শনিবার, ১২ মে, ২০১২

বৃষ্টির সাথে সন্ধি

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

রিম ঝিম ঝিম বৃষ্টি ঝরে
টিনের চালে ঐ,
মেঘ ডাকে গারুম-গুরুম
ডাঙায় ওঠে কৈ।
   
খাল-বিল জলে থৈ থৈ
নদী ডাকে বান,
তাই দেখে খোকা-খুকুর
নেচে ওঠে প্রাণ।

রিম ঝিম ঝিম বৃষ্টি ঝরে
বর্ষা এলো ঐ,
বিলে ফোঁটে শাপলা-শালুক
খোকা-খুকু কই?

খোকা-খুকু বদ্ধ ঘরে
করছে বসে ফন্দি,
বাবা-মা আড়াল হলে
হয়ে যাবে সন্ধি।

কালকিনি প্রবাহ

- আকন মোশাররফ হোসেন
(পূর্ব প্রকাশের পর)
বিলুপ্ত হয়ে গেছে এখানকার খরস্রোতা নদী-নালা। টেংরা নদী, রাজমনী নদী ও গজারিয়া নদী এখনো নদী নামের স্মারক বহন করে আছে। তবে ডাকের চর নদী ও গজারিয়া নদী শত বছর পর্যন্ত নামের স্বার্থকতা বহন করে এখন শুধু গজারিয়া ও ডাকের চর খাল ক্ষীণাবস্থায় বয়ে চলেছে। এই দুটি খালই বাঁশগাড়ী ইউনিয়নে রয়েছে।
রাজমনী নদী পালরদী নদীর ঠাকুর বাড়ি থেকে উৎপত্তি হয়ে শিকারমঙ্গল ও এনায়েত নগর ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে আঁকা-বাঁকা বয়ে গেছে ভবানীপুর ও মৃধা কান্দির নিকট আড়িয়াল খা নদীতে পতিত হয়েছে। এই নদী এখন শুধুই ঠাকুর বাড়ি, সমিতির হাট, মিয়ার হাট খাল।
কথিত আছে যে, জমিদার রাজ মহন দাসের বাড়ির নিকট দিয়ে প্রবাহিত বলে রাজমনি নদীর নাম পত্তন ঘটেছিল। অপর একটি বেশি দৈর্ঘ খাল যেখানে বর্ষায় দুর্গাপুজা উৎসবে নৌকা বাইচের জন্য বিখ্যাত ছিল। এই খালটি মাদারীপুর সদর থানার ঘটকচর - মস্তফাপুর কুমার নদী থেকে ডাসার, কাজী বাকাই, গোপালপুর ও বর্তমান কালকিনি পৌরসভার দক্ষিণ-পশ্চিম খাঞ্জাপুর সীমানা দিয়ে ঝুরগাও বাজারের পশ্চিমপাড়ে মাইড্যাল খেয়াঘাটের নিকট পালরদী নদীতে উপনিত হয়েছে। এই খালটির নাম আমানতগঞ্জ খাল। কাল প্রবাহে এখন খাল নামেই পরিচিত। তবে এই খাল সমুহের যৌবনে পালরদী ও কুমার নদীর মতোই খরস্রোত ছিল।
অপর একটি খাল শরীয়তপুর জেলার পট্টি বাজারের পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে নাগের পাড়া, খাসের হাট, কাচারী বাজার, আকাল বরিশ হয়ে আড়িয়াল খাঁ নদীতে মিলিত হয়েছে। এই খালটি যৌবনে টেংরা নদী নামে পরিচিত ছিল। এই টেংরা নদী দিয়ে এক সময় নারায়নগঞ্জ, ঢাকা, চাঁদপুর থেকে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী জাহাজ ও স্টিমার আড়িয়াল খা নদী ও কুমার নদী হয়ে কোলকাতা যেত এবং আসতো। ইংরেজ আমলে ১৮০০ সালের শেষ দিকে টেংরা নদীর ভাঙণে নদীর দুই পাড়ের লোকজন গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ।
তখন ইংরেজ শাসক নদীর দুই পাড়ের অসহায় মানুষের জন্য আশ্রয় শিবির তৈরি করে তাদের পুণর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এই শিবিরের খাদ্যসামগ্রী টেংরা নদী দিয়ে কোলকাতা থেকে জাহাজ-স্টীমার যোগে আসতো। এই নদী পাড়ের আশ্রয় শিবিরের লোকদের আকালী বলা হতো। সেই থেকে নদীর দুই পাড়ের মৌজার নাম আকাল বরিশ নামে পরিচিত। পরবর্তী কালে ভূমি জরিপে উত্তর ও দক্ষিণ আকাল বরিশ রাখা হয়।

(চলবে)   

মাদারীপুরের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অবলম্বনে ‘একটাই চাওয়া’

আ জ ম কামাল :
‘স্বাধীনতার ৪০ বছর ও শিল্পের আলোয় মহান মুক্তিযুদ্ধ’- স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর এ মহতী আয়োজনের জন্য শিল্পকলা একাডেমীর মহা পরিচালক লিয়াকত আলী লাকীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সাথে সাথে জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুরের যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সভাপতি ও সদস্য সচিবসহ সবার প্রতি আমি চির কৃতজ্ঞ। এছাড়া নাটকের প্রাণ মাদারীপুর সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ ও কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে কলেজ পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক ‘একটাই চাওয়া’ মঞ্চস্থ করতে পেরে আমি আনন্দিত ।
গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় মাদারীপুরের স্বাধীনতা অঙ্গনের মুক্তমঞ্চে ও গত ৫ মে ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে ‘একটাই চাওয়া’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। নাটকে আমীরন চরিত্রে মাহমুদা খান লিটা ও ঝুমা, রফিক চরিত্রে সাজ্জাদ হোসেন, সাজু চরিত্রে লুবনা জাহান নিপা, বয়াতি চরিত্রে আমি আজিজুল ইসলাাম স্বপন, বাদল চরিত্রে সালাহ উদ্দিন মাহমুদ, মানিক চরিত্রে বি এ কে মামুন ও আশিষ রায়, রফিকের মা চরিত্রে শাকিলা আক্তার, ওয়াজেদ আলী চরিত্রে নাহিদুল ইসলাম মুকুল, কেতর আলী চরিত্রে সঞ্জীব তালুকদার, মেজর চরিত্রে শান্ত কুমার, মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে মৃণাল কান্তি বালা , বাচ্চুর বাবা চরিত্রে নির্মল মন্ডল নিলয়, পাক হানাদার চরিত্রে মাইনুল ইসলাম ও সাইদুল ইসলামের অভিনয় দর্শকদের আকৃষ্ট করেছে।
মাদারীপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে সুতীক্ষè মেধা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ‘একটাই চাওয়া’ নাটকটি রচনা করেন আজিজুল ইসলাম স্বপন। তার রচনার ক্ষেত্রে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাটক বিভাগের ছাত্র সালাহ উদ্দিন মাহমুদ অনেক পরিশ্রম করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও সংলাপ সংশোধনের মাধ্যমে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে নাটকটিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের সমন্বয়ে আমি নাট্য প্রশিক্ষক আ জ ম কামাল নির্দেশনার দায়িত্ব নিয়ে নাটকটিকে প্রাণবন্ত করার চেষ্টা করেছি। এছাড়া বিভিন্নভাবে যারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুর জেলায় ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা ফুটে উঠেছে ‘ একটাই চাওয়া’ নাটকে। সোলেমান বয়াতির সংসারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যেতে থাকে নাটকের কাহিনী। সোলেমান বয়াতীর স্ত্রী আমিরনের সম্ভ্রম হারানো। পাক হানাদারের নির্যাতনে সাজুর মৃত্যু। যুদ্ধে গিয়ে শেষ অবধি রফিকের ফিরে না আসা। কিশোর বাচ্চুর যুদ্ধে অংশগ্রহণ। রাজাকার ওয়াজেদ আলী ও কেতর আলীর কুদৃষ্টি একাত্তরের পৈশাচিক দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে। সুফিয়া, বেনু, পান্না ও নুরুল ইসলামের আত্মত্যাগ দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে তোলে। সবশেষে বাচ্চুর বাবা, বয়াতী, বাদল ও মানিকের কন্ঠে দৃঢ়তার সাথে উচ্চারিত হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। অভিনেতাদের সাথে সাথে দর্শকরাও গর্জে ওঠে।

