বুধবার, ১৬ মে, ২০১২

প্রসঙ্গ : রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান

(বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫১ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে)
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসলমানদের জন্য কী করেছেন ? এমন প্রশ্ন বহুকাল ধরেই বাঙলা সাহিত্যের মুসলমান পাঠক ও রবীন্দ্র সংগীতের মুসলমান শ্রোতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে। এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর আছে কি না আমার জানা নেই। অভিযোগগুলো এ রকম : রবীন্দ্র সাহিত্য তথা উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক কিংবা গানে কোথাও কোন মুসলমান চরিত্রকে বড় করে দেখান হয়নি। কেন দেখান হয়নি? এ নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। সাহিত্যিক আনোয়ারুল কাদীর বলেছিলেন : আকাশের সূর্য মুসলমানদের জন্য বিশেষ কি করেছে?
এ প্রসঙ্গে কাজী আব্দুল ওদুদ তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান-সমাজ’ প্রবন্ধে বলেছেন,‘‘ কবি আকাশের সুর্যের মতোই একজন সহজ মানব বন্ধু। অবশ্য যেহেতু কবি একজন মানুষ, এক বিশেষ পরিবেষ্টনের সৃষ্টি, সেজন্যে অত্যন্ত কাছ থেকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে আলোকের উৎস সূর্যেও ধরা পড়ে কারো দাগ। যে গোলাপ সৌষ্ঠব আর গন্ধে অতুলনীয় তার স্পর্শ লোভাতুর লাভ করে হাতে কাঁটার আঘাত। কিন্তু কালোদাগ সত্ত্বেও সূর্য সূর্যই। কাঁটা সত্ত্বেও গোলাপ গোলাপই। এক বিশেষ পরিবেষ্টনে জন্ম সত্ত্বেও কবি চিরন্তন মানব-তাঁর পরিবেষ্টনের সমস্ত সীমারেখা অবলীলাক্রমের অতিক্রম করে তাঁতে উৎসারিত হয় মানুষের চিরন্তন সুখ, চিরন্তন দু:খ, চিরন্তন প্রেম, চিরন্তন অভয়। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ কবি, এবং যেহেতু মুসলমান মানুষ, সে জন্যে মুসলমান তাঁর আজকার বিশেষ ঐতিহাসিক বিবর্তণের প্রভাবে বুঝুক আর নাই বুঝুক, রবীন্দ্রনাথ বাস্তবিকই তার পরম বন্ধু ব্যতীত আর কিছু নন।”
একথা সত্য যে, এমন প্রশ্নের উদ্ভব হওয়া মুলত অবান্তর নয়। কিন্তু রবীন্দ্রানুরাগীরা এমন প্রশ্ন শুনেই চটে যান। কেই কেউ আবার বলেন : রবীন্দ্রনাথ হিন্দুও না, মুসলমানও না- তিনি একজন মানুষ। রবীন্দ্রনাথ মানুষ হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি তার প্রকৃতিগত বিরূপভাব না থাকলেও এমনকি অল্প-বিস্তর অনুরাগ ছিল। তবুও তিনি সে সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রায় মৌন ছিলেন। তাঁর সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে মুসলমান প্রসঙ্গ খুব বেশি এড়িয়ে গেছেন। তবে হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় যখন বাংলাদেশ ফাটো ফাটো, টান টান উত্তেজনা তখন রবীন্দ্রনাথ তার ‘কালান্তর’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের ইতিহাসে পালাবদলের প্রশ্নে মুসলমান বিজয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
মূলত হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে চিন্তাও করেছেন। তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিয়ে উবয়ের সমস্যা সমাদানের কারণগুলো ঘেঁটে দেখেছেন এবং দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর মতে সমস্যা সমাধানে মনের পরিবর্তন, সত্যের সাধনা ও মনুষ্যত্বের বিকাশের প্রয়োজন। সমালোচকরা বলেছেন, শিল্পী ছবি আঁকেন তাঁর বিশেষ পরিচিত জনের মুখ অবলম্বন করে। তাঁর প্রতিদিনের দেখা মুখগুলোও তুলিতে ধরা পড়ে না। অথচ ক্ষণিকের দেখা এক-আধ পরিচিত মুখ তাঁর মনে গেঁথে থাকে দীর্ঘদিন ও দীর্ঘরাত। শিল্পীর এমন পক্ষপাতের আসল রহস্য আমাদের বোধগম্য নয়।
সে কথা না হয় বাদই দিলাম। রবীন্দ্রনাথতো কেবল একজন শিল্পী নন, একজন জীবন সমালোচকও বটে। সে হিসাবে তাঁর দেশবাসী মুসলমান সম্পর্কে তাঁর মৌনভাব কি অদ্ভুত নয়? এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, মুসলমান সম্পর্কে তিনি যে কম আলোচনা করেছেন তা নয়, তিনি যে আলোচনা করেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমান ধর্মের প্রতি অথবা অন্য ধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ব্যক্ত হয়েছে তাঁর ‘সতী’ নাটিকায়। ভারতের মুসলমানদের দোষ ও গুণ দুই-ই-তাঁর আলোচ্য বিষয় ছিল।
‘রবীন্দ্রনাথ মুসলমানদের নিয়ে কোন গান রচনা করেছেন কি না?’ - এমন প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেমন হবে ঠিক বলা যাচ্ছে না। আর শ্রোতাদের নিবৃত্তও করা যাবে কি না আমাদের জানা নেই। বাস্তবিক অর্থে এ ধরণের প্রশ্ন অবান্তর না হলেও অট্টহাসির জন্ম দেয়। এমন প্রশ্ন থেকে সৃষ্টি হয় এক শ্রেণির দু:খী মুসলমানের। সাহিত্য থাকুক সাহিত্যের মতোই। হিন্দু কি মুসলমান- কে কার জন্য কি করেছে? এমন প্রসঙ্গ টেনে মনের মাঝে দীনতা সৃষ্টির প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের , রবীন্দ্রনাথ সত্য ও সুন্দরের। মানুষ সত্য ও সুন্দরের পূজারী, সুতরাং রবীন্দ্রনাথ মানুষের।

