাথে মারামারি জুড়ে দিলেন।প্রথমে নাকি বিশাল ষাড়ের মতো ছুটে আসলো। বশার রাঢ়ি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে শিং দুটো ধরে হ্যাচকা টানে কাৎ করে ফেললেন ষাড়টাকে। গৎ করে একটা শব্দ হলো-তারপর উধাও।

হঠাৎ পেছনে ম্যাও ম্যাও শব্দে ডেকে উঠলো একটা কালো বিড়াল। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। তেড়ে আসছে কামড়াতে। বশার রাঢ়ির পায়ে প্লাস্টিকের জুতো। সজোরে লাথি মারলেন। বিড়ালটা ছিটকে পড়লো দূরে। বিড়ালের আর অস্তিত্ব নেই। যেই বাড়ির পথে পা বাড়াবেন অমনি সামনে ফোঁস করে উঠলো একটা সাপ। দৌড়ে পালাচ্ছেন, সাপও পেছন পেছন ছুটছে। দৌড়াতে দৌড়াতে পেয়ে যান কাফলা গাছের ডাল। ভেঙে দাঁড়ান। সাপ কাছে চলে আসে। বশারের নিশানা ভুল হয় না। এক আঘাতে কাৎ। তবু ফণা তুলে আসতে চায়। সপাৎ সপাৎ কয়েক ঘা মরে অর্ধেকটা নরম মাটির মধ্যে পুতে ফেলেন। তবে মজার বিষয় হলো- সকাল বেলা খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেলো সেখানে মরা সাপের কোনো চিহ্ন নেই। পড়ে আছে একটা মরা কাক। মোতালেব জানে, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়।

মোতালেব মনে মনে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করে। জালটা শক্ত করে হাতের মুঠোয় ধরে। এটুকু সাহস তার আছে। লোহার কাঠি সমেত জাল যতক্ষণ তার হাতে থাকবে ততক্ষণ ভূত-পেত্নী কাছে ঘেঁষতে পারবে না। দূর থেকে শুধু ভয় দেখাবে। শত সাহসের মধ্যেও বুকটা কেমন ধুকধুক করে। পেছনে কিছু একটা ভাঙার শব্দ হয়। তাকিয়ে দেখে পিছনের পাটখেত ভেঙে তছনছ করছে কালো রঙের একটা ষাঁড়।
মোতালেবের বুঝতে বাকি নেই- গল্পই এবার সত্যি হলো। এই রাতে একা নদীর ঘাটে। চিৎকার করারও প্রবৃত্তি হয় না। কেইবা শুনবে তার চিৎকার। ভূত আজ সহজেই তার পিছু ছাড়বে না। গলায় বাঁধা তাবিজটা একবার দেখে নেয়। সঙ্গেই আছে। তাবিজে একটা চুমু খায়। তাবিজটা খাদেম আলী শিকদার তাকে দিয়েছিলো। রাত বিরাতে চলাচলের জন্য। তাবিজেও আজ কাজ হচ্ছে না দেখে বিস্মিত মোতালেব। তাবিজের কার্যক্ষমতা কি শেষ হয়ে গেলো? নাকি ‘ছুইৎ’ লেগেছে? বাড়ি গিয়ে সোনা-রূপার পানি দিয়ে ধুয়ে নিবে। কিন্তু সেটা তো পরে। এখনতো রক্ষা পেতে হবে।

ভাঙচুরের শব্দ শেষ। ষাঁড়ও উধাও। পাটখেত আগের মতোই গোছালো। কোনো আলামত নেই। কাউকে বললেও বিশ্বাস করবে না। এমন সময় নারী কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ আসে। ডান দিকে তাকিয়ে অবাক। নদীর পাড়ে পা ছড়িয়ে বসে এক তরুণী কাঁদছে। চাঁদের আলোয় তার ঔজ্জ্বল্য মোতালেবকে হতবাক করে দেয়। মুহূর্তেই অন্য রকম ভালো লাগা অনুভূত হয়। মেয়েটি কাঁদছে কেন? এতরাতেই বা কোত্থেকে এলো? মেয়েটির জন্য মায়া হয়। এগিয়ে যায় মেয়েটির দিকে।

মোতালেব যতটুকু আগায় মেয়েটি ততটুকু দূরে সরে যায়। এভাবে ১০ মিনিট আগানোর পর মেয়েটি দাঁড়ায়। মোতালেব মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিকট হাসিতে মাঠ কাপিয়ে তোলে মেয়েটি। চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে আগুনের ফুলকি। মোতালেব মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখে মেয়েটি নেই। মোতালেব আস্তে আস্তে ঢলে পড়ে মাটিতে।

তখন ভোরের আলো ফুটেছে। নদীর পাড়ে যারা নৌকা ভিড়িয়েছে তাদের ভিড় এখন মোতালেবকে ঘিরে। মোতালেব চোখ তুলে তাকায়। তাকে ঘিরে আছে গ্রামের মানুষ। কিছুটা অবাক হয়। কিছুই মনে পড়ে না তার। কোথায় জাল আর পাতিল ফেলে এসেছে বলতে পারে না। কেউ একজন নদীর কিনারা থেকে কুড়িয়ে আনে। মোতালেবের বাড়ির লোকজন এসে তাকে ধরে নিয়ে যায়। সোনা-রূপার পানি দিয়ে গোসল করায়। ফকির-কবিরাজ ডেকে আনে। ফকির বাবা বলেছে, ‘তাক্কুর তুক্কুর, তাকে বলে দিও। সে বাঁচবে কি বাঁচবে না। শক্ত সামর্থ ছোকড়া, তাকে রূপবতীর হাতে পানি পান করাও।’ যার সারমর্ম- ছেলেকে বাঁচাতে হলে শিগগিরই বিয়ে দাও। 

এবার জোরেশোরে চলছে মেয়ে খোঁজা। পাশের ভবানী শংকর গ্রামে এক মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেলো। মোতালেবকে সাথে নিয়ে চলল তার বাপ-চাচারা। নাস্তা-পানি খাওয়ার পর মেয়েকে আনা হলো সামনে। শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের মেয়েটির মুখখানা একনজর দেখানোর জন্য ভাবি জাতীয় কেউ মুখের ঘোমটাখানা সরালো। মোতালেব একনজর তাকিয়েই চিৎকার করে উঠলো। চোখ বড় বড় করে বলল, ‘না, এইডাতো সেই মাইয়া। রাইতে যারে দেখছিলাম।’ বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে। মোতালেবকে ধরার জন্য পেছন পেছন ছোটে কয়েকজন। মোতালেবকে ছোঁয়ামাত্রই অজ্ঞান হয়ে যায়। 

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
বিজয় নগর, ঢাকা।
০১৭২৫৪৩০৭৬৩

সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৩

ভাব ও অভাবের তাড়নায় আমি লিখি

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::
মাদারীপুরের প্রথম শ্রেণির আলোচিত ‘সাপ্তাহিক আনন্দবাংলা’য় নিয়মিত লিখতে গিয়ে অনেক প্রশংসা পেয়েছি আবার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। মাদারীপুরের যৌনকর্মীদের ওপর লেখার জন্য পত্রিকার প্রকাশক শহীদুল কবির খোকন, সম্পাদক ইয়াকুব খান শিশির ও প্রধান সম্পাদক সুবল বিশ্বাস বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি সম্পাদকের ছাত্র বা শিষ্য। তার দয়ায় লেখার অনুমতি পাই। তাই পাঠকের মনোরঞ্জনের জন্য লিখি। মূলত অন্যরা যা নিয়ে মাথা ঘামায় না আমি তা নিয়েই উঠে-পড়ে লাগি।
কেন লিখি? এমন প্রশ্ন করলে বলব, ভালো লাগে তাই। এছাড়া আমি চাঁপা স্বভাবের মানুষ। সব কথা বলতে পারিনা তাই লিখে প্রকাশ করি। ভালো লাগা থেকে শুরু হলেও এখন তা ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে। আর ভালোবাসার প্রতি একটা দায়িত্ববোধ এসে যায়। মূলতো আমি আশাবাদী ও স্বপ্নবিলাসী। তবে আমার কোন উচ্চাশা নেই। আমার আশাবাদ ও স্বপ্নবিলাসই আমাকে লেখক হতে উৎসাহ যুগিয়েছে। লেখকের মাঠে আমি কচ্ছপগতীর একজন প্রতিযোগী। অনেকের চেয়ে অনেক পেছনে। তাই বলে আমি থেমে নেই। লিখছি এবং লিখব। এটাই আমার দৃঢ় প্রত্যয়।
সেই তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন একটা গল্প লিখেছিলাম। লিখে লুকিয়ে রাখলাম। তবুও তা পরিবারের কর্তাব্যাক্তিদের হাতে পৌঁছে গেল। স্কুল থেকে ফিরে দেখি সবাই আমাকে দেখে মুচকি হাসছে। মা জানালেন আসল ঘটনা। আমি লজ্জা পেলাম। আমার লেখালেখির পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান আমার মরহুম নানাজান মাওলানা আফসার উদ্দিনের। ছোটবেলায় নানার কাছে থাকতাম। নানা রাত জেগে কী সব বই পড়তেন। আমিও পড়তে শুরু করি।
কবি-লেখকদের জীবনী আমাকে বেশি আকৃষ্ট করে। নিজেও লিখতে চেষ্টা করি। সে সময়ের লেখাগুলো এখন আমার কাছে নেই। থাকলে হয়তো নিজেই লজ্জা পেতাম। এখনো খুব ভালো লিখি কি না জানিনা। তবে প্রতি সপ্তাহে দু’একটা লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাঁপা হয়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন পাঠ্য বইয়ের একটা কবিতাকে নকল করে একটা কবিতা লিখেছিলাম। আমার মামা মাওলানা মেজবাহ উদ্দিন সেটা দেখে বললেন,‘অন্যেরটা নকল করে কেন? নিজে লেখার চেষ্টা করো।’ তবে একটা বিষয় লক্ষণীয়। আমার নানা-মামা দু’জনেই ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও সাহিত্যকে সমাদর করতেন। নিজেরাও প্রচুর পড়তেন।
এক বালিকার প্রেমে পড়ে ডজনখানেক প্রেমের কবিতা লিখলাম। বন্ধুরা কবিতা ধার নিত। কাউকে আবার প্রেমপত্র লিখে দিতাম। নিজেও একটা প্রেমপত্র লিখে বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম। ‘প্রিয় নদী, নদ যেমন নদীর কাছে ছুটে যায়। আমিও তেমন তোমার কাছে ছুটে যাই।’ এটা নিয়ে বকুনি খেতে হয়েছে। যদিও পত্রটা পাত্রীর কাছে পৌঁছানোর আগেই বড়ভাই মোসলেহ উদ্দিনের হাতে পড়ে। মূলত কবি বলেই ভেতরে একটা প্রেমিক প্রেমিক ভাব চলে আসে। এই ভাব থেকেই লেখক হওয়ার বাসনা আরো তীব্র হয়।
অভাব একটা মূল কারণ। দাদার মৃত্যু ও নদী ভাঙন আমাদের অভাবের মুখে ফেলে। টেনেটুনে সংসার চলছে। কোন আবদারই বাবা পূরণ করতে পারেন নি। অভাবের কারণেই নানা বাড়ি থাকতে হয়েছে আমাকে। এক কথায়, ভাব আর অভাবের সংমিশ্রণে কবিসত্ত্বা জেগে উঠেছে।
এখন ভাব আছে অভাব নেই। তবুও মাঝে মাঝে নিজেকে শূন্য মনে হয়। কখনোই মানুষের জীবনে পূর্ণতা আসে না। কিছু না কিছুর অভাব থেকে যায়। বা লেখক-কবির অন্তরে অভাব থাকতে হয়। সেটা হতে পারে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অভাব। এসএসসি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে লেখার ভাবটা তীব্র হয়ে ওঠে। আমার মেজভাই নুরুদ্দিন আহমেদ বিষয়টি ভালোভাবে নেননি। রাতে ঘুমুতে গেলে তিনি বকতে থাকেন। ‘রবীন্দ্রনাথ-নজরুল হবা। লেখা-পড়া নাই। সারাদিন কবিতা’ বলে চেঁচিয়ে উঠলেন। আমি চুপ। কথার জবাব দিলেন বড়ভাই। ‘লিখুক না। সমস্যা কী লিখলে। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলতো একদিনেই বিখ্যাত হননি।’ আমি মনে মনে আন্দোলিত হই। উৎসাহ পাই। যা হোক অন্তত একজন আমার পাশে আছে। পরীক্ষার রাতেও কবিতা লিখেছি। অনেক টেনশন হলে কবিতা লিখতে ইচ্ছে হয়।
এইচএসসি পড়ার সময় একটা টানাপড়েনের মধ্যে পড়ে যাই। সবাই ধরে নিয়েছিল- আমাকে দ্বারা লেখা-পড়া হবে না। অবস্থাটাও তেমন। ভর্তি হয়ে ক্লাসে যাইনা। ঢাকা থেকে চলে আসি গ্রামের বাড়ি। উপন্যাস লিখতে শুরু করি। দু’তিনটা লিখেও ফেলি। কিভাবে ছাঁপানো যায়? চিন্তাটা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। উপায় খুঁজে পাইনা। বাংলাবাজারের অনেক প্রকাশনীর সাথে যোগাযোগ করি। তাতে টাকার প্রয়োজন। ফিরে আসি। তবুও থেমে নেই। লিখে যাই প্রতিনিয়ত। আমার কবিতার খাতার কিছু পাঠক তৈরি হয়। তারা পড়ে উৎসাহ দেন। ভালো লাগে। পোশাক-আশাক, চলা-ফেরায় পরিবর্তন আসে। চটের ব্যাগ কিনি। পাঞ্জাবী-পাজামা পড়ি। সবাই ‘কবি’ বলে ডাকে। শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা অপূর্ণতা থেকেই যায়। একটা লেখাও প্রকাশ হলোনা।
লেখা প্রথম প্রকাশ হয় খালাতো ভাই লুৎফর রহমানের সাহায্যে। ২০০৩ সালে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকায়। ছাপার হরফে আমার কবিতা দেখে সেদিন যে আনন্দ পেয়েছিলাম। তা আজ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সম্মান শ্রেণিতে পড়তে এসে শ্রদ্ধেয় স্যার ইয়াকুব খান শিশিরের সান্নিধ্যে লেখালেখির তাড়নায় যুক্ত হয়ে যাই মফস্বল সাংবাদিকতায়। সংবাদের পাশাপাশি লেখালেখির একটা প্লাটফর্ম পেয়ে যাই। কলেজের নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে গল্পলেখা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম গল্পেই বিশেষ পুরস্কার পেয়ে গেলাম। পুরস্কারের সুবাদে জেলা শহর থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিশ্লেষণ’ ও ‘সাপ্তাহিক আনন্দবাংলা’য় লেখার জন্য অনুমতি পেলাম। ২০০৮ সালে দৈনিক দেশবাংলার সাহিত্য পাতায় কবিতা ছাপা হলো। এরপর থেমে থাকতে হয়নি। জেলার গন্ডি পেরিয়ে জাতীয় দৈনিকসহ সাহিত্যের ছোটকাগজে লেখালেখি শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লেখা আহ্বান করে। খুলনা, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, নীলফামারি, জামালপুর, হাতিয়া, আগৈলঝাড়াসহ বিভিন্ন শহর থেকে আমার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। সর্বোপরি দেশের বাইরে ভারতের কোলকাতার ‘কারক’ সাহিত্য পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হওয়ার আনন্দে এখনো চোখের কোণে চিকচিক করছে জল। আর এ লেখাটা মূলত সম্পাদকের নির্দেশে। নির্দেশ বলবো একারণেই যে, আমার কাছে লেখা চেয়ে অনুরোধ করার মতো ক্ষুদ্র মানুষ তিনি নন। বরং আমার মতো ক্ষুদ্র লেখককে লেখার জন্য বরং নির্দেশ করা যায়।
কেন লিখি? এমন প্রশ্নের জবাবে এতক্ষণ নিজের ঢোল নিজে পেটালাম। আমার ঢোল আমি পেটালে অন্যরা পিটাবে কী? আমি শুধু বলবো- মনের তাগিদেই লিখছি। লেখাটা একটা নেশায় পরিণত হয়েছে। মাঝে মাঝে মন থেকে যখন ভাব ও অভাব দূর হয়ে যায়; তখন কিছুই লিখতে পারিনা। চেষ্টা করেও পারি না। সে সময় অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগি। মনে হয় আমি আমার লেখক সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলেছি। নিজেকে অসহায় মনে হয়। ভাবের জন্য বিরহের দরকার। অভাবের জন্য ঔদাসিন্য দরকার। তখন দু’টাকেই অর্জনের চেষ্টা করি।
‘প্রেমের পরশে প্রত্যেকেই কবি হয়ে ওঠে’ কিংবা কবিতার জন্য কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। আমি প্রেমে পড়ি। কিন্তু আগলে রাখতে পারিনা। সঙ্গত কারণেই বিরহ অবধারিত। তখনই প্রত্যেকটি কথা হয়ে ওঠে একটি কবিতা বা গল্প। সাম্প্রতিক সমস্যাগুলো যখন নাড়া দিয়ে ওঠে- হয়ে যাই বিদ্রোহী। আত্মার প্রশান্তির জন্য রচনা করি নাটক। এবং তাতে নিজেই অভিনয় করি।
লেখালেখি করি ঠিক কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়েনা। মফস্বল শহরে থাকি বলে লেখার জন্য কোন পারিশ্রমিক জোটেনা। ফলে বাধ্য হয়ে অন্য কাজও করতে হয়। কিন্তু কোন কাজই আমার জন্য স্থায়ী হয়না। কবিতার কারখানায় যেমন শ্রমিক- জীবিকার তাগিদেও শ্রমিক হতে হয়। এখনো পরিবারের গঞ্জনা রয়েছে। রয়েছে প্রিয়তমার তিরস্কার। ‘কিছু একটা করো’র তাগাদা। আমিতো কিছু একটা করছি। কিন্তু তাতে অর্থ নেই। আর সবাইতো অর্থই চায়। তবে আমি বিশ্বাস করি, অর্থ ও খ্যাতি একসাথে আসেনা। লেখালেখির ক্ষেত্রে অর্থ আশা করাটাও অরণ্যে রোদন মাত্র। দেশে হূমায়ুন আহমেদ আর ক’জন?
এবার মূল কথায় আসি। বাংলা সাহিত্যে প্রেম রোমান্স এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবিতা লিখতে গিয়ে কবিকে প্রেমে পড়তে হয়। অথবা প্রেমে পড়ে তাকে কবিতা লিখতে হয়। দু’টাই চিরন্তন সত্য। কবি মনে প্রেম জাগ্রত না হলে কবিতা হয় না। সাহিত্যচর্চার জন্য প্রেম অনিবার্য। আর সে চর্চাকে অব্যাহত রাখতে হলে বেছে নিতে হয় বিরহকে। কারণ মিলনের চেয়ে বিরহ কবিকে নতুন স্বপ্ন দেখায়। নব সৃষ্টির উন্মাদনা জাগ্রত করে। কবিতার সাথে যেন প্রেমের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। লোকে বলে- কবি মানেই প্রেমিক। আর প্রেমিক মানেই কবি। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর যিনি জীবনে অন্তত এক লাইন প্রেমের কবিতা বা ছন্দ রচনা করেন নি। সবার জীবনে একবার প্রেম আসে- কথাটা যেমন সত্য; ঠিক তেমনি জীবনে অন্তত একবার কাব্য রচনা বা সাধনা করেন নি একথাও অস্বীকার করার জো নেই। কেউ যদি মনে-প্রাণে,ধ্যানে-জ্ঞানে কবি হন তবেতো কথাই নেই। বর্তমানে যারা খ্যাতনামা কবি বা যারা প্রতিষ্ঠার জন্য কাব্যচর্চা করছেন প্রত্যেকেই হয়তো প্রথম জীবনে কোন বালিকার উদ্দ্যেশ্যে প্রেমকাব্য রচনার মাধ্যমে আবির্ভূত হয়েছেন।