আ জ ম কামাল
নির্দেশক,
একটাই চাওয়া,
জেলা শিল্পকলা একাডেমী, মাদারীপুর।

সুখ-দুঃখ

-কৃষ্ণকলি

ছোট ছোট কষ্ট বড় কষ্টে পরিণত হয়,
যখন সে বলে মুক্তি দেব তোমায়।
বিন্দু বিন্দু জল মিলে ঝর্ণা হয়,
যখন সে বলে ভালোবাসিনা তোমায়।
একটু একটু হাসি অনেক আনন্দে পরিণত হয়,
যখন সে বলে বকবোনা তোমায়।
ছোট ছোট সুখ বড় সুখে পরিনত হয়,
যখন সে বলে ঠকাবো না তোমায়।
-‘ভয় পেও না আমি আছি না!’
-‘ তুমি আছ বলেই ভয় হয়।’

নিজেকে অচেনা লাগে

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখি-
নিজেকে নিজের কাছে অচেনা লাগে,
আঁৎকে উঠি ভয়াবহতা দেখে।

চোখ দু’টি মনে হয় আমার নয়,
ও চোখে কার যেন ছাঁয়া পড়েছে।
কপালে কার যেন দুঃখের তিলক,
তাকিয়ে থাকি অপলক।

ও মুখ বড়ই বিকৃত- অসুন্দর,
হিংস্রতা আর কামের খিস্তি-খেউর।
জিহ্বা সর্বদাই থাকে লালায়িত।

নিজেকে নিজের কাছে অচেনা লাগে,
সক্রেতিসকে প্রশ্ন করি বারে বারে
নিজেকে চিনবো কী প্রকারে?
সদুত্তর মেলে না কস্মিনকালে....।
কালকিনি, মাদারীপুর।

আমরা তোমাকে ভুলবো না

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ:
যাদের আত্মত্যাগে আমাদের প্রিয় স্বদেশ আজ স্বাধীন। আমরা তাদের কতটুকু সম্মান করতে পেরেছি। এ প্রশ্ন সবার কাছে। কেননা স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও শহীদ এম নুরুল ইসলামের কোন স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি তাঁর পৈত্রিক বাড়ি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ বাঁশগাড়ী( পরিপত্তর) গ্রামে। বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে তাঁর নাম। স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা সড়কের নামকরণ করা হয়নি তাঁর নামে। এমনকি ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু দিনেও স্মরণ করতে পারিনি তাঁকে। তবেকি আমরা তাঁকে ভুলতে বসেছি?
উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পরিপত্তর গ্রামে গিয়ে কথা হয় শহীদ বীর বিক্রমের ভাই মুক্তিযোদ্ধা আঃ কুদ্দুস শিকদারের সাথে। ভাইয়ের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে কান্না ভেজা কন্ঠে জানান অনেক অজানা কথা। তাঁরা চার ভাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। এক ভাই শহীদ হয়েছেন। তাদের বাবার নাম লাল মিয়া শিকদার। মা জহুরা বেগম।
শহীদ বীর বিক্রম এম নুরুল ইসলাম বিবাহিত ছিলেন। স্ত্রীর নাম ফাতেমা বেগম। তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। শহীদ এম নুরুল ইসলাম চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন পিলখানা ইপিআর হাসপাতালে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াবহ কালোরাতে পিলখানা ইপিআর হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বোরোচিত হামলার একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। পাকিস্তানী হাবিলদার শফি তাকে আক্রমন করে। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে কৌশলে পাকিস্তানী হাবিলদারকে আটক করে রাইফেলটি কেড়ে নেন। হাবিলদার শফিকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে হামাগুড়ি দিয়ে ময়লার ড্রেনে ডুকে পড়েন। হানাদার বাহিনী টের পেয়ে ড্রেনের মুখে গুলি চালায়। নুরুল ইসলাম ড্রেনের ভেতর দিয়ে পিলখানার এক নম্বর গেটের কাছে এসে পাহাড়ারত পাকিস্তানি সৈনিকদের মুভমেন্ট লক্ষ্য করে ড্রেন থেকে বের হয়ে বাঙ্গালী ডাঃ মেজর এমএ রশিদের বাসায় পৌঁছান। এমএ রশিদের পরামর্শে আত্মরক্ষার্থে পাক হাবিলদার শফিকে ছেড়ে দেন।
নুরুল ইসলামের অপর সহদর পাকিস্তান সেনা সদস্য সিরাজুল হক শিকদার । তিনি করাচি যাওয়ার জন্য ঢাকা ক্যান্টনম্যান্ট ট্রানজিট ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে তাকে কৌশলে বের করে আনেন। এবং অপর সহদর এসএম আবু তাহেরকে হাজারিবাগ থেকে এনে নারায়ণগঞ্জ টার্মিনালে পৌঁছান। সেখানে কয়েকশত নির্যাতিত ও আশ্রয়হীন মানুষকে সাথে নিয়ে নাটকীয়ভাবে একটি স্টিমার দখল করে মাদারীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। চালকের অভাবে নিজেই স্টিমার চালানোর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু জ্বালানির অভাবে শরীয়তপুর জেলার গোসাইর হাট উপজেলার পট্টি ঘাটে স্টিমার থামান। বাঙালীদের স্টিমার দেখে সেখানে লোক জড়ো হতে থাকলে তিনি সবার উদ্দেশ্যে ঢাকার গণহত্যার বিবরণ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আহ্বানে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ডাক দেন।
পরে নিজের এলাকায় এসে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদের চেয়ারম্যান কর্ণেল শওকত আলীর সহায়তায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সীমান্ত এলাকায় চলে যান। সেখানে এ্যাডভোকেট মতিউর রহমানের সহায়তায় যুদ্ধ চালিয়ে চান। এসময় তিনি ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিল, ফ্লাইট সার্জেন্ট মোঃ ফজলুল হক, মুক্তিযোদ্ধা ইলিয়াস আহমেদ, মেজর এম শাজাহান ওমর বীর উত্তম ও মেজর জেনারেল এএসএম নাসিম বীর বিক্রমের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। কিছুদিন পর সীমান্ত এলাকা ছেড়ে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ ঘাট এলাকায় এসে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ করে গানবোট ডুবিয়ে দেন। এপ্রিল মাসে বরিশালের শিকারপুর এলাকায় নয় নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিলের পরামর্শে বিশেষ অপারেশনে প্রায় পঞ্চাশ জন পাকসেনাকে হত্যা করেন। এবং সেখানে কিছুদিন অসুস্থ্য মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা প্রদান করেন। ৩০ জুলাই সংগীয় ফোর্স নিয়ে শ্রীপুর বিওপি দখল করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর অপারেশন চালিয়ে খুলনার পারুলিয়া ব্রীজ ধবংস করেন। ১৯ সেপ্টেম্বর মাদারীপুরের সিএনবি এলাকায় পাক আর্মি অ্যাম্বুশ করলে তার পরিচালনায় বিশ জন রাজাকার, তিন জন পাক আর্মি হত্যা করেন। এ সময় আট জন রাজাকার আটক, সাতটি রাইফেল ও কয়েক বাক্স গুলি উদ্ধার করেন।
সবশেষে ২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা- বরিশাল সড়কে পাকবাহিনীর যাতায়াতে বিঘœ ঘটানোর জন্য কালকিনির গোপালপুর ব্রীজে মাইন বিস্ফোরণ শেষে ফেরার পথে রাজাকার ও পাক আর্মির আক্রমণে বুলেট বিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। কিন্তু তার লাশ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শণের জন্য শহীদ এম নুরুল ইসলামকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালে সরকারি গেজেট অনুযায়ি তাঁর বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ১০৪। এসব এখন কেবলি ইতিহাস। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও তাঁকে স্মরণ করে রাখার মত কোন স্তম্ভ বা স্থাপনা তৈরি হয়নি। নিজ একালায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন স্থাপনার নামকরণও করা হয়নি তাঁর নামে। শুধু গত ৯ এপ্রিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন খাসের হাট-পরিপত্তর সড়কটি তাঁর নামে নামকরণ করেন। এলাকাবাসীর দাবি প্রস্তাবিত আড়িয়াল খাঁ সেতুর নামকরণ তার নামে করা হোক।
শহীদ এম নুরুল ইসলামের ছেলে কাওছার আহমেদ বলেন,‘দেশের স্বাধীনতার জন্য আমার বাবা জীবন উৎসর্গ করেছেন। এজন্য আমি গর্বিত। আমার বাবা শহীদ হওয়ার পর আমাকে ও আমার বোনকে আমার চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক শিকদারই লালন পালন করেছেন। আমাদের পুরো পরিবার মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আমার চাচারাও বীর মুক্তিযোদ্ধা। এটা আমার জন্য বড় ধরণের প্রাপ্তি।’