কালকিনি প্রবাহ

- আকন মোশাররফ হোসেন :
(পূর্ব প্রকাশের পর)
কালকিনি উপজেলার আদিবাসী কারা, কোথা থেকে তাদের আগমন ঘটেছিল আর কোথায় চলে গেছেন তা- বলা কঠিন। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, কালকিনি উপজেলার মুসলমান বনেদী পরিবারগুলো বহিরাগত। সৈয়দ, খন্দকার, চৌধুরী, হাওলাদার, ভূইয়া, তালুকদার এদের অন্তর্ভূক্ত। অন্যদিকে ব্রাক্ষ্মণ সম্প্রদায়ের বসবাস এখানে অনেক আগে থেকে তাছাড়া কায়স্থ, সাহা, মালো ইত্যাদি হিন্দু সম্প্রদায় তখনও ছিল এখনও আছে। তবে নিু বর্ণের হিন্দু নম সম্প্রদায়ের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি ছিল। বাঁশগাড়ী, আলীনগর, কাজী বাকাই, মাইজপাড়া, ঘোষেরহাট, নবগ্রাম, শশিকর এলাকার জলাভূমিতে ও বিল অঞ্চলের এরা প্রধান অধিবাসী। হিন্দু জমিদার ও উচ্চ বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যাচার ও শোষণের কারণে এরা নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছিল। ভৌগোলিক  দৃষ্টিতে দেখা যায় নদী প্রবাহিত এলাকা আলীনগর, এনায়েতনগর, বাঁশগাড়ী, শিকারমঙ্গল, চর দৌলত খান, সাহেবরামপুর, কয়ারিয়া ও রমজানপুর ইউনিয়নের নদীর তীর বা চরাঞ্চলের মুসলমানদের আবাসন। যদিও নদীর ভাঙ্গা-গড়ার খেলা কৌতুহলের বিষয়। এ এলাকার নম শুদ্র সম্প্রদায়ের নারীরা এবং গরীব মুসলমান নারীদের অনেককে পুরুষের মতো ধুমপান করতে দেখা গিয়েছে আদীকাল থেকেই।
প্রাচীন অনেক নিদর্শন কালকিনি থানাতে রয়েছে। এই উপজেলার বালিগ্রাম ইউনিয়নের আমড়াতলা ও খাতিয়াল গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে আড়াই হাজার একর জমিতে সেনাপতির দিঘি রয়েছে। শীত মৌসুমে নানা প্রকার হাজার হাজার অতিথি পাখি ঐ দিঘিতে শীত অবকাশ যাপন করে। জনশ্র“তিতে জানা যায়, মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে সুবাদার ইসলাম খার নেতৃত্বে বিশাল একদল সৈন্য ঢাকা যাওয়ার পথে এখানে কিছুদিন অতিবাহিত করেন। পানীয় জলের অভাব মেটাতে সেনাবাহিনী দ্বারা এই দিঘি খনন করা হয়। এ কারণেই এই দিঘির নামকরণ করা হয় সেনাপতির দিঘি।
কালকিনি উপজেলায় ইসলাম ধর্মের আগমন ও বিকাশের পূর্বে হিন্দু ধর্ম ছিল প্রধান। এখানকার প্রাচীন জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। দশম শতাব্দীতে এ এলাকায় কিছু কিছু বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর বসবাসের প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায়। ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার লক্ষে এ এলাকায় পীর-দরবেশ- আউলিয়ার আগমন ঘটেছে। সেই সুবাদে এই এলাকার একটি মৌজার নাম আউলিয়ার চর।
হযরত পীরজাদা শাহ সুফি এনায়েতপুরী (র) সাহেবের বর্জার (ইঞ্জিনবিহীন বড় নৌকা) নোঙর করে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন যেকারনে এই মৌজার নাম এনায়েতনগর হয়েছে। এবং সেই থেকে এই মৌজা ও ইউনিয়নের নাম এনায়েতনগর।
(চলবে)   

মঙ্গলবার, ১৫ মে, ২০১২

বর্ষা আসে বিরহ নিয়ে

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
আমার জীবনে বর্ষা আসে বিরহ নিয়ে। তাই আমার কাছে মনে হয় বর্ষা মানে ক্ষণে ক্ষণে বিরহের গান। বলা নেই - কওয়া নেই অমনি শুরু হয়ে গেল অশ্র“র বর্ষণ। কখনো কখনো মনে হয় চোখ ভরা অভিমান নিয়ে ধেয়ে আসা কিশোরীর পায়ের নূপুরের রিনি ঝিনি আওয়াজ।
এখনো বর্ষা আমাকে কাঁদায়। তাই আমার কাছে বর্ষা মানে গর্জে ওঠা নদী। দু’কুল ছাপিয়ে তলিয়ে দেওয়া গ্রামের পর গ্রাম। সুখ-দু:খে একাকার হয়ে ভেসে বেড়ানো পাল তোলা নৌকা। বিরহী সুর জেগে ওঠা মাঝির ভাটিয়ালি গান। কলা গাছের ভেলায় ভেসে যাওয়া ক্ষুদ্র জীবন। ব্যাঙের একটানা ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ ডাকে দূর থেকে ভেসে আসা রাগ-রাগিণী। পানকৌড়ির ডুবসাঁতারের খেলার মতো প্রিয়তমার লুকোচুরি।
তবুও অসহায় আমি নি:সঙ্গ হয়ে আজ চার দেয়ালের বন্দী জীবন থেকে বের হয়ে বারবার ফিরে যেতে চাই বর্ষাস্নাত গাঁয়ের বুকে। যান্ত্রিক সভ্যতার নাগপাশ ছিড়ে দু’হাতের আজলা ভরে কুড়িয়ে নিতে চাই প্রকৃতির নির্মল বাতাস। ইচ্ছে হয় কাদা জলে হোচট খেতে, ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে। সাঁঝ পোহানো কোন রাতে জোছনা বিলাসের আয়োজন করতে। গভীর রাতে বিলের জলে নৌকা ছেড়ে দিয়ে সুখের বাঁশরী বাজাতে।
সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি বৃষ্টির তোড়ে থরথর কওে কাঁপে জানালার শার্শি। ঝড়ো হাওয়ার রাতে বিরহের গান গেয়ে যায় বাতাস। এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় শরীর। কী এক স্বপ্নীল শিহরণ জেগে ওঠে মনে। মনে পড়ে এক বর্ষারাতে হাতে হাত রেখে বলেছিল সোনাবউ- ‘ আজ জোছনার আলোয় বৃষ্টির জলে ভিজবো দু’জন’।
এখনো আগের মতোই বর্ষা আসে ; আবার চলেও যায়। শুধু আমার সোনাবউ অন্য কোথাও। বৃষ্টির শব্দে তার কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে। দু'চোখের তারায় ভেসে ওঠে বৃষ্টিভেজা একটি গ্রাম। মাঝখানে আমি আর সোনাবউ।
দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াই খোলা আকাশের নিচে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা তার চোখের অশ্র“ হয়ে জমা হয় আমার অসহায় হাতের তারায়.....।