পড়নে পাঞ্জাবী-পায়জামা আর পায়ে চটি জুতো পড়ে কাধে একটা চটের ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে প্রথম দর্শনেই সবাই তাকে কবি বা লেখক ভাববেন। ভাবাটাই স্বাভাবিক। বেশ-ভূষায় কবি বা লেখক হলেই কী প্রকৃত লেখক হওয়া যায়? যায় না। লেখকের প্রাণশক্তি তার লেখনী। লেখনীর মাধ্যমেই সে পাঠক মহলে কবিখ্যাতি বা লেখক হিসাবে পরিচিতি লাভ করবেন। আসলে লেখক হওয়ার উপায় কী? শুধু কি কালি-কলম-মন দিয়েই লেখা যায়? নাকি আরও কিছু দরকার হয়? আপনারা যারা লেখক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর, তারা নিশ্চয় এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজছেন।
খালাতো ভাই মহিউদ্দিনের দেখাদেখি লেখালেখি করার সাধ জাগে। তার কন্ঠে আবৃত্তি শুনতাম। সুনীলের ‘কেউ কথা রাখেনি’ বহুবার শুনেছি। তার লেখা একাধিক কবিতাও পড়েছি। তার স্টাইল আমাকে আকৃষ্ট করে। তাকে অনুসরণ করতে শুরু করি। কিন্তু আজ তিনি লেখালেখি জগতে নেই। পারিবারিক সংঘাতে বিপর্যস্ত এক দিকহারা নাবিক। জীবন-জীবিকার সন্ধানে তার কবি প্রতিভা আজ বিলুপ্ত এক ঐতিহ্য। আমি কিন্তু থেমে যাইনি। হেরে যেতে চাইনি বা হেরে যাইনি। আমি এর শেষ দেখবো। লেখালেখির প্রসঙ্গ এলে খুব বেশি মনে পড়ে নানাজান, মামা, বড়ভাই, মেজভাই, বড়দা, শিশির স্যার, ঢাকার কবি মুনশী মোহাম্মদ উবাইদুল্লাহ, জামালপুরের কবি ও রচয়িতা সম্পাদক আরিফুল ইসলাম ও হারিয়ে যাওয়া কবি সেজভাইকে। আমার পিছনে তারা প্রত্যেকেই অনুপ্রেরণা। আমার মাথার ওপরে তারা বটবৃক্ষের ছায়া।
বিশেষ করে আমার বাবা আমার একনিষ্ঠ পাঠক। আমার শুভাকাঙ্খি। তিনি আমাকে ব্যাপক উৎসাহ দেন। যদিও একসময় বিরোধিতা করতেন। কারণ তাকে বোঝানো হয়েছিল- বাংলায় পড়ে ছেলেটা উচ্ছন্নে যাবে। চটের ব্যাগ নিয়ে ঘুরবে। বিশ্রী অর্থে- দাঁড়িয়ে প্রসাব করবে। ঢিলা-কুলুখ ব্যবহার করবেনা। আজ ভুলে গেছি সে সব কথা। বরং সে সমস্ত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা আরো বেড়ে যায়। কারণ তাদের তিরস্কারের কারণেই আজ আমি অনেক পুরস্কার পাচ্ছি। অনেক ভালোবাসা পাচ্ছি।
লেখা-লেখিটা প্রধানত সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত এক ক্ষমতা। ইচ্ছে করলেই লেখক হওয়া যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য ও অধ্যবসায়। ত্যাগের মানসিকতা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। সর্বোপরি লিখতে হলে পড়তে হবে। বিশিষ্ট কবি-লেখকরা অবশ্য একথার সাথে একমত যে, ‘এক লাইন লিখতে হলে দশ লাইন পড়তে হবে।’ পড়ার বা জানার কোন বিকল্প নেই। তথ্য বা শব্দ ভান্ডার হতে হবে সমৃদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থাক বা না থাক তাতে কিছু যায় আসে না। সামাজিক, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা একান্ত আবশ্যক। এছাড়া লিখতে গেলে অগ্রজ কাউকে না কাউকে অনুসরণ করতে হয়। অনেকেই অনেক কবি-লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এক্ষেত্রে লেখকের কল্পনা শক্তি হতে হবে প্রখর। লেখকের ‘তৃতীয় নয়ন’ বলে একটা বিষয় আছে। যা আর দশজন সাধারণ মানুষের নেই। কবি ও অকবিদের মধ্যে মূল পার্থক্য এখানেই। সাধারণ মানুষ যে জিনিসটি সাধারণ ভাবে দেখে; একজন অসাধারাণ মানুষ সেটাকে অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে। একজন লেখকের দর্শন বা দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে আলাদা হতে হয়।
জানি না আমি তেমন হতে পেরেছি কি না? হওয়ার চেষ্টা করছি। আমি যদি ভালো লেখক নাও হতে পারি তবুও আমার অনুরোধ-আপনারা এগিয়ে আসুন। প্রত্যেকটি সমাজে অন্তত একজন করে লেখক থাকা দরকার। যদি বলেন কিভাবে সম্ভব। পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সবকিছুর মূলে চেষ্টা। সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা যায়। নিন্দুকের নিন্দা, মানুষের কটাক্ষ, সমাজের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করেই এ সাধনা চালিয়ে যেতে হয়। দস্যু রতœাকর তপস্যা করে যদি বাল্মিকী হতে পারেন। আপনি কেন পারবেন না। রামায়ণ না হোক একটা নিটোল হাসির গল্পতো লিখে যান। তা পড়ে যদি অন্তত একজনের মুখে হাসি ফোটে তাতেই আপনার সার্থকতা। এবার বলি বিখ্যাত জনেরা লেখক হওয়ার ব্যাপারে কী পরামর্শ দেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করতেন, যদি আজকের দিনই হয় আমার জীবনের শেষ দিন, তাহলে আমার কোন কাজটি সবার আগে করা উচিত? একজন লেখকও এ রকমভাবে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেন শব্দে শব্দে কী লিখতে চান তিনি, কীভাবে লিখতে চান, কী কথাই বা বলতে চান? অমর একুশে বইমেলার বই-গন্ধ গায়ে মেখে তোমরা যারা লেখক হওয়ার পথ খুঁজছ, যারা স্বপ্ন দেখছ ভবিষ্যতের লেখক হওয়ার, তারা তো জানোই শব্দে শব্দে মিল- অমিল দিয়ে লেখক হওয়া এত সহজ কর্ম নয়। এর জন্যও লাগে দীর্ঘ প্রস্তুতি, পড়াশোনা। তোমাদের জন্য দেশের তিন খ্যাতিমান লেখক এবার জানাচ্ছেন কেন লেখক হলেন তাঁরা, কীভাবে লেখক হলেন। অভিজ্ঞতার আদ্যপান্ত।
লেখক হওয়ার উপায় সম্পর্কে প্রখ্যাত সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক বলেছেন- লিখতে হলে পড়তে হবে। তরুণ লেখকদের প্রতি প্রথমত এটিই আমার বলার কথা। মনে রাখতে হবে, লেখকের পথ বড়ই বিপদসঙ্কুল। এটা সম্পূর্ণ একার পথ। কঠিন এক সাধনা। কোনো লেখকের পক্ষে কি বলা সম্ভব, তিনি কেন লেখক হয়েছেন? মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, লেখক না হয়ে উপায় ছিল না বলেই শেষ পর্যন্ত লেখক হয়েছি। খুব ছোটবেলা থেকে কেন যে কবিতা, গল্প এসব লিখতাম, আজ সেটা স্মৃতি খুঁড়ে বের করা কঠিন। বলা যায়, যে পৃথিবীতে বেঁচে আছি সেই পৃথিবীর একটা অর্থ ও ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারি লেখার মাধ্যমে। এটি হয়তো প্রত্যেক লেখকই পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে একজন লেখকের সমাজ-রাষ্ট্র-পৃথিবী সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট একটা ধারণা থাকা জরুরি। লেখক হতে চাইলে তুমি যা কিছু করতে চাও, তার সবই তোমাকে লেখার ভেতর দিয়ে প্রতিফলিত করতে হবে। ব্যক্তিভেদে একেকজন লেখকের লেখার কৌশল একেক রকম। আমি যেমন সাধারণত একটি লেখা একবারেই লিখে ফেলি। কিন্তু লেখাটি লেখার আগে, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা থাকে বিস্তর। কীভাবে আগের লেখা থেকে নতুন লেখাকে আলাদা করা যায়। এই ভাবনাও থাকে। আমি মনে করি, প্রত্যেক লেখকই তাঁর নিজস্ব জগৎ তৈরি করে নেন একান্ত তাঁর মতো করে।
কবি মহাদেব সাহা বলেছেন, আমি কি কবি হতে পেরেছি? জানি না। মনে পড়ে, ১৯৭৬ সালে প্রেসক্লাব-সংলগ্ন ফুটপাতের ওপর বসে একটানে লিখেছিলাম ‘চিঠি দিও’ কবিতাটি। পরে সেটি প্রচণ্ড জনপ্রিয় হয়। শৈশবে আমার মা বিরাজমোহিনির মুখে রামায়ণ ও মহাভারত শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তখন মনে হতো, বাল্মীকি বা ব্যাসদেবের মতো যদি কবি হতে পারতাম!
তিনি আরো বলেছেন, একটি শব্দের জন্য বসে থেকেছি সারা রাত। জীবনানন্দ দাশ কিংবা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা পড়েছি উন্মাদের মতো। পড়েছি জন কিটস, রাইনার মারিয়া রিলকে, ডব্লিউ বি ইয়েটস। পড়তে পড়তে লিখতে লিখতে হয়তো কবি হয়ে উঠেছি আমি। আমার মনে হয়, পৃথিবীতে কবি হচ্ছে একমাত্র অবিনাশী সত্ত্বা, রাজা, সম্রাট তাঁর কাছে কিছু নয়। তাই কবি বা লেখক হতে গেলে যেমন পড়াশোনা জরুরি, তেমনি দরকার লেখকের স্বাধীন সত্ত্বা। কারও পরামর্শ নিয়ে কেউ কোনো দিন কবি হতে পারে না।
অদিতি ফাল্গুনীর বক্তব্য এরকম, যদি মেয়ে না হতাম, তাহলে আমি হয়তো কখনোই লেখক হতাম না। কথাটি খোলাসা করি, মেয়ে হওয়ার কারণে আমার পৃথিবী সঙ্কুচিত হয়েছে। সেই শৈশব উত্তীর্ণকালে আমার বয়সী বন্ধুগোত্রীয় ছেলেরা যেভাবে পৃথিবীকে দেখেছে, আমার দেখা ছিল তাঁদের থেকে ভিন্ন। শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে আমার পৃথিবী যে ছোট হয়ে এল, এই বেদনাবোধই আমাকে লেখক করে তুলেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, প্রতিকূলতা অনেক সময় আমাদের ভেতরের আগুনকে উসকে দেয়।
আমাদের বাড়িতে বড় একটি পাঠাগার ছিল। সেখানে ছিল রুশ সাহিত্যসহ নানা ধরনের বই। এ ছাড়া কলেজের গ্রন্থাগারে পড়েছি গ্রিক নাটক। এই পাঠ আমাকে পুষ্টি দিয়েছে। একসময় পাহাড়ে ওঠার খুব শখ ছিল, পারিনি। শেষমেষ দেখি, গল্প-কবিতা লিখতে লিখতে লেখকই হয়ে উঠেছি!
লেখালেখির জন্য প্রথমত ভাষাগত প্রস্তুতি থাকা খুব দরকার বলে আমার মনে হয়। আর ভাষাগত প্রস্তুতি গড়ে ওঠে মহৎ সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে। বাংলা ভাষায় লিখতে হলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়া যেমন আবশ্যক তেমনি অন্য ভাষার মহৎ সাহিত্যিকদের লেখাও পাঠ করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে আমার নানার অনুপ্রেরণায়। তিনি রাত জেগে পড়তেন। দেশি-বিদেশি সবধরণের সংগ্রহ ছিল তার। মাঝে মাঝে লিখতেন। ভালো বক্তৃতা দিতে পারতেন। তার সংস্পর্শে আমিও পড়া ও লেখার অভ্যাস গড়ে তুলি। নানা বলতেন, লিখতে লিখতে লেখক হওয়া যায়। গ্রামীণ প্রবাদের মতো- ‘হাটতে হাটতে নলা/ গাইতে গাইতে গলা।’ সর্বোপরি কথা হচ্ছে- নিরলস চেষ্টা, চর্চা ও সাধনাই একজনকে লেখক হিসাবে গড়ে তুলতে পারে।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
কবি, কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