শুক্রবার, ১১ মে, ২০১২

কালকিনি প্রবাহ

-আকন মোশাররফ হোসেন
( পূর্ব প্রকাশের পর)
জালালপুর বা ইদিলপুর পরগোনার মুল মৌজার নাম লক্ষ্মীপুর। ‘দামুসা মেলা’র প্রায় এক বর্গমাইল আয়তনের জায়গা ছিল। বর্তমানে জনবসতিপূর্ণ ও চাষাবাদের ফলে ‘দামুসা মেলা’র জায়গা ক্ষীণ হয়ে আছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ঐ এলাকার আর.এস এবং এস.এ কোন জরিপেই জরিপ হয় নাই।
জমিদার ভগোলা সুন্দরীর নামে এখনও তপসিল ভুক্ত আছে। বর্তমান বি.আর.এস জরিপে ‘দামুসা মেলা’র জমিটি পতিত আছে। আর বাকি জমি দখলদার এলাকাবাসীর নামে জরিপ করা হয়েছে।
কালকিনি থানা একটি পরিবর্তিত নাম। মাদারীপুর মহকুমার উজানে পদ্মা নদী আর দক্ষিণে মেঘনা নদীর মধ্যস্থল ভাগের সংযোগ রক্ষাকারী আড়িয়াল খাঁ নদী। কালকিনি থানার ভৌগোলিক অবস্থানে এ অঞ্চলের ভূ-গঠনে প্রবাহিত নদীগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কালকিনি থানার ভূ-ভাগের মধ্য দিয়ে আড়িয়াল খাঁ নদী, পালরদী নদী, গজারিয়া নদী, কাচিকাঁটা-তুলাতলা নদী, øানঘাটা নদী ( ছোট গাঙ) এবং টেংরা নদীর সিকস্তি ও চরাঞ্চল এলাকায় বেলে মাটির আধিক্য অত্যন্ত বেশি।
তবে এ উপজেলার আবাসযোগ্য জমির জনবসতি খুব প্রাচীন নয়। হাজার বছরের ভূ-গঠন প্রক্রিয়ায় চলছে প্রকৃতির বিচিত্র লীলায় লীলায়িত ভাঙ্গা-গড়ার বিচিত্র অভিজ্ঞতায় বিকশিত এক বিস্ময়কর ঐতিহ্যের স্মারক। ভূ-প্রকৃতি নিয়ত: ভাঙ্গা-গড়ায় এ এলাকার পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে জনজীবনে সুগভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। এখানকার মানুষ সিংহশার্দুল, সংগ্রামী। কখনও শান্ত- সৌম্য- সংযমী। কঠোরতা-কোমলতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে পল্লবিত এখানকার গণমানুষ কালকিনি থানা বা উপজেলার পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের স্থলভাগ ও জনবসতি অনেকটা একেবারেই স্থিতিশীল। এবং প্রাচীনত্বের দাবিদার।
তবে পূর্বাঞ্চলের লক্ষ্মীপুর, বাঁশগাড়ী, চর দৌলত খান, চর সাহেবরাম পুর, রমজান পুর, শিকার মঙ্গল ও এনায়েত নগরসহ পালরদী নদীর পশ্চিম পাড় এলাকা এক সময়ে গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। বাঘ, ভালুক, চিতাবাঘ, মহিষ, বানর ও শুকরের আস্তানা ছিল এই কালকিনির অঞ্চলে। ১৭৯২ সালে বাঘ শিকারের জন্য সরকারিভাবে পুরস্কৃত করা হতো। বিষয়টি এখনো কথিত আছে। ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত শীত মৌসুমে ঘোসের হাট, শেওলাপট্টি এবং পূর্বাঞ্চলের গজারিয়া ও টেংরা নদীর উভয় অঞ্চলের বনভূমিতে মহিষের সমাগম ছিল। সে সময়ে শখ করে মানুষ ঘোড়া লালন-পালন করত। নিজের বাহন হিসাবে ব্যবহার করতো। একটু সৌখিন মেজাজের মানুষেরা ঘোড়ায় চড়ে যাতায়াত করতো। ১৯২৬ সালে øানঘাটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর মুলাদীর ছফিপুরের মাওলানা আঃ মাজেদ নিয়মিত ঘোড়ায় চড়ে মাদ্রাসায় আসতেন। এছাড়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পুর্বে ও  পরেও ১৯৭৩/৭৪ সাল পর্যন্ত পাঙ্গাশিয়া ও শেওলাপট্টির জঙ্গলে শুকর ও বানর- হনুমান দেখা যেত। বর্তমানে এ প্রজাতিগুলো এখন বিলুপ্ত। (চলবে)