কিশোর কবি সুকান্ত স্মরণে

মারজিয়া নিশি :
“বন্ধু, আজকে বিদায়! দেখেছ উঠল যে হাওয়া ঝড়ো, ঠিকানা রইল, এবার মুক্ত স্বদেশেই দেখা করো ॥”-এ আহ্বান জানিয়ে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ১৯৪৭ সালের ১৩ই মে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২১ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য ১৯২৬ সালরে ১৬ই আগষ্ট কোলকাতার ৪২ মহীম হালদার স্ট্রিটের মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম নবারুন ভট্টাচার্য্য। মাতার নাম সুনীতি দেবী। কবির পুর্ব পুরুষরা এদেশের গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বসবাস করতেন। কবির জন্মের পূর্বেই তাঁর পূর্ব পূরুষরা এ দেশ থেকে ভারতে চলে যান। দীর্ঘদিন ধরে কবির পৈতৃক ভিটায় কোন প্রকার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই তার জন্ম ও মৃর্ত্যুবার্ষিকী পালিত হতো। গত বছর থেকে সুকান্ত স্মৃতি সংসদ, উদীচী ও সুকান্ত সেবা সংঘের পক্ষ থেকে ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে কবির মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হচ্ছে।
কবির পূর্ব পুরুষরা এদেশ থেকে চলে যাবার পর তার পৈত্রিক ভিটা ভূমিদস্যুরা দখল করে নেয়। দীর্ঘদিন দখল থাকার পর ২০০৫ সালে কবির পৈত্রিক ভিটাটি দখলমুক্ত করা হয়। কবির স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তার পৈত্রিক ভিটায় সরকারিভাবে একটি অডিটোরিয়াম এবং একটি লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয়।
বাংলা বিশ দশকের সূচনাতে ঔপনিবেশিক বৃিটশ শাসনের বিরুদ্ধে গণজাগরণ শুরু হয়। এই গণজাগরণের উত্তাপ ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে থেকে কবি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য্য। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, হিন্দু-মুসলমান বিরোধ, রুশ বিপ্লব সুকান্তের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ঘুম নেই, ছাড়পত্র, পূর্বাভাস কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।


বন্ধু কী খবর বল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে অগণিত বন্ধু আমার। তাদের ছবি দেখি। অনলাইনে কথাও হয়। হাই- হ্যালো ! কেমন আছ? কি করছ...? ইত্যাদি। কেবল জানার জন্যই জানা। অন্তর থেকে কোন টান অনুভূত হয়না। অনেকটা যন্ত্রমানবের মতো। সভ্যতার উৎকর্ষতার সাথে সাথে আজকাল আমিও হয়ে উঠেছি যান্ত্রিক।
বন্ধুদের প্রসঙ্গ এলে কাজী নজরুল ইসলামের একটা চিঠির কয়েকটি কথা মনে পড়ে-‘ বন্ধু আমি পেয়েছি- যার সংখ্যা আমি নিজেই করতে পারব না। এরা সবাই আমার হাসির বন্ধু, গানের বন্ধু। ফুলের সওদার খরিদ্দার এরা। এরা অনেকেই আমার আত্মীয় হয়েছে, প্রিয় হয়ে ওঠেনি কেউ।’
যান্ত্রিক বন্ধুদের কথা বলছিলাম। যার সংখ্যা অগণিত। বন্ধু হয়েছে ঠিকই ; কিন্তু প্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি কেউ। ফেসবুকের ফাইন্ড ফ্রেন্ড্সে গিয়ে আজও হারিয়ে যাওয়া পুরনো দিনের বন্ধুদের খুঁজি। কোন কোন নিস্তব্ধ রাতে যাদেরকে প্রিয়ার মতো জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলাম। মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলতে বলতে রাত ভোর করে দিয়েছি।
যান্ত্রিক বন্ধুদের সব কথা বলা হয় না। সব ব্যথার অংশীদারও করা হয় না। তাই সত্যিকারের বন্ধুদের আজও খুঁজি শেষ বিকেলের কোন চায়ের আড্ডায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্য অস্ত যাবার দৃশ্য দেখতে দেখতে। খুঁজি ব্যস্ততম জনপদে।
আজ থেকে আট বছর আগের কথা। ঢাকার শাহজাহান পুরে থাকতে ভালোবেসে ফেলি খন্দকার মাহমুদুল হক মিলনকে। দু’জনার মনের অনেক কথা ভাগাভাগি করেছি আমরা। জীবনের ব্যর্থতা-হতাশার গল্প বলে কাটিয়ে দিয়েছি রাত। একসাথে অনেক ঘুরেছি। শাহজাহান পুর থেকে হাটতে হাটতে চলে গেছি টি এস সি। শহীদ দিবসে গিয়েছি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কত স্মৃতি আজ মনে পড়ে। কিন্তু সেই প্রিয় মানুষটি আজ কোথায় জানি না। তার বাড়ি ছিল রাজশাহী। তখন আমার ফোন ছিলনা। তবুও তার একটা নম্বর আমার ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম। কিন্তু সে নম্বরও এখন বন্ধ। তার বাসার ঠিকানাও ছিল। চিঠি দিয়েছি- তার কোন উত্তর পাইনি। আজো মনে পড়ে তাকে। এখন ফোনে- ফেইস বুকে কিংবা কর্মস্থলে এতো বন্ধু আমার। অথচ আজো তার শূন্যতা আমাকে গ্রাস করে। 
সুমনের একটা গানের কথা ঘুরে-ফিরে মনে আসে-`হঠাৎ রাস্তায় আপিস অঞ্চলে, হারিয়ে যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে - বন্ধু কী খবর বল? কতদিন দেখা হয়না।’ এমন একটা মুহূর্তের জন্য আমি আজও প্রতীক্ষায় থাকি। গলির মোড়ে কিংবা পার্কে হঠাৎ কেউ পিঠ চাপড়ে চমকে দিক। তাকিয়ে দেখবো শৈশবের কোন বন্ধু সহাস্যবদনে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুকে টেনে নেওয়ার জন্য। কেবল ঘুরে-ফিরে দু:সময়ের বন্ধুদের কথাই মনে পড়ে। কারণ দু:সময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু। তাই অসংখ্য বন্ধুর ভিড়ে আজও মনে পড়ে পুরনো দিনের সেই চেনা মুখগুলো। যে মুখ থেকে একদিন উচ্চারিত হবেÑ বন্ধু কী খবর বল...?