পুরনো স্মৃতি

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::

সেই পুরনো ঘর, পুরনো বিছানা
ছেড়া মশারি, কাঁথা-কম্বল।
সেই পুরনো স্মৃতি-
সারাদিন একই অনুভূতি
আর একগাদা মুখস্থ মানুষ।
বদলায় না কিছুই-
মাঝে মাঝে বদলে যাই আমি,
তবু বারবার ফিরে ফিরে আসি
সেই পুরনোর কাছাকাছি।

কী যে এক মায়া, অশরীরী ছায়া
দূর থেকে কাছে, টানে বারবার।
চোখের পলকে, সুখের ঝলকে
বদলে গিয়েও আগের মতোই
তোমাকেই ভালোবাসি।

রাজপথে রক্ত-রক্ত খেলা

:: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ::

রাজপথে আজ রক্ত-রক্ত খেলা
আমরাই খেলোয়ারÑ
এখানে ভাইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বি ভাই।
তোমরা নীরব দর্শক কিংবা জয় নির্দেশক।

আমার উল্লাসে ভাইয়ের পরাজয়-
আমার মুখের ফুৎকারে নিভে যায়
পিতা-মাতার যাবতীয় স্বপ্নের প্রদীপ,
মুছে যায় বোনের হাতের মেহেদী-
সন্তানের চোখে উঁকি দেয় দুঃস্বপ্নের মেঘ,
আঁধারে ডুবে যায় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