প্রবন্ধ: উন্নত জাতি গঠনে ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি

জাহিদ হাসান
 বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। অধিকাংশ লোক দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করছে। জনসংখ্যা অনুযায়ী দিন দিন বেকারত্বের সংখ্যা বেড়ে চলছে জ্যামিতিক হারে যা জাতির উন্নয়নের পথে বড় ধরনের বাধা হিসেবে কাজ করে। তাই মানুষ জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য নানা ধরনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে অনেক নীতি গর্হিত কর্মকান্ড, ধনী শ্রেণীর নিপীড়ন যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে দরিদ্র মানুষের নিত্য দিনের আহাজারি। হতদরিদ্র নিঃস্ব মানুষগুলো বাধ্য হয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেয়। অন্যদিকে সুস্থ সবল মানুষ ছদ্মবেশে ভিক্ষা করে বড় অংকের টাকা সঞ্চয় করে রাতারাতির বাড়ি গাড়ীর মালিক হয়ে যাচ্ছেন।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ঢাকার শহরে ভিক্ষা করে বাড়ি করেছেন এমন ঘটনা বাস্তবে রয়েছে। প্রথমে শখের বশে বা সুকৌশলে জীবিকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করলেও পরে ভালো আয় হওয়াতে পেশা হিসেবে বেছে নেয়। বাংলাদেশে মোট জনসখ্যা ১৬ কোটি তাই যারা ভিক্ষা করেন তারা হিসেব করে ১ লক্ষ লোক ১ টাকা করে দিলে কত দিন লাগে টাকার মালিক হতে। অন্ধ, খোড়া, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী অল্প বয়সী বা বয়স্ক মানুষদের অপহরণ করে বা অল্প অর্থে ক্রয় করে দালালরা বিভিন্ন যায়গায় বসিয়ে দেয়। দালালদের কথা মতে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, মসজিদের সামনে, লোকালয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি স্থানে জীর্ণ, শীর্ণ সাজসজ্জা এবং ভিক্ষা চাওয়ার বাচন ভঙ্গি শিখিয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে দালাল বা ভিক্ষাবৃত্তির মস্তান চক্র খুবই অমানবিক আচরণ করে থাকে।
বাংলাদেশে এমনও ভিক্ষুক নেতা বা সর্দার আছেন তার অধীনে ১০/২০ জন ভিক্ষুক একটি নির্দিষ্ট এলাকায় ভিক্ষা করেন। সারা দিন ভিক্ষা করে যা পান তার সিংহ ভাগ নিয়ে যায় নেতারা আর যথা সামান্য পায় ভিক্ষুকরা। এতে করেন খুব সহজে মোটা অংকের টাকা উর্পাজন করছে বিনা পরিশ্রমে। আমাদের দেশের রন্দ্রে রন্দ্রে দূর্নীতি গ্রাস করার ফলে এবং সবর্ত্র স্বজন প্রীতির কারনে ধনীরা আরো ধনী আর গরীব মানুষেরা দিন দিন দারিদ্র থেকে দারিদ্র সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। যার ফলে অসহায় মানুষ নিরুপায় হয়ে ভিক্ষাবৃত্তির মতো আপত্তিকর পেশা বেছে নিচ্ছে। অভাবের কারনে, মসজিদ বা মাদ্রাসা নির্মাণের কথা বলে, শখের বশে বা ছদ্মবেশে ভিক্ষা করা বা দল নেতা হওয়া সবই ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে পড়ে। মানুষের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে মসজিদের পাশে (জুমার দিনে) , ঈদের জামাতের পাশে, মাজার সংলগ্ন এলাকায়, হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশে পাশে ভিক্ষা করার প্রবনতা বেশী দেখা যায়। বাংলাদেশে যতগুলো সামাজিক সমস্যা বিদ্যমান তার মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি অন্যতম। সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা যদি এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন না করেন তাহলে সময়ের পালাক্রমে এ সমস্যা সমাজে প্রকট আকার ধারন করবে যা সভ্য জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরী করবে। একটি উন্নত জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে হলে সবাইকে কর্মঠ হতে হবে। আমরা অহরহ ধর্মের দোহাই দিয়ে থাকি কিন্তু আমাদের ইসলাম ধর্ম কত কঠোরভাবে ভিক্ষাবৃত্তি নিষেধ করেছেন তা মেনে চলি না। ১৬০১ সালে ইংল্যান্ডে ভিক্ষাবৃত্তি চরম আকার ধারণ করেছিল তখন রানী এলিজাবেধ শক্ত হাতে সেদিন ভিক্ষাবৃত্তি নির্মুল করার কারনে আজকে যুক্তরাজ্য উন্নত জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাড়াতে পেরেছে। ভিক্ষাবৃত্তি যে কোন জাতির কাছে একটি লজ্জাজনক বিষয়। আমাদের দেশে ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে রুপ লাভ করেছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এ অবস্থার উন্নয়ন করা দরকার। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে এই বিশ্বায়নের যুগে কোনো ভাবেই ভিক্ষাবৃত্তি কাম্য নয়। ভিক্ষাবৃত্তির ফলে জাতি দিন দিন অলস হয়ে যাচ্ছে যার ফলে আমাদের জনশক্তি কাজে লাগছে না। জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে অনেক পিছনে পড়ে আছি। সুতরাং ভিক্ষাবৃত্তি জাতির জন্য অভিশাপ বয়ে আনছে। একটি উন্নত জাতি গঠনের ক্ষেত্রে ভিক্ষাবৃত্তি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি। তাই এখনই সমাজ থেকেই ভিক্ষাবৃত্তির মূলৎপাটন করতে হবে।
লেখক- নির্বাহী সম্পাদক,সাপ্তাহিক কালকিনি।

কবি

রোহিনী কান্ত রায়

কল্পপ্রিয় একটি প্রাণী কবি,
ঘরে বসে বসে কি অবলিলায় দুনিয়া চষে বেড়ায়
তুমুল সাওয়ারী হয়ে আলোকিত সব শব্দ ডানায়
সীমার প্রাচীর দেখেনি কোনদিন তার অবারিত পদরেখায়।

কল্পাশ্রয়ী জীব কবি
যতটুকু না দেখেছে নিজে
তারি সহস্রগুণ বেশি দেখিয়েছে পরম বিশ্বস্ততায়
চেতনার অনুভবে তার মুগ্ধ ভক্তকে।
দেখ, দেখ কি সহজে যুক্তিতর্কের জাল কেটে, কার্যকারণ
সম্পর্ককে ভীষণ ডিঙিয়ে এখনো ( বিজ্ঞানমনস্ক যুগ) বিশ্বসের
বীজ বুনে চলে মানুষের পাথর মনে- ইনিয়ে বিনিয়ে বলা কথায়
নিজে যা কোনদিন দেখেনি তাই  লেখে
অথবা লিখেও নিজেই বোঝেনি কোনদিন তার মানে-
তবুও কৌতুহল বাড়ে মানুষের তার প্রতি
তবুও কংক্রিট ভেঙে বিশ্বাসের ঢল নামে অতি, তার প্রতি
কি অদ্ভুত ঈশ্বর অনুমোদিত এক জীব
‘‘ কবি যা রচে তাই সত্য
ঘটে যা তার সব সত্য নয়।”

কবির মুখে স্বীয় স্তুতি শোনার জন্য স্বর্গের দেবতা সব
উন্মুখ হয়ে আছে, দেবতা জানে তার মানে
অমৃত পান করে দেবতা যে টুকু অমরত্ব পেয়েছে
তারি চেয়ে বেশি অমরত্ব লভেছে মর্তের
কোন কোন মানুষ কবির স্তুতি গানে।