সোমবার, ১৪ মে, ২০১২

‘দহন’ সম্পাদকের সুনীল সাহিত্য পুরস্কার লাভ


মেহেদী হাসান :
`দহন’র ( সাহিত্যপত্র) সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ছোটগল্পের জন্য ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার-২০১১’ লাভ করায় আমরা আনন্দিত ও গর্বিত। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি। এর আগে তিনি ২০০৬ ও ২০১০ সালেও উক্ত পুরস্কার লাভ করেন। সুনীল সাহিত্য পুরস্কার ট্রাস্ট, মাদারীপুর এ পুরস্কারের প্রবর্তণ করেন।


প্রেম নয় অমৃত

আদনীন ইভা সুমি

তিমিরাচ্ছন্ন রাতের বুক থেকে তুলে আনো স্নিগ্ধ প্রভাত,
বিকশিত প্রতিভায় যেন ফুটে ওঠে পুষ্প পারিজাত।
দেখতে চাই তোমার লেখনীর তেজদীপ্ত রশ্মি,
সেখান থেকে শুষে নেব জ্ঞানের অমৃত সুধা।
পুষ্পের মধুচোষা মধুকর নয়- জ্ঞান সাধকের মতো।

আমি কৃষ্ণ হয়েছি তোমার এক টুকরো কাব্য অমৃতের আশায়।
প্রতীক্ষার বিষাক্ত দাওয়ায় বসে আছি, প্রয়োজন নেই,
কোন প্রয়োজনের জন্য ছুটবো না কৃষ্ণ হয়ে রাধার পিছু।
কারণ দু’জনেই আজ ভিন্ন পথের পথিক।

উপমহাদেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক জোহরা বেগম কাজী

আফিয়া মুন :
৭ নভেম্বর উপমহাদেশের প্রথম মহিলা চিকিৎসক জোহরা বেগম কাজীর মৃত্যুবার্ষিকী। তার স্মৃতির উদ্দ্যেশ্যে আমাদের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি । জীবদ্দশায় যিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন নিঃস্বার্থভাবে। অধ্যাপক ডাঃ জোহরা বেগম কাজী স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যায় নতুন এক ইতিহাস তৈরি করেছেন। তিনিই প্রথম ধাত্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করে নারী সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসেন। নারী সমাজের উন্নত চিকিৎসার সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। কুসংস্কার ও ধর্মীয় বাধা অতিক্রম করে নারী সমাজের মুক্তিদাতা হিসাবে আবির্ভূত হন।
জন্মঃ
এই মহিয়সী নারী ১৯১২ সালের ১৫ অক্টোবর ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজনানগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈত্রিক নিবাস মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার গোপালপুর গ্রামে। পিতার নাম কাজী আব্দুস সাত্তার এবং মাতার নাম আঞ্জুমান নেছা।
শিক্ষা জীবনঃ
রাজানানগাঁওয়ে রাণী সূর্যমুখী পুত্রিমানেতে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু।  প্রাথমিক শিক্ষা শেষে একে একে তিনি কৃতিত্বের সাথে মেট্রিক ও আইএসসি পাস করেন। পরে ১৯২৯ সালে দিল্লীর লেডি হাডিং গার্লস মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এটি উপমহাদেশের প্রথম মহিলা মেডিকেল কলেজ। আর এ কলেজে তিনিই প্রথম মুসলিম বাঙালি ছাত্রী। এখান থেকে ১৯৩৫ সালে এমবিবিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করেন। তখন তাকে সম্মানজনক ভাইসরয় ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
কর্মজীবনঃ
মহাত্মা গান্ধীর পরিবারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তখন নাগপুরে সেবাগ্রামে একটি গান্ধী আশ্রম ছিল। তিনি সেখানে অবৈতনিক চিকিৎসা সেবা দিতেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশবিভাগের পর তিনি বড়ভাই কাজী আশরাফ মাহমুদ ও ছোটবোন শিরিন কাজীর সাথে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে গাইনি বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের অনারারি কর্ণেল পদে এবং হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত ছিলেন।
পদকঃ
তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘তখমা-ই পাকিস্তান’ খেতাবে ভূষিত করেন। ২০০২ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘রোকেয়া পদক’ প্রদান করে। তিনি ‘ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল অব ঢাকা’ নামে পরিচিত ছিলেন।
শেষ কথাঃ
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৩২ বছর বয়সে তৎকালীন আইনজীবি ও এমপি রাজু উদ্দিন ভূইয়ার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আজীবন মানব সেবায় নিয়োজিত জোহরা বেগম কাজী ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। প্রতিবছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিনে কালকিনিসহ সারাদেশের মানুষ তাঁর স্মরণে মিলাদ-মাহফিলের আয়োজন করেন।