তবুও, আমাদের রক্ত ঢেলেই আজ
তোমাদের ক্ষমতার মসনদ পবিত্র করি।

কালকিনি, মাদারীপুর।

সোমবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৩

রচয়িতা সম্পাদক কবি আরিফুল ইসলামের আঁকাবাঁকা পথচলা

:: এম এস আই সাগর ::
একবিংশ শতাব্দীর সূচনাতে যে সকল উদীয়মান তরুণ কবির আবির্ভাব ঘটেছে তাদের মধ্যে অন্যতম লিটলম্যাগ রচয়িতা সম্পাদক কবি আরিফুল ইসলাম। হৃদয়ের লুকায়িত আবেগ, অনুভূতি ও আত্মপ্রত্যয়টুকুই সাধারণত কবি-সাহিত্যিকরা বিভিন্ন বাচনভঙ্গি, কাব্যরস, গল্প, কবিতা, ছড়া, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন। আবার উপন্যাস, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও হতে পারে। মূলকথা সমাজে ঘটে যাওয়া প্রতিটি বাস্তব চিত্রের প্রতিচ্ছবি নিজের মত করে সাজিয়ে কবি-সাহিত্যকরা প্রকাশ করে থাকেন। তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ কবি ও ঔপন্যাসিক আরিফুল ইসলাম। বর্তমান তরুণ সমাজ যখন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন; তখন কবি ও সম্পাদক আরিফুল ইসলাম এর জীবন সৃজনশীল নেশায় ঢুলুঢুলু।
আরিফুল ইসলাম ১৯৮৩ সালের ১৫ মে জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার কিংজাল্লা নামক এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাবিবুর রহমান ও মাতা মোছাঃ ফাতেমা বেগমের পঞ্চম সন্তান তিনি। কবির শৈশব কেটেছে আঁকাবাঁকা মেঠোপথের মত। ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটে স্বভাবের এই তুখোড় কিশোরের কাছে লেখাপড়া ছিল অস্বস্তিকর। কিন্তু সাহিত্যের প্রতি তার ছিল অকৃত্রিম অনুরাগ। যার ফলশ্র“তিতে প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি না পেরোতেই ১৯৯৬ সালে দৈনিক পত্রিকাতে ‘রক্তের বিনিময়ে’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। কবিতাটির দু’টি লাইন উদ্ধৃতি না দিলেই নয়-
‘রক্তে খেয়েছে স্বাধীনতার তারছিড়াঁ বিনিময়
বাঙালি সয়েছে তারও প্রতিফলন।’
এ থেকে অনুমান করা যায়, কবি তার কবিতায় দেশপ্রেমের নিবীড় প্রেমে পাগল ছিলেন। এদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগি না হওয়ায় তার শিক্ষাজীবন বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। তবে তিনি যথেষ্ঠ মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমাপনিতে বৃত্তি অর্জন করেছিলেন। কৃতিতের সাথে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন ইসলামপুরের বিখ্যাত ইসলামপুর নেকজাহান পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। স্থানীয় কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে কবি শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন রীতিমত বাধ্য হয়েই। কিন্তু তার সাহিত্য জীবন থেমে থাকেনি। এরই মধ্যে বেরিয়ে আসে তার কলম থেকে কালজয়ী সব কবিতার পঙক্তি। তার উল্লেখ্যযোগ্য কবিতার মধ্যে ‘যা বাস্তব’,‘আমি বিদ্রোহী’,‘রক্তে বাংলাদেশ’,‘রচয়িতার কাছে খোলা চিঠি’,‘নন্দিনীর কাছে খোলা চিঠি’,‘আমি পূজারী নই’,‘কবিতায় আমি পথকলি’,‘কবিতায় আমি পথকলি-২’,‘কবি’,‘কলমের আতœকথা’,‘বিদায় অতপর বেঁচে থাকা’,‘মুক্তিযোদ্ধা বাতেন বলছি’,‘আমন্ত্রণ’,‘অধিকার চাই’,‘আমি বাঙালি’,‘স্বরসতীর প্রেম’,‘আমি হিন্দুদের অনুসারী’ প্রভৃতি।
তার কবিতায় ঢেউ খেলেছে প্রেম, প্রেমকে দিয়েছেন হাজারো রূপ। ‘নন্দিনীর কাছে খোলা চিঠি’ তার এক অনবদ্য ও জ্বলন্ত প্রমাণ-
 “চন্দ্রাণী বলেছিলো-
     পাঁচদিন পর জেল থেকে বেরিয়ে আসছি!
তোমার অপেক্ষার অবসান ঘটাতে
অন্তরের অব্যক্ত কথনগুলোকে-
উজাড়  করে দেবো তোমার তরে
নগ্ন পায়ে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ের চূড়াঁয়-
গিয়ে ঘপটি মেরে বসে থাকবো
     রাতকে সন্ধ্যার সাথে সন্ধি করে দেবো
নদীর ভরা যৌবন দেখতে দেখতে...
দু’জনে মিলে একাকার হয়ে যাবো।
         আমি পোড়ামুখে হেসে বলেছিলাম,
          ভার্সিটি কখনো কি জেলখানা হয় ?”
তিনি ধর্মের ভেদাভেদ ভাঙতে সদা অস্থির। তাই তাকে পড়তে হয়েছে অনেক বির্তকের মধ্যে। তারপরও তার কলম তাকে ছুটি দেয়নি কখনো। তার কলমের কালি তার সাথেই সুর মিলিয়ে লিখেছে বির্তকের কবিতা “আমন্ত্রণ”-
“ভেঙে ফেল তোমার অস্পষ্ট মন্দির নামের পবিত্র উপাসনালয়
যেখানে অমানুষের রাজ্যে বসবাস করে অপদার্থ, বেহায়া আর মানুষ্যরূপী কিছু শয়তান
ভগবানের নামে মাটির স্বর্গে যারা ধোয়া উড়িয়ে উড়িয়ে পাপ করেই চলেছে দিন দিন
আমি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী! কারণ আমি মানুষ রুপে জন্ম নিয়েছি কুকুরের বেশে নয়
জন্মের সাত জনম আগে আমি হয়ত সনাতন অথবা পুরোহিত ছিলাম
খ্রিস্টান হয়ত আমার প্রিয় ধর্ম ছিল অথবা বৌদ্ধ ছিলাম হয়ত”
তাকে ডাকা যেতে পারে টোকাইদের সহযোদ্ধা বলে। কারণ তিনি ব্যতিক্রমভাবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তার কবিতায় পথকলিদের। তার মন কেঁদেছে পথকলিদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে। লিপিবদ্ধ করেছেন অনেক কবিতা তাদের নিয়ে। তাই তিনি অবশ্যই আর সব কবিদের চেয়ে একটু আলাদা। একদিকে দেশ, একদিকে ধর্ম, একদিকে পথকলি। কোথায় নেই তার কলমের বিচরণ। পথকলির প্রতি তার ভালবাসা সত্যি প্রশংসনীয়। তিনি এভাবেই গেঁথে দিয়েছেন ‘কবিতায় আমি পথকলি-২’ কবিতায়-
“সমাজ বদলাতে হলে আগে আমার অধিকার দিতে হবে
দিতে হবে পথকলি ভাতা, পথকলি পেনশন, মহার্ঘ্য ভাতা-
সম্মান, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা অথবা ত্রাণের সবটুকু অধিকার
আমিও তো মুক্তিযোদ্ধা!
তোমরা দেশের জন্য একবার  যুদ্ধ করেছ; আর আমি যুদ্ধ করি প্রতিনিয়ত!।”
সমাজের অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, মারামারি, হত্যা এগুলো দেখে তিনি চুপ ছিলেন না । লিখে গেছেন প্রতিবাদী হিসেবে অনেক বিদ্রোহী কবিতা। যেমনটি তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন “আমি বিদ্রোহী” কবিতায়-
“যুদ্ধে যাবো মা, আরেক বার যুদ্ধে যাবো
৭১’ এর যুদ্ধে যারা রাজাকার, আলবদর ছিল
তাদের ধ্বংস করার যুদ্ধে
আমি আজ বিদ্রোহী
রক্তে আমার বিস্ফোরিত হচ্ছে
জ্বালা মেটানোর ইচ্ছাগুলো
আমি উন্মাদ মাগো, বড্ড উন্মাদ।”
এভাবেই লিখেছেন তিনি অনেক কবিতা। একদিকে দারিদ্রের সাথে যুদ্ধ; আরেক দিকে সাহিত্যকর্ম সত্যি আশ্চর্যজনক। তা তার লিখনিতে বুঝে নেবে যে কোন পাঠক। তার কর্ম জীবনের শুরুটা আরও চমকে দেওয়ার মত। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার কর্মজীবন শুরু। তারপর থেকেই চলছে জীবনের সাথে যুদ্ধ। তারপরও থেমে থাকেনি তার সাহিত্যকর্ম। প্রথমে বাবার হাত ধরেই কর্ম শুরু করেন। মুদির দোকানে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেন তার বাবার সাখে। তারপর তিনি পরিবারকে না জানিয়ে চলে যান চট্টগ্রাম । সেখানে জাহাজ ঘাঁটিতে কাজ করেন দুই বছর। তিনি ছিলেন জাহাজের মাল খালাসের সুপার ভাইজার। সেখানেও তিনি বেশিদিন টিকতে পারেননি। চলে আসেন ঢাকায় তার এক চাচাতো ভাইয়ের বাসায়। চাচাতো ভাইয়ের সহযোগিতায় একবছর চাকুরি করেন একটি কাপড় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে ফ্লোর ইনচার্জ হিসাবে। সেটাও বেশিদিন টেকেনি। তারপর সোজা চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। এ যেন নাড়ীর টানে ঘরে ফেরা। বাড়িতে এসে আবার চলে তার কর্মচেষ্টা। এবার চাকুরী নেন বেসরকারী ট্রেনে সুপারভাইজার পদে।  চাকরির সুবাদে তিনি ভ্রমণ করেছেন বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। আর কুড়িয়েছেন হাজারো অভিজ্ঞতা। এ থেকে প্রমাণিত হয়- কবি শুধু নিজ এলাকা নয়, সারা বাংলার সংগতি-অসংগতি সব কিছুই পাওয়া যায় তার কবিতায়। একবছর সততার সাথে চাকুরী করেন তিনি। ভালো না লাগায় আবার চলে আসেন। কর্মের স্বাদ যেন কোন ভাবেই মিটতে চায় না তার। গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকায় তিনি অল্প কিছুদিন জুতার কারখানায় চাকুরী করেন। তারপর এলাকার কোন এক শিল্পপতির সাহায্যে চলে যান চাঁদপুর। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। চাঁদপুরের বিশিষ্ট শিল্পপতি আলম খানের ম্যানেজার হিসাবে দীর্ঘদিন (প্রায় ৪ বছর) চাকুরী করেন। এরপর ২০১০ সালের দিকে নিজগ্রামে ফিরে আসেন মালিককে না বলে। তারপরই তার জীবনের একাকী পথ চলা শুরু। বর্তমানে তিনি ভাই ভাই গ্র“পের ডিজিটাল টেকনোলজি এর নির্বাহী পরিচালক। শুরু করেন সাহিত্যচর্চা। রচয়িতা সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে তিনি উইড (অসহায় জনগোষ্ঠির জন্য একটি বিদ্যালয়) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। রাসান-২০১২ (একটি শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র) এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
দুই বাংলার বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘রচয়িতা’ সম্পাদনা করায় সত্যি তার সাহস অনুজদের আশ্চর্যের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে ভাবলে বিন্দুমাত্র ভুল হবেনা। রচয়িতা সম্পাদনা করে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। বয়সে তরুণ এবং সম্পাদক হিসেবে নবীন হলেও তিনি ‘রচয়িতা’ প্রকাশ করে প্রমাণ করে দিয়েছেন, বয়স দিয়ে সাহিত্যিকদের মেধা মাপা যায় না বরং সাহিত্যিকের লেখাই তার জ্ঞানগড়িমা, দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে। অর্থাৎ বয়স কারো যোগ্যতা কিংবা অভিজ্ঞতা মাপার মাপকাঠি নয়। দেশ-বিদেশের অনেক সুনামধণ্য কবি-লেখকরা লিখেন তার রচয়িতায়। প্রতিবছর কবির নিজের অর্থায়নে ‘রচয়িতা সাহিত্য পরিষদ’ কর্তৃক রচয়িতার বাছাইকৃত কবি লেখকদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। জামালপুর জেলার জন্য অবশ্যই তা গর্বের বিষয়। তিনি একমাত্র সম্পাদক; যিনি সর্বপ্রথম ইসলামপুরে কবি-লেখকদের সম্মানিত করেছেন। করে যাচ্ছেন। তিনি ‘কাব্য কথা’ লিটলম্যাগ এর নির্বাহী সম্পাদক পদে নিয়োজিত আছেন। সদ্য প্রকাশিত ‘রচয়িতা’ (চার বাংলার ১০০ কবি ও কবিতা) সংখ্যাটি বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছে লিটলম্যাগ মহলে। দেশ ও দেশের বাহিরের অনেক সনামধণ্য কবি-লেখকগণ লিখেছেন এ সংখ্যায়। এ যাবৎ ‘রচয়িতা’ প্রসঙ্গে দৈনিক যায়যায়দিন, দৈনিক ইত্তেফাক, বগুড়ার বিখ্যাত দৈনিক করতোয়া, জাতীয় অনলাইন প্রতিমুহূর্ত ডটকম, জাতীয় সাহিত্যবিষয়ক অনলাইন অন্যধারা ডটকম ও মাদারীপুরনিউজ ডটকম-এ আলোচনা স্থান পেয়েছে।
এছাড়াও ডজন খানেক অনলাইন পত্রিকায় এসেছে রচয়িতার আলোচনা। কবি আরিফুল ইসলামকে নিয়ে বিশেষ আলোচনা ছাপা হয়েছে জামালপুরের সনামখ্যাত ‘দৈনিক আজকের জামালপুর’ পত্রিকায়। মাদারীপুর জেলার কালকিনি প্রেস ক্লাবে রচয়িতার মোড়ক উন্মোচন করেছেন রচয়িতার সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। দ্বিতীয় বারের মত মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে সহ-সম্পাদক সুমন হাফিজের সভাপতিত্বে ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত শান্ত মরিয়ম এন্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি’র ক্যাম্পাসে। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় কবি তার নিজের গুণে কত বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রেখেছেন। 
তিনি একাধারে কবি, সম্পাদক, ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। তাকে সব্যসাচী বললেও অত্যুক্তি হবেনা। তার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘অপেক্ষার শেষ প্রহর...’ ২০১১ সালে প্রগতি প্রকাশনী, আরামবাগ, ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়ে সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উপন্যাসে তিনি সমাজের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছেন যা ভাবিয়ে তুলেছে অনেক পাঠকের অন্তর। আলোচনা এসেছে প্রায় ১০-১৫ টি আঞ্চলিক পত্রিকায়। তার লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কালোমুখোশ’। প্রকাশক সৈকত আহমেদ বিল্লালের সাহয্যে প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে লেখায় তা স্থানীয় প্রশাসনের কারণে বিক্রি নিষিদ্ধ হয়। ‘কালো মুখোশ’ এর একটা কবিতা “মানুষ ঝালাই” এরকম-
“দেশটা তোর বাবার বলেই দেখাস্ যত ক্ষমতা
ভেবে দেখ্ কি  হবে তোর ক্ষেপে যদি জনতা”
তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘একাকী জীবন’। নিরেট প্রেম ধরা দিয়েছিল কবির কলমে। বাস্তববাদী প্রেম কতটা নির্মল হয় তা বোঝাতে চেয়েছেন কবি তার একাকী জীবন কাব্যগ্রন্থের “আটটি বছর পর” কবিতায়-
ভুল করেই আবার আসার অপেক্ষায়-
হাতে হাত,আর দু-বাহুর স্পর্শে চরম তৃপ্তি প্রাপ্তির প্রত্যাশায়
যৌবন যেখানে দাঁড়িয়ে হাস্যরসে
শূণ্য অযৌবনের লাঠির উপর ভর করে।”
তার সাহিত্য কর্ম আর জীবন কর্ম সত্যি ভাবিয়ে তোলার মতই।
 কবি আরিফুল ইসলাম অনেক জায়গায় সাহিত্যকর্মের জন্য পেয়েছেন অনেক সম্মান। ২০০৬ এ পেয়েছেন চাঁদপুর সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক কবিতার জন্য বিশেষ সনদ ও কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবি সেলিনা পারভিন এর স্বরণে  ঢাকা পাবলিক লাইব্ররিতে আয়োজিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে কবিতা লেখার জন্য পেয়েছেন বিশেষ সনদ ২০১৩। এ যাবৎ কবির অনেক কবিতা গল্প, উপন্যাস, বাংলাদেশসহ পশ্চিম বঙ্গের অনেক সনামধণ্য লিটলম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে।
লেখক: এম এস আই সাগর
কবি, শিক্ষক, সম্পাদক ও আলোচক
ইসলামপুর, জামালপুর

অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান: লোকপ্রিয় স্বপ্নবিলাসী এক রসিক মানব

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। লোকপ্রিয় স্বপ্নবিলাসী এক রসিক মানব। তাঁর সাথে আমার পরিচয় বা যোগাযোগ বছর খানেকের। ২০১২ সালের জুলাই মাসে গাজীপুরের কোনাবাড়ি ক্যামব্রিজ কলেজে যোগদান করি। প্রথমদিন পাঠদানের পর আর ভালো লাগেনি। মন কেমন পালাই পালাই করছিল। পালাবার পথ খুঁজছিলাম। হঠাৎ করে পেয়ে গেলাম। কলেজ জীবনের এক বড় আপার সাথে ফোনে কথা হয়। তিনি জানালেন সাহেবরামপুর কবি নজরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজে একজন খন্ডকালিন বাংলা প্রভাষক দরকার। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি তাঁর সাথে কথা বলে আমাকে বললেন, কালকিনি চলে যাও। স্যারের সাথে ফোনে কথা বলো। সেই তাঁর সাথে প্রথম কথা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে কথা হয়েছে। এখনো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। খুব অল্প দিনেই আমার মনে হয়েছে তিনি লোকপ্রিয় এক মানুষ। কিন্তু আত্মপ্রচার বিমুখ। তবে স্বপ্নবিলাসী ও পুরোদস্তুর রসিক মানুষ। তাঁর নির্মল হাসি ও নিভাঁজ গল্পবলার ঢঙ দেখেই তার উদারতা ও মনের বিশালতা অনুমান করা যায়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও তার কর্মচাঞ্চল্য ও আশাবাদ আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি আমাদের অনুকরণিয় আদর্শ।
জন্মপরিচয়:
অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামান ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের সাহেবরামপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ্ব আব্দুর রহমান রাঢ়ি ও মাতা মরহুমা জোবেদা খাতুন। ছয় ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। কিশোর বয়সেই তিনি প্রতিবেশি আ. মাজেদ আকনের কন্যা মোসা: মনোয়ারা বেগম বুনুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর এবং বর্তমানে তিনি পাঁচ পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক।
অধ্যয়ন:
১৯৪৭ সালে গ্রামের জুনিয়র স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে প্রথম বিভাগে পাস করে চলে যান জেলা শহরে। ১৯৫২ সালে মাদারীপুর ইউনাইটেড ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে মাদারীপুর সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। উচ্চ শিক্ষার জন্য ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় সম্মানসহ এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
বর্ণাঢ্য কর্মজীবন:
অধ্যাপক মো. আসাদুজ্জামান ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, নাসিরাবাদ কলেজ, বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন। তিনি মাদারীপুর সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ, কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ, নরসিংদী সরকারি কলেজ ও টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ডের একত্রীকরণ পর্যন্ত এর সচিব হিসেবে এবং কিছুকাল তিনি এ সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষা কমিশনে প্রধান প্রতিবেদক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভ্রমণ করার সুযোগ লাভ করেন। সর্বশেষ তিনি জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির (নায়েম) পরিচালকের পদ থেকে ১৯৯৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর ঢাকা সেনানিবাসস্থ শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কিছুকাল কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৩-১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার্থে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট সুপারিশমালা প্রনয়ন কমিটির একজন সদস্য ছিলেন। তিনি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের সাহেবরামপুর কবি নজরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমানে কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
সাহিত্যচর্চা:
স্কুল জীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫১ সালে দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় পুরান বাজারের সাহিত্য মজলিসে যাতায়াত শুরু করেন। একই বছর মাদারীপুর এমএম হাফিজ মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। ১৯৫৪-১৯৫৫ সালে মাসিক সাহিত্যপত্র ‘মোহাম্মদী’তে ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা। ১৯৫৬-১৯৫৭ সালে ‘শুধু কাহিনী’,‘কুমার নদীর ইতিকথা’,‘দাদুর আঙ্গিনা ও আকাশ’,‘অধিকার’ ও ‘কেচ্ছার মানুষ শৈজুদ্দিনের দ্বিতীয় মরণ’ নামে কয়েকটি ছোটগল্প  প্রকাশিত হয়। অনুবাদ সাহিত্যে তার অবদান বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে ঢাকার তৎকালিন সিভিল সার্জন জেমস টেলর ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের মেডিক্যাল বোর্ডের সচিব লর্ড হাসিনসনের নির্দেশে এদেশের রোগব্যাধি সংক্রান্ত টপোগ্রাফি লিখতে গিয়ে ঢাকা তথা বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতি, মানুষ ও উদ্ভিদরাজির চমৎকার বিবরণ পেশ করেন এবং তা ‘টপোগ্রাফি অব ঢাকা’ নামে কলকাতা মিলিটারি অরফ্যান প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কর্তৃক এই দু®প্রাপ্য ও মূল্যবান গ্রন্থটি ‘কোম্পানি আমলে ঢাকা’ নামে অনূদিত হয়ে বাঙলা একাডেমী থেকে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় এবং পাঠকমহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। তাঁর অন্য অনূদিত গ্রন্থের নাম ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড)। তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘এই আঙিনা ও আকাশের উপাখ্যান’। এছাড়া ২০০৪ সালে ‘ঔপনিবেশিক প্রশাসন কাঠামোঃ প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা:
অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অনুবাদক, শিক্ষানুরাগী, জনগণের ক্ষমতায়ন ধারার লেখক, গবেষক, আলোচক, সাহিত্যিক ও সমাজ কর্মী। তিনি ‘দৈনিক বাংলা’,‘সাপ্তাহিক রোববার’,‘দৈনিক ইনকিলাব’,‘দৈনিক সকালের খবর’ সহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের নিয়মিত কলাম লেখক। তিনি মহকুমাকে জেলায় রূপান্তর করে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ক্যালেন্ডারে ইংরেজির সাথে বাংলা তারিখ সংযুক্ত করা, সমমান ও সমমর্যাদার ক্যাডার সার্ভিস গঠন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে আন্তঃ ও বহিঃ পরীক্ষার গড় নম্বরে ফলাফল প্রকাশ ও প্যাকেট ভিত্তিক পাশ-ফেল রহিতকরণ, কৃষিভিত্তিক মিনি গ্রন্থাগার ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করেন। গত ২৯ জুলাই ২০১৩ তারিখে দৈনিক সকালের খবরের ‘সম্পাদকীয়’ পাতায় ‘গণতন্ত্র, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জাতীয় সার্ভিস সিস্টেম থেকে বৈষম্যদূরীকরণ’ শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে তিনি বলেন,‘পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ও শোষণের হাতিয়ার হিসেবে এই ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্রের ভিত আরো পাকাপোক্ত করা হয়। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির পরিবর্তে তৎকালিন সিএসপিরা অধিক ক্ষমতা ও মহিমায় শাসন চালাতে থাকে। জনগণ থাকে অপাঙক্তেয় ও অবহেলিত।’ এছাড়া চ্যানেল আই আয়োজিত টক শো’তে অতিথি হিসাবেও অংশগ্রহণ করেন।
লোকপ্রিয় স্বপ্নবিলাসী এক রসিক মানব:
তাঁর রসবোধ চমৎকার। গল্পে ঢঙে উপস্থাপনায় সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখ। তৎকালিন উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আলোকচিত্র দেখেছি তাঁর গ্রামের বাড়ি সাহেবরামপুরের ঘরের দেয়ালে। মেয়ের দেওয়া একটা শখের ক্যামেরায় গ্রামের প্রকৃতির ছবি তুলে তা ফ্রেমবন্দী করে রেখেছেন। মাঝে মাঝে তিনি বাড়ি আসেন। হাসি-আনন্দ-আড্ডায় মাতিয়ে রাখেন পুরো বাড়ি। নাতি-নাতনিদের নিয়ে গল্প করে, গ্রামের মেঠোপথ ঘুরে কিংবা ফসলের মাঠের কিনারে বসে কাটিয়ে দেন পড়ন্ত বিকাল কিংবা জ্যোৎøা রাতের গহীণ অবধি।
শেষ হয়েও হলো না শেষ:
তাঁর কথা কীভাবে এত স্বল্প কথনে শেষ করা যায়? আমার জানা নেই। আমার মনে হয় এ যেন শেষ হয়েও হলো না শেষ। মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মনে প্রাণে একজন কবি-স্বভাবের মানুষ। তাঁকে প্রকৃতিপ্রেমিক বললেও অত্যুক্তি হবে না। গ্রামকে ভালোবাসেন মায়ের মতোই। পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর আর্কষণ দুর্নিবার। এই লোকপ্রিয় মানুষটির মধ্যে একটি মহৎ ও সুন্দর মনের সন্ধান মেলে। তার সহজাত সারল্য, চিত্তের ঔদার্য, অনুভূতি ও উপলব্ধির তীব্রতা তাকে করেছে মহিমান্বিত। দীর্ঘ ও সফল অধ্যাপনা জীবনে তার সাহচর্যে ও স্নিগ্ধ মনের স্পর্শে উজ্জীবিত হয়েছে অগণিত ছাত্রছাত্রী ও অসংখ্য গুণগ্রাহী, অনুরাগী বন্ধুজন। এমন লোকপ্রিয় স্বপ্নবিলাসী রসিক মানুষ বেঁচে থাকুক অনন্তকাল। তাঁর দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি।