জলঢাকা, নীলফামারী।

কালকিনির নাট্যাঙ্গনে আলোচিত নাম প্রথমা রঙ্গমঞ্চ

কাজী নিয়ামুল ইসলাম:
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় ২০০৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর গড়ে ওঠে ‘প্রথমা রঙ্গমঞ্চ’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এক ডজনেরও বেশি নাটক মঞ্চস্থ করে দলটি। সাংস্কৃতিক কর্মী সালাহ উদ্দিন মাহমুদের প্রচেষ্টায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও বেশ সুনাম অর্জন করে প্রথমা রঙ্গমঞ্চ।
প্রথমে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের লেখা হাস্যরসাত্মক নাটক দিয়ে শুরু। মহড়া চলে পৌর মার্কেটের ছাদে। নারী নাট্যকর্মী না থাকায় কোন নারী চরিত্র ছিলনা। ২০০৮ সালে কালকিনি শিল্পকলা একাডেমীর বৈশাখী মেলা মঞ্চে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনা ও পরিচালনায় ‘মুকুট বাবার মাজার’ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এরপর সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনায় কাজী নিয়ামূল ইসলাম, এইচ এম মিলন, জাহিদ হাসান, বি এ কে মামুন, মেহেদী হাসান, মাইনুল ইসলাম ও নাফিজ সিদ্দিকী তপুর পরিচালনায় আ.জ.ম কামালের নির্দেশনায় ‘ঘৃণা নয় ভালোবাসা চাই’, ‘আলোর পথে’,‘ ডিসকো ফকির’,‘ কালচারাল ফ্যামিলি’,‘বোকার হদ্দ’,‘ঘাতক’,‘যুদ্ধাপরাধী’,‘কাপুরুষ’ ও ‘মুক্তি’সহ বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়।
এছাড়া লিয়াকত আলী লাকীর ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’,সেলিম আল দীনের ‘বাসন’,মমতাজ জামানের ‘মুক্তির জননী’,এস.এম সোলায়মানের‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচাল’,মান্নান হীরার‘ফেরারী নিশান’ ও মলিয়েঁরের ‘পেজগী’ মঞ্চস্থ হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে পটুয়াখালীর ভান্ডারিয়ায় ওয়ার্ল্ড ভিশনের আমন্ত্রণে‘ঘাতক’মঞ্চস্থ হয়। একই বছর মার্চ মাসে যশোরে ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ‘মুক্তি’ নাটক মঞ্চস্থ করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। কিন্তু অভাব দেখা দেয় স্থান ও অর্থের। এগিয়ে আসে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ-কালকিনি এডিপি, প্রেসক্লাব,শিল্পকলা একাডেমি,সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, মো: খালেকুজ্জামান,মো: মনিরুজ্জামান, মসিউর রহমান সবুজ, শহীদ খান ও খায়রুল আলমসহ অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে প্রথমা রঙ্গমঞ্চ। উপজেলার যেকোন অনুষ্ঠানে নাটক পরিবেশনের জন্য ডাক পরে দলটির।
প্রথমা রঙ্গমঞ্চের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এর পরিচালক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ জানান,‘শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম। আজ একটা অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছি। কালকিনির নাট্যাঙ্গণ তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। কিন্তু এখানে কোন অডিটোরিয়াম নেই। আশা করি সে স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে। আমরা থেমে থাকবো না।’