সম্পাদনা: সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

নানামতঃ কালকিনির গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :
১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাসিয়াতলা বাজারের হাটের দিন । সরগরম প্রায় দোকানপাট। সন্ধ্যার ঠিক আগে হঠ্যাৎ দু'জন অপরিচিত মানুষ ঢোল পিটিয়ে ঘোষনা করলো মুক্তিবাহিনী আসছে মিটিং করবে আপনারা কেউ বাজার ছেড়ে যাবেন না। মিনিট ১৫ না পেরোতেই হাটটি ঘেরাও করে রাজাকার, আল-বদর বাহিনী। ১০ মিনিট পরই নদীতে গানবোটে চড়ে আসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। ততক্ষণে রাজাকাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিকামী মানুষের ওপর।  একদিকে হানাদারদের গুলি অপরদিকে স্থানীয় রাজাকার, আল-বদরদের নির্মম হানায় হত্যা করা হয় অন্তত দেড় শত মুক্তিকামী মানুষকে। অনেককে ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীতে।  লুটপাট শেষে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাটের দোকানপাট। যাওয়ার সময় ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ১৮ জনকে। এরমধ্যে ১০ জন আজও ফিরে আসেনি। এরপর কেটে গেছে ৪০ টি বছর। তবে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া হয়নি কোন পদক্ষেপ। ফলে নতুন প্রজন্ম মহান এই স্মৃতিকে ভুলে যাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর ২০০৮ সালের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে উপজেলা গেট সংলগ্ন সুরভী সিনেমা হলের পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন। কিন্তু তারপর কেটে গেছে তিনুটি বছর। তবুও কাজ শুরু হয়নি স্মৃতিসৌধের। ঠিক তেমনিভাবে অবজ্ঞা-অবহেলায় পড়ে আছে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়। অর্থাভাবে সংস্কার বা পুণঃনির্মাণ কোনটাই সম্ভব হচ্ছেনা।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এসকান্দার আলী বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশ বছর আগে। অথচ দেশের জন্য যারা জীবন দিল, পঙ্গু হল, সর্বস্ব হারালো তাদের স্মৃতি সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিন বছর আগে স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও কাজ শুরু হয়নি। ফাসিয়াতলার গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়টিও অর্থাভাবে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে আছে। এরকম হলে আগামী প্রজন্ম স্বাধীনতার ইতিহাস ভুলে যাবে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধা আকন মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসেরহাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় ২০১০ সালের ১৮ ডিসেম্বর উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপিত হয়। ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ ও মিউজিয়ামের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। মিউজিয়ামের সংস্কার কাজ চললেও স্মৃতিসৌধের কাজ শুরু হয়নি। অর্থাভাবে ঢিমেতালে চলছে মিউজিয়ামের কাজ। কাজ শেষ না হওয়ায় দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এখানে সংরক্ষিত আছে শহীদ বীর বিক্রম নুরুল ইসলাম শিকদারসহ ২৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবি, মুজিব নগর সরকারের গার্ড অব অনারের ছবি, নিয়াজীর আত্মসমর্পণের দলিল ও ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত হেলমেট ও বিভিন্ন জিনিসপত্র।
মিউজিয়ামের প্রতিষ্ঠাতা আকন মোশাররফ হোসেন জানান, দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। শহীদ বীর বিক্রম নুরুল ইসলাম এ এলাকার সন্তান। তার জন্য কিছু করতে পারিনি। কেবল একটি স্মৃতিসৌধ ও মিউজিয়াম করার উদ্যোগ নিয়েছি। মিউজিয়ামের সংস্কার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এখনো স্মৃতিসৌধের কাজ শুরু করতে পারিনি। অর্থাভাবে করতে পারছিনা। মন্ত্রী মহোদয় আশ্বাস দিয়েছিলেন। সরকারী বা বেসরকারী সাহায্য পেলেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের বিনিময়ে শত্র“মুক্ত হয়েছে এদেশ। স্বাধীনতার জন্য বুকের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়েছে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। ইজ্জত হারিয়েছে মা-বোন। পঙ্গু হয়েছে অগণিত মানুষ। অথচ স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার ফাসিয়াতলা গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষিত হয়নি। এমনকি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে গড়ে ওঠেনি কোন স্মৃতিস্তম্ভ। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয়টিও সংস্কারের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবীর মুখে উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের খাসের হাট বন্দরে মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপিত হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে প্রস্তাবিত স্মৃতিসৌধের কাজ এখনো শুরু হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি এখন আপামর জনসাধারণের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আর কালক্ষেপণ না করে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে কার্যকরি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে কালকিনিবাসী।

দর্পণ থিয়েটার : একদিন জ্বলে উঠেছিল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :
২০০৪- ২০০৫ সালের কথা। কালকিনিতে দর্পণ থিয়েটারের নাম সবার মুখে মুখে। মাত্র তিনটি নাটক মঞ্চস্থ করতে পেরেছিল। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। মৌলবাদ, নোংড়া রাজনীতি আর প্রশাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হতে হয়েছিল তাদের।
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের তৎকালীন প্রভাষক মুজিবুল হায়দারের উদ্যোগে সম্ভবত ২০০৩ সালে দর্পণ থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজিবুল হায়দারকে আহ্বায়ক করে কালকিনি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে চলতে থাকে এর কার্যক্রম। কিছুদিন পরে কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম আজাদকে সভাপতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাজহারুল আলমকে সাধারণ সম্পাদক করে এগিয়ে যেতে থাকে থিয়েটারের কার্যক্রম। জহিরুল আলম সিদ্দিকী ডালিম, কাজী নিয়ামুল ইসলাম ও শাহ মাহমুদ শাওনসহ এক ঝাঁক তরুণ নাট্যকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমে সমৃদ্ধ হতে থাকে দর্পণ থিয়েটার।
আবুল কালাম আজাদের রচনা ও পরিচালনায় ‘সাধু বাবার পাঠশালা’ নাটক দিয়ে মঞ্চায়ন শুরু। এরপর আবুল কালাম আজাদের রচনা ও পরিচালনায় ‘পিশাচ’ ও হেমায়েত হোসেনের রচনায় আনোয়ার হোসেনের পরিচালনায় ‘ বিয়ে পাগলা বুড়া’ নাটক মঞ্চস্থ হয়।
এরপরই শুরু হতে থাকে মৌলবাদীদের নখরাঘাত। থিয়েটারটি বড় ধরণের হোচট খায়। তার সাথে যুক্ত হয় প্রশাসনের অসহযোগিতা। খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেও থমকে দাঁড়িয়েছিল দর্পণ থিয়েটার। আর এগুতে পারেনি। কালের সাক্ষী হয়ে আজীবন দাঁড়িয়ে থাকবে হয়তো।
‘প্রদীপ নিভিয়া যাইবার আগে একবার ধপ করিয়া জ্বলিয়া ওঠা’র মতোই দর্পণ থিয়েটার নিভে যাওয়ার আগে জ্বলে উঠেছিল। তাইতো একবুক ব্যথা নিয়ে থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল আলম জানান,‘ আমরা ভালোভাবেই শুরু করেছিলাম। মাত্র তিনটা শো'তেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলাম। নাট্যকর্মীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো। কিন্তু কোন এক স্বার্থান্বেষী মহল পিছু নিল আমাদের। মৌলবাদীরা ক্ষেপে উঠল। তকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ শোয়েবুল আলম বিমাতাসুলভ আচরণ করলেন। আমরা হেরে গেলাম। আমাদের পথচলা থেমে গেল। আর এক পা ও এগুতে পারিনি।’