তথ্যসুত্র:  কোম্পানি আমলে ঢাকা: জেমস্ টেলর- মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান অনূদিত।
দৈনিক সকালের খবর, ২৯ জুলাই’ ২০১৩ইং।
একজন লোকপ্রিয় মানুষ আসাদুজ্জামান তাঁর জীবন ভাবনা ও কর্মসাধনা- অধ্যাপক সফিউল আলম
লেখক:   সাধারণ সম্পাদক, কালকিনি প্রেস ক্লাব
    কবি, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

আমি আমার নয়

:: এম,ডি রাসেল ::
আমি আমাকে কখনও নিজের ভাবি না
আমি সবার,সব কিছুর ভিতরে,
সকলের মাঝে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
 কখনও বাঁশরীর বাঁশীর সুরে
আবার কবির নিরব ভাবনাতে
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
সকাল বেলার সূর্য,সোলালী রঙের আলো ছড়ায়
আলোকিত করে ধরণীর বুক
লাঙ্গল কাঁধে কৃষক মাঠে যায়
রাখাল ধরে যখন গান
শিল্পীর মনের মাধুরী দিয়ে
আঁকে যখন রূপসী বাংলার ছবি
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
প্রিয়াহারা বেদনায় কাতর
হতচকিত জীবনের মাঝে
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
রমণীর চোখে মায়াবী যাদু
মিনতি করে ভালোবাসা চাওয়া
ঠোঁটের বাঁকা হাসিতে মুক্তো ঝরায়
জন্ম নেয় ভালোবাসার ফন্দি
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
যুবক, যৌবনের দাপটে পাড়ি দেয়
অজানা পথে,ফিরিবার আশা নেই
সৃষ্টি করে নতুন কিছু
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
যখন কোনো যুদ্ধ বাঁধে
 নিজ মাতৃভূমির রক্ষার্থে
জীবন বাজি ধরে যুদ্ধ করে
সেখানে আমি আমাকে খুঁজে পাই।
উৎসর্গ:- জনাব কাজী কামরুজ্জামান স্যারকে।


শনিবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৩

প্রসঙ্গ: মালালা- আসলে কোনটা সত্য?