বৃহস্পতিবার, ১০ মে, ২০১২

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ

মাইনুল ইসলাম:
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার একটি আলোচিত নাম। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। কালকিনির বিনোদন জগতে যার অবদান অপরিসীম। ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র নেশায় যিনি ছুটে যান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ঘুণে ধরা সমাজের জন্য কিছু করার ব্রত নিয়ে যিনি এগিয়ে যেতে চান বহুদূর। আজ তাকে নিয়ে আমাদের আয়োজন।
জন্ম :
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্র“য়ারি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের উত্তর উড়ার চর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম জেড এম এ মাজেদ। একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। মাতা হাসনে আরা। একজন আদর্শ গৃহিনী। ৬ ভাই ১ বোনের মধ্যে বাবা-মার তৃতীয় সন্তান।
শিক্ষা জীবন:
øানঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পার্শ্ববর্তী øানঘাটা ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ২০০২ সালে দাখিল পাশ করেন। ২০০৪ সালে ঢাকার নয়াটোলা এ ইউ এন কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম পাশ করেন। মাদ্রাসা-ই- আলিয়ায় ফাজিল শ্রেণিতে ভর্তি হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিজ এলাকার কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিএ ( সম্মান) শ্রেণির বাঙলা বিভাগে ভর্তি হন। ২০০৮ সালে সম্মান শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে এমএ ( বাংলা) শ্রেণিতে অধ্যয়নরত রয়েছেন।
কর্মজীবন:
ছাত্রাবস্থায়ই ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, কালকিনি এডিপি’র স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্পের পিয়ার এডুকেটর হিসাবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তিতে ওয়েস্টার্ন কোচিং সেন্টারে বাংলা, অক্সফোর্ড কোচিং সেন্টারের ধর্মীয় ও শিশুকানন কিন্ডার গার্টেনের প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক হিসাবে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি ২০০৭ সাল থেকে দৈনিক দেশবাংলা পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন।
সাহিত্য চর্চা:
তৃতীয় শ্রেণিতে থাকাকালীন ছোটগল্প লেখার মাধ্যমে সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। ২০০৩ সালে মাদারীপুর থেকে প্রকাশিত ‘জাবাল ই নুর’ পত্রিকায় ‘জিজ্ঞাসা’ নামে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে দৈনিক প্রথম আলো, কালের কন্ঠ, সমকাল, সকালের খবর, যায়যায়দিন, দেশবাংলা, জনতা, স্থানীয় বিশ্লেষণ, সুবর্ণগ্রাম, আনন্দবাংলা, সাপ্তাহিক কালকিনি, কালকিনি ডটকম, খুলনা থেকে প্রকাশিত‘ কবি ও কবিতা’, ‘পানসী’, নীলফামারী থেকে ‘রাঙা শিমুল’,গোপালগঞ্জ থেকে ‘গাঙচিল কন্ঠ’, মাসিক কবিতাপত্র ‘বোধিবৃক্ষ’, ‘মিছিল’ ও লিটল ম্যাগাজিন ‘বুনন’সহ একাধিক পত্রিকায় কবিতা, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ছোট গল্পের জন্য ২০০৬, ২০১০ ও ২০১১ সালে ‘সুনীল সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।
সাংগঠনিক কার্যক্রম :
সাংবাদিক খায়রুল আলমের হাত ধরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার আগমন ঘটে। বন্ধুসভার প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাংবাদিক ইয়াকুব খান শিশিরের অনুপ্রেরণায় উদীচীর সাথে যুক্ত হন। সালাহ উদ্দিন মাহমুদ বর্তমানে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কালকিনি শাখার সহ সাধারণ সম্পাদক।  উদীচী মাদারীপুর জেলা সংসদের সাবেক কার্র্যনির্বাহী সদস্য, প্রথম আলো কালকিনি বন্ধুসভার সভাপতি,  জেজেডি ফ্রেন্ডস ফোরাম কালকিনির সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক, প্রথমা রঙ্গমঞ্চ কালকিনির পরিচালক, কালকিনি শিল্পকলা একাডেমির আবৃত্তি বিভাগের সাবেক সদস্য, মাদারীপুর শিল্পকলা একাডেমির নাটক বিভাগ ছাত্র,  মাদারীপুরের উদ্ভাস আবৃত্তি সংগঠনের  সদস্য, দহন সাহিত্য সংসদের সভাপতি ও কালকিনি প্রেসক্লাব’র সহ সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন।
আবৃত্তি চর্চা :
কলেজ জীবনে এসে বিভিন্ন আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। একাধারে লিগ্যাল এইড এসোসিয়েশন আয়োজিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিযোগিতায় আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করে বহুবার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এছাড়া টি আই বি, উদীচী, মাত্রা আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অক্ষুণœ রাখেন। বর্তমানে আবৃত্তি সংগঠন উদ্ভাস-এর সাথে নিয়মিত কাজ করেন।
নাট্য চর্চা:
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় ২০০৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর গড়ে তোলেন ‘প্রথমা রঙ্গমঞ্চ’ নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী। ২০০৮ সালে কালকিনি শিল্পকলা একাডেমীর বৈশাখী মেলা মঞ্চে সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনা ও পরিচালনায় ‘মুকুট বাবার মাজার’ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এরপর সালাহ উদ্দিন মাহমুদের রচনায় কাজী নিয়ামূল ইসলাম, জাহিদ হাসান, এইচ এম মিলন, মেহেদী হাসান, বি এ কে মামুন, মাইনুল ইসলাম ও নাফিজ সিদ্দিকী তপু’র পরিচালনায় আ.জ.ম কামালের নির্দেশনায় ‘ঘৃণা নয় ভালোবাসা চাই’, ‘আলোর পথে’,‘ ডিসকো ফকির’,‘ কালচারাল ফ্যামিলি’,‘বোকার হদ্দ’,‘ঘাতক’,‘যুদ্ধাপরাধী’,‘কাপুরুষ’ ও ‘মুক্তি’সহ বেশ কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়।
এছাড়া সালাহ উদ্দিন মাহমুদের পরিচালনায় লিয়াকত আলী লাকীর ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’,সেলিম আল দীনের ‘বাসন’,মমতাজ জামানের ‘মুক্তির জননী’,এস.এম সোলায়মানের‘ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচাল’,মান্নান হীরার‘ফেরারী নিশান’ ও মলিয়েঁরের ‘পেজগী’ মঞ্চস্থ হয়। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে পটুয়াখালীর ভান্ডারিয়ায় ওয়ার্ল্ড ভিশনের আমন্ত্রণে‘ঘাতক’মঞ্চস্থ হয়। একই বছর মার্চ মাসে যশোরে ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ‘মুক্তি’ নাটক মঞ্চস্থ করে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। জেলা শিল্পকলা একাডেমীর নাটক বিভাগের ছাত্র হিসাবে মাদারীপুরে ক্ষুদিরামের দেশে, গ্রাস, ফেরারী নিশান ও একটাই চাওয়া নাটকে অভিনয় করেন। তাছাড়া বিভাগীয় নাট্য উৎসবে ২০১২ সালের ৫ মে ফরিদপুরে শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চে ‘একটাই চাওয়া’ নাটকে অভিনয় করেন। ছাত্র জীবনে লিগ্যাল এইড এসোসিয়েশন আয়োজিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিযোগিতায় একক অভিনয়ে অংশগ্রহণ করে বহুবার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। বর্তমানে লিগ্যাল এইড এসোসিয়েশন মাদারীপুরের নাট্যদলের সাথে মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর অঞ্চলে ‘গ্রামের আদালত’ ও ‘সুবিচার চাই’ নাটকে নিয়মিত অভিনয় করেন।
সম্পাদনা:
কলেজ জীবন থেকে বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ করে আসছেন। কলেজের বাঙলা বিভাগের উদ্যোগে ‘রক্তিম ফালগুন’ নামে দেয়াল পত্রিকা দিয়ে সম্পাদনা শুরু করেন। কালকিনি বন্ধুসভা থেকে ‘বন্ধন’ ও ‘বৈশাখী’ নামে দেয়াল পত্রিকা, ‘আলোর পথে’ নামে সাহিত্য পত্রিকা ও ‘দহন’ নামে মাসিক কবিতাপত্র সম্পাদনা করেন। এছাড়া লিটল ম্যাগাজিন ‘বুনন’র সহ সম্পাদক হিসাবে কিছুদিন কাজ করেন।
সাংবাদিকতা:
তৎকালীন ‘আজকের কাগজ’র সাংবাদিক জাকির হোসেনের কাছে তার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। ২০০৭ সালে দৈনিক দেশবাংলা’র কালকিনি প্রতিনিধি হিসাবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরে দৈনিক বিশ্লেষণ’র বিশেষ প্রতিনিধি, দৈনিক প্রান্ত’র কালকিনি প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ ডটকম’র নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা’র কারকিনি প্রতিনিধি ও সাপ্তাহিক একুশ দর্পণের কালকিনি প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করেন। বর্তমানে দৈনিক সকালের খবর’র কালকিনি সংবাদদাতা, দৈনিক সুবর্ণগ্রাম’র কালকিনি প্রতিনিধি, সাপ্তাহিক আনন্দবাংলার কালকিনি অফিসে কর্মরত। এবং সাপ্তাহিক কালকিনির বার্তা বিভাগে ও কালকিনি ডটকমের সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত আছেন।
শেষ কথা :
গতাণুগতিকতার বাইরে থেকে কাজ করাই যার স্বভাব। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, চাকুরী ও সমাজ ব্যবস্থার বিরোধী সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিহিংসা তাকে আহত করে। জীবিকা নির্বাহের কথা কখনোই ভাবেন না। অর্থ-বিত্তের প্রতিও আকর্ষণ নেই বললেই চলে। তার মতে-‘ খ্যাতি ও বিত্ত এক সাথে আসে না। যার খ্যাতি আছে তার বিত্তের তেমন প্রয়োজন হয় না। বিত্তের লোভ মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করে। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপার্জনেই সন্তুষ্ট তিনি। আশা করি তিনি তার কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন। নিরন্তর শুভকামনা তার জন্য।

চৈতীর রোজনামচা

 সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
(সুনীল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটগল্প)

সারারাত দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি চৈতী। ফজরের আজানের পর সারারাতের ক্লান্তিতে অবশ শরীরে একটু চোখ বন্ধ করেছিল। তাও আবার মায়ের চেঁচামেচিতে ভেঙ্গে গেল। ঘরের দেয়াল ঘড়িটা ঢং ঢং শব্দে জানান দিলো- সকাল নয় টা।

বিছানা ছেড়ে উঠে বসল চৈতী। সারারাতের দু:শ্চিন্তাগুলো মাথার মধ্যে পোকার মতো কিলবিল করছে। প্রচন্ড মাথাব্যথা। কিছুই আর ভাবতে পারছেনা। দু’হাত দিয়ে মাথাটা চেঁপে ধরলো। জানালা খুলে ভোরের আলো দেখতে ইচ্ছে করছেনা। জীবনের আলো যার ফুরিয়ে এসেছে। জগতের আলোতে তার কী হবে? আলোকিত অতীত আর অন্ধকারাচ্ছন্ন বর্তমান তাকে দোদুল্যমান করে তুলেছে।
‘এ্যাই চৈতী, এ্যাতো ব্যালা পর্যন্ত ঘুমাস, কলেজে যাওয়া লাগবো না।’-মায়ের চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে পায় সে।

কলেজ! হ্যা, সেতো কলেজেই পড়ে। একাদশ শ্রেণীতে। কলেজের প্রিয় মুখগুলো ভেসে ওঠে মনের ক্যানভাসে। ভেসে ওঠে জমজ বোন চাঁদনীর মুখ। হঠাৎ আঁৎক ওঠে। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। না, যেভাবে হোক চাঁদনীকে তার রক্ষা করতেই হবে।

স্মৃতির পথ ধরে চৈতী চলে যায় চিরচেনা এক  জগতে। তখন সে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। জমজ বলে চৈতী ও চাঁদনী একই ক্লাসে পড়ে। তখনকার আনন্দের মুহূর্তগুলো এখন কেবল বেদনা বাড়ায়। চৈতীকে চাঁদনী, চাঁদনীকে চৈতী বলে অনেকেই ভুল করতেন। এমন কি শিক্ষকরাও।