ভালোবাসার প্রতিস্থাপন

- মাইনুল ইসলাম

শুনেছ, সবাই কি বলে, কি বলে?
তুমি নাকি হারিয়ে গেছ গহীন অরণ্যে
আমার জীবন থেকে।
তারা জানে না,
তুমি মিশে আছো আমার শিরা- উপশিরায়,
রক্তের হিমোগ্লোবিনে
আমার কলা-টিস্যুতেও যে শুধুই তুমি।
তা কি তারা বুঝবে বল, তুমিই বল?
তাদের কথা শুনে আমি নিশ্চুপ
কি কারনে থাকি?
কেন থাকবো না?
আমার শিরা-উপশিরা, কলা-টিস্যু
তাদের কথার জবাব দেয়।
তারা যখন জবাব শুনে ক্ষিপ্ত হয়
তখন হিমোগ্লোবিন ওদের ক্ষিপ্ততাকে
সুপ্ততায় পরিণত করে।

তুমি নাকি গহীন অরণ্যে নতুন সঙ্গী নিয়ে আছ।
তারা জানে না, আমি আছি তোমার শিরা-উপশিরায়,
আমারা ভালোবেসে কলা-টিস্যু স্থাপন করেছি।
তারা জানে না,
ভালোবাসার যোজন-বিয়োজন
তারা জানে না,
ভালোবাসা মানেই যোজন
তারা জানে না,
ভালোবাসার প্রতিস্থাপন।
আমাদের প্রতিস্থাপিত ভালোবাসা থাকবে আজীবন।

রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

অধিকার চাই

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :

প্রথম দৃশ্য :
মঞ্চের পেছনে চিৎকার চেঁচামেচি। দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে ইভা। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকে। এমন সময রাজুর প্রবেশ।
রাজু : কিরে ইভা, তুই রাস্তায় দাড়ায়া কান্তাছোস ক্যান?
ইভা : বাড়ির মালিক মাইরা বাইর কইরা দিছে।
রাজু : ক্যান? কি অন্যায় করছোস?
ইভা : হাতের তোন পইরা একটা প্লেট ভাইঙ্গা গ্যাছে। আমি কী ইচ্ছা কইরা ভাঙছি?
রাজু : কস কি? তারা বুঝি তোরে খুব মারে?
ইভা : হ, ওঠতে-বইতে সব সময়ই মারে।
রাজু : কস কি? এরা কি মানুষ না? তা এহন কি করবি? কই যাবি?
ইভা : কই যামু , কি করমু কিছুই জানিনা।
রাজু : চল, তোরে আমাগো বাাড়ি নিয়া যাই। আমাগো বাড়ি তেমন কাজ-কর্ম নাই। আমার তো কোন বোন নাই। তুই খালি মার লগে থাকবি। চিন্তা করিস না, আমার লগে স্কুলে যাবি। আমার বোনের মতো থাকবি। যাবি তুই?
ইভা : কি কস, তোর বাপ-মা কি আমারে রাখবো?
রাজু: হ, রাখবো। হেদিন হুনি মায় আব্বারে কইয়- যদি একটা মাইয়া পাইতাম তয় ভালো অইতো। কাম-কাইজ করা লাগবো না। খালি আমার লগে লগে থাকলেই     অইবো।
ইভা: (একটু ভেবে) হ, আমি যামু তোর লগে। খাড়া, জামা-কাপড় কয়ডা লইয়া আহি।
রাজু : ল, আমিও তোর লগে যামু। তাগো কইয়াই তোরে নিয়া যামু। ( উভয়ের প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য :
কারখানায় কাজ করতে করতে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে অপু। দৌঁড়ে আসে জয় ও আকাশ। তুলে বসায়। পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরায়। কপালে হাত দিয়ে-
জয় : ইসরে, জ্বরে তোর গাও দি পুইরা যাইতাছে। কামে আইছোস ক্যান?
অপু : কামে না আইলে যে সবাই না খায়া থাকবো।
আকাশ : অষুধ খাইছোস?
অপু : না, টাহা আছিল না। মালিকরে কইছিলাম, কয় এহোন টাহা পাবি না। মাস গেলে একবারে দিমু। কইলাম, জ্বর আইছে। হে কয়, ইস্ ব্যাঙের আবার সর্দি।
জয়: হ, মালিকডা কেমন জানি চামার। মজুরীর টাহাই ঠিক মত দেয় না। আবার অষুধ কেনার টাহা দিব।
আকাশ: চল, তোরে গাড়িতে উডায়া দেই, বাড়ি যা গা।
অপু : না, হ্যালে একদিনের মজুরি কাইট্যা দিব। বাড়ি যামুনা। কষ্ট অইলেও কাম করতে অইবো। ঘরে একটা চাউলও নাই।
আকাশ : তাইলে এক কাম করি। আমার ধারে ২০ টাহা আছে। ( জয়কে লক্ষ করে) জয় তোর পকেটে কয় টাহা আছে?
জয় : আমার ধারে মাত্র ১০ টাহা আছে।
আকাশ: দে, আমরা টাহা দিয়া অর লেইগ্যা অষুধ কিইনা আনি। আমরা না হয় আইজ যাওয়ার সময় হাইটা যামু।
জয়: ( টাকা বের করে) নে, পারলে অপুর লেইগ্যা একটা কলা আর একটা রুটি আনিছ।ওতো দুপুরের খাওনও আনে নাই।
আকাশ : মালিক আহনের সময় অইয়া গেছে। আমি গেলাম , তুই অরে পিছনের গোডাউনে একটু শোয়ায়া মাথায় পানি দে।
অপু : না মালিক দেখলে বকাবকি করবো।
জয় : মালিক আইতে আইতে তোর জ্বর কইমা যাইবো। চল।
অপু : তয় চল। মালিক আইলে আমারে ইশারা দিস। ( উভয়ের প্রস্থান)