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
রাত তিনটায় একটি অনলাইন পত্রিকার প্রতিবেদন দেখে চোখ আটকে গেল। কৌতুহল নিয়ে পড়ে জানলাম, মালালার ঘটনা না কি পুরোটাই সাজানো নাটক। আসলে কোনটা বিশ্বাস করবো? মালালার ঘটনা একটা সাজানো নাটক; পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ডনের ব্লগে এমন দাবি করা হয়েছে।
অনলাইন পত্রিকাটি বলছে, নারীশিক্ষার পক্ষে কলাম ধরায় পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় গত বছর ৯ অক্টোবর মালালা ইউসুফজাইর ওপর হামলা চালায় তালেবান। গুলি লাগে মালালার মুখ আর মাথায়। সে সময় সঙ্গে থাকা আরো তিনজন আহত হন। এরপর গণমাধ্যমের 'কল্যাণে' স্কুলপড়ুয়া মালালা মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি। প্রথমে পাকিস্তান এবং পরে ইংল্যান্ডে কয়েক মাসের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। এত কিছুর পরও ১৫ বছরের মালালা নারীশিক্ষার পক্ষে অনড় থাকার ঘোষণা দেন। মালালা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, হাজারো বাধা টপকাতে তিনি প্রস্তুত। জঙ্গি হামলার ভয়ে মালালা বর্তমানে ব্রিটেনেই থাকছেন। এবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য তাঁর নামটাই ছিল প্রত্যাশার শীর্ষে। যদিও শেষমেষ পুরস্কার তিনি পান নি। আর সে পুরস্কার না পাওয়ার আলোচনা শেষ হতে না হতেই 'বোমা' ফাটালেন পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ডনের ব্লগ।
ডন পত্রিকা ও অনলাইনের জ্যেষ্ঠ কলামিস্ট নাদিম ফারুক পারাচা ব্লগে দাবি করছেন, কাহিনী আগেই লেখা ছিল, মালালা সে অনুযায়ি অভিনয় করেছে মাত্র। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও পশ্চিমা বিশ্ব না কি এ নাটক সাজিয়েছে। যা গত ১০ অক্টোবর পাকিস্তান সময় বিকাল ৪টা ৪৭ মিনিটে দ্য ডনের ব্লগে আপডেটসহ প্রকাশ করা হয়। পরে অবশ্য ১১ অক্টোবর শুক্রবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ১১ মিনিটে আপডেট দিয়ে জানানো হয়, ব্লগের লেখাটি ব্যঙ্গাত্মক ও কল্পকাহিনী। কিন্তু ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে সারাবিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা ঝড় শুরু হয়ে যায়।
ব্লগে বলা হয়েছে, মালালার ঘটনা সারাবিশ্ব যা জেনেছে তা ভুল। আসল ঘটনা একেবারে উল্টো। লেখক ফারুক বলছেন, মালালার বিষয়টি নিয়ে এ বছরের এপ্রিল মাসে ডনের একটি দক্ষ প্রতিবেদক দল সোয়াত এলাকায় গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছে। তারা পাঁচ মাসের অনুসন্ধানে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মত তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন। মালালা মূলত সোয়াতে জন্মগ্রহণ করে নি, এমনকি সে পশতুনও নয়। সোয়াতের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ইমতিয়াজ আলী খানজাই ডনের প্রতিবেদককে না কি জানিয়েছেন, তার কাছে মালালার ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল আছে। যা প্রমাণ করে মালালা পশতুন নয়। রিপোর্টটি দেখিয়ে তিনি জানান, তিনি মালালার ডিএনএ সংগ্রহ করেছেন। যখন তিনি মালালার ডিএনএ সংগ্রহ করেছেন; তখন মালালা শিশু ছিল। সে সময় মালালার কানের সমস্যা নিয়ে তার কাছে এসেছিল।
ডাক্তার ডিএনএ পরীক্ষায় দেখেন, মালালা আসলে ককেশীয়। ধারণা করা হচ্ছে- মালালা পোল্যান্ড থেকে এসেছে। এরপর তিনি মালালার বাবাকে ডেকে পাঠান। তখন তিনি মালালার বাবাকে বলেন, আমি মালালার আসল পরিচয় জানি। এ কথা শুনে মালালার বাবা জিয়াউদ্দিন ইউসুফজাই ঘাবড়ে যান। তিনি বলেন, এ কথা আমি যেন প্রকাশ না করি। আমি তাকে বলি, আপনি যদি সত্য ঘটনা খুলে বলেন তবে কাউকে বলব না। মালালার বাবা তখন ডাক্তারকে বলেন, মালালার প্রকৃত নাম হচ্ছে জেইন। ১৯৯৭ সালে সে হাঙ্গেরিতে জন্মগ্রহণ করেছে। তার প্রকৃত বাবা-মা খ্রিস্টান মিশনারিতে ছিলেন। তারা ২০০২ সালে সোয়াতে বেড়াতে এসেছিলেন এবং মালালাকে উপহার হিসেবে তার কাছে দিয়ে যান। ওই সময় তারা গোপনে খ্রিস্টান ধর্মগ্রহণ করেন।
এ সময় ডনের প্রতিবেদক ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তিনি মালালার আসল পরিচয় এখন প্রকাশ করছেন। তখন ডাক্তার বলেন,‘তিনি মনে করেন মালালাকে পাকিস্তানের বিপক্ষে দাঁড় করানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে পাঠানো হয়েছিল।’ এমনকি গুলিবর্ষণকারির ডিএনএ পরীক্ষা করেও ডাক্তার আবিষ্কার করেন যে, সে ইতালি থেকে এসেছে। ডাক্তার বলেন, আমি ২০১২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে এ বিষয়গুলো জানিয়ে ই-মেইল করি। এর কয়েকদিন পর তার ক্লিনিকে পুলিশ অভিযান চালায়। তার কয়েকজন কর্মচারীকে সে সময় নির্যাতনও করা হয়েছিল। তিনি জানান, এ বছরের জুন মাসে ডাক্তার আইএসআই’র একজন তরুণ কর্মকর্তার কাছে যান। তখন ওই কর্মকর্তা ক্লিনিকে এমন অভিযানের জন্য তার কাছে ক্ষমা চান।
অফিসার ডাক্তারকে বলেন, আইএসআই মালালার আসল পরিচয়ের ব্যাপারে খুব সতর্ক অবস্থানে আছে। অনেক অনুরোধের পর ডাক্তার ওই আইএসআই অফিসারের মুঠোফোনর নাম্বার দেন। এরপর সেই ডাক্তার আইএসআই অফিসারের নম্বর দেন ডনের এ প্রতিবেদককে। ডনের প্রতিবেদকের সাথে অফিসার দেখা করেন সোয়াতের একটি পরিত্যক্ত বিদ্যালয়ে। আইএসআই’র সেই অফিসার ডনের প্রতিবেদককে জানান, মালালার ওপর হামলার ঘটনা পাতানো হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে। উত্তর ওয়াজিরিস্তানে আক্রমণে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পথ পরিষ্কার করতে পুরো ঘটনাটি পাকিস্তান ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সাজানো হয়েছিল। অফিসার জানান,‘এটা একটা নাটক। পাকিস্তান সেনাবাহিনী উত্তর ওয়াজিরিস্তান আক্রমণের একটি অজুহাত দাঁড় করানোর জন্য এটি মঞ্চস্থ করেছিল।’
তার দেওয়া তথ্য মতে, ১ অক্টোবর ১৯৯৭ সালে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে হাঙ্গেরিয়ান বাবা-মায়ের ঘরে মালালার জন্ম । তার নাম রাখা হয় জেইন। ২০০২ সালের ৪ অক্টোবর তার বাবা-মা সিআই’র সাথে যুক্ত হন। তাদের একটি সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর তারা পাকিস্তানে প্রবেশ করেন এবং সোয়াতে একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ শুরু করেন। সে সময় তারা আইএসআই’র একজন নিু শ্রেণির এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি পুরো পরিবারকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করেন। তারা জেইনকে তার কাছে রেখে যান। পরবর্তীতে ওই এজেন্ট জেইনের নাম পরিবর্তন করে রাখেন মালালা। ২০০৭ সালের ৩০ অক্টোবর মালালা ব্লগে লেখা শুরু করেন এবং সেখানে তিনি সোয়াতের জঙ্গিদের অস্ত্রবাজি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর জঙ্গিরা তাকে আনুরোধ করে এ ধরণের ব্লগ না লিখতে। ২০১২ সালের ১ অক্টোবর সিআইএ নিউইয়র্কে বসবাসকারী ইতালিয় বংশোদ্ভুত রবার্ট নামের এক ব্যক্তিকে নিয়োগ করে। এবং নিয়োগের পর তাকে গুলি চালানোর ওপর স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর সিআইএ মালালার ওপর মিথ্যা গুলিবর্ষণের জন্য আইএসআই’র সাথে পরিকল্পনার ব্যাপারে আলোচনা করে এবং বিষয়টি মালালা ও তার পরিবারকে অবগত করা হয়। ২০১২ সালের ১১ অক্টোবর রবার্ট সোয়াত এলাকায় প্রবেশ করে উজবেক বলে পরিচয় দেয়।
সবশেষে ২০১২ সালের ১২ অক্টোবর রবার্টকে গুলিহীন একটি বন্দুক সরবারহ করা হয়। বন্দুকধারী মালালার ওপর মিথ্যা গুলি চালায়। এ সময় মালালা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার অভিনয় করে। মালালার কাছে আগে থেকে টমেটোর সস রাখা ছিলো যা সে শরীর ও মুখে মেখে নেয়। পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি অ্যাম্বুলেন্সও সেখানে পৌঁছায় এবং মালালাকে নিয়ে যায়। এরপর পশ্চিমা মিডিয়াগুলো সারাবিশ্বে প্রচার করতে থাকে যে, মালালাকে তালেবান জঙ্গিরা গুলি করেছে।
এই কথাগুলো যদি সত্য ঘটনা হয়, তাহলে কত বড় ধোঁকা দেওয়া হলো সারা বিশ্বকে। তা আর ভাববার অবকাশ রাখেনা। তাই যদি হয় তাহলে এর জবাব দেবে কারা? তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়। আসলে কোনটা সত্য? ডনের প্রতিবেদন না কি মালালার ওপর ঘটে যাওয়া কাহিনী। মালালাকে নিয়ে সারা বিশ্ব যখন মুখর; তখন এমন একটা সংবাদ মানুষকে ভড়কে দেবে। এটাই স্বাভাবিক। এদিকে আবার বাংলাদেশের অন্য একটি অনলাইনের বার্তা সম্পাদক আমাকে বললেন, ঘটনা ভূয়া। মালালা ঠিক আছে। পাকিস্তানের ্ওই দৈনিক একটি স্যাটায়ার লিখেছে। সেটাকে না বুঝে বাংলাদেশের অনেক পত্রিকা নিউজ করেছে। এখন আমরা পাঠক সমাজ কী করবো? কী আর করার? আছি শুধু সময়ের অপেক্ষায়। সত্য একদিন বেরিয়ে আসবেই। আজ অথবা কাল। সে অপেক্ষাতেই রইলাম।

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী।

সেই সে রাতে

মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

সেদিনের সেই বৃষ্টিভেজা রাতে
হাতে হাত রেখে এক বুক সাহস নিয়ে দু’জনের নিরন্তর পথচলা
আজ শুধু স্মৃতি;
শরতের বৃষ্টিজলে অনুভবের কাঁশফুল ছুঁয়ে গেছে হৃদয়
পুলকের কোনো এক মায়াবি আবির্ভাবে
জীবনের না পাওয়া সব সত্যগুলো পেয়েছিলাম সেদিন।

ভিজেছে এই তনু-মন শরৎপ্রেমে;
প্রেমের গহীন জলাশয়ে সাঁতরিয়ে পেয়েছে সব না পাওয়াকে
আহ্ পৃথিবীর সর্বসুখ যেনো ছিলো তারই মাঝে!

কবি: নিজস্ব প্রতিবেদক, আলোকিত বাংলাদেশ।