মধুময় স্মৃতির প্রসবণ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে আসে কণ্টকাকীর্ণ মোহনায়। আসতে বাধ্য হয়। একরকম সুখেই কাটছিল ওদের দিনগুলো। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে রোজ একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কোন কথা নেই। শুধু অপলকে তাকিয়ে থাকা।

একদিন একটা গোলাপ ফুল হাতে চৈতী-চাঁদনীর পথ আগলে দাঁড়ায় ছেলেটা। চৈতীরা ভীত-সন্ত্রস্ত। এদিক-সেদিক তাকায়। নির্জন রাস্তা। দৌঁড়ে পালাবার সাহসও হয়না। চিৎকার করার মনোবৃত্তি জাগেনা মান-সম্মানের ভয়ে। নিথর হয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে দু’জন। ছেলেটার মুখে স্মীত হাসি।
‘আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। চৈতীর জন্য আমার এ ক্ষুদ্র উপহার।’-বলেই ফুলটা চাঁদনীর হাতে জোর করে গুঁজে দিয়ে কম্পমান পায়ে দাঁড়ায়। চাঁদনী হেসে ওঠে।
‘ফুলটা কার? চৈতী না চাঁদনীর ?’-ছেলেটা হতবাক।
থতমত খেয়ে বলে-‘চৈতীর জন্য।’
আবার হাসে চাঁদনী। ‘আমি চাঁদনী, এটা নিশ্চয়ই আমার নয়?’
ছেলেটা এবার ভীষণ লজ্জিত হয়Ñ‘সরি, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। যারটা তাকেই দিয়ে দাও।’-বলে দ্রুত চলে যায়। একবারও পিছন ফিরে তাকায়নি।

চৈতী ও চাঁদনী খুব মজা পায়। হাসতে হাসতে পা বাড়ায় স্কুলের দিকে।

সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে , না পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। বিষয়টি নিয়ে স্যার খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করছেন। কিন্তু কোন কথাই  চৈতীর মাথায় ডোকে না। কারণ চৈতীর পৃথিবীই এখন বিরামহীন ঘুরছে।
চৈতীকে লক্ষ্য করে স্যার বললেন,‘ চাঁদনী তোমার কী হয়েছে?’
চৈতী এবার হেসে উঠলোÑ‘ স্যার আমি চাঁদনী নই-চৈতী।’
‘এই হলো আর কী, কি হয়েছে তোমার?’-স্যার জানতে চাইলেন।
‘না স্যার কিছু হয়নি তো।’-বাধ্যগত ছাত্রের মতো কথাটা বলল চৈতী।
‘ ঠিক আছে পড়ায় মনোযোগ দাও।’ -বলেই স্যার পুনরায় আলোচনা শুরু করলেন।

একটা উদাসীনতা ক্রমেই গ্রাস করতে থাকে চৈতীকে। ঘুরে-ফিরে একটা লাল গোলাপ আর গোবেচারা ধরণের একটা চেহারা ভেসে ওঠে মনের ক্যানভাসে। ছেলেটার প্রতি কেন যেন একটা মায়া জন্ম হয় তার। ভালো লাগতে শুরু করে।

এই ভালোলাগাই ভালোবাসার মহিরূহ আকার ধারণ করে। মধুময় হয়ে ওঠে জীবন ও যৌবন। বাবা-মার অগোচরে ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে ভাবতে কতই না ভালো লাগে।

আর ভাবতে পারেনা। শরীরটা গুলিয়ে ওঠে। বমি বমি ভাব হয়। নিজের শরীরের দিকে তাকায়। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। নিজেকে নিজের কাছে কেমন অচেনা লাগে। শরীরটাকে আর নিজের বলে মনে হয়  না। রাতের কথা মনে পড়ে। খাবারের টেবিলে কী বিশ্রীভাবে বকলেন বাবা। বাবাতো বকবেনই। নিজের চোখে কে তার মেয়ের অধ:পতন সহ্য করবে? কিন্তু কূল-মানের আশা ছেড়ে চৈতী যার জন্য আজ পথের ভিখিরি। সেই বা কোথায়? এ পথের শেষই বা কোথায়? কেনই বা এমন হলো?

সাগরের পরিবার মেনে নেয়নি ওদের ভালোবাসা। তাই জোর করে সাগরকে বিয়ে করালো অন্য জায়গায়। চৈতীর মাথায় বাজ পড়লো। বিয়ের দেড় বছর পর ঘর আলো করে এল সন্তান। ঘর আলো করলেও সাগরের মন আলোকিত করতে পারেনি। পুরনো ভালোবাসা নাকি শরীরী টানে কাঙালের মতো ছুটে এসেছে চৈতীর কাছে।

এ কেমন খেলা? কোন আশায় বাঁধবে তারা খেলাঘর? এ কেমন পরীক্ষা? কী করবে এখন চৈতী? একটা দোদুল্যমানতা আঁকড়ে ধরে তাকে। কিন্তু মন যে মানে না। সেও কাছে পেতে চায় সাগরকে। ফিরে পেতে চায় হারানো ধন। একটি ঘর ভাঙ্গার আয়োজন চলে প্রতিনিয়ত। ভালোবাসার উন্মাদনায় মেতে ওঠে দু’টি প্রাণ। মনের টানে শরীরে শরীর ঘষে পেতে চায় মধুর উত্তাপ। দগ্ধ হতে চায় দু’জন। সে উত্তাপের আগুনেই তিলে তিলে দগ্ধ হয় চৈতী। পরকীয়ার অপবাদ নিয়ে গৃহবন্দীর মতো সময় কাটে। তিলে তিলে বিপর্যস্ত নাবিকের মতো ছেড়া পালে ভাঙ্গা নায়ে হাল ধরে বসে থাকে।

কথাটা বাবার কান অব্দি পৌঁছে যায়। তাই যাচ্ছে-তাই বলে বকলেন রাতে। দরজাটা খুলতে আর প্রবৃত্তি হয় না। এ মুখ সে কাকে দেখাবে, কীভাবে দেখাবে?

চাঁদনী কলেজে চলে গেছে। চৈতীর ওপর ঝড়ের বিধ্বস্ততা দেখে কলেজে যাওয়ার সময় ডাকতে ইচ্ছে হয়নি। বাবা রীতিমতো ফার্মেসীতে। মা গৃহস্থালির টুকিটাকি নিয়ে ব্যস্ত। ক্ষণে ক্ষণে চেঁচিয়ে যায়-‘চৈতী ওঠ, বের হ।’
ঝড়ের পূর্বাভাস সবাই টের পায়। আকাশে মেঘ দেখে সবাই বলে দেয় কীরকম ঝড় হতে পারে। ক্ষুব্ধ নদীতে মাঝি শক্ত হাতে হাল ধরে। উত্তাল সমুদ্রে নাবিক খোঁজে কূল। অকূল পাথারে পড়ে চৈতীও সাঁতরায়। খড়-কুটা ধরে বাঁচতে চায়।

টলতে টলতে গিয়ে বসে পড়ার টেবিলে। বইয়ের সাথে সাজানো ডায়রিটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টায়। কলমদানী থেকে একটা কলম নিয়ে পরাজীত জীবনের কিছু কথা লিখে রেখে যায় কালো অক্ষরে। ভুল আর মিথ্যা সম্পর্কের জাল ছিন্ন করতে না পারার ব্যর্থতা তাকে আর কতদূর নিয়ে যেতে পারে?