তৃতীয় দৃশ্য :
সাথী রাস্তায় কাগজ, বোতল ইত্যাদি কুড়ায়। এমন সময় রাজু ও ইভার প্রবেশ।
রাজু : কিরে সাথী, তুই দি এহন আর স্কুলে যাসনা । লেহা-পড়া বন্ধ করলি ক্যান?
সাথী: মোরা গরিব মানুষ। স্কুলে যামু ক্যামনে? বাপ নাই। মার অসুখ। অষুধ কেনার টাহা নাই। কাগজ-কলম কিনমু কেমনে?
ইভা : কাগজ-বোতল টোকায়া আর কত পাওয়া যায়?
সাথী : যা পাই। ল্যাহা-পড়া কি আমাগো লেইগ্যা? তুই না মাইনষের বাড়ি কাম করছ? তোরে স্কুলে যাইতে দেয়?
ইভা : তুই জানোস না, আমি এখন রাজু গো ঘরে থাকি। তারা আমারে মাইয়ার মত জানে।ভালো জায়গায় থাকি, ভালো কাপড় পড়ি, ভালো খাই, লেহা-পড়া করায়, অসুখ-বিসুখ অইলে অসুধ কিন্যা দেয়। মনে অয় নিজের বাড়ি।
সাথী : ইসসি রে, সবাই যদি এমন অইতো? তাইলে আমাগো মত অসহায় শিশুগো কোন কষ্টই থাকতো না।
রাজু : আচ্ছা, তুই কি জানোস না, ওয়ার্ল্ড ভিশন অসহায় শিশুগো সাহায্য করে?
সাথী : না, মুই তো এর আগে হুনি নাই।
ইভা: হ, বই-খাতা থেইকা শুরু কইরা অনেক সুযোগ সুবিধা দেয়।
সাথী : আমারে দিবো নি?
রাজু : দিবো না ক্যান? অবশ্যই দিবো। চল তোরে ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিশু ফোরামের সদস্য বানায়া দেই।
ইভা: হ চল, বাড়ি যাওয়ার আগে তোরে অপিসে নিয়া যামু।
সাথী : কোন অপিসে?
রাজু : আমাগো শিশু ফোরামের অপিসে। যেইডা আমাগো ভরসা। অসহায়, অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত শিশুদের একমাত্র আশ্রয়।
সাথী : হ, আমারও তো মানুষ। আমরাও বাঁচার মতো বাঁচতে চাই। আমরাও আমাগো অধিকার চাই।
ইভা : চল তাইলে। ( উভয়ের প্রস্থান)। পেছনে ‘আমরা করব জয়.....’ গানটি বেজে উঠবে। সবাই ফ্রিজ।

চাইছি তোমার বন্ধুতা...

অনন্ত সালু:
কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। হঠাৎ এক বালিকা এসে সামনে দাঁড়ালো। বয়স তের কি চৌদ্দ। সাথে ওর বয়সী একটি ছেলে। মোটামুটি পরিচিত। তবে তেমন কোন ঘনিষ্টতা ছিল না আগে। মেয়েটি বলল,‘তুমি কি আমার বন্ধু হবে?’ কিছুটা অবাক হলাম। এইটুকুন মেয়ে বলে কি? তবুও বললাম,‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ ও বলল,‘তোমাকে বন্ধু দিবসের শুভেচ্ছা।’ হঠাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কি আর করা- হাতে ছিল ছোট্ট একটা বাতাবি লেবু। ওর হাতে দিয়ে বললাম,‘ছোট্ট বন্ধুকে এই ছোট্ট লেবুর শুভেচ্ছা।’ ও তাতেই মহা খুশি। ওরা হাসতে হাসতে চলে গেল।
পরদিন ওর সাথে থাকা ছেলেটার কাছে জানলাম, আমাকে নিয়ে ওদের মধ্যে বাজি হয়েছিল। ওদের ধারণা, আমি খুব গম্ভীর প্রকৃতির লোক। কেউ যদি আমাকে বন্ধু বানাতে পারে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। মেয়েটি বাজিতে জিতে গেল।
দু’দিন পর আবার দেখা। মেয়েটার হাতে একটা জবা ফুল। অনেক আশা নিয়ে ফুলটা চাইলাম। ও বলল, ‘এটা দেওয়া যাবে না। সবার হাতে ফুল মানায় না।’ আমি অপমান ও কষ্টে একবুক অভিমান নিয়ে চলে গেলাম। তারপর অনেক দিন কোন দেখা নেই।
হঠাৎ একদিন পাশে এসে দাঁড়িয়ে চমকে দিয়ে বলল,‘বন্ধু কী খবর?’ আমি অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বললাম,‘আমার কোন বন্ধু নেই। তাছাড়া সবার সাথে বন্ধুত্ব মানায় না।’ মেয়েটা আমার কথায় কষ্ট পেল। ওর চাঁদের মতো মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা নি:শব্দে চলে গেল। ওর পথপানে তাকিয়ে কেমন যেন বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। একটা অপরাধবোধ যেন গ্রাস করছে আমাকে। এ কেমন খেলায় মেতে উঠেছি আমরা।
পরদিন মেয়েটা এক বন্ধুর সাথে তার বাসায় যাচ্ছিল। পথ আগলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বললাম,‘গতকালের আচরণের জন্য আমি দু:খিত!’ ওর চোখ ভরে উঠলো জলে। কান্নাভেজা কন্ঠে বলল,‘দু:খিত আমার কোন বন্ধু নেই। আমি আপনাকে চিনিনা।’ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। 
হতে পারে সে বাজি ধরেছিল। আসলেই কি আমি গম্ভীর প্রকৃতির? আমি কি কারো বন্ধু হতে পারি না। তাছাড়া বন্ধুর সাথে অভিমান হতেই পারে। তাই বলে কি একটা সম্পর্ক অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে? তবে কি আমি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছি? কী এমন রহস্য লুকিয়েছিল ঐ ফুলে? ফুল দিতে না পারুক, তাই বলে কি কাঁটা দিয়ে তার প্রতিদান দিবে? আর কত বড় হবে অনুতপ্তের পাহাড়? এর শেষ কোথায়?
এক বছর গত হতে চলল। আর কোন কথা হয়নি সেই বালিকা বন্ধুর সাথে। হয়তো সে এখন বালিকা থেকে কিশোরী। একদিন কিশোরী থেকে যুবতী হবে। শেষে যুবতী থেকে বৃদ্ধা। তবুও তাকে বলবো, চাইছি তোমার বন্ধুতা...।