বাইরের কাজ শেষে ঘরে  এসে দরজা বন্ধ দেখে থমকে দাঁড়ায় চৈতীর মা। মেয়েটার হলো কী? বেলা বয়ে যায় তবু ওঠার নাম নেই। বাবা না হয় একটু বকেছে। ভুল করলে বাবাতো বকবেই। এখনতো ভুলেরই বয়স। বাবা-মাতো শাসন করবেই। তাই বলে এতো অভিমান? এতই যদি ঘৃণা হয়- তবে কেন একটা বিবাহিত ছেলের সাথে প্রেম। কেন অন্যের সাজানো সংসার তছনছ করার অভিপ্রায়। একবার হারানোর পরও কেন মিথ্যে প্রণয়ে আবদ্ধ হওয়া।

দরজায় কড়া নাড়ে বারকয়েক। কোন সাড়া শব্দ নেই। এমন অঘোরে কেউ ঘুমায়? হঠাৎ বুকের মধ্যে একটা হোচট খায়। দু:শ্চিন্তার রেখা অঙ্কিত হয় মুখে। জোরে জোরে ডাকে বারকয়েক। প্রতিবেশিরা কী ভাববে? মহল্লায় এমনিতেই কানাকানি। ঘরের কথা পরের মুখে বাতাসের আগে দৌঁড়ায়। তিলকে তাল বানানোর ভয়। কণ্ঠ কিছুটা ক্ষীণ হয়ে আসে। এবার সে হতাশ হয়ে পড়ে।

দরজা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে যায় চৈতীর মা। নির্বাক চোখে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ে দু’গন্ড বেয়ে। সম্মুখে ঝুলন্ত চৈতীর শরীর। নিথর সে দেহ। চৈতীর চোখে মুখে ক্ষোভের বিচ্ছুরণ। জিহ্বাটা বের হয়ে দু’মাড়ির দাতের সাথে আটকে আছে। এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় একটি টিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন চৈতীর মা। চিৎকার আর পতনের শব্দে ছুটে আসেন পাশের বাড়ির একজন। ক্রমান্বয়ে বাড়ি ভর্তি লোকজন। আত্মীয়-স্বজন, শত্র“-মিত্র, থানা-পুলিশ, সাংবাদিক, হিতাকাক্সিক্ষ-পরশ্রীকাতর সহ সর্বস্তরের মানুষ।

চৈতী এখন একটা লাশ। সবাই ভুলে যাচ্ছে তার নাম। সবার মুখে মুখে চৈতী শব্দের পরিবর্তে লাশ শব্দটাই ব্যবহার হচ্ছে। সুরতহাল প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ ও ময়না তদন্তের জন্য মর্গে পাঠানোর আয়োজন চলছে। পুলিশের হাতে একটি রোজনামচা। আলামত সংগ্রহ করতে গিয়ে যেটা পাওয়া গেছে চৈতীর টেবিলে। সাংবাদিকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তার উপর।

পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে এক জায়গায় এসে সবার চোখ আটকে যায়। কোন সম্বোধন ছাড়াই শুরু হয়েছে লেখাটি
         ‘ লম্পট সাগর আমাকে বাঁচতে দিল না। ভালোবাসার অভিনয় করে মিথ্যা আশ্বাসে আমাকে নষ্ট করেছে। এখন আমার ছোট বোনকেও নষ্ট করবে বলে হুমকি দিচ্ছে। একথাগুলো কাউকেই বলতে পারলামনা। আমার বাবা খুব রাগী। তাকে খুব সম্মান করি। তাই তার কাছেও বলার সাহস হয়নি।

একটা মেয়ে কখন তার জীবনের মায়া ত্যাগ করে? কিন্তু আমি যে বাঁচবো, তার কোন কূল-কিনারা বা পথ খুঁজে পাই না। বাধ্য হয়ে আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম।

আব্বু-আম্মু, তোমরা আমাকে ক্ষমা করে দিও। দাদু,কাকা,চাঁদনী,আন্না,মুন্না ও স্বর্ণা তোমরা কেউ আমার জন্য কেঁদ না।

যারা আমার চিঠি পড়বেন, তাদের কাছে আমার একটাই অনুরোধ- আমার মতো আর কারো জীবন যেন নষ্ট না হয়। এই সব লম্পট বখাটে ছেলের শিকার যেন আর কাউকে না হতে হয়।
 ইতি, চৈতী।’

স্বপ্ন

প্রিয়া চক্রবর্তী

এক সময়ে স্বপ্ন ছিল
চড়বো কবে গাড়ি,
কবে হবে এ শহরে
তিনতলা এক বাড়ি।
সোনারগাঁয়ে নাস্তা খাব
শেরাটনে ডিনার,
লং ড্রাইভে আড্ডা মেরে
গড়বো স্মৃতির মিনার।
মুঠোফোনে কথা বলে
দিন বানাবো রাত,
রুই কাতলা রাঘব বোয়াল
অমনি কুপোকাত।
এখন আমার সব হয়েছে
হইনি আমি মানুষ,
সুখ শান্তির বাইরে থাকা
রঙ করা এক ফাণুস।

স্বাধীন বাংলাদেশ

আমির হোসেন

স্বাধীনতা তুমি চির মুক্ত আকাশ,
মুক্ত কেতন ওড়ার শো শো আওয়াজ।
স্বাধীনতা তুমি মায়ের কোলে দোলনার দোল,
বোনের গালে মাখা রাঙা আবীর।
স্বাধীনতা তুমি রক্তে মাখা বিজয় নিশান,
লক্ষ কোটি জনতার উল্লাস।
স্বাধীনতা তুমি বাবার মুখে শেখা প্রথম বুলি,
আমার চির মুক্ত স্বদেশ তুমি।

একাদশ শ্রেণী
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ।






প্রিয় স্বদেশ

আলী ইদরিস

শিশিরের ঘুম ভাঙেনি এখনও
অবগুন্ঠন খোলেনি শীতের প্রকৃতি,
কুয়াশায় ঘেরা অস্পষ্ট শস্য ক্ষেত আর
শিশির ভেজা পথে হেটেছি দিগি¦জয়ী বীরের বেশে,
কত শিশিরের মুখে দেখেছি প্রথম সূর্যের হাসি
বিকেলের ম্লান রোদেও তুমি এত সুন্দর!
এই প্রথম আবিষ্কার করি সরষে ফুলে তোমার ছবি।

তুমি রাগলেও যে এত ভাল লাগে
কালো মেঘের পাশে উড়ন্ত বলাকা দেখেছ?
কত সুন্দর ! ও তোমার রাগান্বিত চোখের উপমা।
আমি স্বপ্নিল বলাকার মত আত্মবিশ্বাসে
পাখা মারি তোমার আকাশে বাতাসে
আমার বিশ্বাস তোমার বুকেই আমার নিশ্চিত আশ্রয়।
অঝোর বর্ষার জলে ভাসিয়ে দিবে না তো!
বলো কার কাছে গেলে পাবো এত ভালোবাসা,
কার এমন সুন্দর মুখ প্রাণে জাগাবে নতুন আশা?

মেঘমুক্ত সুনীল আকাশসম হৃদয়ে তোমার
আমি জারুল, কৃষ্ণচূড়া হয়ে ফুটবো,
গহীণ অরণ্যে বুনো ঝোপের আড়ালে
নামহীন ফুলের মত সুবাস বিলাব
তোমার উড়ন্ত উৎসবে।

তুমি যে আমার প্রিয় স্বদেশ।