কালকিনি শিল্পকলা একাডেমি চলছে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মতো

- সালাহ উদ্দিন মাহমুদ :

মানুষ স্বভাবতই বিনোদন প্রিয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও তারা একটু বিনোদন খোঁজে। দুঃখের সাগরে ডুব দিয়েও সুখের মনি-মুক্তা আহরণ করতে চায়। এটা মানুষের চিরন্তন ধারা। আপামর মানুষের বিনোদন আকাঙ্খা নিবারণ করতে একদল মানুষ ‘নিজের খেয়ে বনের মেষ তাড়ানো’র মতো বিনোদন দিতে দিনরাত খেটে মরে। স্বার্থকতা এইÑ মনের ক্ষুধা মেটে।
মানুষের ক্ষুধা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। এক. পেটের ক্ষুধা দুই. দেহের ক্ষুধা তিন. মনের ক্ষুধা। পেটের ক্ষুধার জন্য প্রয়োজন পরিশ্রম, দেহের ক্ষুধার জন্য প্রয়োজন সঙ্গম আর মনের ক্ষুধার জন্য প্রয়োজন বিনোদন।
বিনোদনের জন্যই গড়ে তুলতে হয় শিল্পকলা। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডই আবহমান বাঙলার বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে প্রস্ফুটিত করতে তৎকালীন কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ খালেকুজ্জামানসহ অনেকেই। তাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠল একটি প্রতিষ্ঠান।
যখন স্থানাভাব দেখা দিল- সর্বসম্মতিক্রমে সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের লাইব্রেরি ভবনের মিলায়তন হলো এর অস্থায়ী কার্যালয়। সেখানে থাকতে হলো না বেশি দিন। স্থানান্তর করা হলো উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ৫ টি বিভাগ নিয়ে চলতে থাকে এর কার্যক্রম।
দেখতে দেখতে দাতা সদস্য ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, কালকিনি এডিপি’র আর্থিক সহায়তায় উপজেলার কাঁঠাল তলায় তোলা হলো নতুন ভবন। তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিনের তৎপরতায় ভাল একটি অবস্থানে চলে এলো কালকিনি শিল্পকলা একাডেমি ।
কিন্তু ‘অতি সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট’ হওয়ার মতো হঠাৎ করেই স্থবির হয়ে পড়লো একাডেমির কার্যক্রম। পরিচালনা পরিষদের অন্তর্দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সংকটসহ নানাবিধ কারনে দিনদিন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মত চলছে প্রতিষ্ঠানটি। হতাশ হয়ে পড়লো বিনোদন প্রিয় মানুষগুলো।
একাডেমির বর্তমান অবস্থা বড়ই নাজুক। নৃত্য, সংগীত, চিত্রকলা, আবৃত্তি ও নাট্যকলা বিভাগ থাকলেও নৃত্য, সংগীত, চিত্রকলা চলছে খুড়িয়ে খুড়িয়ে। আবৃত্তি ও নাট্যকলা রয়েছে নিষ্ক্রিয়। যে তিনটি বিভাগ চালু আছে তাতে আবার দক্ষ প্রশিক্ষক না থাকায় আগ্রহ হারাতে বসেছে  শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে স্বজনপ্রীতির অভিযোগেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অনেকে। একাডেমির বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ জনের মতো। সবাই শিশু; যেন প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ নিষেধ। অনেকটা শিশু একাডেমির মতো। মাঝে মাঝে বিভ্রম হয় যে, এটা কি শিল্পকলা একাডেমি না শিশু একাডমি। সে যাই হোক, এখানে প্রশিক্ষক রয়েছেন তিন জন। সংগীতে সীমা সাহা ও মিলন বড়াল আর চিত্রকলায় আনোয়ার হোসেন। এদের সম্মানী ভাতা কম হওয়ায় কাজের প্রতি দরদও কম। এখানে কেয়ারটেকার ও প্রশিক্ষকের ভাতা সমান বলে অনেকের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে। এছাড়া প্রশিক্ষকদের চার - পাঁচ মাসের ভাতাও বকেয়া রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন তারা।
এখন কথা হচ্ছে- সবকিছুর মূলে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা। সাদামাঠাভাবে ‘ওঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ বলে চালাতে  হচ্ছে অনুষ্ঠান। দিনদিন শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহ হারাতে বসেছে সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মানুষ বিনোদনবিমুখ হয়ে পড়বে। আস্থা হারাবে শিল্প- সংস্কৃতির ওপর। এখনই সময় ঘুরে দাঁড়াবার। হারিয়ে যাওয়া যৌবন ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন মানসিক শক্তি। সঠিক পরিচর্যাই দূর করতে পারে পক্ষাঘাত সমস্যা।
একটু আন্তরিকতা, উদার মানসিকতা ও পরিষ‹ার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে পারে কালকিনি শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান চেহারা। মুখ ফেড়ানো মানুগুলোকে টেনে আনতে পারে বটতলা, হাটখোলা ও নবান্ন উৎসবে কিংবা বর্ষবরণে। ‘এসো মিলি সৃষ্টির মোহনায়, গড়ে তুলি সুন্দর আগামী’-এই হোক আমাদের দীপ্ত শপথ।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ,
লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতি কর্মী

অন্ধকার

- বিমূর্ত প্রত্যয়

আমি কোথাও কোন আলো দেখিনি-
দেখেছি-
দুর্গন্ধময় ড্রেনে জারজ শিশুর কান্না।
দেখেছি -
মানুষ রূপী নরপিশাচের শিকারী
দুর্বল নারীর অসহায়ত্ব।
দেখেছি -
রাস্তার পাশে বস্ত্রহীন এক পাগলীকে।
দেখেছি -
স্বার্থান্বেষী সমাজের অবিচার।
দেখেছি -
নিঃস্ব জীবনের দিশেহারা চিত্র।
দেখিনি -
কোথাও কোন মনুষ্যত্বের আলো।
অন্ধকার....অন্ধকার...অন্ধকার দেখেছি।